ঢাকা, শনিবার 25 August 2018, ১০ ভাদ্র ১৪২৫, ১৩ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কর্মসংস্থানে অমানিশা দূর করতে ডিপ্লোমা শিক্ষা অনিবার্য

আবুল হাসান: নবীন প্রজন্ম অনুপুত অভূতপূর্ব পর্যায়ে পৌঁছায় বিশ্বসমাজ এবং বিশ্ব অর্থনীতির ওপর নতুন ধরনের চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। অনেক দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ছে, ব্যাপকহারে অভিবাসনের জন্য ভিনদেশে চলে যাওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিয়ে ও বসবাস থেকে শুরু করে ইন্টারনেটে যোগাযোগের ক্ষেত্রে চরিত্রগত পরিবর্তন হচ্ছে। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলসহ বিভিন্ন পর্যবেক্ষক মহলে বিশ্বজনসংখ্যায় নবীন প্রজন্মের অনুপাত বেড়ে যাওয়ার ব্যাপারে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা করছে। এখন বিশ্বের জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশের বয়স হচ্ছে ১০ থেকে ২৪ বছরের মধ্যে। এদের বেশির ভাগই বাস করে অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। পৃথিবীর ইতিহাসে আগে কখনো জনসংখ্যার এমন বৈপরীত্যের অনুপাত ঘটেনি। বিশ্বের ধনী দেশগুলোতে প্রবীণদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কিশোর ও যুবা বয়সের জনসংখ্যার অনুপাত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পিউ রিসার্চ সেন্টারের জনমিতি বিশেষজ্ঞরা হিসাব দিয়েছেন, বর্তমানে বিশ্বের মোট ৭৪০ কোটি মানুষের মধ্যে ২০০ কোটির বয়স ১৯ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। মোট বৈশ্বিক জনসংখ্যার এই ২৭ শতাংশকে বলা হচ্ছে মিলেনিয়াল জেনারেশন বা সহস্রাব্দ প্রজন্ম- আগামী পৃথিবীর সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান অনুঘটক। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে প্রমাণিত সত্য তারুণ্যের শক্তিই আসলে প্রাণ। তারুণ্য আনন্দ করবে, তারুণ্য যুদ্ধ করবে, তারুণ দেশ স্বাধীন করবে। তারুণ্য ভাষার জন্য বুকের রক্ত দেবে এবং তারুণ্য আনন্দ দিয়ে পৃথিবীর চেহারাটা বদলে দেবে। এর মধ্যেও রয়েছে হতাশা, রয়েছে দরিদ্রতা। বিশ্বের যত হতদরিদ্র শিশু আছে, এর অর্ধেকের বেশি প্রায় ৫১ শতাংশের মতো আফ্রিকার সাবসাহারা এলাকার দেশগুলোর শিশু। ওই অঞ্চলে প্রায় ১৯ কোটি হতদরিদ্র শিশুর বসবাস। আর বাংলাদেশ, ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ হতদরিদ্র শিশুর বাস। এ দু অঞ্চলেই প্রায় ৮৭ ভাগ দরিদ্র শিশু বাস করে। দারিদ্র সবচেয়ে আঘাত করে  শৈশবকে। বিশ্বব্যাংক ও ইউনিসেফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারা বিশ্বে এখন ৭৬ কোটি ৭০ লাখ হতদরিদ্র মানুষ আছে। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি শিশু। ৩৮ কোটি ২০ লাখ পূর্ণবয়স্ক হত দরিদ্র। আর কর্মক্ষম হতদরিদ্র মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩৪ কোটি। যাদের বয়স ১৯ থেকে ৫৯ বছর।

পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, পাবিারিক উদাসীনতা শিশু-কিশোরদের রাজনৈতিক ব্যবহারসহ নানা কারণে বিশ্বে কিশোর অপরাধ বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। দিন দিন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে তারা। খুনখারাবিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে সামাজিক শান্তি ও শৃঙ্খলা নষ্ট করছে শিশু। শিশু-কিশোর, তরুণের অপরাধ নির্মূলে চাই বেকারমুক্ত বিশ্ব ও সামাজিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা দৃঢ় করা। একবিংশ শতাব্দীর মানুষ চাইছে মানবিক বিশ্বব্যবস্থা। গোটা বিশ্বের উন্নয়ন অব্যাহত রাখার উপযোগী পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি উদ্ভাবনের সুফল তরুণ যুবদের মধ্যে সঞ্চারিত করতে হবে। পুঁজিবাদ অপেক্ষা উন্নততর এবং সমাজতন্ত্র অপেক্ষা বাস্তবতর সমাজকাঠামো উদ্ভাবন করা  আমাদের অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বলছে, বিশ্বব্যাপী প্রতি পাচঁজন যুবা বয়সীর মধ্যে দুইজন হয় বেকার নতুবা এমন কম বেতনের কর্ম করছে যে, তারা দারিদ্র্য থেকে মুক্ত হতে পারছে না। উন্নয়নশীল বিশ্বে কিশোর-যুবাদের  বেশির ভাগকেই কাজ করতে হচ্ছে অনিশ্চিত ও খ--কালীন ভিত্তিতে, অত্যন্ত স্বল্প বেতনে এবং নিরাপত্তাহীনতায়। ওয়াশিংটনভিত্তিক সংস্থা ‘গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট’- এর প্রতিবেদনের মন্তব্য এরকম যদি উচ্চাভিলাষ পূরণের পথ দেখা না যায়, তাতে যে অসন্তোষের জন্ম দেয় সমাজের প্রতি তা হুমকিতে পরিণত হয়’। তখন আপনি নিশ্চিত হতে পারেন না যে, সমাজে বিপুল নবীন প্রজন্ম আপনার দেশকে সমৃদ্ধ করবে, দুই যুগ আগে এশিয়াতে যা করতে পেরেছে। এসব দেশে অধিক সংখ্যায় উপযুক্ত কর্ম সৃষ্টি করাই হচ্ছে উন্নয়নের পথে প্রধান চ্যালেঞ্জ। এর রকম চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করতে শুধু ভারতেই এখন প্রতি বছর এক কোটি ১২ লাখ থেকে এক কোটি ১৭ লাখে নতুন কর্ম সৃষ্টি করতে হবে। জনসংখ্যাকে শক্তি ও সম্পদে পরিণত করতে হলে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। আমাদের অবশ্যই মানবসম্পদে বিনিয়োগ করতে হবে এবং দক্ষতা বাড়াতে হবে যা প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সম্পূরক হয়ে উঠবে এবং শ্রম আয় বৃদ্ধি করবে। এতে দেশগুলোর মধ্যে আয় স্থানান্তরের নতুন পদ্ধতি চালু হবে। একটি দেশ বা অঞ্চল বা বিশ্বকে উন্নতির স্বর্ণ-শিখরে পৌঁছাতে হলে শিক্ষার দিকে প্রথমে তাকাতে হয়। সে জনগোষ্ঠিকে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হয়। কাগজে কলমে শুধু শিক্ষার হার বৃদ্ধিই করলেই এগিয়ে যাওয়া যায় না বরং সুশিক্ষা ও স্বশিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে পারলেই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। সমগ্র বিশ্বের কর্মের হাতছানি দেয়া ডিপ্লোমা শিক্ষাব্যবস্থা আধুনিকায়ন, পরিবর্ধন, পরিমার্জনের সময় এসেছে। এখনই যদি গুরুত্বপূর্ণ ডিপ্লোমা শিক্ষার প্রতি বিশেষ নজর আর সাধারণ শিক্ষাকে নিরুৎসাহিত করা না হয় তাহলে দেশের সাথে বিশ্ব কর্মসংস্থান অর্থনীতি ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়বে।

বিশ্বব্যাংকের চার সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদসহ ১৩ জন অর্থনীতিবিদ সুইডেনের স্টকহোমে দুদিনের (১৬-১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬) এক বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন। আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল, ‘আজকের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকরা যেসব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন’। বৈঠকটির আয়োজন করেছিল সুইডিশ ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এজেন্সি (সিডা) ও বিশ্বব্যাংক। বৈঠক শেষে অর্থনীতিবিদরা নিজেদের মধ্যে যে বিষয়গুলোয় ঐকমত্যে পৌঁছেছেন, তা হলো কর্মসংস্থানমুখি বিশেষায়িত ডিপ্লোমা শিক্ষা। এক্ষেত্রে বিশ্ব ডিপ্লোমা শিক্ষা দিবস (World Diploma Education Day) কর্মসংস্থান শিক্ষার দিগন্ত প্রসারিত করবে। সমগ্র বিশ্বে শিক্ষাব্যবস্থার সাথে মহামিলনের উচ্ছ্বাস তৈরি হবে।

সকল অগতি-দুর্গতি দুঃখ, কষ্ট, বেদনা, যন্ত্রণা নাশ হয়ে তরুণ যুবরা চিত্তবিত্তের উৎসব আনন্দে বিভোর হবে। বিশ্বব্যাপী কর্মসংস্থান অমানিশার অন্ধকার অবধারিতভাবে বিলোপ হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ