ঢাকা, শনিবার 25 August 2018, ১০ ভাদ্র ১৪২৫, ১৩ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আইসিসিতে মিয়ানমারের বিচার দাবি আসিয়ানের ১৩২ এমপির

সংঘর্ষের মুখে পালাচ্ছে রোহিঙ্গারা -ফাইল ছবি রয়টার্স

২৪ আগস্ট, দ্য গার্ডিয়ান, চ্যানেল নিউজ এশিয়া : দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোট আসিয়ানের ১৩২ জন সংসদ সদস্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) মিয়ানমারের বিচার দাবি করেছেন। এক বছর আগে মিয়ানমারের রাখাইনে সহিংসতার পর এটাই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে সবচেয়ে ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম এ খবর জানিয়েছে।

আসিয়ান পার্লামেন্টারিয়ার ফর হিউম্যান রাইটস (এপিএইচআর) প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে এই বিচার চাওয়া হয়েছে। তারা রাখাইন রাজ্যে খুনে অভিযান পরিচালনার জন্য মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন।

১৩২ জন এমপির পক্ষ থেকে এপিএইচআর সদস্য ও মালয়েশিয়ার ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিক চার্লস সান্তিয়াগো বলেন, মিয়ানমার তদন্ত করতে অনিচ্ছুক ও অক্ষম স্পষ্ট হওয়ার কারণে আমরা এখন এমন একটি পর্যায়ে যেখানে জবাবদিহীতা নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পদক্ষেপ প্রয়োজন।

চার্লস সান্তিয়াগো আরও বলেন, আমি নির্বাচিত ১৩১ জন এমপির সঙ্গে একমত এবং অবিলম্বে আইসিসিতে মিয়ানমারের বিচারের জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। মিয়ানমারের যারা নৃশংস অপরাধে জড়িত তাদের বিচার হওয়া উচিত। তাদেরকে মুক্ত থাকতে দেওয়া যায় না ভবিষ্যতে আবারও এমন অপরাধ করার জন্য।

আসিয়ান এমপিদের এই ঐক্যবদ্ধ দাবি রোহিঙ্গা সংকটের এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগে আসলো। গত বছরের ২৫ আগস্ট রাখাইনে নিরাপত্তা বাহিনীর তল্লাশি চৌকিতে হামলার পর রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। খুন, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা। হত্যা করা হয়েছে ২৫ হাজার মানুষকে, পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে রোহিঙ্গা গ্রাম এবং নারীরা যৌন হামলা ও ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। জাতিসংঘ এই ঘটনাকে জাতিগত নিধনযজ্ঞ আখ্যায়িত করেছে। যদিও মিয়ানমার এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হওয়া এসব রোহিঙ্গাদের ফেরাতে বাংলাদেশ ও জাতিসংঘের সঙ্গে মিয়ানমার চুক্তি স্বাক্ষর করলেও এখনও শুরু হয়নি প্রত্যাবাসন।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দশটির দেশের সরকারের সংস্থা আসিয়ান। গত এক বছর রোহিঙ্গা সংকটে সংস্থাটি চোখ বন্ধ করেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াতে রোহিঙ্গা বোঝাই নৌকা ভীড় করলেও এই ইস্যুতে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া থেকে দূরে ছিল আসিয়ান।

এপিএইচআর এর বোর্ড মেম্বার ও ইন্দোনেশিয়ার সংসদ সদস্য এভা কুমা সুন্দরি জানান, আসিয়ান দেশগুলো অন্যদেশের অভ্যন্তরীণ হস্তক্ষেপের নীতি ভাঙা এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এখন। রোহিঙ্গাদের জন্য ন্যায়বিচারের ইস্যুটি আঞ্চলিক রাজনীতির গ-ি অতিক্রম করেছে। এটা পুরো মানবতাকে উদ্বিগ্ন করেছে। একেবারে দায়মুক্তিসহ আমাদের কোনও দেশকে এমন নৃশংসতা চালানোর অনুমতি দিতে পারি না।

বিবৃতিতে ১৩২ জন এমপির নাম থাকলেও তারা মূলত ৫টি দেশের। দেশগুলো হলো ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইনের টিমোর লেস্তে এবং সিঙ্গাপুর। এতে প্রমাণিত হয় মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কথা বলতে এখনও এ অঞ্চলে বিভিন্ন দেশ অনিচ্ছুক। জুনে বাংলাদেশের বিভিন্ন সংগঠনের একটি জোট আইসিসি প্রসিকিউটরদের কাছে রোহিঙ্গা নিপীড়নের তথ্য পাঠায়। আইসিসির তদন্তের জন্য শুনানির নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রসিকিউটর ফাতৌ বেনসৌদা।

রোহিঙ্গা শিশুদের নিয়ে জাতিসংঘের

নতুন সতর্কতা

বাংলাদেশের শরণার্থী শিবির এবং মিয়ানমারে থেকে যাওয়া রোহিঙ্গা শিশুদের ‘সব হারানো প্রজন্ম’ আখ্যা দিয়েছে জাতিসংঘ। ছয় সপ্তাহ বাংলাদেশের কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে কাটানোর পর জেনেভায় এক সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘের ওই কর্মকর্তা শিশুদের রোগ ও বন্যার ঝুঁকি ছাড়াও মিয়ানমারে থাকা রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। গত বৃহস্পতিবারের সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) মুখপাত্র সিমোন ইনগ্রাম রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের স্বপ্ন যেকোনও সময়ে বিবর্ণ হয়ে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেন। সিঙ্গাপুরভিত্তিক সংবাদমাধ্যম এই খবর জানিয়েছে।

এক বছর আগে রাখাইনে মিয়ানমারের সেনা অভিযানের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা। সীমান্তের দুই পাড়ের শিশুদের চরম পরিস্থিতি নিয়ে গত বৃহস্পতিবার মূল্যায়ন তুলে ধরে ইউনিসেফ। সেখানে সিমোন ইনগ্রাম বলেন, আমরা রোহিঙ্গা শিশুদের একটি প্রজন্মের ক্ষতি ও সম্ভাব্য ক্ষতির আশঙ্কা বিষয়ে কথা বলছি। বাংলাদেশের শিবিরে থাকা রোহিঙ্গা শিশুরা রোগ ও বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে জানিয়ে জেনেভার সংবাদ সম্মেলনে সিমোন ইনগ্রাম বলেন, ‘ঝুঁকি শুধু পাঁচ লাখ শিশু বা সীমান্তের বাংলাদেশের অংশে থাকা শিশুদের নয় বরং যারা এখনও সীমান্তের ওপারে রাখাইনে রয়ে গেছে তাদের শিক্ষায় প্রবেশাধিকারও খুব সীমিত।’

ইনগ্রাম জানান, জাতিসংঘের ধারণা রাখাইনে এখনও ৫ লাখ ৩০ হাজার থেকে ৬ লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে। এদের মধ্যে ৩ লাখ ৬০ হাজারই শিশু। রাখাইনে জাতিসংঘের প্রবেশাধিকারের সুযোগ সীমিত।

দীর্ঘকাল রাখাইনে বসবাস করে আসলেও রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করে মিয়ানমার। রাখাইনে নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর গত বছরের আগস্টে সেখানে সেনা অভিযান শুরু করে মিয়ানমার। দেশটির এককালের গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চির সরকার ওই সেনা অভিযানকে বৈধ হিসেবে দাবি করে আসলেও জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা একে গণহত্যা ও জাতিগত নিধনযজ্ঞ বলে বর্ণনা করে। বাংলাদেশে শরণার্থীদের ফিরিয়ে নিতে প্রস্তুত থাকার দাবি করছে মিয়ানমারেরে প্রশাসন। গত মঙ্গলবার সিঙ্গাপুরের এক ভাষণে রোহিঙ্গাদের ফেরানোর দায় বাংলাদেশের বলে দাবি করেন। তবে বাংলাদেশ জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের কথা বলে আসছে। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের প্রস্তুতি নিয়ে জাতিসংঘ শঙ্কা প্রকাশ করলেও মঙ্গলবার সু চি বলেন, রোহিঙ্গাদের থাকা জায়গা নিন্দিষ্ট করা হয়েছে।

ইউনিসেফ মুখপাত্র ইনগ্রাম বলেন, জুনে জাতিসংঘ সংস্থার সঙ্গে ইয়াঙ্গুন সরকারের প্রত্যাবাসন চুক্তি স্বাক্ষর সত্তে¦ও রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরার আশা যেকোনও সময়েই বিবর্ণ হয়ে পড়বে। তিনি বলেন রাখাইনের পরিস্থিতি এখনও অনিরাপদ।

ইউনিসেফ বলছে, বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরের অপেক্ষাকৃত বেশি বয়সী শিশুদের শিক্ষার প্রয়োজনে বর্তমানে সেখানে শিশুদের শিক্ষায় ইউনিসেফের বয়সসীমা বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশের শিবিরে ১৪ বছর পর্যন্ত বয়সের শিশুদের শিক্ষার আওতায় আনা হচ্ছে।

নির্যাতন বিষয়ে নিষ্ক্রিয় থাকায়

যা যা হারালেন সুচি

রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন বন্ধে কোনো ভূমিকা না রাখার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত মায়ানমারের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেত্রী অং সান সুচি। ফলে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে অবদানের জন্য পাওয়া স্বীকৃতিও হারাচ্ছেন তিনি। যেসব স্বীকৃতি হারালেন

এলি উইজেল অ্যাওয়ার্ড যুক্তরাষ্ট্রের হলোকস্ট মেমোরিয়াল মিউজয়াম মানবাধিকারের বিষয়ে অবদানের জন্য ২০১২ সালে সুচি’কে এ পুরস্কার দিয়েছিল। কিন্তু রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন বন্ধে নোবেল বিজয়ী এ নেত্রী কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি দাবি করে পদকটি প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।

ফ্রিডম অব অক্সফোর্ড নিজ দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে দীর্ঘ সময় ধরে লড়াই করে যাওয়ার স্বীকৃতিস্বরূপ যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড শহর কর্তৃপক্ষ ১৯৯৭ সালে সুচি’কে ‘ফ্রিডম অব অক্সফোর্ড’ সম্মাননা প্রদান করে।

মায়ানমারে রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন শুরুর পর এ সম্মাননা ফিরিয়ে নেয়া হয়। কর্তৃপক্ষ বলেছে, তারা এমন কাউকে এ সম্মানে ভূষিত করতে চান না যিনি মানবাধিকার লংঘনের সময় ‘ চোখ বন্ধ’ করে রাখে।

ফ্রিডম অব গ্লাসগো অ্যাওয়ার্ড  রোহিঙ্গা নির্যাতন বিষয়ে নিষ্ক্রিয় ভূমিকার জন্য ফ্রিডম অব গ্লাসগো অ্যাওয়ার্ডও হারিয়েছেন সুচি। স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো শহর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা এক চিঠিতে মানবতাবিরোধী অপরাধ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানালে পালটা প্রতিক্রিয়া দেখান সুচি।

অক্সফোর্ডের কক্ষ থেকে বিতাড়িত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জুনিয়র কমন রুম’ টাইটেল থেকে মুছে ফেলা হয়েছে সুচির নাম। রোহিঙ্গা বিষয়ে সুচির কোনো ভূমিকা না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়টির ছাত্র-ছাত্রীরা সুচির নাম মুছে ফেলার পক্ষে ভোট দেয়।

ইউনিসন অ্যাওয়ার্ড  রোহিঙ্গা নির্যাতন বিষয়ে নিষ্ক্রিয় থাকার কারণে হারানো পদকগুলোর মধ্যে আরেকটি হলো ইউনিসন অ্যাওয়ার্ড। যুক্তরাজ্যের সর্ববৃহৎ ট্রেড ইউনিয়ন ইউনিসন সুচিকে তার গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষায় অবদান রাখার জন্য এ পদকটি দিয়েছিল।

এডিনবার্গ অ্যাওয়ার্ডস্কটল্যান্ডের এডিনবার্গ শহর কর্তৃপক্ষ সুচিকে ২০০৫ সালে দেয়া এডিনবার্গ অ্যাওয়ার্ডটি বাতিল করে দেয়ার চিন্তা করছে। রোহিঙ্গা নির্যাতন বন্ধে পদক্ষেপ নিতে গত নভেম্বরে এডিনবার্গ শহর কর্তৃপক্ষ সুচিকে চিঠি লেখে।

কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো উত্তর দেননি শান্তিতে নোবেল বিজয়ী এ নেত্রী। চলতি সপ্তাহেই অ্যাওয়ার্ডটি প্রত্যাহারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে কর্তৃপক্ষ। নোবেল বাতিলের আহ্বানরোহিঙ্গা নির্যাতনের বিষয়ে নিশ্চুপ থাকার কারণে ১৯৯১ সালে শান্তিতে পাওয়া সুচির নোবেল পুরস্কারটি প্রত্যাহার করে নেয়ার জন্য একটি আন্তার্জাতিক ক্যাম্পেইন হয়েছিল। কিন্তু নোবেল কমিটির প্রধান বলেছেন, এ পুরস্কার প্রত্যাহার করে নেয়া সম্ভব নয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ