ঢাকা, শনিবার 25 August 2018, ১০ ভাদ্র ১৪২৫, ১৩ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

চামড়া কিনে বিপাকে মৌসুমী ব্যবসায়ীরা

আল আমিন: পাড়া-মহল্লা থেকে কেনা চামড়া আড়তদারদের কাছে বিক্রি করতে গিয়ে মাথায় হাত পড়েছে  মৌসুমী বিক্রেতাদের। ঈদের দিন দুপুরের পর থেকে আড়তে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম কমতে থাকায় অনেক  মৌসুমী বিক্রেতা হাজার হাজার টাকা লোকসান গুনেছেন বলে দাবি করেছেন।

সরকার ট্যানারি মালিকদের জন্য চামড়ার দর নির্ধারণ করে দিলেও  মৌসুমী বিক্রেতারা সেটি মাথায় রেখে বেশি দাম দিয়ে চামড়ায় কিনেই লোকসানে পড়েছেন বলে মনে করেন আড়তদাররা।  

রাজধানীর সায়েন্সল্যাব মোড়ে অস্থায়ী চামড়ার হাটে চামড়া বিক্রি করতে এসে বাজারের দৈন্যদশার বর্ণনা দিচ্ছিলেন শনির আখড়ার  মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ী মো. আরিফ। তিনি বলেন, যত সময় যাচ্ছে ততই চামড়ার দাম কমে যাচ্ছে। সন্ধ্যার আগে যে চামড়ার দাম ছিল ৭০০ টাকা, সে চামড়া এখন বলছে ৫০০ টাকা। অথচ এ দামের চেয়ে বেশি দাম দিয়ে চামড়া কিনতে হয়েছে। এখন যদি এ দামেও বিক্রি না করি তাহলে যত রাত হবে তত লোকসান বাড়তে থাকবে। একটু আগে যিনি দাম বলেছেন ৫০০ টাকা, এখন তাকে খুঁজেও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে চামড়াগুলো কোথায় বিক্রি করব বুঝতে পারছি না।

তার মতে, একটু লাভের আশায় খুচরা বিক্রেতা ও বিভিন্ন মাদরাসার লোকজন থেকে চামড়া কিনে এখন উল্টো লোকসান গুণতে হচ্ছে। কারণ গতকাল চামড়ার যে দাম ছিল আজ সে দাম নেই। ফলে আজ যেসব চামড়া তিনি কিনেছেন সেগুলো লাভ তো দূরের কথা, চালান ধরে বিক্রি করা যাবে কি না তা নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। এ অবস্থা শুধু আরিফের নয়, এ অবস্থা  মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ীদের। ব্যবসায়ী রাতুল বলেন, সকাল ৯টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত শনির আখড়া ও যাত্রাবাড়ি এলাকা থেকে ৫১টা চামড়া কিনেছি। কিন্তু এগুলো নিয়ে দ্রুত এখানে আসতে আসতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। এখানে এসে ১ ঘণ্টা ধরে চামড়া নিয়ে বসে আছি। কিন্তু একটাও বিক্রি করতে পারিনি। দু’একজন কিনতে আসে, তাও আবার কেনা দামের চেয়ে কম দাম দিতে চায়। এ বছর সরকার ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৪৫ টাকা থেকে ৫০ টাকা নির্ধারণ করে দেয়। গত বছর লবণযুক্ত চামড়ার দাম ধরা হয়েছিল প্রতি বর্গফুট ৫০ টাকা থেকে ৫৫ টাকা। 

অন্যবছর রাজধানীর হাজারীবাগ ছিল কাঁচা চামড়া সংগ্রহের প্রধান ক্ষেত্র। হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সাভারের হেমায়েতপুরে সরে যাওয়ায় এবার রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি, লালবাগের পোস্তা, নবাবপুরের মানসী সিনেমা হল, পুরান ঢাকার রায় সাহেব বাজার এলাকায় বসেছে চামড়ার অস্থায়ী পাইকারি বাজার।

 মৌসুমি বিক্রেতারা পাড়া-মহল্লা থেকে বেশি দামে চামড়া কেনাতেই বিপত্তি হয়েছে বলে মনে করেন লালবাগের পোস্তা এলাকার আড়ত প্রগতি লেদার কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, এবছর চামড়ার সর্বোচ্চ মূল্য ৪৫ টাকা থেকে ৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই হিসাবে প্রতি বর্গফুট চামড়া ৩০ থেকে ৩৫ টাকায় কিনতে হচ্ছে। কারণ এর সঙ্গে লবণ দেওয়ার খরচ যোগ হবে। আবার এই চামড়া নিয়ে যেতে হবে সাভারের হেমায়েতপুরে। আগে আমরা হাজারীবাগে পৌঁছে দিলেই চলত। অনেকে মহল্লা থেকে বেশি দামে চামড়া কিনে ফেলেছে। তারা আমাদের কাছে নিয়ে আসার পর সেই দাম আমরা দিতে পারিনি। এভাবেই চামড়া নিয়ে এবার একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি আফতাব উদ্দিন বলেন, এবছর আন্তর্জাতিকভাবে চামড়ার দাম কম থাকায় দেশের বাজারেও সরকার দাম কিছুটা কমিয়েছে। কিন্তু অনেক  মৌসুমী ব্যবসায়ী বিষয়টি ধরতে পারেননি। তারা ভেবেছিলেন এলাকা থেকে চামড়া সংগ্রহ করার পর তা প্রতি বর্গফুট ৪৫ টাকা থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি করতে পারবেন। কিন্তু এই দামটা আড়তদারদের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, যারা লবণযুক্ত চামড়া ট্যানারি মালিকদের কাছে বিক্রি করবেন। অনেক  মৌসুমী ব্যবসায়ী না বুঝতে পেরে এবার বেশি দামে চামড়া কিনে ফেলেছেন। তারা আংশিকভাবে একটু লোকসানের শিকার হয়েছেন।

এবছর ঢাকার দুই সিটিতে প্রায় পাঁচ লাখ পশু কোরবানি হয়েছে বলে নগর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। এর সঙ্গে আশপাশের জেলা মিলিয়ে এবার ১০ লাখ চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য ধরেছে বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন। তবে সংগঠনের সভাপতি হাজি দেলোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, দুই দিনে চার লাখ চামড়া সংগ্রহ হয়েছে। ট্যানারি মালিকরা নিজেরা উদ্যোগী হয়ে বাকি চামড়া কিনে নিয়েছেন। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, রফতানি পরিস্থিতি ভালো না থাকার কারণে ও আর্ন্তজাতিক বাজার পরিস্থিতি ভালো না থাকায় চামড়ার বাজার এখন একেবারেই ভালো না। যে কারণে চামড়ার দাম এতটা কমে গেছে। বিগত তিন দশকে এখন চামড়ার দাম সর্বনিম্ন বলেও জানান তিনি। উল্লেখ্য, এবছর ঢাকায় লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়া ৪৫ থেকে ৫০ টাকা; ঢাকার বাইরে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার। এছাড়া খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ১৮ থেকে ২০ টাকা এবং বকরির চামড়া ১৩ থেকে ১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছর প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়া ৫০ থেকে ৫৫ টাকা; ঢাকার বাইরে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা এবং খাসির চামড়া ২০ থেকে ২২ টাকা এবং বকরির চামড়া ১৫ থেকে ১৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ