ঢাকা, মঙ্গলবার 21 August 2018, ৬ ভাদ্র ১৪২৫, ৯ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ঈদের প্রস্তুতির শেষ মুহূর্তে ভিড় মসলা সেমাই ও দা বটির দোকানে

* মসলা সেমাইয়ের দাম অনেক  বেশি   
* দাম বেড়েছে দা বটির
মুহাম্মদ নূরে আলম: পবিত্র ঈদুল আযহার আর মাত্র একদিন বাকী। কুরবানি ঈদে মসলার চাহিদা সবচেয়ে বেশি। শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায় মসলার দোকানগুলোতে তাই ভিড় সবচেয়ে বেশি। ঈদকে সামনে রেখে সব ধরনের মসলার দামও বেড়েছে অন্তত ২০ শতাংশ। তবে খুচরা ও পাইকারি বাজারে মসলার দামে রয়েছে বেশ পার্থক্য। ক্রেতারা বলছেন, মসলার দাম আগের চেয়ে অনেক বেশি। তবে বিক্রেতারা বলছেন, বেশ কিছুদিন ধরেই মশলার দাম স্থিতিশীল রয়েছে। খুচরা ও পাইকারি বাজার ঘুরে ক্রেতা বিক্রেতাদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। ঈদে আপ্যায়নের অন্যতম অনুষঙ্গ সেমাই। শুধু অতিথি আপ্যায়নে নয়, অনেকেরই পবিত্র ঈদুল আজহা দিন শুরু হয় সেমাই খেয়ে। তাই ঈদের কেনাকাটার শেষ পর্যায়ে মানুষ এখন ছুটছে সেমাই-চিনি কিনতে।
কুরবানির ঈদকে সামনে রেখে কামার পাড়ায় ব্যস্ততা বেড়েছে কামারদের। কেউ ভারি হাতুড়ি দিয়ে পেটাচ্ছেন দগদগে লাল লোহার খন্ড। কেউ শান দিচ্ছেন, কেউবা আবার কয়লার আগুনে বাতাস দিচ্ছেন। এক রকম পাল্লা দিয়ে কাজে নেমেছেন তারা। লোহা পিটিয়ে তৈরী করছেন দা বটি চাপাতি ছুরিসহ করবানির গোশত কাটার উপযোগী সামগ্রী।
মসলার বাজার: এদিকে কারওয়ান বাজারের খুচরা বাজারে দেখা গেছে, জিরা ৩৮০ থেকে ৪০০ টাকা, দারচিনি ৩৪০ টাকা, এলাচি ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকা , লবঙ্গ ১০০ টাকা, গোলমরিচ ৮০০ টাকা, কিচমিচ ৩৮০ থেকে ৪৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বিক্রেতা আব্দুস সালাম বলেন, কোনোটাতে হয়তো কেজিতে ১০ টাকা বেড়েছে, আবার কোনোটাতে ১০ টাকা কমেছে। সবমিলিয়ে দাম খুব একটা বাড়েনি। এলাচ বাদে অন্য সবগুলোর দাম প্রায় একই রয়েছে। আর বেচাকেনা অন্য সময়ের চেয়ে এখন অনেক বেশি।
 মো. শাহ আলম বাজার করতে এসেছিলেন কারওয়ান বাজারে। মসলা কেনাকাটার পর বলেন, ‘গরিব মানুষ। তারপরও তো কিছু কেনাকাটা করতে হয়। আর মসলার দাম তো এখন একটু বেশিই।’ ফার্মগেটের বাসিন্দা ফাতেমা আক্তারও বলেন, কুরবানি এলেই মসলার দাম বাড়ানো হয়। এখন মসলার দাম আগের চেয়ে বেশি। তবে মনিপুরী পাড়ার বাসিন্দা আব্দুল বাকী (৪০) বললেন, মসলার বাজারে দাম রয়েছে আগের মতোই। এদিকে, পাইকারি বাজারে জিরা কেজিতে ৩৪০ থেকে ৩৪৫ টাকা, দারচিনি ২৮০ থেকে ২৯০ টাকা, এলাচি ১৬৫০ থেকে ১৯৫০ টাকা, গোলমরিচ ৫০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। একমাসের ব্যবধানে এসব পণ্যের দাম কেজিতে ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। পাইকারি বিক্রেতা সেলিম মিয়া বলেন, দুই মাস আগে যে এলাচ ১১শ টাকা ছিল, সেটা এখন ১৭০০ টাকা। আর ১৪শ টাকায় যা বিক্রি হতো, তা এখন ২০০০ টাকা। এছাড়া, বাজারে কেজিতে আদার দাম বেড়েছে ২০ টাকা। সপ্তাহখানেক আগে বার্মিজ আদা ৮০ টাকায় বিক্রি হলেও গত রোববার তা ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর তিন দিন আগে চায়না আদা ৮০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন তার দাম ৯০ টাকা। অন্যদিকে, রসুন বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ টাকা কেজিতে। এসব তথ্য জানান বিক্রেতা মো. কামরুল। বলেন, ঈদে বেচাকেনা খুব একটা বাড়েনি।
এদিকে, পাইকারি বাজারে দেশি পেঁয়াজ ৫০ টাকা ও ভারতীয় পেঁয়াজ ৩০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। কারওয়ান বাজারের পাইকারি বিক্রেতা ময়না বলেন, ভারতীয় পেঁয়াজের দাম ৩৪ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল, এখন তা ৩০ টাকায় নেমে এসেছে। আর দেশি পেঁয়াজ ৫২ টাকা পর্যন্ত উঠলেও এখন তার দাম ৫০ টাকা। এই বিক্রেতার মতে, ‘ঈদের পর পেঁয়াজের দাম আরও কমবে’ বাণিজ্যমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের প্রভাবেই ক্রেতারা এখন পেঁয়াজ কেনা থেকে দূরে রয়েছেন। ফলে বাজারে পেয়াজের দাম কমে নাই। এতে ঈদের আগে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
অন্যদিকে, খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, দেশী পেঁয়াজ ৬০ টাকা, ভারতীয় ৪০ টাকা, রসুন ৮০ টাকা ও আদা ১২০ থেকে ১৪০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। মসলাজাতীয় পণ্যের মধ্যে ছোট এলাচ ২০০০ থেকে ২২০০ টাকা কেজি, দারচিনি ৪০০ টাকা, জিরা ৪৮০ টাকা, লবঙ্গ ১৪০০ টাকা ও গোলমরিচ ১১০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
মহাখালী বউবাজারের খুচরা দোকানি মো. আলম বলেন, অন্য সময়ের চেয়ে মসলার দাম এখন গড়ে অন্তত ২০ শতাংশ বেশি। বেচাকেনাও বেশ ভালো। মশলা জাতীয় পণ্যের বেচাকেনা বেড়েছে অন্তত ৫০ শতাংশ। সেখানে বাজার করতে আসা গৃহিণী সোহেলি বেগম ( ৩৫) বললেন, কোরবানি এলেই মসলার দাম বাড়ে। দাম বাড়তি হলেও কিনতে তো হবেই।
ঈদের বাজারে শেষ মুহূর্তে কেনাকাটা সেমাই কিচমিচ: গতকাল সোমবার রাজধানীর বিভিন্ন স্থানের মুদি দোকান ও সুপার শপগুলোয় সেমাই-চিনি কিনতে দেখা গেছে ক্রেতাদের। মালিবাগ বাজারে গিয়ে দেখা যায়, সামনেই সাজিয়ে রাখা আছে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সেমাই। এখানে বনফুল, প্রাণ, ওয়েল ফুড, কুলসন, কিশোয়ান, ড্যানিশ ও প্রিন্স ব্র্যান্ডের ২০০ গ্রাম লাচ্ছা সেমাই বিক্রি হচ্ছে ৩৫ টাকায়। আর ৫০০ গ্রামের স্পেশাল লাচ্ছা সেমাই বিক্রি হচ্ছে ৯০ থেকে ১২০ টাকায়। এখানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হলদিরাম ভুজিওয়ালা নামের একটি ব্র্যান্ডের সেমাইও দেখা যায়। লাচ্ছা সেমাইটির ২০০ গ্রামের দাম ১৬০ টাকা। এখানে চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের আখের চিনির দাম ৭০ টাকা, ফ্রেশ চিনি ৭৩ টাকা, তীর ৭২ টাকা প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া এখানে বিভিন্ন প্যাকেটজাত সেমাই ছাড়াও বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ঘি, কিশমিশ, বাদাম, মসলা, দারুচিনি, এলাচি, গুঁড়ো ও তরল দুধ বিক্রি হচ্ছে। গতকাল কারওয়ান বাজারের পাইকারি সেমাইয়ের দোকানগুলোয়ও ক্রেতাদের বেশ ভিড় দেখা গেছে। কারওয়ান বাজারের বিক্রেতারা বলেন, পোশাক কেনা শেষে লোকজন এখন সেমাই-চিনি কিনছেন।
কারওয়ান বাজারে ২০০, ৪০০, ৫০০ ও ৮০০ গ্রামের সেমাইয়ের প্যাকেট বিক্রি হচ্ছে। প্যাকেটজাত সেমাইয়ের পাশাপাশি এখানে খোলা সেমাইও বিক্রি হচ্ছে। কারওয়ান বাজারের বিভিন্ন দোকানে খোলা চিকন সেমাই বিক্রি হচ্ছে এক কেজি ৫০ থেকে ৮০ টাকা করে। দুই ধরনের খোলা লাচ্ছা সেমাই বিক্রি হচ্ছে এখানে। একটা সাদা, আরেকটা রঙিন। সাদা লাচ্ছা সেমাই বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৯০ থেকে ১৫০ টাকায়, রঙিনগুলো ৯০ থেকে ১০০ টাকায়। এখানে খোলা চিনির খুচরা মূল্য ৬৮ থেকে ৭০ টাকা। কারওয়ান বাজারে কিশমিশ ২০০ গ্রাম ১৩০ থেকে ১৬০ টাকা, আলুবোখারা ১০০ গ্রাম ৯০ টাকা, মিক্সড ফ্রুট ৫০ গ্রাম ৪৫ টাকা, পেস্তা বাদাম ১০০ গ্রাম ১৭০ টাকা, দারুচিনি ৫০ গ্রাম ২৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
রাজধানী ঢাকায় শেষ মুহূর্তে দা বটি ছুরির দোকানে ভিড়: ঈদুল আজহার আগে ব্যস্ততা বেড়েছে কামার পাড়াগুলোতে। দিনরাত ধারালো অস্ত্র তৈরিতে ব্যস্ত কারিগররা। তবে, এখনো তেমন বেচাকেনা না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন তারা। হাতুড়ি পেটানোর এমন টুং-টাং শব্দে মুখর কারওয়ান বাজারসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার কামারের দোকানগুলো। লোহা পিটিয়ে দিনরাত দা, বটি, ছুরি, চাপাতি তৈরিতে ব্যস্ত কারিগররা। ঈদুল আজহা সামনে রেখে এবার অনেক আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছেন এ’সব এলাকার দোকানিরা। লোহার মান ও আকারভেদে দা, বটি বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন দামে। তবে, প্রত্যাশা অনুযায়ি ক্রেতা না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন তারা। তবে দাম বেশির অভিযোগ ক্রেতাদের। এ কোরবানীর ঈদে গরু, ছাগল ও উট কুরবানির পশু হিসেবে জবাই করা হবে। আর এসব পশুর গোস্ত কাটতে দা, বটি, ছুরি, ও চাপাতি ইত্যাদি ধাতব হাতিয়ার অপরিহার্য। এজন্য গৃহস্থালি ব্যতিব্যস্ত দা, বটি, চুরি, ও চাপাতি শান দিতে। এদিকে ধাতব সরঞ্জামাদী শান দিতে কামার পাড়াগুলোতে ভিড় বাড়ছে সাধারণ মানুষের। ভ্রাম্যমাণ কামাররা চষে বেরাচ্ছে ছোট-বড় বিভিন্ন হাট-বাজারে। আগামী ২২ আগস্ট কুরবানির ঈদের তারিখ নির্ধারণ হওয়ায় দা-ছুরি সংস্কারের জন্য রাজধানীবাসী ইতোমধ্যে ভিড় করছেন কামারের কাছে। কেউ দাম-দর করছেন বাজার বোঝার জন্য কেউবা কিনে নিচ্ছেন পছন্দের দা-ছুরি। গতকাল রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকার কামারশালা ঘুরে দেখা যায় এক ধরনের ফুরফুলে মেজাজেই ব্যস্ত সময় পার করছেন কামাররা। কেউ তৈরি করছেন দা, কেউ বা তৈরি করছেন চাপাতি আবার কেউ কেউ তৈরি করছেন ছুরি। আর এসব জিনিস সারিবদ্ধভাবে দোকানের সামনে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে চাপাতি ৩০০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা, দা ৩০০ টাকা থেকে ৮০০ টাকা, কুড়াল প্রতি কেজি ২৫০ টাকা, চাকু ৫০ টাকা থেকে ১২০০ টাকা, খুন্তি ২৫ টাকা, হাতা ৬০ টাকা থেকে ৭০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে কামারশালায়।
ব্যবসায়ী মনির হোসের জানায়, আমি প্রায় ২০ বছর ধরে এ পেশায় নিয়োজিত। ঈদকে কেন্দ্র করে আমরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছি। আগে প্রতিদিন আমার ৪০০ টাকা বিক্রি হতো, এখন ১৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্তও জিনিস বিক্রি হচ্ছে। এবার ঈদে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা বিক্রি হবে বলে তিনি আশা করছেন। আমাদের এখানে বিক্রি সব সময়ই ভালো হয়। তবে সামনে কোরবানি উপলক্ষে বিক্রি বেশি হয়। দিদার নামের এক ক্রেতা বলেন, কয়েক দিন পরেই তো ঈদ। আগে থেকে সব কিনে রাখছি। যাতে পরে অসুবিধা না হয়। প্রতি বছরের ন্যায় এবার ঈদেও কন্ট্রাক্টে পশু জবাই করব আমরা কয়েকজন। এসময় ভালো মানের দা-ছুরির প্রয়োজন হয়। এখানে ভালো মানের দা-ছুরি পাওয়া যায়। তাই কিনতে এসেছি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ