ঢাকা, শনিবার 25 August 2018, ১০ ভাদ্র ১৪২৫, ১৩ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

চামড়া শিল্পের সেকাল একাল

মাহমুদুল হক আনসারী: বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম মাধ্যম ছিল চামড়া শিল্প। পাট এবং চামড়াশিল্প দুটোই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখছিল। ধীরে ধীরে এ দুটি শিল্পের বর্তমান অবস্থা খুবই খারাপ। পাট শিল্পের নানা ভাবে কিছুটা উন্নতি হলেও চামড়া শিল্পের তেমন উন্নতি বলার মতো নয়। তবুও সারাবছর চামড়ার যে সংগ্রহ হয় তা দিয়ে জাতীয় অর্থনীতির ব্যাপক সাফল্য অর্জন করার কথা ছিল। বাংলাদেশের ধর্মীয়ভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান হওয়ার কারণে এখানে প্রতিবছর কোরবানীর সময় লাখ লাখ পশু কোরবানী হয়ে থাকে। সেখান থেকে পশুর চামড়া ব্যবসায়ীরা সংগ্রহ করে থাকে। কোরবানীর এসব পশুর চামড়ার মধ্যে রয়েছে উল্লেখযোগ্য হারে গরু, মহিষ, ছাগল, দুম্বা, ভেড়া ইত্যাদির। ৮/১০ বছর পূর্বেও চামড়াশিল্পের ব্যাপক চাহিদা ছিল। এসব চামড়া ব্যবসায়ীর সংগ্রহ করে প্রক্রিয়াজাত করত। আগেভাগেই ব্যবসায়ীদের ব্যাংক ও অর্থ লগ্নির প্রতিষ্ঠান চাহিদামতো ঋণ প্রদান করত। ফলে ব্যবসায়ীরা বিশেষত কোরবানীর পশুর চামড়া আন্তর্জাতিক বাজারের দরের সাথে মিল রেখে চামড়া ক্রয় করত। চামড়াশিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এলাকায় এলাকায় পাড়া মহল্লায় তাদের প্রতিনিধির মাধ্যমে সঠিকমূল্য দিয়ে চামড়া সংগ্রহ করতে দেখা যেত। 

উল্লেখ্য, কোরবানীর পশুর চামড়ার অর্থটা পেয়ে থাকে সাধারণত গরীব, মিসকিন, দুস্থ, এতিম মানুষগুলো। এসব অর্থের মূল দাবিদার ওইসব শ্রেণীর মানুষ। কিন্তু চামড়াশিল্পের বাজারদর একেবারে নিম্নমুখী হওয়ার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাস্তবে ওইসব শ্রেণীর মানুষগুলো। 

চামড়া শিল্প অর্থনীতিতে যেভাবে দেশে সাফল্য দেখাবার কথা ছিল সেভাবে সফলতা দেখাতে ব্যর্থ হচ্ছে। প্রতিবেশী দেশে কোরবানীর মৌসুমে চামড়া পাচার হওয়ার সংবাদ নতুন নয়। 

দেশের আইন শৃংখলা বাহিনী কোরবানীর মৌসুমে চামড়া পাচার রোধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বললেও বাস্তবে পাচার রোধ করা সম্ভব হয় না। বিগত কয়েক বছর থেকে দেখা যাচ্ছে, কোরবানীর মৌসুমে পশুর চামড়া ক্রয় করার লোক খুঁজে পাওয়া যায় না। কেউ এক লক্ষ টাকার গরুর চামড়া দুই হাজার টাকায় কিনতে চায় না। 

অনেক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে দেখা গেছে এতিম ছাত্রদের অর্থনৈতিক উপকারের জন্য এলাকা থেকে সংগৃহীত চামড়া লোকসান দিয়ে ব্যবসায়ীদের বিক্রি করে দিতে হয়েছে। প্রতিষ্টিত যারা ব্যবসায়ী তারা দেশীয় বাজারে চামড়ার সঠিকমূল্যের নির্দেশনা না পাওয়াতে এলাকায় এলাকায় সংগৃহীত চামড়া তারা কিনতে অপারগতা প্রকাশ করে। এসব কারণে বঞ্চিত হচ্ছে কোরবানী পশুর চামড়ার প্রকৃত ভুক্তভোগীগণ। এক সময় আমরা শুনতাম ধর্মীয় অনাথ দুস্থ শিশুদের জন্য কোরবানীর পশুর চামড়ার সংগৃহীত অর্থ দিয়ে সারাবছরের খরচের জন্য একটা ফান্ড তৈরী হতো। মাত্র ৫-৭ বছরের মাথায় এ শিল্পের বাজারদরের ওলটপালট হওয়াতে ওইসব শিশু প্রতিষ্টানের চামড়াশিল্পের ফান্ড আর সংগৃহীত হয় না। যেহেতু চামড়া সংগ্রহ করার পর এ শিল্পের সাথে যারা সম্পৃক্ত তারা চামড়া কিনতে যখন চায় না, তখন অনাথদের প্রতিষ্ঠান তারাও চামড়া স্থানীয় বাজার থেকে নিতে চায় না। এভাবে পর্যায়ক্রমে চামড়াশিল্পের গৌরব ও ইতিহাস ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে। 

আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার ব্যাপক চাহিদা থাকলেও দেশীয় ব্যবস্থাপনায় চামড়া শিল্পের আন্তর্জাতিক ভাবে সমন্বয় এ শিল্পের প্রয়োজনীয় ত্রুটিসমূহ চিহ্নিত না করা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও ব্যবস্থা, বাস্তবায়ন না থাকার কারণে অর্থনৈতিক সফলতার বিশাল এ চামড়াশিল্পের পর্যায়ক্রমে আজ ধ্বংসের শেষ প্রান্তে এসে গেছে। জাতীয় অর্থনীতিতে যেভাবে অতীতে চামড়াশিল্প অবদান রাখছিল তা এখন নেই বললেই কম বলা চলে।

এ শিল্পের ঐতিহ্য অর্থনৈতিক সফলতা আনতে হলে এ শিল্প ব্যবসার সাথে যারা সম্পৃক্ত তাদের সাথে সমন্বয় করে রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের প্রনোদনা দিতে হবে এ শিল্পকে পুরোনো ঐতিহ্যে এবং অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে জাতীয় অন্তর্জাতিক সব ধরনের ষড়যন্ত্র, প্রতিবন্ধকতা দূর করে চামড়া শিল্প খাতকে পূর্বে ব্যবসায় ফিরিয়ে নিতে হবে। আর এই জন্য দরকার শিল্প মন্ত্রণালয় চামড়া শিল্প মালিক সমিতি স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সকলের মতামত ও পরামর্শ গ্রহণ করে শিল্প মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে যত দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার তা করতে হবে। যেহেতু বাংলাদেশে মুসলমানদের সংখ্যা অধিক। এখানে পশু লালন পালন খাওয়ার প্রচলন বেশী। 

প্রতিবছর লাখো কোটি চামড়াশিল্প সংগৃহীত হয়। আন্তর্জাতিকভাবে নানামুখী ষড়যন্ত্রের কারণে চমড়া শিল্পের জাতীয় অর্থনৈতিক সফলতা  রাষ্ট্র ও জনগণ ভোগ করতে পারছে না। সময় থাকতে এ শিল্পকে লাভের খাতায় নিতে হলে অবশ্যই সব ধরনের ষড়যন্ত্রের পথ বন্ধ করতে হবে এবং পাচারের সমস্ত রাস্তা ও ছিদ্র বন্ধ করে এ শিল্পের সাথে জড়িতদের রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা সংরক্ষণের ব্যবস্থা ব্যাংক ঋণের ন্যায্য অধিকার দিতে হবে। যদি তাই হয় চামড়াশিল্পের মাধ্যমে দেশ জাতীয় অর্থনীতিতে এগিয়ে যাবে। 

অর্থনীতিতে সফলতা আসবে। বিশেষ করে কোরবানীর মৌসুমের লাখ লাখ চামড়া ন্যায্য মূল্য তৃণমূল পর্যায় থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্য্ন্ত ভোগ করতে পারবে। 

তাহলে এ শিল্পের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে বিশাল পরিবর্তন ও সফলতা প্রতিষ্টা হবে। আসুন চামড়াশিল্পের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এ শিল্পকে তার পুরোনো ঐতিহ্যে ফিরিয়ে নিতে সকলেই ভূমিকা রাখি।  প্রাবন্ধিক ও গবেষক

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ