ঢাকা, সোমবার 19 November 2018, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের এক বছর: প্রত্যাবাসনে প্রকৃত অগ্রগতি নেই

সংগ্রাম অনলাইন ডেস্ক:

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্মম নির্যাতন ও গণহত্যার হাত থেকে বাঁচতে দেশটির রাখাইন প্রদেশের শতকরা ৯০ শতাংশ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়।জাতিসংঘ একে ‌‌''জাতিগত নির্মূল অভিযান'' বলে অভিহিত করলেও গত এক বছরেও এর কোন প্রতিকার হয়নি।

উপরন্তু ইতোমধ্যে যে অল্প সংখ্যক রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নেয়া হয়েছে, তাদের উপরও নতুন করে নির্যাতন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে প্রায় ৭ লক্ষ বাস্তুহারা মানুষ বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।তাদের এই অনিশ্চিত জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে ভয়াল সন্ত্রাস, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া, হত্যা, নির্যাতন ও ধর্ষণের দুঃসহ ইতিহাস।

জাতিসংঘের হিসেব মতে, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ৯ লক্ষ ৬০ হাজার রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুকে আশ্রয় দিয়েছে, এদের মধ্য এক বছর আগে যারা আশ্রয় নিয়েছে তারাও রয়েছে।তবে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ বলছে, এই সংখ্যা দশ লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে।

সর্বশেষ আগতদের বেশিরভাগই আশ্রয় নিয়েছে ঘন বসতিপূর্ণ কুতুপালং-বালুখালি আশ্রয় শিবিরে, যা ইতোমধ্যে ''মেগা ক্যাম্প'' নামে পরিচিত এবং আশ্রয়প্রাপ্ত উদ্বাস্তুদের সংখ্যা ৬ লাখেরও উপরে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার প্রায় এক লক্ষ রোহিঙ্গাকে সীমান্তবর্তী ভাসান চর উদ্বাস্তু শিবিরে সড়িয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করেছে, যা মূলত জনমানবহীন একটি নদী-তীরবর্তী নির্জন দ্বীপ, প্রায় বিশ বছর আগে এটি বঙ্গোপসাগরের বুক চিরে জেগে উঠেছিল।

সরকার বলছে, তারা দ্বীপটিতে বাড়ীঘর এবং অবকাঠামো নির্মাণ বাবদ ২৮০ মিলিলিয়ন ডলার ব্যয় করবে।সরকার আরো বলছে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পর এটি স্থানীয় অধিবাসীরাও ব্যবহার করতে পারবে।

কিন্তু হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সহ মানবাধিকার সংস্থাগুলো সরকারের এই উদ্যোগের সমালোচনা করে বলেছে, নদীর উচ্চ তরঙ্গ, জোয়ার এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে দ্বীপটি এখনো মানুষের বসবাসের উপযোগী হয়নি।

এদিকে একবছর পার হয়ে গেলেও মিয়ানমার নেত্রী অং সান সুচি এখনো রাখাইনে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির বিরুদ্ধে তার সরকারের বিতর্কিত পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সাফাই গেয়েই চলেছেন এবং সেনাবাহিনীর অত্যাচারের কথা অস্বীকার করছেন।

শনিবার বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের প্রথম বার্ষিকী হলেও তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় প্রকৃতপক্ষে কোন অগ্রগতি নেই।

মিয়ানমারের সাথে শুধুমাত্র আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে রাখাইন রাজ্যে উপযোগী পরিবেশ না থাকায় রোহিঙ্গারা এখনো বাংলাদেশে আসছে।

পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইউএনবিকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত, একমাত্র অগ্রগতি হচ্ছে প্রত্যাবাসন বিষয়ে মিয়ানমারের সাথে আলোচনা বন্ধ হয়নি। দুর্ভাগ্যবশত রাখাইন রাজ্যে অনুকূল পরিবেশের অভাবে রোহিঙ্গারা এখনো বাংলাদেশে আসছে।’

সম্প্রতি সিঙ্গাপুরে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি এক বিবৃতিতে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন বিলম্বিত হওয়ার জন্য বাংলাদেশকে দায়ী করেন। রোহিঙ্গাদের দ্রুত মিয়ানমারের ফেরানোর সময়সীমা বাংলাদেশের ওপর নির্ভর করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

 ‘এটি সত্যি নয় যে বাংলাদেশ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বিলম্বিত করছে’ উল্লেখ করে ওই কর্মকর্তা বলেন, প্রতি সপ্তাহে এখনো রোহিঙ্গাদের ছোট ছোট দল বাংলাদেশে  আসছে।

আগামীকাল ২৫ আগস্ট রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের ওপর দমন অভিযানের প্রথম বার্ষিকী। অথচ উল্টো প্রতিক্রিয়ায় মিয়ানমার বলছে, পুলিশ স্টেশনে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) আক্রমণ করেছে।

সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগীরা হাজার হাজার রোহিঙ্গাদের হত্যা করেছে, গ্রামের অসংখ্য ঘরবাড়ি পুড়িয়েছে, ব্যাপক যৌন সহিংসতা চালিয়েছে। ফলে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে।

এক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ সীমান্ত এখনো খোলা রয়েছে যা নজিরবিহীন এবং মানবিক ভিত্তিতে বাংলাদেশ উদারতা দেখাচ্ছে।

গত মঙ্গলবার সিঙ্গাপুরে এক বক্তব্যে মিয়ানমার নেত্রী সু চি বলেন, রোহিঙ্গা মুসলিমদের রাখাইন রাজ্যে ফেরানোর বিষয়ে সময়সীমা বেঁধে দেয়া কঠিন। কারণ এ বিষয়ে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় নেয়া দেশ বাংলাদেশের সহযোগিতা প্রয়োজন মিয়ানমারের।

তিনি বলেন, ফেরত আসা রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেছে মিয়ানমার। কিন্তু রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর বিষয়টি বাংলাদেশের ওপর নির্ভর করছে।

রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্মম দমন অভিযানের কারণে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা মুসলিমদের দেশ ছেড়ে বাংলাদেশে পালানোর ঘটনায় মিয়ানমার সরকারের পদক্ষেপে সমর্থন জানিয়ে সু চি বলেন, সন্ত্রাসবাদের কারণে সংকট সৃষ্টি হয়েছে, সামাজিক বৈষম্যের কারণে নয়।

গত ১১ আগস্ট পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল রাখাইন রাজ্য পরিদর্শনে করে ওই রাজ্যে চালানো ‘ব্যাপক বিধ্বংসী অবস্থা' পর্যবেক্ষণ করেছেন। বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের পুড়ে যাওয়া ঘরবাড়িগুলো সরেজমিনে ঘুরে দেখেছেন। অথচ মিয়ানমার সরকার ওইসব ঘরবাড়িতে ‘দুর্ঘটনাজনিত আগুন' লেগেছে বলে বর্ণনা করছে।

রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র সচিব এম শহিদুল হক বলেন, তারা খুব আশাবাদী যে রোহিঙ্গারা রাখাইনে তাদের নিজ বাড়িতে একটি প্রক্রিয়া মধ্য দিয়ে ফিরে যাবে।

তবে তিনি জানান, মিয়ানমার ফিরে যাওয়ার আগে রোহিঙ্গারা তাদের সুরক্ষা, নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকারের নিশ্চিয়তা চাচ্ছেন। সেজন্য প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াটি কিছুটা বিলম্বিত হচ্ছে।

‘এতে কোন সন্দেহ নেই যে তারা মিয়ানমার ফিরে যাবেন’, বলেন পররাষ্ট্র সচিব।

তিনি আরো বলেন, ‘পুরো প্রক্রিয়াটি একটি চ্যালেঞ্জ। সব চ্যালেঞ্জেরই একটি সমাধান রয়েছে। আমরা যেকোন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারবো যদি দুই দেশের বা দলের মধ্যে একটি দৃঢ় ইচ্ছা আছে। যেটা সবচেয়ে জরুরি।’

সূত্র: আল জাজিরা, ইউএনবি

ডি.এস/আ.হু

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ