ঢাকা, মঙ্গলবার 21 August 2018, ৬ ভাদ্র ১৪২৫, ৯ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

দালাল-বহিরাগত দিয়ে চলছে কক্সবাজার বিআরটিএ’র কার্যক্রম!

শাহনেওয়াজ জিল্লু, কক্সবাজার: সম্প্রতি রাজধানী ঢাকায় গাড়ি চাপা দিয়ে দু’শিক্ষার্থীকে হত্যার প্রতিবাদে দেশব্যাপী শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবীতে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলে। এর ধারাবাহিকতায় সড়কের যাবতীয় অনিয়ম দুরীকরণে সরকারও হার্ডলাইনে পা দিয়েছে। চলমান এ অভিযানের ফলে যানবাহন সংক্রান্ত সমস্ত কাজ নিয়ে বিআরটিএ কার্যালয় মুখী হয়েছে যানচালক, মালিক ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। এসুযোগে কক্সবাজার বিআরটিএ অফিসে চলছে অনিয়ম দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্য। চিহ্নিত বহিরাগত দালালরাই এখন এ অফিসের কথিত সরকারী স্টাফ। চেয়ার টেবিল নিয়ে দপ্তর বসিয়ে যানবাহন সংক্রান্ত কার্যক্রম হরদমে চালিয়ে যাচ্ছে এরা। ভুক্তভোগীরা বলছেন, এই অফিসের অনিয়মের প্রথা দীর্ঘদিনের পুরোনো হলেও এখন বৃদ্ধি পেয়েছে আরও বহুগুণে। যার ফলে ওই কার্যালয়ে সেবা নিতে গিয়ে নানাভাবে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন জেলার যানবাহন মালিক, চালক ও সাধারণ মানুষ। কক্সবাজার বিআরটিএ কার্যালয়ের প্রধান সহকারী পরিচালক মো. জামাল উদ্দিনের সামনেই এসব অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা চলমান রয়েছে। একথা তিনি নিজেও মৌখিকভাবে স্বীকার করেছেন যে, বহিরাগত দালাল সাবের, বাবুল ও নুরুল ইসলামসহ আরোও বেশ কয়েকজন যুবক সেখানে কাজ করছে। তবে তারা কেউ এই অফিসের প্রকৃত কর্মচারী নয়। তাহলে কিভাবে সরকারী অফিসে বসে বহিরাগত দালালেরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আগের অফিসাররা তাদেরকে এখানে রেখে দিয়েছে তাই আমিও রেখে দিয়েছি। আপনারা বললে তাড়িয়ে দিবো। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, বহিরাগত দালাল দুর্নীতিবাজরাই যদি যানবাহনের লাইসেন্স দেওয়ার কাজে যুক্ত থাকে তাহলে কিভাবে সৃষ্টি হবে নিরাপদ সড়ক ও নিরাপদ চালক।
সরেজমিন দেখা যায়, নিরাপদ সড়কের দাবীতে চলমান আন্দোলন ও তৎপরতার কারণে যানবাহন সংশ্লিষ্টরা এখন ভীড় জমিয়েছে বিআরটিএ অফিসে। সেবা দিতে অফিসের কর্মকর্তা কর্মচারীরা সকলেই ব্যাস্ত রয়েছেন। বিআরটিএ অফিসের এই শুভ চিত্রের মাঝে ধরা পড়লো ভয়াবহ অশুভ চিত্র। অফিসের ভেতরে বাহিরে দালাল এবং বহিরগতদের আনাগোনা।
এমনকি চেয়ার টেবিল নিয়ে বসে অফিসও করছে তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সেবাপ্রার্থী জানান, সকল অনিয়মের নাটের গুরু এই অফিসের বড়কর্তা। তার আস্কারাতেই এসব অনিয়ম দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে।
এমনকি সাংবাদিকরা কোনো তথ্য জানতে চাইলে দায়সারা এলোমেলো কথাবার্তা বলে এড়িয়ে যান এই কর্তা। শুধু তাই নয়, অধীনস্তদের কাছেও তিনি যেনো জিম্মি। কারণ এ অফিসে বহিরাগত কতিপয় যুবক তার চোখের সামনেই সরকারি অফিসে চেয়ার টেবিল নিয়ে যানবাহন সংক্রান্ত সমস্ত কাজ এবং কাগজপত্র তারাই সম্পাদন করছে বছরের পর বছর। কিন্তু এবহিরাগতরাদের ব্যাপারে তিনি নিজেই অকপটে স্বীকার করেন তারা অফিসিয়ালী কোনো স্টাফ না তবে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতেও অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি। তার এমন রহস্যজনক আচরণে কোন প্রশ্নের উত্তর মিলছেনা।
ভুক্তভোগীরা জানান, বিআরটিএ অফিসে গেলে দালাল ছাড়া কোনো কাজ হয় না। ব্যাংকে সরকারি ফি দিয়ে কাগজপত্র জমা দিতে গেলে অফিসের কর্মচারীরা সেই কাগজ ঠিক করার নামে দালালের হাতে তুলে দেন। দালালের সঙ্গে চুক্তি করে টাকা দেওয়ার পর অফিসে জমা নেওয়া হয়। এরপর থেকে যথারীতি দালালের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হয় গ্রাহকদের।
জানা যায়, একটি সিএনজি অটোরিকশা রেজিস্ট্রেশন করতে ব্যাংকে সরকার নির্ধারিত ফি জমা দেওয়ার পরও অফিস খরচ হিসেবে মালিকদের ৩৫ হাজার টাকা বাড়তি গুনতে হয়। লাইসেন্স নবায়ন করতে এক হাজার ৫০০, ফিটনেস বাবদ অতিরিক্ত ৮০০, রুট পারমিট বাবদ এক হাজার, বাস, ট্রাক ও পিকাপের ক্ষেত্রে ফিটনেস বাবদ সাড়ে তিন হাজার ও রুট পারমিটে দেড় হাজার টাকা দিতে হয়। মালিকানা বদলির ক্ষেত্রে আড়াই হাজার টাকা, দুর্ঘটনার রিপোর্ট প্রদানকালে দিতে হয় ৫-১০ হাজার টাকা। তাছাড়া মোটরসাইকেল রেজিস্ট্রেশনে অতিরিক্ত দেড় হাজার, মালিকানা বদলির জন্য দুই হাজার টাকা অফিস খরচ বাবদ নেন কর্মকর্তারা।
দালালরা সন্ধ্যার পর কখনো সহকারী পরিচালকের (এডি) কক্ষে, কখনো অফিস সহকারী ও পরিদর্শকের কক্ষে এ টাকা লেনদেন করেন বলে জানা যায়। শুধু তাই নয়, লাইসেন্স ও কাগজপত্র ডেলিভারি দেওয়ার সময় বখশিশের নামে দেড় থেকে ২হাজার টাকা দিতে হয়। লাইসেন্স ও ডিজিটাল ব্লু- বুকের ছবি তোলার সময় ১০০ এবং মোটরসাইকেল ও অটোরিকশার নাম্বার প্লেট সংযোজনকালে তারা ১০০ টাকা করে আদায় করে। কয়েকজন সিএনজিচালক অভিযোগ করেন, বিআরটিএ কার্যালয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে গেলে ১৫-২০ হাজার টাকা দাবি করে দালালরা। দিনে এনে দিনে খাওয়া এসব শ্রমিক একসঙ্গে এত টাকা দিতে না পারায় লাইসেন্স আর হয় না। জানা যায়, জেলার প্রায় ৯৫ ভাগ চালকেরই লাইসেন্স নেই।
এব্যাপারে জেলা প্রশাসক কামাল হোসেন গণমাধ্যমকর্মীদের জানান, তিনি এখন জেলার বাহিরে অবস্থান করছেন। ফিরে এসে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখবেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ