ঢাকা, রোববার 26 August 2018, ১১ ভাদ্র ১৪২৫, ১৪ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কুষ্টিয়ায় মাছ চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা  পরিকল্পনার অভাবে উৎপাদন ব্যাহত

 

খালিদ হাসান সিপাই, কুষ্টিয়া : মাছ উৎপাদনের উজ্জ্বল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পরিকল্পনার অভাবে  কুষ্টিয়ায় মাছের উৎপাদন হচ্ছে না। সুষ্ঠু পরিকল্পনা আর পরিবেশের উপর ফারাক্কার বিরুপ প্রভাব পড়ায় কুষ্টিয়াসহ দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের জলাশয়গুলোতে মাছের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়াও জলাশয়গুলোতে প্রভাবশালীদের দখলে থাকায় মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে না। কুষ্টিয়া জেলায়  বার্ষিক মাছের চাহিদা ৪২ হাজার ৮২০ টন, সেখানে উৎপাদন হচ্ছে ৩২ হাজার ৮৪০ টন। ফলে চাহিদার তুলনায় ঘাটতি থাকছে ১০ হাজার টন। এ জেলায় প্রায় ২১ লাখ মানুষের চাহিদা অনুসারে মাছের চাষ ও উৎপাদন কম হচ্ছে। জেলায় চাহিদার তুলনায় মাছের উৎপাদন কম হওয়ায় প্রায় সময়ই হাট-বাজারগুলোয় মাছের দাম চড়া। কুষ্টিয়া জেলা মৎস্য অফিস সুত্রে জানা যায়, কুষ্টিয়া জেলায় সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে প্রায় ২ হাজার খাল,বিল, হাওড়-বাওড়, পুকুর দীঘি, ডোবা-নালা, নদ-নদী। এর মধ্যে ১৪ হাজার ৮’শ ৩১টি পুকুর, ৩৯ টি বিল, ৮টি দীঘি, ৩টি বাওড়, নদী ৮টি, বেসরকারী কার্প নার্সারীরর সংখ্যা ৮৯ টি, হ্যাচারীর সংখ্যা ২০টি, সরকারি মৎস্য বীজ উৎপাদনকারী খামারের সংখ্যা ৪টি।  

সরকারি পুকুর রয়েছে ১৫টি। ওইসব পুকুরে মাছ উৎপাদন হয় প্রায় তিন হাজার ৫০০ টন। এছাড়াও বেসরকারি পুকুর রয়েছে ২১ হাজার ৫১১টি। এতে মাছের উৎপাদন হয় প্রায় ১৮ হাজার ১৯০ টন। বেসরকারি (বাণিজ্যিক) ১৭৫টি মৎস্যখামারে মাছ উৎপাদন হয় প্রায় ছয় হাজার ৩১৬ টন। সড়ক ও জনপথ, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও অন্য ১৯২টি জলাশয়ে মাছের উৎপাদন হয় ৪৮৪ টন। ধানক্ষেতে ৯১ টন মাছ চাষ হয়। এছাড়া প্লাবন ভূমি ও অন্য ৩২ জলাশয়ে ৮৪৩ টন মাছ চাষ হয়। সরকারি ২৪টি খালে ৩৮৭ টন মাছ চাষ হয়। সরকারি দুটি বাঁওড়ে ১০২ টন ও ১১ নদীতে দুই হাজার ৫৪৩ টন মাছ উৎপাদন হয়। এছাড়াও সরকারি তিনটি বিলে ৯৫ টন এবং বেসরকারি ৪৪ বিলে ৮৪৬ টন মাছ উৎপাদন হয়।  মাছ উৎপাদনের পরও ঘাটতি থেকে যাচ্ছে প্রায় ১০ হাজার টন।

জেলার এ সকল জলাশয়ে মাছ চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা ও অনুকুল পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও পরিকল্পনা মাফিক মৎস্য চাষ না করায় কুষ্টিয়া জেলায় মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছেনা। ইতিপূর্বে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য খাল বিল হাওড় বাওড়ে পোনা অবমুক্ত করলেও এখন আর ঠিকমতো পোনা অবমুক্ত করা হয় না।  এ ব্যাপারে জেলা মৎস্য অফিস সঠিকভাবে তত্ত্বাবধান না করায়  এবং মৎস্য চাষীদের উদ্বুদ্ধ না করায় মাছের উৎপাদন কমে যাচ্ছে।  জেলার বিভিন্ন উপজেলার মৎস্য খামার ও জলাশয় ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ পুকুর জলাশয়ে সনাতন পদ্ধতিতে মাছের চাষ করা হচ্ছে। তবে কিছু কিছু জলাশয়ে আধা নিবিড় পদ্ধতিতে মাছের চাষ করা হচ্ছে। যার কারণে মাছের চাষ সঠিকভাবে বাড়ছে না। উৎপাদনও বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। এদিকে জেলায় দিন দিন মাছের চাহিদা বেড়েই চলেছে। সে তুলনায় উৎপাদন করা হচ্ছেনা। 

তাই এ ঘাটতি পূরণে জেলায় মাছের বাড়তি চাহিদা পূরণে বাইরে থেকে মাছ আমদানি করতে হচ্ছে। মাছের চাহিদা বেশি থাকায় জেলার সকল হাট বাজারে দাম বেড়েই চলেছে। কোনক্রমেই মাছের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। নিম্নবিত্ত মানুষের মাছ কেনা ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ আমিষ জাতীয় খাবার মাছ নিয়মিত না খাওয়ায় পুষ্টিহীনতা দিন দিন বাড়ছে। এ জেলায় আছে অসংখ্য পুকুর-ডোবা, নদ-নদী, খাল-বিল, হাওড়-বাওড় এবং বিস্তৃর্ণ প্ল¬াবনভূমি। ষাটের দশকেও দেশে মোট মৎস্য উৎপাদনের ৯৫% আসতো প্ল¬াবনভূমিসহ অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয় থেকে। এর মধ্যে ১০-১৫% আসতো চাষকৃত মাছ থেকে। কিন্তু বর্তমানে ফারাক্কার বিরুপ প্রতিক্রিয়ায় বাধাগ্রস্থ হয়ে দাড়িয়েছে এ উৎপাদন। পুকুর ডোবায় পানি না থাকায় মাছের উৎপাদন যেমন কম হচ্ছে। তেমনিভাবে বছরে ৯ মাস নদ-নদীগুলোতেও পানি না থাকায় প্রাকৃতিক মাছ উৎপাদনও অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে জেলায় মাছের ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। 

মৎস্য বিজ্ঞানীদের অভিমত, চাষের মাধ্যমে মাছের উৎপাদন আর খুব একটা বাড়ানো যাবে না। তাই আমাদের প্লাবনভূমিসহ অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয়কে মাছ চাষ ও ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। দেশের যেসব নিম্নাঞ্চল বর্ষাকালে প্ল¬াবিত হয় এবং সাধারণত ৪-৫ মাস পানিতে নিমজ্জিত থাকে সেগুলোই 

মৎস্য গবেষক গৌতম কুমার জানান, পরিবেশের প্রভাবে বৃষ্টিপাত না হওয়ায় পুকুর কাল বিলে পানি নেই মাছের উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফারাক্কার কারণে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে ফলে মাছের উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। পানির ধারা প্রবাহিত না হওয়ায় মাছের প্রজনন যেমন হচ্ছেনা তেমনি মিঠা পানির মাছও বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। তাই পানির জন্য দেশীয় আর্ন্তজাতিক সমাধান যেমন প্রয়োজন তেমনই জরুরী হয়ে পড়েছে দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য গাছ লাগানো। গাছ ও বনাঞ্চল বাড়লে বৃষ্টিপাতের প্রভাবও বাড়বে খাল বিলে পানি পাওয়া যাবে, মাছের উৎপাদন বাড়বে। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা গোলাম কিবরিয়া জানান, মাছ উৎপাদন বৃদ্ধি করে ঘাটতি পূরণের জন্য ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১৫.৯৩ টন কার্প/দেশীয় প্রজাতির পোনা মাছ বিভিন্ন জলাশয়ে অবমুক্ত করা হয়েছে। এফসিডিআই ও জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১৬টি জলাশয় পুনর্খনন করা হয়েছে। কার্প, তেলাপিয়া ও পাঙ্গাস মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে কারিগরি সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। এছাড়াও জেলার মৎস্যচাষী ও মৎস্যজীবীদের অভিমত, প্রতি বছর হ্যাচারীতে উৎপাদিত একটা নির্দিষ্ট সংখ্যক বড় আকারের পোনা প্লাবনভূমিতে অবমুক্ত করে সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি করা যায়। এজন্য হ্যাচারীতে ব্যাপক পোনা উৎপাদন কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। 

 পোনা হ্যাচারীর মালিকরা জানান, এ জেলায় বেসরকারি মৎস্য হ্যাচারী ও নার্সারীতে জেলার চাহিদার তুলনায় ১০ গুণ পোনা উৎপাদন হয়েছে। যা জেলার চাহিদা পূরণ করে বাইরে রফতানী করা হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ