ঢাকা, শনিবার 25 August 2018, ১০ ভাদ্র ১৪২৫, ১৩ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

গরু বিক্রি করতে না পেরে খামারির মাথায় হাত

 

স্টাফ রিপোর্টার : এবার কুরবানি পশুর হাটগুলোতে পশুর পর্যাপ্ত দাম পাননি ব্যবসায়ীরা। দাম না পেয়ে পশু নিয়ে বাড়ি ফিরছেন খামারিরা। কুরবানি হাট শুরুর দিকে যথেষ্ট দাম থাকলেও শেষের দিকে পশুর দাম একেবারেই পড়ে যায়। এ জন্য অনেক ব্যবসায়ীকে লোকসান গুনতে হয়েছে। বেশি লাভের আশায় যারা শেষ মুহূর্তের জন্য পশু রেখে দিয়েছেন তারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, কুরবানি হাটের এই দরপতনের পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে।

তাদের মতে, গত বছরের তুলনায় এ বছর তারা একটু বেশি পশু পালন করেছেন। কারণ, গত ঈদে পশুর সংকট দেখা দেয়। তাছাড়া এ বছর ১৫ আগস্ট ও ঈদ কাছাকাছি সময়ে পড়ে যায়। এ কারণে একটু চাহিদা বেশি থাকবে বলে তাদের ধারণা ছিল। এ চাহিদাকে কেন্দ্র করে ঈদ বাজারে পশুর দাম বাড়বে। তখন বেশি দামে পশু কিনতে হবে ক্রেতাকে।

 দেশে পর্যাপ্ত পশু মজুদ রয়েছে জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়, এবার ঈদুল আযহায় কুরবানিযোগ্য গবাদিপশু রয়েছে প্রায় এক কোটি ১৬ লাখ। গত বছর এ সংখ্যা ছিল এক কোটি চার লাখ ২২ হাজার।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২০১৬ সালে দেশে কুরবানি হয়েছে এক কোটি তিন লাখ (সব ধরনের পশু)। ২০১৭ সালে এ সংখ্যা ছিল এক কোটি পাঁচ লাখ। সে অনুযায়ী এবার পাঁচ বা ১০ ভাগ কুরবানি বেশি হলেও এক কোটি ১৬ লাখ পশু যথেষ্ট। এ অবস্থায় ভারত ও মিয়ানমার থেকেও পশু এসেছে। এমন খবরের পরও ব্যবসায়ীরা শেষ মুহূর্তের জন্য পশু ধরে রেখেছেন।

ব্যবসায়ীদেও অভিযোগ সারা দেশে রাজনৈতিক হয়রানি আর বিরোধী দলের নেতা কর্মীদের ওপর অব্যাহত হামলা মামলার কারনেই কুরবানির পরিমানও অনেক কমেছে। কি পরিমান কুরবানি আসলে কমেছে তা কেউ বলতে পারছেনা। তবে গরুর ব্যবসায়ীরা বলছেন,এখনও সারা দেশে প্রায় ১০/১২ পশু অবিক্রীত রয়ে গেছে।

ব্যসায়ীরা জানিয়েছেন, প্রথম কয়েকদিন পশুর চাহিদা ছিল যথেষ্ট। তখন কুরবানিদাতাদের অনেকেই অপেক্ষাকৃত বেশি দামে পশু কিনেছেন। আরও বেশি দাম পাওয়ার আশায় অনেক ব্যবসায়ী তখন পশু বেচেননি। তাদের আশা ছিল, শেষ মুহূর্তে আবার পশুর সংকট দেখা দেবে। তখন বেশি দাম পাওয়া যাবে।

তবে ব্যবসায়ীদের এই ‘ফাঁদ’ সরকার নজরে রাখে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এ জন্য সীমান্তেও কড়াকড়ি ছিল না। ভারত ও মিয়ারমার থেকে পশু আসতে থাকে।

ব্যবসায়ীদের মতে, এই ঈদকে কেন্দ্র করে কমপক্ষে ১৬ থেকে ২০ লাখ পশু এসেছে দেশের বাইরে থেকে। এই অতিরিক্ত পশু যুক্ত হয় দেশের কুরবানির বাজারে। এ খবর পেয়ে যান ক্রেতারাও। ঈদের আগের দিন মঙ্গলবার  সকাল থেকে রাজধানী হাটে এসব গরু প্রবেশ করতে থাকে। এর পরেই শুরু হয় দরপতন। আগেরদিন সোমবার মাঝারি আকারের যে গরুর দাম ওঠে ৯০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পরদিন সেই গরুর দাম হয় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। এ অবস্থায় বেশি দামের আশায় যারা শেষ মুহূর্তের জন্য পশু রেখে দেন তাদের মাথায় হাত পড়ে।

জানতে চাইলে কমলাপুর হাটের পশু ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন বলেন, এ বছর পশুর পর্যাপ্ত সরবরাহ ছিল। দেশের খামারগুলোতেও ভালো উৎপাদন হয়েছে। গত ঈদে পশুর কাড়াকাড়ি দেখে এ বছর আমরা লাভের আশায় একটু বেশি করেই পশু পালন করেছি।  তিনি জানান, তাছাড়া ঈদ ও ১৫ আগস্ট প্রায় সমসাময়িক সময়ে পড়ে যাওয়ায় চাহিদা একটু বেশি হয়েছে। ১৫ আগস্টেও অনেক গরু জবাই হয়েছে। এজন্য তারা শেষ মুহূর্তের জন্য পশু রেখে দিয়েছেন। ভালো দাম পেয়েও আরও বেশি দামের আশায় বিক্রি করেননি। শেষ মুহূর্তে ভারত ও মিয়ানমার থেকে অনেক পশু এসেছে। সে কারণে দাম পড়ে গেছে।

মেরাদিয়া হাটের ব্যবসায়ী ইউনুছ আলী বলেন, ভারতীয় গরু আর দেশি গরুর দাম এক নয়। ভারতীয় গরু দাম অনেক কম। দেশি গরুতে খরচ বেশি। দেশি গরু ভারতীয় গরুর দামে বিক্রি করলে ব্যবসায়ীকে লোকসান গুনতে হবে। আর ক্রেতারা কম দামে পশু পেয়ে ভারতীয় গরুর দিকে ঝুঁকেছে। সে কারণে গরুর দাম পড়ে গেছে।

তিনি জানান, শুরুর দিকে পশুর দাম বেশি হওয়ার কারনেই সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে এক দিনেই কয়েক লাখ গরু প্রবেশ করে। এসব গরু ঈদের আগের দিন রাজধানীর বাজারে প্রবেশ করে। এতে  হঠাৎ করে বাজার পড়ে যায়। ব্যবসাযীরা কোন কিছু বুঝে উঠার আগে বাজার তাদের নিয়ন্ত্রনের বাহিরে চলে যায়। এতে করে তাদের লোকসান গুনতে হয়েছে। তবে বাজার এত মন্দা হয়ে যাবে তা কেউ ধারনাও করতে পারেনি।

 খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর হাটগুলোতে শেষ সময়ে যারা এসেছেন, তারা কম দামে পশু পেয়ে ফিরছেন হাসিমুখে। আর কাঙ্ক্ষিত দাম না পেয়ে বিক্রেতাদের চোখেমুখে হতাশার ছাপ দেখা গেছে।

গাবতলী হাটের ইজারাদার মো. লুৎফুর রহমান বলেন, যেসব বিক্রেতা বেশি দামের আশায় প্রথমে পশু বেচেননি তারা পরে পশুর দাম পাননি। যারা বেচে দিয়েছেন তারা মোটামুটি লাভবান হয়েছে। শেষ মুহূর্তে বাজারে অনেক গরু এসেছে। তখন চাহিদা কমে গেছে। ফলে দাম পড়ে যায়। এ কারণে ব্যবসায়ীরা পশুর দাম পাননি।

বাংলাদেশ গোস্ত ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব রবিউল আলমের জানান, ভারত ও মিয়ানমার থেকে অনেক গরু এসেছে। বিদেশি গরু ছাড়াও এবছর দেশি পশু দিয়ে কুরবানি শেষ করা সম্ভব হতো। ব্যবসায়ীরাও শেষ মুহূর্তের জন্য বসে ছিল। কিন্তু শেষ বাজারে ভারত ও মিয়ানমারের অনেক গরু চলে এসেছে। সে কারণে দাম পায়নি ব্যবসায়ীরা।

তিনি বলেন, এ বছর শেষ মুহূর্তে কুরবানি পশুর হাটে যে দামে পশু বেচা হয়েছে সারাবছর তার চেয়েও কম দামে পশু বিক্রি করা সম্ভব হতো না। কারণ, এই ঈদে পথে পথে চাঁদাবাজি হয়নি। অন্য সময় চাঁদাবাজি হয়। পশুর দাম যদি ৫০ হাজার টাকা হয় চাঁদাবাজি হয় আরও ১০ হাজার। সে কারণে তখন দাম বেশি হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ