ঢাকা, শনিবার 25 August 2018, ১০ ভাদ্র ১৪২৫, ১৩ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বৃহত্তর আন্দোলনের দিকে যাচ্ছে বিরোধী জোট

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার, খালেদা জিয়ার মুক্তি, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড, নেতাকর্মীদের মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহারসহ জনগণের ভোটের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট আন্দোলন চালিয়ে যাবে। একই সঙ্গে চলবে কূটিৈনতক তৎপরতাও। সরকার যদি সংলাপ আহ্বানে সহসাই ইতিবাচক ভূমিকায় অবতীর্ণ না হয় তাহলে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝিতে রাজপথের আন্দোলন শুরু হবে বলে জানা গেছে। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জমান দুদু বলেন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই শুরু হবে ১ সেপ্টেম্বর থেকে।  দুদু বলেন, এখন আগস্ট মাস চলছে। এই আগস্ট মাসে বলছি, আগামী সেপ্টেম্বর মাস বিএনপি প্রতিষ্ঠার মাস, বিএনপি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও জনগণের অধিকার রক্ষার জন্য। সেই সেপ্টেম্বর মাস সামনে। ১ সেপ্টেম্বর থেকেই বাংলাদেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই শুরু হবে। সেই লড়াই শেষ হবে বিএনপি ও ২০ দল রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর।

জানা গেছে, চলমান সংকট সমাধানে আলোচনার প্রস্তাবের পাশাপাশি আন্দোলন ও কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখবে বিরোধী জোট। জোটের শীর্ষ নেতা বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার আগেই সরকারকে সংকট সমাধানে দ্রুত আলোচনায় বসার তাগিদ দিয়ে বলেছেন, সময় থাকতে নির্দলীয় সরকারের দাবি মেনে নিন। অন্যথায় আপনাদের (সরকার) করুণ পরিণতি ভোগ করতে হবে। একইসাথে তিনি বলেছেন, নিরপেক্ষ সরকারের দাবি না মানা পর্যন্ত হরতাল অবরোধসহ অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেয়া হবে। জানা গেছে, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলনরত ২০ দলীয় জোট  সেপ্টম্বরে রাজপথে নামবে। আগে রাজধানী ঢাকা থেকে সারাদেশকে বিচ্ছিন্ন করার মাধ্যমে অচল করে রাখা হতো। এবার ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতে চাচ্ছে বিএনপির নের্তৃত্বাধীন জোট। ঢাকাসহ সারাদেশ অচল করার পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে দলটি। 

জানা গেছে, ঈদের পর ঢাকার বাইরে কয়েকটি জেলা সফর করবেন বিএনপির সিনিয়র নেতারা। আন্দোলনে জনসম্পৃক্ততা বাড়াতেই তারা জেলা সফরে যাবেন। তৃণমূল নেতাদের পরামর্শ নেবেন। এরই মধ্যে ঢাকায় কয়েকদফা তৃণমূল নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেছেন বিএনপি মহাসচিবসহ সিনিয়র নেতারা।  দলের ভবিষ্যৎ করণীয় ঠিক করতে গত ৩ ও ৪ আগস্ট বিএনপির হাইকমান্ড ৮৪টি সাংগঠনিক জেলার নেতার পরামর্শ নিয়েছে। ওই বৈঠকগুলোয় দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন জোরদার, দলীয় কোন্দল নিরসন করে সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি ও একাদশ সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়াসহ একগুচ্ছ পরামর্শ দিয়েছে তৃণমূল নেতারা। 

এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ফেনী জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট আবু তাহের বলেন, বিএনপির হাইকমান্ডের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দলের ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে বেশকিছু পরামর্শ দিয়েছি। তখন আমাদের বলা হয়েছিল, তৃণমূল নেতাদের এসব পরামর্শ নিয়ে স্থায়ী কমিটির সদস্যরা বৈঠক করে আগামী দিনের করণীয় ঠিক করবেন। এরপর তা চূড়ান্ত করতে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পরামর্শ নিয়ে আমাদের জানাবেন। তিনি আরও বলেন, সেপ্টেম্বর থেকে কঠোর আন্দোলনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

বিএনপির তৃণমূল নেতারা মনে করেন, আগামী দিনের সরকারবিরোধী আন্দোলন সফল করতে হলে আগে ঢাকায় কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। না হলে ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপির আন্দোলন যেভাবে ব্যর্থ হয়েছে, এবারও সেভাবে ব্যর্থ হবে। এ কারণে নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা, নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের দাবি মানাতে সরকারকে বাধ্য করতে হলে ঢাকায় আন্দোলন সফল করতে হবে।

জানতে চাইলে খুলনা জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট শফিকুল আলম মনা বলেন, এখনও আন্দোলনের কোনও নির্দেশনা আমরা পাইনি। কিন্তু আগামী দিনের আন্দোলন সফলতা পাওয়াসহ বিএনপির দাবিগুলো সরকারকে মানাতে বাধ্য করতে হলে ঢাকার নেতাদের কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। ঢাকায় কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলতে পারলে জেলাগুলোয় এমনিতে আন্দোলন সফল হবে। তবে আমরা সাংগঠনিক শক্তি অনুযায়ী আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছি।

রাজশাহী মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শফিকুল হক মিলন বলেন, সেপ্টেম্বরে দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী থেকে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে। আগামীতে ঢাকায় শতভাগ আন্দোলন গড়ে তুলতে পারলে আন্দোলন দৃশ্যমান হবে। না হলে তৃণমূলে আন্দোলন করে কোনও লাভ হবে বলে আমার মনে হয় না। কারণ, ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে জেলাগুলো আন্দোলন সফল হলেও ঢাকায় কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারায় এর সফলতা বিএনপির ঘরে ওঠেনি।

জানা গেছে, আগামী পহেলা সেপ্টম্বর দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকায় একটি বিশাল জনসমাবেশের আয়োজন করবে বিএনপি। এরই মধ্যে সোহরাওয়াদী উদ্যান অথবা নয়াপল্টনে সমাবেশ করার অনুমতি চাওয়া হয়েছে। এতে দলের সিনিয়র নেতারা বক্তব্য রাখবেন। আর সেই জনসমাবেশে বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারকে শেষবারের মতো সংলাপের আহ্বান জানিয়ে সময় নির্ধারণ করে দেয়া হবে। একইসঙ্গে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানানো হবে। সেক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে সংলাপ-সমঝোতায় সকলের অংশগ্রহণে নির্বাচন ব্যবস্থার উদ্যোগ গ্রহণ না করা হলে আন্দোলনের চূড়ান্ত কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করার মাধ্যমে ভোটের অধিকার রক্ষায় সমগ্র দেশ অচল করার আন্দোলন কর্মসূচিও ঘোষণা করা হতে পারে ওই সমাবেশে।

বিএনপি’র দফতর সূত্রে জানা গেছে, আন্দোলনের জন্য ২০ দলীয় জোট তাদের সাংগঠনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে নেতাকর্মীদের মাঝে উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি আদায়ে এবার উত্তাল আন্দোলন গড়ে তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে জোট। এ আন্দোলনে শুধু বিএনপি ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটেই নয়, বরং সরকার বিরোধী ভিন্ন মত পোষণকারী সর্বস্তরের রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে সমাজের বিশিষ্ট নাগরিক, সুশীল সমাজ, পেশাজীবীদের শরিক করার পরিকল্পনা রয়েছে দলটির। এ আন্দোলনে যোগ দিতে ইতিমধ্যে জোটের বাইওে থাকা অন্যান্য দলগুলোকে নিয়ে জাতীয় ঐক্য করার প্রক্রিয়া চলছে। যার মাধ্যমে সরকারকে ক্ষমতা থেকে হটানো হবে বলে বিশ্বাস করে বিএনপি। তারই অংশ হিসেবে বেগম জিয়া কে ডান আর কে বাম, তা চিন্তা না করে সবাইকে সরকার বিরোধী আন্দোলনে সামিল হওয়ার আহবান জানিয়েছেন। কারাগারে থেকেও তিনি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সবাইকে ঐক্যভদ্ধভাবে আন্দোলন করার নির্দেশ দিয়েছেন। 

এ প্রসঙ্গে ক্ষমতাসীন সরকারকে উদ্দেশ্য করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, কাল বিলম্ব করবেন না। অপহরণ, গুম ও খুন বন্ধ করে সুস্থ মন নিয়ে আলোচনার টেবিলে আসুন। অসুস্থ মন নিয়ে আলোচনায় আসবেন না। আসুন গণতন্ত্র রক্ষায় সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশকে রক্ষা করি। তিনি বলেন, সংলাপ, আলোচনা ও সমঝোতার মধ্য দিয়ে আমরা নির্বাচন চাই। কারণ, নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্রকে রক্ষা করা যাবে না। গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে হলে দেশের সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই।

বিএনপির সিনিয়র এক নেতা বলেন, ঈদের পর যে আন্দোলন হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর এবার এমন আন্দোলন গড়ে তোলা হবে যে ক্ষমতাসীন সরকারের অস্ত্র স্তব্ধ হয়ে যাবে। জুলুমবাজ সরকারের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তিনি আগামী দিনের আন্দোলন সংগ্রাম শতভাগ সফল করে কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে নিজেদের ভেদাভেদ ভুলে জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন। 

এদিকে আন্দোলনের পাশাপাশি নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ অন্যান্য দাবিতে কূটনৈতিক তৎপরতাও অব্যাহত রাখবে ২০ দলীয় জোট। অভিযোগ রয়েছে, নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায়ে বিএনপি রাজপথে আন্দোলনের পাশাপাশি কূটনৈতিক পর্যায়ে সু-সম্পর্ক গড়ে তুলতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। যদিও এখন দেখা যাচ্ছে রাজপথে বিএনপি’র আন্দোলন যেমন ব্যর্থ হয়নি, তেমনি কূটনৈতিক পর্যায়ে সম্পর্কের কোনো অবনতি হয়নি। দেশি-বিদেশি একটি মহল নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য জাতীয়তাবাদী শক্তির বিরুদ্ধে এ ধরনের অপবাদ-অপপ্রচার চালাচ্ছে। 

সূত্রটি জোর দাবি করে বলেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানের দোহাই দিয়ে আজীবন ক্ষমতায় থাকতে ৫ জানুয়ারি একটি একদলীয় তামাশার নির্বাচন করেছে। যে নির্বাচন কেবল দেশের জনগণই নয়, সমগ্র বিশ্ববাসী প্রত্যাখ্যান করেছে।

জানা গেছে, অতীত কর্মকা-ের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে বিএনপি এবার দেশি-বিদেশি কূটনীতিকদের সাথে সু-সম্পর্ক সৃষ্টিকে বেশি আমলে নিয়েছে। বিএনপি’র কূটনীতি বিষয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর,  স্থায়ী কমিটির সদ্য ড. মঈন খান, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা রিয়াজ রহমান ও সাবিহ উদ্দিন আহমেদ, ড. ওসমান ফারুক, সাংবাদিক শফির রেহমানকে। জানা গেছে, দেশের বাইরে যে সব দেশে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকা- রয়েছে এবং বিএনপি সম্পর্কিত কমিটি রয়েছে, তারাও তাদের সাধ্যমত নিজ নিজ দেশের কূটনৈতিক পর্যায়ের সাথে সু-সম্পর্ক গড়ে তুলতে কাজ করে যাচ্ছেন। দলের পক্ষে অনেক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে বিভিন্ন ইস্যুতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের উদ্দেশ্যে তীর ছুঁড়ছেন। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের ৯০ ভাগ মানুষ সংলাপের মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান চাইছে। ঠিক তেমনী বিদেশীরাও একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের তাগিদ দিচ্ছে। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অধিকাংশ দেশই মনে করে একটি দেশের বেশিরভাগ মানুষ যে ফর্মূলা চায় গণতান্ত্রিক দেশ সেই অনুযায়ী চলা দরকার। আর এ প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনায় রেখেই জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন সরকারের বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করে একটি নিরপেক্ষ সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা বলেছেন।  ক্ষমতা ছেড়ে বাংলাদেশের মানুষের দাবির আলোকে সবার অংশ গ্রহণে একটি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দেওয়ার পক্ষে অবস্থান করছে যুক্তরাষ্ট্র। তারা বার বার বলছে, বাংলাদেশকে এগোতে হলে সবার অংমগ্রহণে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশে নিযুক্ত দেশটির নতুন রাষ্ট্রদূতও বলেছেন, বাংলাদেশের নির্বাচন ছিল খুবই প্রশ্নবিদ্ধ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ