ঢাকা, শুক্রবার 16 November 2018, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

সিলেটের পর্যটন স্পটগুলোতে উপচে পড়া ভিড়

সংগ্রাম অনলাইন ডেস্ক:

জেলার জাফলং, লালাখাল, রাতারগুল, বিছনাকান্দি, পাংথুমাইকে ঘিরে পর্যটকদের আগ্রহ সারা বছরই থাকে। ঈদুল আযহার লম্বা ছুটিতেও তাই এর ব্যতিক্রম নেই, বরং এবছরের ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের সংখ্যা আগের তুলনায় কয়েকগুণ বেড়েছে। নগরীর বিভিন্ন হোটেল মোটেল ঈদের আগে থেকেই বুক করা, ফাঁকা নেই কোথাও। সারা দেশ থেকে হাজার হাজার সৌন্দর্য পিপাসু মানুষ ছুটে এসেছেন সিলেটে। কেউবা পরিবার পরিজন নিয়ে, কেউ আবার বন্ধুবান্ধবের সাথে।

সিলেট জেলার ছয় পর্যটন স্পটের পাশাপাশি চা-বাগান, কমলা বাগান, খাসিয়াপুঞ্জি সবই ঘুরে দেখছেন পর্যটকরা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পর্যটকরে ভিড় জাফলং-এ। গোয়াইনঘাট উপজেলার এ পাথরবেষ্টিত পর্যটনকেন্দ্র দেশের অন্যতম সুপরিচিত বলেই এখানে ভিড়টা তুলনামুলকভাবে বেশি। ভাঙাচোরা সড়কের কারণে অনেক পর্যটক একটু বিরক্ত হলেও উৎসবের আমেজই ছিলো সবার মাঝে। কথা হয় জাফলং ঘুরতে আসা ময়মনসিংহের আদিব আহমেদের সাথে। তিনি বলেন, ‘আমি আগেও কয়েকবার এসেছি এখানে। স্বপরিবারে এসেছি এ প্রথম। মায়াবী ঝরণাটা দেখা হয়নি এর আগে, এবারই প্রথম দেখলাম। প্রকৃতির কাছাকাছি আসতে পেরে ভালো লাগছে শুধু রাস্তাটা ভালো হলে আরো ভালো লাগতো।’ তাঁর স্ত্রী ফারিয়া জানান, ‘সিলেটের সবকিছুই সুন্দর। মেঘালয়ের পাহাড়গুলোও অসাধারণ, তার কোল বেয়ে নেমে আসা ঠান্ডা পানির নদী সত্যিই অপরুপ। জাফলং আর লালাখাল ঘুরেছি, দুই জায়গাই পছন্দ হয়েছে খুব।’ তবে প্রশংসার পাশাপাশি অভিযোগ জানাতে ভোলেন নি তিনি। ভেজা কাপড় পাল্টানোর কোনো জায়গা নেই, রাস্তা ভালোনা এইটুকু বাদ দিলে প্রথমবার জাফলং ঘুরতে আসা ফারিয়ার ভালোই লেগেছে।

বিছানাকান্দিতেও পর্যটকদের ঢল নেমেছে। বাইরে থেকে আসা পর্যটকদের সাথে যোগ দিয়েছেন সিলেটের স্থানীয় সৌন্দর্য পিয়াসিরাও। মেঘালয় থেকে নেমে আসা স্বচ্ছ জলের নদী পিয়াইন আর পাংথুমাই-এর পাহাড়ী ঝরণা মন কেড়েছে সবার। নৌপথে এক ঘন্টার মনোরম ভ্রমণের পর জলে নামা থেকে বিরত থাকতে পারেন না কেউই। অনেকেই সদলবলে মেতে ওঠেন জলকেলিতে। ঠন্ডা জলের স্পর্শে নিজেকে মাতিয়ে রাখেন। বিছনাকান্দিতে ঘুরতে আসা আকাশ দাশ জানান, তিনি এসছেন সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে। বন্ধুদের সাথে এবারই প্রথম এসেছেন তাই বিছনাকান্দির সৌন্দর্যে মুগ্ধ তিনি। আকাশ দাস বাসসকে বলেন, এতো সুন্দর জায়গা আমাদের আশেপাশে আছে না দেখলে বিশ্বাসই করতে পারতাম না। ছবির মতো এমন সুন্দর জায়গাটিকে সরকার চাইলে একটি উন্নত পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। এখানে ভালো মানের কোনো হোটেল নেই। পাবলিক টয়লেট বা ওয়াশ ব্লক নেই। তাছাড়া রাস্তার অবস্থাও খারাপ। এসব দিকে নজর দিলে আমাদের মতো দেশি পর্যটকদের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকদেরও আরো বেশি আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে।

জাফলং, লালাখাল, বিছনাকান্দির মতো রাতারগুলেও প্রচুর পর্যটক এসেছেন এবার। নৌকা নিয়ে ঘুরে বেড়ানো আর ওয়াচ টাওয়ার থেকে বনের সৌন্দর্য অবলোকনে দেশের নানা প্রান্ত থেকে ভিড় জমাচ্ছেন পর্যটকরা। এছাড়াও মালনিছড়া, লাক্কাতুরা, জাফলং চা বাগানেও পর্যটকদের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।

গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিশ্বজিত কুমার পাল জানান, প্রতিটি ঈদেই গোয়াইনঘাট উপজেলার রাতারগুল, বিছনাকান্দি, জাফলং এ পর্যটক সমাগম বেশি হয়। আমরা পর্যটকদের নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি এবারও। ট্যুরিস্ট পুলিশের পাশাপাশি রাখা হয়েছে উদ্ধারকারী দল। এছাড়া পর্যটকদের জন্য বিশেষ হেল্প ডেস্ক খোলা হয়েছে। বিভিন্ন স্পটে ভাড়ার তালিকা টানিয়ে দেয়া হয়েছে।

এদিকে সিলেটে ঘুরতে আসা পর্যটকদের চাপে হিমশিম খাচ্ছে হোটেলগুলোও। নগরীর আবাসিক হোটেলগুলোতে তিল ধারণের জায়গা নেই। গত দুদিন থেকে অনেক পর্যটককেই হোটেল না পেয়ে ফিরে যেতে দেখা গেছে। নগরীর জিন্দাবাজারের হোটেল গোল্ডেন সিটির ব্যবস্থাপক মিষ্টু দত্ত জানান, শুক্রবার থেকে হোটেলে ভিড় বাড়তে থাকে। শনিবার দুপুর পর্যন্ত আমাদের পুরো হোটেলই বুক হয়ে যায়। এরপর থেকে অনেককেই ফিরিয়ে দিতে হয়েছে।

তবে পর্যটকদের অভিযোগের ব্যাপারে সিলেটের জেলা প্রশাসক নুমেরী জামান বলেন, ‘পর্যটকদের অভিযোগ একেবারেই ভুল নয়, তবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বিছনাকান্দি, পাংথুমাইতে ওয়াসব্লক নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। শীঘ্রই এটি স্থাপন করা হবে। এছাড়া আগামী ৬/৭ মাসের মধ্যে জাফলং, জৈন্তাসহ সিলেটের বিভিন্ন পর্যটন স্পটকে কেন্দ্র করে কয়েকটি রেস্ট হাউজ নির্মাণ করা হবে।’ তবে সিলেটের পর্যটন খাতের বিকাশে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

এদিকে সিলেটের পাশপাশি সুনামগঞ্জেও পর্যটকদের আগমন লক্ষ্যণীয়। হাজার হাজার পর্যটক এসেছেন টাঙ্গুয়ার হাওর, নীলদ্রি লেক, যাদুকাটা ও লাউড়ের গড় এলাকার সৌন্দর্য দেখতে। সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

ঈদের ছুটিতে হাজারো পর্যটকের পদচারণায় মুখরিত হাওরবেষ্টিত ভাটির জনপদ ও পর্যটন এলাকাখ্যাত সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলা। হিজল-করচ, নলখাগড়া বেষ্টিত নীল জলরাশির টাঙ্গুয়ার হাওর, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বীর বিক্রম শহীদ সিরাজ লেক (নীলাদ্রী লেক), রূপের নদী যাদুকাটা ও প্রয়াত চেয়ারম্যান হাজি জয়নাল আবেদীনের শিমুল বাগানে হাজারো পর্যটকের ঢল নেমেছে।

ঢাকা, সিলেট, ময়নসিংহ, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা পর্যটকদের উল্লাসে মেতে উঠেছিল পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনাময় তাহিরপুর উপজেলার পর্যটন স্পটগুলো।

কথা হয় ঢাকা থেকে আসা এক বেসরকারি চাকুরিজীবি সাব্বির খানের সাথে। তিনি সপরিবারে বেড়াতে এসেছেন টাঙ্গুয়ার হাওরে। তিনি বললেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে টাঙ্গুয়ার হাওরসহ এ উপজেলার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানের ছবি দেখে ঈদের ছুটিতে এখানে বেড়াতে আসলাম। অনেক ভালো লেগেছে। প্রতিটি স্থানই আলাদা, প্রকৃতির এ অপরূপ শোভা দেখে আমি মুগ্ধ।

পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে তাহিরপুর থানা পুলিশের উদ্যোগে বিশেষ টহলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া নৌকায় রাত্রিযাপনকারীদের নাম ঠিকানা অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে বিশেষভাবে। সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

বরিশাল থেকে আসা পর্যটক সিরাজ মিয়া বলেন, এলাকাটি খুবই মনোমুগ্ধকর। যে কারো ভালো লাগবে। কিন্তু রাস্তাঘাট ভালো না থাকায় কিছুটা কষ্ট হয়েছে। এছাড়া নৌকা ভাড়াও বেশি। এদিকে প্রশাসনের নজর দেয়া উচিত।-বাসস

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ