ঢাকা, শনিবার 25 August 2018, ১০ ভাদ্র ১৪২৫, ১৩ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সংকট যত বাড়ছে তত বেশি বঞ্চিত হচ্ছে হকদাররা

চামড়া ইংরেজি Skin or Leather এবং শিল্প ইংরেজি Industry. প্রাণিদেহে অনুভূতির পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মধ্যে ত্বক (চামড়া) একটি। চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা ও ত্বক হলো পঞ্চ ইন্দ্রিয়। এই ত্বককে যখন প্রাণিদেহ থেকে আলাদা করে ফেলা হয় এবং প্রক্রিয়া জাত করে পন্যে রূপান্তর করা হয় তখন তাকে বলে চামড়া বা Leather এবং আরবিতে বলে জিল্দুন। শিল্প বা Industry হলো পণ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংযোজন এবং প্রক্রিয়াজাত পণ্যের মেরামত পুনঃসংস্কার সাধন করার প্রতিষ্ঠান। 

বাংলাদেশে ৩ ধরনের শিল্প রয়েছে: ১। বৃহৎশিল্প, যথা- পাট, বস্ত্র, তৈরি পোশাক, কাগজ, চিনি, সার, রাসায়নিক শিল্প ইত্যাদি। ২। মাঝারি শিল্প যথা- চামড়া, সাবান, দিয়াশলাই, প্রসাধনী, কাচ শিল্প ইত্যাদি। ৩। ক্ষুদ্র ও কুঠির শিল্প যথা- তাঁত, বেশন, মৃৎ, বাশঁ ও বেত শিল্প ইত্যাদি। দীর্ঘকাল ধরেই বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ বাজার ও রপ্তানির জন্য চামড়া ও চামড়া জাত সামগ্রী উৎপাদন করে আসছে। কাঁচা চামড়া এবং সেমি পাকা চামড়া বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী রপ্তানি সামগ্রী। সব সময়ই বিশ্ব বাজারে আমাদের দেশের ছাগলের চামড়ার প্রচুর চাহিদা রয়েছে। এ বছর প্রতি বর্গফুট ছাগলের চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে, শহরে ১৫-১৭ টাকা, আর গ্রামে ১২-১৪ টাকা। একটি ছাগলের চামড়ার পরিমান মাত্র ৩ বর্গফুট এ হিসেবে দাম দাড়াঁয় ৪০ থেকে ৪৫ টাকা কিন্তু বাস্তবে তা বিক্রি হয়ে থাকে ২০-২২ টাকায়। কাঁচা চামড়ার ব্যবসায়ীরা  বলছেন, ছাগলের চামড়া সংরক্ষণে ব্যয় হবে ৩৯ টাকা। তার সাথে রয়েছে পরিবহন খরচ আরও ৫ টাকা। এতে একটি ছাগলের চামড়ার দাম পড়ে ৯০ টাকা। অথচ লবনযুক্ত প্রতি বর্গফুট ছাগলের  চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ১৫-১৭ টাকা। তারা বলছেন, ৯০ টাকার চামড়া কিভাবে ৪০-৪৫ টাকা বিক্রি করা সম্ভব। এতে করে প্রতিটি চামড়ার ক্ষতি হবে ৪৫ টাকা। অর্থাৎ যদি ছাগলের চামড়া ফ্রিও আনা হয় তা হলেও লোকসান হবে ৫-১০ টাকা। তা হলে কি হবে ৫৫ লাখ ছাগলের চামড়ার! সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতীতে চামড়ার এত দুরবস্তা কখনও দেখা যায় নি। এ বছর গরুর চামড়াই বিক্রি হবে ৫০০-৭০০ টাকা। আর ছাগলের চামড়া কিনার কোনো প্রশ্নই উঠে না। কারণ যারা এ চামড়া ক্রয় করবে তারাই বিপাকে পড়বে। জানা গেছে, প্রতি বছর কুরবানি ঈদে ৬০ -৬৫ লাখ গরু মহিষ আর ৫০ থেকে ৫৫ লাখ ছাগল ভেড়া জবাই হয়ে থাকে। কিন্তু এত পরিমাণে চামড়া প্রক্রিয়াকরণ করতে এখনও প্রস্তুত হয়ে ওঠে নি সাভারের চামড়া শিল্প নগরী। এতে করে প্রতিবেশি দেশে কাঁচা চামড়া পাচার হওয়ার আশঙ্কা আরও বাড়ছে।

ঢাকা বাঁচাতে শিল্প কারখানা বাইরে পাঠানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে ঢাকার হাজারিবাগে ট্যানারি শিল্প কারখানাগুলোতে ঢাকার বাইরে সাভারে উন্নত ও পরিবেশ বান্ধব স্থানে স্থানান্তর করা হয়েছে। বলেছেন, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু। সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া করণের সক্ষমতা রয়েছে মাত্র ১০ টি- ট্যানারির। আর প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে এমন ট্যানারির সংখ্যা প্রায় ৫০টি। ৮ টি ট্যানারিতে বছরে মাত্র ৩০ লাখ চামড়া প্রক্রিয়াকরণে সক্ষম। বাকি ৮৫ লাখ চামড়ার কি হবে চামড়া নিয়ে বিপাকে পড়বে ব্যবসায়ীরা আর বঞ্চিত হবে হকদাররা। চামড়া প্রক্রিয়া করণে এখন সক্ষম সাভারের ট্যানারি শিল্প। বিসিকের এমন রিপোর্টে হাজারিবাগ থেকে ট্যানারি শিল্প স্থানান্তরের ঘোষণা দেয় সরকার। ২০০৩ সালে কাজ শুরু হয়ে ২০০৬ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও গত ১৪ বছরে কাজ শেষ হয়নি। পুরো কাজ শেষ হতে আরও সময় লাগবে কয়েক বছর। চামড়া শিল্প নগরীর তিন বছরের প্রকল্প গড়াল ১৭ বছরে। ১৭৬ কোটি টাকা থেকে বেড়ে বরাদ্দ দাঁড়িয়েছে ১০৭৯ কোটি টাকা। হাজারিবাগের অপরিকল্পিত ট্যানারিগুলোকে স্বাস্থ্যসম্মত স্থান সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে স্থানান্তরের জন্যই উদ্যোগ। এ বছর প্রতি বর্গফুট চামড়ার দাম কমেছে ১০ টাকা। এক বছরে এতিম গরিবের প্রাপ্তি কমেছে ১৫৯ কোটি টাকা। আর ৬ বছরে প্রাপ্তি কমেছে ৪ হাজার ৭৭০ কোটি টাকা। সংকটে পড়েছে দেশের এতিমখানাগুলো। কারণ শরীয়া মতে চামড়া বিক্রয়লব্ধ টাকার হকদার হলো যারা যাকাতের হকদার। অর্থাৎ এতিম, মিসকিন, গরিব ও অসহায় দুস্থরা। এ শিল্পে যত সংকট বাড়ছে তত বেশি বঞ্চিত হচ্ছে এ হকদাররা। ৯ আগষ্ট ২০১৮ খ্রিঃ বৃহস্পতিবার পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করতে চামড়া খাতের শিল্পের উদ্যোক্তা ব্যবসায়ী, রপ্তানিকারক ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধিদের নিয়ে লম্বা বৈঠক করেন, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের কোরবানির পশুর চামড়ার নতুন দামের কথা জানান। 

চামড়া ব্যবসায়ীদের কাছে সরকার পণবন্দী কিনা এমন প্রশ্ন করা হলে তোফায়েল আহমেদ বলেন, “আমরা ব্যবসায়ীদের বন্ধু। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চামড়া খাত খারাপ পর্যায়ে আছে। অন্য খাতে বাড়লেও চামড়া খাতে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কমেছে ১২ শতাংশ। ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করতেই চামড়ার দাম কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে।” ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করার অর্থ জিম্মি হওয়া নয়। দাম কমানোতে চোরাচালানের মাধ্যমে দেশের বাইরে চামড়া চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, “সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনী বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) অত্যন্ত শক্তিশালী এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেবে তারা।” চামড়া খাতের সমস্যা নিয়ে কথা বলেন, ট্যানান্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদও। তিনি বলেন, “গত বছর কেনা চামড়ার ৪০ শতাংশ এখনো মজুত আছে যেগুলোর গুণগত মানও অনেকটা নষ্ট হয়ে গেছে।” রাষ্ট্র যদি দেহ (Body) হয় তবে সরকার হলো ত্বক (Skin)। সরকারকে অনুভব করতে হবে রাষ্ট্রের এ মুহুর্তে চাহিদা কি। আর সে অনুভূতি হারিয়ে ফেললে  বুঝতে হবে এটা এখন আর ত্বক (Skin) নেই। এটা চামড়ায় (Leather) পরিণত হয়েছে।  আবু মুনীর

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ