ঢাকা, রোববার 26 August 2018, ১১ ভাদ্র ১৪২৫, ১৪ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ক্ষমতাসীনদের লিখা রায়ই আদালতকে  দিয়ে বলানো হতে পারে

 

স্টাফ রিপোর্টার: ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা নিয়ে সরকারের বক্তব্যে ‘ফরমায়েসী’ রায়ের আশঙ্কা করছে বিএনপি। গতকাল শনিবার সকালে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এই আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় নিজেরা লিখে আদালতকে দিয়ে তা বাস্তবায়ন করাবেন কিনা মানুষের মনে সেই সংশয় এখন দেখা দিয়েছে তাদের (সরকার) বক্তব্য শুনে। মানুষ সেটাই ভাবছে। তাদের বক্তব্য শুনে মনে হয়, একটি ফরমায়েসী রায় হতে যাচ্ছে। আমাদের প্রশ্ন- আমরা দৃঢ়তার সাথে বলতে চাই, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ওবায়দুল কাদের সাহেবরা একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়কে প্রভাবিত করতেই দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে নিয়ে বেসামাল বক্তব্য রাখছেন।

সাংবাদিক সম্মেলনে দলের চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুক, আতাউর রহমান ঢালী, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, সাংগঠনিক সম্পাদক রহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, কেন্দ্রীয় নেতা মীর সরফত আলী সপু, আবদুস সালাম আজাদ, আসাদুল করিম শাহীন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে এই জাতীয় বক্তব্য সুদূর প্রসারী ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিতবাহী এমন প্রশ্ন তুলে রুহুল কবির রিজভী বলেন, ওবায়দুল কাদের সাহেব গত শুক্রবার বলেছেন, ২১ আগস্টের মামলার রায় হলে সংকটে পড়বে বিএনপি এবং আগামী সেপ্টেম্বরে সেই রায় হবে। কী করে জানলেন তিনি? তিনি তো সরকারের লোক মন্ত্রী। এটা তো আদালতের বিষয়। এটাই গভীর সন্দেহের বিষয়। কাদের সাহেবের এই বক্তব্যে এটাই প্রমাণিত হয় যে, তারা এই মামলার রায় নিয়ে আগাম কাজ করছেন। সেজন্য একের পর ষড়যন্ত্রমূলক কুট চাল চালাচ্ছেন তারা।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা নিয়ে আওয়ামী লীগ ‘উদ্দেশ্য প্রণোদিত রাজনীতি’ করছে অভিযোগ করে ওই মামলার রায়ে ক্ষমতাসীনদের অনুগত অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা কাহার আখন্দকে তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ, সম্পূরক চার্জশিট প্রদান, মুফতি হান্নানকে ৪১০ দিন রিমান্ডে নিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী করানো এবং একই ব্যক্তির দু’বার ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী প্রদানসহ নানা বিষয়ে প্রশ্ন তুলেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম-মহাসচিব। ২১ আগস্টে ঘটনার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তদন্ত সংস্থা এফবিআইকে আওয়ামী লীগ সহায়তা না করা, শেখ হাসিনাকে বহনকারী গাড়ি তদন্তকারীদের দেখতে না দেয়ার ঘটনার পেছনে ‘অনেক গভীর রহস্য লুকনো’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

রিজভী বলেন, ২০০৮ সালের ১১ জুন বর্তমান আইজিপি ও তৎকালীন সিআইডির অতিরিক্ত আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারীর তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে- ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালায় হরকাতুল জিহাদ, মুফতি হান্নানই পরিকল্পনাকারী, মওলানা তাজউদ্দিন গ্রেনেড সরবারহকারী, হামলার পরিকল্পনা হয় ১৯ আগস্ট। জাবেদ পাটোয়ারি তদন্ত প্রতিবেদনে কোথাও তারেক রহমান বা বিএনপির নাম নেই। যা ইতোমধ্যে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তাহলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ওবায়দুল কাদের সাহেবরা নীলনকশা পুরনের তাদের নিজেদের আইজিপির প্রতিবেদনকেও অগ্রাহ্য করা যা ছিলো দুরভিসন্ধিমূলক। 

রিজভী বলেন, আমরা প্রথম থেকেই দেখছি আওয়ামী লীগ একুশে আগস্ট বোমা হামলা মামলা নিয়ে উদ্দেশ্য প্রণোদিত রাজনীতি করছে। তাদের আন্দোলনের ফসল মইনউদ্দিন ফখরুদ্দিন সরকারের সময়ও এ মামলার চার্জশিটে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নাম ছিল না। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তাদের দলীয় লোক কাহার আকন্দকে তদন্তে কর্মকর্তা নিয়োগ দেন। তার আগেই কাহার আকন্দ পুলিশ ডিপার্টমেন্ট থেকে অবসরে গিয়ে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছিলেন, এমনকি ২০০৮ সালে জাতীয় নির্বাচনে নৌকার পক্ষে কাজ করেছেন। রাজনৈতিকউদ্দেশ্য হাসিলের জন্য তাকে পুলিশ বিভাগে ফের নিয়োগ দিয়ে এ মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা করা হয় ২০০৯ সালে। দলীয় চেতনার তদন্ত কর্মকর্তা কাহার আকন্দকে নিয়োগ দেয়ার উদ্দেশ্যই ছিল এ মামলায় তারেক রহমানকে জড়ানো। পরে ২০১১ সালে তারেক রহমানের নাম সম্পূরক চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করে শেখ হাসিনার প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা হয়। পূর্ব পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্রমূলকভাবে চার্জশিটে জনাব তারেক রহমানের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ জন্য নানা ধরণের ফন্দি ফিকিরের আশ্রয় নেয়া হয়। ২০০৭ সালে ১/১১ এর সময় ১৬৪ ধারায় মুফতি হান্নানের জবানবন্দীতে তারেক রহমানের নাম ছিল না। শুধুমাত্র এ মামলায় তারেক রহমানের নাম বলানোর জন্য অন্য মামলায় ৪১০ দিন রিমান্ডে নিয়ে অমানুষিক ও নির্মম নির্যাতন করা হয় মুফতি হান্নানকে। পৃথিবীর কোন দেশেই এ ধরনের নজির নেই। ৪১০ দিন রিমান্ডে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করে মুফতি হান্নানকে দিয়ে ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় জনাব তারেক রহমানের নাম বলতে ও তথাকথিত স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করে কাহার আকন্দ- যার কোন আইনগত ভিত্তি নেই। একই ব্যক্তির একই মামলায় দুই বার ১৬৪ ধারায় জবানবন্দীর নজির নেই। পরবর্তীতে আদালতে আবেদন করে মুফতি হান্নান তার তথাকথিত স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্যও প্রত্যাহার করে নেয় এবং তার উপর বর্বোরচিত নির্যাতনের বিবরণ দেয়।

তিনি বলেন, মুফতি হান্নানের ওপর নির্যাতন চালিয়ে তারেক রহমানকে একুশে আগষ্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় ফাঁসানোর জন্য পুরষ্কার স্বরূপ কাহার আকন্দের বার বার পদোন্নতিসহ চাকরির মেয়াদ বেড়েছে । আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা সমাবেশ শুরুর ২ ঘন্টা আগেও জানত না সমাবেশ বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে হবে। সেখানে মুফতি হান্নান কিভাবে দু’দিন আগেই জেনেছিল সমাবেশ বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে হবে? কার সিদ্ধান্তে সমাবেশস্থল মুক্তাঙ্গন থেকে সরিয়ে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে নেওয়া হয়েছিল। মুফতি হান্নান তার স্বীকারোক্তিতে বলেছিল, মুক্তাঙ্গনে আওয়ামী লীগের সভার কথাটি সে জানত। আবার স্বীকারোক্তিতে বলেছে বঙ্গবন্ধু এ্যাভিনিউতে বোমা হামলার পরিকল্পনা করেছে এবং সে জন্য সে তার বাড্ডার বাসা থেকে বঙ্গবন্ধু এ্যাভিনিউর দিকে রওয়ানা দিয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো মুফতি হান্নান মুক্তাঙ্গনে সভার কথা জেনে কেন শুরু থেকে সে বঙ্গবন্ধু এ্যাভিনিউতে বোমা হামলার পরিকল্পনা করেছিল? মুফতি হান্নান সভার স্থান পরিবর্তনের সংবাদ পেয়েছিল তাহলে কে তাকে এ সংবাদটি দিয়েছিল? মুফতি হান্নানের স্বীকারোক্তিতে গ্রেনেড নিক্ষেপের কথা বলা হয়েছে কিন্তু বন্দুক ব্যবহারের কথা নেই। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয় ও সিকিউরিটি অফিসার নাজিব আহমেদ বলেন তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার বুলেট প্রুফ গাড়িতে অসংখ্য গুলী করা হয়েছে। এ বন্দুক ও গুলী আসলো কোথা থেকে?

তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বিরোধী দল শূন্য আগামী নির্বাচন করতেই সরকার সর্বনাশা খেলায় মেতে উঠেছে। মানুষের ক্ষোভের ধাক্কায় আসন্ন পতনের ভয়ে সরকারের বুকে ধড়ফাড়ানি শুরু হয়েছে বলেই উদ্ভট বক্তব্য রাখছে । সামনে হয়ত আরো নতুন নতুন ষড়যন্ত্র করবে সরকার। রিজভী বলেন, যে দেশের প্রধান বিচারপতিকে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয় এবং জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করা হয় সেখানে নি¤œ আদালত কতটুকু স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে সে প্রশ্ন সারাদেশের মানুষের। বেগম খালেদা জিয়াও ন্যায় বিচার পান নি। বিরোধীদলশূন্য আগামী নির্বাচন করতেই সরকার সর্বনাশা খেলায় মেতে উঠেছে। মানুষের ক্ষোভের ধাক্কায় আসন্ন পতনের ভয়ে সরকারের বুকে ধড়ফড়ানি শুরু হয়েছে বলেই উদ্ভট বক্তব্য রাখছে। সামনে হয়ত আরও নতুন নতুন ষড়যন্ত্র করবে সরকার। কিন্তু যতই ষড়যন্ত্র ও মহাপরিকল্পনা করেন না কেন ওবায়দুল কাদের সাহেব আপনাদের পতন ঠেকানো যাবে না। আপনাদের পতনের ভূমিকম্প শুরু হয়েছে। 

লক্ষ্মীপুরে স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক ইয়াসীন আলীর বাড়িতে এবং ছাত্র দলের সিনিয়র সহ-সভাপতি মামুনুর রশীদ মামুনের নোয়াখালীর চাটখিলের বাড়িতে পুলিশ তল্লাশি, ভাঙচুর ও পরিবারের সদস্যদের দুর্ব্যবহার, স্থানীয় বিএনপি নেতা নাসিরউদ্দিন বকশী, দেওয়ান শামসুল আরেফিন শামীম, কাজল হোসেন ও রবিন শেখ, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের যুগ্ম-সম্পাদক এম এ হান্নান, ঢাকার দোহার উপজেলা সভাপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদকে গ্রেফতারের ঘটনার নিন্দা জানান রিজভী।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ