ঢাকা, রোববার 26 August 2018, ১১ ভাদ্র ১৪২৫, ১৪ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সামুদ্রিক জাহাজ থেকে  অবাধে বর্জ্য নিক্ষেপ

 

খুলনা অফিস : নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে মংলা বন্দরে আসা দেশী-বিদেশী জাহাজ থেকে পশুর নদীসহ সুন্দরবন উপকূলের জলসীমার যেখানে সেখানে বর্জ্য ও ময়লা আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। দেশের দ্বিতীয় সমুদ্র বন্দর মংলায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গড়ে দুইশ’র বেশি দেশী-বিদেশী বাণিজ্যিক জাহাজ আসা-যাওয়া করে। এসব জাহাজ থেকে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকা ও পশুর নদীতে অবাধে বর্জ্য ও দূষিত তেল নিক্ষেপ করা হচ্ছে। আর এ কারণে পশুর নদীসহ সুন্দরবন উপকূলীয় এলাকায় পরিবেশের ভয়াবহ বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন পরিবেশ বিজ্ঞানীরা।

বন্দর কর্তৃপক্ষের ট্রাফিক বিভাগের লাইসেন্স শাখার সহকারী ট্রাফিক পরিদর্শক মো.হারুনর রশিদ জানান, মংলা বন্দরে তালিকাভুক্ত ২৪টি গার্বেজ ক্লিনার (লাইসেন্স হোল্ডার) কোম্পানি রয়েছে। কিন্তু বন্দরে কোনো গার্বেজ সেন্টার না থাকায় বাণিজ্যিক জাহাজগুলো বন্দরে অবস্থান ও খালাস শেষে বন্দর ত্যাগ করার পথে সুন্দরবনের পশুর নদী ও উপকূলীয় জলসীমায় ময়লা আবর্জনা ও দূষিত জ্বালানি তেলের ফেলে যায়।

তিনি আরও বলেন, ‘অবাধে যত্রতত্র বর্জ্য ও দূষিত তেল ফেলার কারণে একদিকে যেমন নদীর নাব্যতা হ্রাস পাচ্ছে অন্য দিকে মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে পানি। পানিতে ফেলা বর্জ্য ও দূষিত তেলের প্রভাবে সুন্দরবনের গাছপালাসহ উপকূলীয় নদ-নদীর মৎস্য সম্পদের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে।’

সুন্দরবনে নির্ভরশীল পেশাজীবী সংগঠক পশুর রিভার ওয়াটার কিপার মো. নুর আলম শেখ জানান, বন্দরে নোঙ্গর করার পর থেকে অবস্থানকালীন প্রতিটি জাহাজে দুই থেকে তিন প্রকার বর্জ্য তৈরি হয়। এর মধ্যে তৈলাক্ত বা তরল বর্জ্য এবং গৃহস্থালি উভয় ধরনের আবর্জনাই রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘সাধারণ নিয়ম হচ্ছে বন্দরের একটি নির্দিষ্ট স্থানে জাহাজগুলো তাদের গার্বেজ বা বর্জ্য অপসারিত করবে। এ জন্য তারা বন্দর কর্তৃপক্ষ বা দায়িত্বপ্রাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে নির্ধারিত হারে টাকা দিতে বাধ্য। কিন্তু মংলা বন্দরের ক্ষেত্রে কোনও নিয়ম-নীতি নেই। অথচ ১৯৭৩ সালের বন্দর ব্যবহার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বিধিতে বর্জ্য অপসারণের ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশনা আছে।’

সূত্র জানায়, বন্দরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা কোনও ব্যবস্থা নেই। গার্বেজ ডাম্পিং বা আবর্জনা একটি নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার জন্য বন্দর এলাকায় দুই একর জায়গা রাখা হয়েছিল যা বর্তমান রফতানি প্রক্রিয়াজাতকরণ এলাকার মধ্যে পড়েছে।

এ ব্যাপারে মংলা বন্দরের কাস্টম ভেন্ডার এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এম এ মোতালেব বলেন, ‘বন্দরে জাহাজ ভিড়ার পর গার্বেজ অপসারণে জাহাজের ক্যাপ্টেনরা রাজি হন না। আর গার্বেজ অপসারণ সম্পর্কে এজেন্টও (শিপিং এজেন্ট) কিছুই বলেন না। ফলে বর্জ্য অপসারণের ক্ষেত্রে এই বন্দরের তেমন কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। যে সব ক্যাপ্টেন বর্জ্য অপসারণে রাজি হন তারা নামমাত্র অর্থ দেয়। ওই টাকায় যে সব শ্রমিক বর্জ্য অপসারণ করে তাদের পাওনা ও আনুষাঙ্গিক ব্যয় মেটানো সম্ভব হয় না। এ কারণে লাইসেন্স গ্রহীতারাও হতাশ। উপরন্তু এসব লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানকে গার্বেজ ডাম্পিং এর জন্য কোনো নির্দিষ্ট স্থান দেয়া হয়নি।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানের প্রফেসর ড. আব্দুল্লা হারুন বলেন, ‘জাহাজের আবর্জনা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সমর্থন দিতে পারেনি। তা ছাড়াও তারা আবর্জনা সংক্রান্ত বিধি মানতে বাধ্য করাতে না পারার জন্য সামগ্রিক পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। তরল বর্জ্য ঢেউয়ের আঘাতে আঘাতে সুন্দরবন সংলগ্ন নদ-নদী-খাল ও নালায় ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে কঠিন বর্জ্যগুলো এক পর্যায়ে নদীগর্ভে গিয়ে ঠাই নেয়। এর ফলে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় বলে তিনি জানান।

মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের ট্রাফিক সূত্র জানায়, ২০০১ সাল থেকে ২০১৮ সাল এর জুলাই পর্যন্ত ৫ হাজার ৩২৫টি দেশী-বিদেশী জাহাজ বন্দরে আসা-যাওয়া করেছে। সে হিসাবে প্রতি বছর গড়ে ২ শতাধিক জাহাজ মংলা বন্দরে আসা-যাওয়া করে। প্রতি জাহাজ থেকে সর্বনিম্ম ১০ থেকে ১৫ টন জ্বালানি বর্জ্য পশুর নদী ও সাগরে ফেলা হচ্ছে। এ হিসাব অনুযায়ী বছরে প্রায় ২ হাজার টন জ্বালানি বর্জ্য সাগর উপকূলে নিক্ষেপ করা হয়। এভাবে প্রতিনিয়ত পরিবেশ আইন লঙ্ঘন চললেও এ ব্যাপারে কোনও মামলা কিংবা আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, এমন কোনও নজির নেই।

সমুদ্রগামী নৌযান থেকে সুন্দরবন সংলগ্ন নদ-নদীতে ফেলা বর্জ্য ও জ্বালানি তেল সুন্দরবনের ওপর প্রভাব ফেলছে বলে জানান, পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জ কর্মকর্তা শাহীন কবির।

তিনি বলেন, জোয়ারের পানির সঙ্গে বর্জ্য ও দূষিত তেল বনের ভেতরে ঢুকে গাছের মারাত্মক ক্ষতি করেছে। দূষিত বর্জ্য ও জ্বালানি তেলের প্রভাবে উপকূলীয় মৎস্য সম্পদ অনেকটা হুমকির মুখে।’

বছর কয়েক আগে বঙ্গোপসাগরে পানি দূষণের উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান, বিদেশি জাহাজের বর্জ্যে ওই সময় সুন্দরবন উপকূলীয় নদ-নদীগুলোর পানি দূষিত হয়ে কালো বর্ণ ধারণ করেছিল। দূষণে টিকতে না পেরে প্রকৃতির নিয়ম ভঙ্গ করে ইলিশসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছ উপকূলীয় খাল ও নদ নদীতে ঢুকছে। এর কারণে প্রজনন ও বৃদ্ধি বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ