ঢাকা, রোববার 26 August 2018, ১১ ভাদ্র ১৪২৫, ১৪ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আমরা সবাই রোহিঙ্গা

২৫ আগস্ট, রয়টার্স/পার্স টুডে : গত বছর ২৫ আগস্ট শুরু হয়েছিল মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত সামরিক অভিযান। এর এক বছর পূর্তি উপলক্ষে গত শুক্রবার নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে অনুষ্ঠিত হয় এক বহুজাতিক ও আন্তধর্মীয় প্রতিবাদ সভা ও পদযাত্রা। এর আয়োজক ছিল বার্মা টাস্কফোর্স নামের একটি নাগরিক অধিকার সংগঠন। ম্যানহাটনের ইসলামিক কালচারাল সেন্টার থেকে শুরু হয়ে পদযাত্রাটি শেষ হয় মধ্য ম্যানহাটনে জাতিসংঘে মিয়ানমারের স্থায়ী প্রতিনিধির দপ্তরের সামনে। সেখানে বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে একটি স্মারকপত্র হস্তান্তর করা হয়। স্মারকপত্রে অবিলম্বে রোহিঙ্গা নির্যাতন বন্ধের পাশাপাশি বাংলাদেশ অবস্থানরত সব রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুকে নিরাপদে প্রত্যাবর্তন ও তাদের নাগরিকত্বসহ সব মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দাবি করা হয়।

নাগরিক জমায়েতে বিভিন্ন ধর্মের প্রতিনিধিরা রোহিঙ্গা মুসলিমদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন। যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের একজন প্রতিনিধিও এই জমায়েতে বক্তব্য দেন। ‘মুসলিম কবি’দের পক্ষে নিজের লেখা একটি দ্বিভাষিক কবিতা পড়ে শোনান আয়েশা। এক রোহিঙ্গা কিশোরী মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর হাতে নিহত রোহিঙ্গাদের একটি তালিকা থেকে কয়েকজনের নাম পড়ে শোনায়।বার্মা টাস্কফোর্সের অন্যতম সমন্বয়কারী এডেম ক্যারল জানান, গণহত্যার প্রথম বার্ষিকী উপলক্ষে নিউইয়র্ক ছাড়াও ওয়াশিংটন ডিসি ও শিকাগো এবং কানাডাতে পদযাত্রার আয়োজন করা হয়েছে। মার্কিন সরকার যাতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে, সে উদ্দেশ্যে এই টাস্কফোর্স কংগ্রেসের নেতাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চালাচ্ছেন বলে জানান।আগামী সপ্তাহে স্টেট ডিপার্টমেন্ট রোহিঙ্গা গণহত্যা বিষয়ে একটি প্রতিবেদন পেশ করার কথা। এই প্রতিবেদনের পর কংগ্রেসের ওপর চাপ সৃষ্টি তাদের পক্ষে সহজতর হবে বলে টাস্কফোর্সের অন্য এক সদস্য মতপ্রকাশ করেন।জুইশ এলায়েন্স ফর বার্মার একজন প্রতিনিধি বলেন, মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের যে হত্যাযজ্ঞের সম্মুখীন হতে হয়েছে, তার প্রতিবাদ করা সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ইহুদিদের বিরুদ্ধে গণহত্যার পর বলা হয়েছিল ‘আর নয়’। কিন্তু রোহিঙ্গাদের ঘটনা প্রমাণ করে, বিশ্ব সে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারেনি। নিজের হাতে ধরা একটি পোস্টারের দিকে অঙ্গুলিনিন্দেশ করে তিনি বলেন, ‘আজ আমরা সবাই রোহিঙ্গা।’

সঙ্কটে বিশ্ব ব্যর্থ : অ্যামনেস্টি

রোহিঙ্গা শরণার্থী সঙ্কটের একবছর হয়ে গেলেও বিশ্বনেতাদের ব্যর্থতার কারণে রাখাইনে মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটানো মিয়ানমারের সেনা সদস্যরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে বলে মনে করে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।

গতবছর অগাস্টেই শুরু হয়েছিল বিশ্বকে নাড়িয়ে দেয়া শরণার্থী সঙ্কটের। কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে সশস্ত্র সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) কয়েকদফা হামলার প্রেক্ষাপটে রাখাইনে রোহিঙ্গা নিধনে নামে সেনাবাহিনী।

দমন-পীড়নের মুখে ওই বছরের ২৫ অগাস্ট থেকে বাংলাদেশ অভিমুখে রোহিঙ্গাদের ঢল শুরু হয়। এরপর থেকে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে, যা এখনো চলছে। 

মিয়ানমারের বাহিনীর ওই অভিযানকে ‘জাতিগত নির্মূল অভিযান’ হিসেবে বর্ণনা করে আসছে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা। তবে মিয়ানমার সরকার তা অস্বীকার করে বলে আসছে, ওই অভিযান চালানো হয়েছে ‘সন্ত্রাসীদের বিরদ্ধে’।

রাখাইনে মিয়ানমার বাহিনী কিভাবে ‘জাতিগত নির্মূল অভিযান’ চালিয়েছে তারও ব্যবপাক তথ্যপ্রমাণ পেয়েছে অ্যামনেস্টি।

শুক্রবার অ্যামনেস্টির এক বিবৃতিতে বলা হয়, রাখাইনে রোহিঙ্গা গ্রামগুলো জ্বালিয়ে দেওয়া ছাড়াও সেখানে স্থলমাইনও ব্যবহার করেছে সেনাবাহিনী। এছাড়া হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, জোরপƒর্বক অনাহারে রাখা এবং দেশত্যাগে বাধ্য করার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো ঘটনাও সেখানে ঘটানো হয়েছে।

রোহিঙ্গা সঙ্কটের বর্ষপূর্তিকে লজ্জাজনক বলছে অ্যামনেস্টি।

অ্যামনেস্টির ক্রাইসিস রেসপন্স ডিরেক্টর তিরানা হাসান বিবৃতিতে বলেন, “এই বর্ষপূর্তি লজ্জাজনক একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। মানবতাবিরোধী সেইসব অপরাধীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে ব্যর্থতার মধ্যে দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিপদজনক যে বার্তা দিয়েছে, তা হল মিয়ারমারের সেনাবাহিনী শুধু দায়মুক্তিই ভোগ করবে না, তারা আবারও এ ধরনের নৃশংসতা চালাতে পারবে। আমাদের অবশ্যই আর এমন ঘটনা ঘটতে দেওয়া উচিত হবে না।”

তিনি আরও বলেন, একবছর হল লাখ লাখ রোহিঙ্গা পরিকল্পিত হামলার মুখে পালিয়ে এখনো বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরগুলোতে অমানবিকভাবে বসবাস করছে। পাশাপাশি তাদের নির্যাতনকারী মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাওয়ায় রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ স্বেচ্ছায় ঘরে ফেরার বিষয়টি উপহাসের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পথ খুলতে গত জুনে জাতিসংঘ এবং মিয়ানমার সরকারের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হলেও এর খসড়া ফাঁস হয়ে যাওয়ায় তা আর আলোর মুখে দেখেনি।

তবে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ফেরানোর আগে সেখানে ব্যাপক সংস্কারকাজ চালাতে হবে বলে জানিয়েছে অ্যামনেস্ট।

গত জুনে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের এক প্রতিবেদনে (উই উইল ডেস্ট্রয় এভরিথিং) রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির ওপর দমন অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া ১২ জনের নাম উঠে আসে। এদের মধ্যে মিয়ানমারের সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লায়িং রয়েছেন।

সংগঠনটি এদেরকে আটক করে জবাবদিহিতার আওতায় আনার সুপারিশ করেছে। বিশেষ করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা কাউন্সিলের অনুমোদন নিয়ে তাদেরকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে হাজির করা এবং ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য তাদের অপরাধের তথ্যপ্রমাণ সংরক্ষণের একটি পদ্ধতি খুঁজে বের করার সুপারিশ করেছে অ্যামনেস্টি।

“রোহিঙ্গা এবং মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের সংখ্যালঘুদের জন্য সুবিচার নিশ্চিতের পথ তৈরি করতে আগামী মাসে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল ও সাধারণ পরিষদের বৈঠকে কঠোর এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের উচিত জরুরিভিত্তিতে পুরো পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে জানানো। এক্ষত্রে ভিটো ক্ষমতা প্রয়োগের হুমকি কোনো অজুহাত হতে পারে না। জরুরি এই পরিস্থিতি হারানো উচিত হবে না,” বলেন অ্যামনেস্টির পরিচালক তিরানা হাসান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ