ঢাকা, শনিবার 25 August 2018, ১০ ভাদ্র ১৪২৫, ১৩ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রাম বাংলার  প্রকৃতির কারিগর বাবুই পাখি

একটি গাছে শৈল্পিক বাবুই পাখির বাসা

আল হেলাল, নালিতাবাড়ী : বাবুই পাখিরে ডাকিয়া বলিছে চড়াই, কুঁড়ে ঘরে থেকে করো শিল্পের বড়াই। আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকা পরে/ তুমি কত কষ্ট পাও রোদ বৃষ্টি ঝড়ে / বাবুই হাসিয়া কহে সন্দেহ কি তায় / কুঁড়ে ঘরে থাকি তবু নিজেরই বাস / পাকা হোক তবু ভাই পরের বাসা / নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচাঘর খাসা। বাবুই পাখির গড়া নিপুণ শিল্পের বুননের বাসা দেখে কবি রজনীকান্ত মুগ্ধ হয়ে লিখেছিলেন এই কবিতাটি। পাখিদের মধ্যে একমাত্র বাবুই কেবল খড়, ধান পাতা, খেজুর পাতা তালপাতা ঠোঁটে নিয়ে নিপুন বুননে বাসা বানায় উঁচু খেজুর গাছ, তালগাছ বা বাবলা গাছে। বাবুই পাখির বাসা আজো রহস্যে ঘেরা। নির্মাণশৈলী নান্দনিক। আগের মতো খেজুর গাছ কিংবা তালগাছ না থাকায় সর্বোপরি স্বাভাবিক বিচরণ ক্ষেত্র কমে যাওয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতির কারিগর বলে পরিচিত বাবুই পাখি। গ্রাম বাংলায় এখন আর আগের মতো বাবুই পাখির সেই শৈল্পিক বাসা চোখে পড়ে না।

জানা যায় কালের বিবর্তন ও প্রকৃতির বিপর্যয়ের কারণে আজ আমরা হারাতে বসেছি সেই কারিগর বাবুই শিল্পকর্মকে। আমাদের দেশে এক সময়ে তিন প্রজাতির বাবুই দাগী বাবুই ও দেশি বাবুই পাওয়া যোতো। গাছে জগের মজো চমৎকার বাসা তৈরি করায় এ পাখি করিগর বাবুই পাখি নামে পরিচিত। অনেকেই একে ‘তাঁতি পাখি’ও বলে। কথিত আছে বাবুই পাখি রাতের বেলায় ঘর আলোকিত করার জন্য জোনাকি পোকা ধরে নিয়ে বাসায় রাখে এবং সকাল হলে আবার তাদের ছেড়ে দেয়।

পরিবেশবিদদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, প্রায় ১৬-২০ বছর আগে গ্রাম গঞ্জের খেজুর, তাল, নারিকেল, বাবলা ও সুপারি গাছে প্রচুর বাবুই পাখির বাসা চোখে পড়তো। বাবুই পাখির এসব বাসা শুধুমাত্র শৈল্পিক নিদর্শনই ছিলোনা, বরং মানুষের মনে চিন্তারও খোরাক যোগাতো।

বাবুই পাখির বাসা যেমন দৃষ্টি নন্দন তেমনি মজবুতও বটে। প্রবল ঝড়ে বাতাসে টিকে থাকে তাদের বাসা। খড়, ধানের পাতা, তালের কচিপাতা, ঝাউ, ঘাস আখের পাতা ও কাঁশবনের লতাপাতা দিয়ে উঁচু নারিকেল খেজুর ও তাল গাছে চমৎকার আকৃতির বাসা তৈরি করতো বাবুই পাখিরা। গুচ্ছ গ্রামের মতো এক সাথে বাস করতো বাবুই পাখি। একাধারে স্থাপিত শিল্পী এবং সামাজিক বন্ধনেরও প্রতিচ্ছবি। বাবুই পাখি তাদের বাসা এতো মজবুত ও শক্তিশালীভাবে তৈরি করতো যে এ বাসা টেনেও ছেঁড়া কঠিন। এরা এক বাসা থেকে আরেক বাসায় যায় পছন্দের সঙ্গী খুঁজতে। বাবুই সাধারণত দ্ইু ধরণের বাসা তৈরি করে থাকে। স্ত্রী বাবুই পাখির প্রেরণা পেয়ে পুরুষ বাবুই খুবই শৈল্পিকভাবে এসব বাসা তৈরি করে। একটা বাসা তৈরি করতে ১০/১২ দিন সময় লাগে।

বাবুই পাখির কিচির-মিচির শব্দ এবং তাদের শৈল্পিক বাসা মানুষকে আনন্দিত করতো। কিন্তু বর্তমানে গ্রামাঞ্চলের রাস্তার ধারে বাড়ির পাশে ও পুকুর পাড়ে সেই তালগাছ যেমন আর দেখা যায়না তেমনি দেখা মেলে না শিল্পি বাবুই পাখিরও। গ্রামের মাঠের ধারে, পুকুর কিংবা নদীর তীরে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছ হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে গেছে বাবুই পাখি। এখন এসব যেন বইয়ের ছড়া এবং প্রবীনদের কাছে শানা গল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ। পরিবেশে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করা এবং বড় বড় তাল, খেজুর গাছ না থাকার কারণে হারিয়ে যাচ্ছে কারিগর পাখি বাবুই। তাই বাবুই পাখি ও এর শৈল্পিক নিদর্শন রাখার জন্য দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ