ঢাকা, সোমবার 27 August 2018, ১২ ভাদ্র ১৪২৫, ১৫ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সোনার বাংলায় নাব্যতা- প্রাপ্যতার হিসাব-নিকাশ

 

অধ্যক্ষ ডা. মিজানুর রহমান : ॥ পূর্বপ্রকাশিতের পর ॥ বিশেষ করে এসব বিষয়ে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মাসিক আইন শৃঙ্খলা কমিটির সভায় ব্যাপক আলোচনা ও পর্যালোচনার পর কাগজে কলমে সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও বিষয়গুলো সুরাহা বা উন্নতির কার্যকরী পদক্ষেপ অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতির কারণে সম্ভব  হয়ে ওঠে না। ফলে নানা রকম দুর্ভোগ ও জননিরাপত্তার হুমকির মধ্যে দিয়েই দুর্গম চরবাসীদের দিনের পর দিন বসবাস করতে হয়।

এ বিষয়ে বিভিন্ন উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানার অফিসার ইনচার্জদের সাথে আলাপকালে তারা জানান-আইন শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আমরা আন্তরিক, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতির কারণে ঐসব দুর্গম এলাকায় তড়িৎ ভুমিকা রাখা সম্ভব হয় না। তবে তাৎক্ষণিক মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে আমরা নদী পথে বা স্থল পথে অভিযান চলাতে চেষ্টা করে থাকি।

বিগত ২০ বছরে প্রাকৃতিক বিপর্যয়, যমুনানদী ভাংগন ও বন্যায় এ সব জেলার মানচিত্র পাল্টে গেছে। স্থায়ী বা কাইম এলাকা নদী ভাঙ্গনের ফলে বিস্তীর্ণ জনপদ জেলা সদর ও থানা সদর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া যাতায়াত ব্যবস্থা নাজুক হয়ে পড়েছে। এসব চরাঞ্চলের যাতায়াতের একমাত্র বাহন হলো নৌকা। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নৌকা যোগে ঐসব এলাকায় পৌঁছাতে সময় লাগে ৫/১০ ঘন্টা। অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের ঐসব ভয়াবহ এলাকায় পুলিশ বাহিনীর স্বল্প সংখ্যক সদস্য চরাঞ্চলে জীবনের ঝুকি নিয়ে দুর্গম এলাকায় সড়ক ও নৌপথে যেতে অনিহা প্রকাশ করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়, ফলে এই সব চরাঞ্চলের অধিবাসীরা ভয়াবহ আতংকে দিনাতিপাত করেন। এছাড়া খড়া, বন্যা, ঝড়, সাইক্লোন, নদী ভাঙ্গন এর কারণে অভাবে দারিদ্রতা, পুষ্টিহীনতা, বাল্যবিবাহ, যৌতুক, সেনিটেশনের অভাব ও কর্মসংস্থানের অভাবের কারণে ঋণগ্রস্থ হয়ে অধিক সুদে টাকা ঋণ নিতে হয়। ঋণের টাকা পরিশোধ না করায় ভিটেমাটি হারিয়ে সর্বসান্ত হয়ে হাজার হাজার পরিবার এলাকা ছেড়ে নদী তীরবর্তি বাঁধে অথবা সরকারি খাস জমিতে ঝুপড়ি বেঁধে সন্তান স্ত্রী পরিবার নিয়ে মানবতার জীবনযাপন করতে হয়।

মুষ্টিমেয় ভাল মানুষ প্রথমে এদের সহায়তায় এগিয়ে এলেও সে পথ এখন রুদ্ধ প্রায়। এসব এলাকার নির্যাতিত বঞ্চিত মানুষেরা থানায় যোগাযোগ করলেও থানা কর্তৃপক্ষ অনেক সময় বলে থকেন এটাতো এই থানার এলাকা নয়। তা ছাড়া প্রয়োজনীয় ফোর্স নেই, সেলো নৌকা নেই, নৌকার ড্রাইভার নেই, রাত্রিবেলা যাতায়াত সম্ভব নয়, তেল নেই ইত্যাদি বাহানা করে দায় সারতে চায় বলে এলাকাবাসী অভিযোগ রয়েছে।

বগুড়া জেলার সরিয়াকান্দি উপজেলার দুর্গম এলাকা চালুয়া বাড়ী ইউনিয়নের মানিক দাইড় চরে গত ৫ বছরে অন্তত ৬ বার ডাকাতির ঘটনায় শতশত গরু ডাকাতি হয়েছে। সিরাজগঞ্জ জেলার কাজীপুর উপজেলার চর গিরিশ ইউনিয়নের যমুনা নদী তীরবর্তী নাটুয়ার পাড়া বৃহৎ হাটে সপ্তাহে দু’বার হাট বসে। এই হাটে ৫-৭টি জেলার চরবাসীরা তাদের উৎপাদিত শষ্য সামগ্রীসহ গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া বিক্রি করে নৌ যোগে বাড়ি ফেরার পথে নৌ ডাকাতদের কবলে পড়ে হাটুরেদের অনেকের জীবন অবসানসহ সর্বস্ব হারাতে হায়েছে।  

এবারের বর্ষার পর ৭টি জেলার অন্তত ১৫শ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বালু চর পড়েছে। ফলে রাজধানী ঢাকা সহ সারা দেশের সাথে নেী যোগাযোগ বন্ধ হয়ে পড়েছে। ১৯৯০ সালের পর যমুনা নদীর নাব্য সংকটের কারণে ফেরি সার্ভিসগুলো বন্ধ হওয়ায় অল্প সময়ে সল্প ব্যয়ে যাত্রী পারাপার, কৃষি পণ্য সামগ্রি, ডিজেল, সার সরবরাহ সহ নিত্য প্রয়োজনীয় মালামাল পরিবহন করা মারাত্মক ভাবে ব্যহত হচ্ছে।

২০০০ সালের পর থেকে উত্তরাঞ্চলের একমাত্র বড় নদী যমুনাতে শুরু হয়েছে নাব্য সংকট। বিগত পনের বছরে এই সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। শুকনো মৌসুমে লঞ্চ-ফেরি তো দূরের কথা, এসব এলাকায় এখন নৌকাও চালানো সম্ভব হচ্ছে না। 

সম্প্রতি সিরাজগঞ্জ জেলা থেকে উত্তরাঞ্চলের কুড়িগ্রাম জেলা পর্যন্ত যমুনা নদীতে নৌকা ঘাট ছিল প্রায় দেড় শতাধিক। পানির সল্পতাহেতু চর ও ডুবোচর পড়ায় নৌকা চলাচল করতে নাপারায় ঘাটগুলোর বেশীর ভাগই বর্তমানে বন্ধ হয়ে পড়ছে। ফলে নদী উপকূলীয় ১০ জেলার সঙ্গে রাজধানী ঢাকার সাথে নদীপথে যাতায়াত ও যোগাযোগ বন্ধ হয়ে পড়েছে। জামালপুরের বাহাদুরাবাদ ঘাট ও গাইবান্ধার বালাসীঘাট এবং জামালপুরের জগন্নাথগঞ্জ ঘাট ও সিরাজগঞ্জে ঘাটের মধ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ে ফেরি চলাচল প্রায় ১৫ বছর যাবত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে রেল পথে উত্তরাঞ্চলে জেলাগুলোতে নৌপথে পরিবহন ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে বেড়েছে চরম ভোগান্তি। 

ব্রিটিশ সকরার ১৯৩৮ সালে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে দেশে উত্তরাঞ্চলের রেল যোগাযোগ বৃদ্ধি লক্ষে যমুনা নদীতে জামালপুরের বাহাদুরাবাদ ঘাট ও গাইবান্ধার তিস্তামুখ ঘাট এবং জামালপুরের জগন্নাথগঞ্জ ঘাট ও সিরাজগঞ্জে ঘাটের মধ্যে ফেরি চলাচলের ব্যবস্থা করে ছিলো। ফলে দেশের পূর্বাংশে রাজধানী ঢাকা সহ চট্টগ্রাম, সিলেট বিভাগের সাথে দেশের পশ্চিমাঞ্চল রাজশাহী, খুলনা ও রংপুর বিভাগের সাথে রেল পথে অল্প খরচে নিরাপদে সল্প সময়েই মালামাল সহ যাত্রীসাধারণ যাতায়াতের পথ সুগম হয়ে ছিলো।

যমুনা সেতু নির্মাণের পূর্ব পর্যন্ত এদেশের ৪৫টি জেলার মানুষ রেলওয়ের সুবিধা ভোগ করছিলো। কালের বিবর্তনে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব জনিত কারণে নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় নদী পথে সহজলভ্য পরিবহন ও যোগাযোগ অনেকাংশে পরিসমাপ্তি ঘটার পথে। স্বরণকালের বিলাসবহুল রেলওয়ে ও স্টিমার যাত্রা এখনো কোটি মানুষের অন্তরে দাগাদেয়।

বিগত ১৯৮৫-২০১৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ৩২ বছরে পর্যটক হিসেবে আমি দেশের উত্তরাঞ্চলের নদী উপকূলীয় উপজেলা ও জেলায় ভ্রমন করেছি। এ সময় জনপ্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক এবং ঐ সব এলাকার সাধারণ চরবাসীদের সাথে কথা হলে তারা আমার নিকট তাদের জীবন জীবিকার বিষয়ে নানা ধরনের অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরেন। 

এতে করে চরবাসীদের জীবন প্রবাহের নানারকম বিচিত্র অভিজ্ঞতা অর্জন করতে সক্ষম হই। বিশেষ করে বন্যা, খরা কবলিত নদী সিকস্তি জনপদের চরবাসীদের গত ২০ বছরের ব্যবধানে প্রচলিত গ্রামীণ লোক সংস্কৃতিতে দারুন ভাটা পড়েছে। খেলা-ধুলা, গান বাজনা, মেলা, যাত্রা, পালাগান, ভাটিয়ালি গান, জারিসারি গান, পল্লী গীতি, ভাওয়াইয়া, পীর-মুর্সিদি, মারফতী, দেহতত্ব, কাওয়ালী, লালন সংগীত, কবি লড়াই, সহ নানা প্রকৃতির চিত্তবিনোদন মূলক সংস্কৃতিক চর্চা এখান আর আগের মতো নেই। 

অপর দিকে নৌকা বাইজ, বাউদ (দলবেধে মাছ ধরা) সাতার, লাঠিবারী, হাডুডু, দাড়িয়া বান্দা, গোল্লাছুট, ঘুড়ি উড়ানো, ঘোরদৌড়, গরু দৌড়, ইত্যাদি প্রতিযোগিতা মূলক গ্রামীণ লোক সংস্কৃতিক বিলুপ্তির পথে। ধর্ম সভা, ওয়াজ মাহফিল, ইসালে সাওয়াব, তরীকতের সামা, এখন আর আগের মতো জাক-জমক ভাবে পালিত হয় না। আগের মতো জৌলুস নেই, নেই আনন্দ উল্লাস। সর্বপরী আধুনিকতার সব রকম সুযোগ সুবিধা বঞ্চিত এসব চরবাসীরা। এখনো গর্ভবতী মহিলাসহ জটিল রুগীদের সদর হাসপাতালে নিতে নিতে অসংখ্য রোগী মারা পড়ে। ডাক বিভাগের একটি চিঠি এখনও মালিকের হাতে পৌছতে সময় লাগে ১৫ থেকে ৩০ দিন।  

কাজেই একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় “৬৮ হাজার গ্রাম বাঁচলে-বাংলাদেশ বাঁচবে” এটি এখনো কথার কথা। এই বাণীর বাস্তবায়নে দেশের সরকার, সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, বৈদেশিক সংস্থা, রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবি, লেখক, সাংবাদিক, জনপতিনিধী, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র জনতা সহ সর্বস্তরের মেহনতি মানুষকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই হাজী শরিয়তুল্লা, শাহ্ মাখদুম, তিতুমির, শাহ জালাল, শাহ কামাল, শাহ পরান, মাওলানা ভাষানী, প্রেসিডেন্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ড. শহিদুল্লাহ, কবি নজরুল, কবি জসিম উদ্দিন, প্রেসিডেন্ট শহীদ জিয়াউর রহমান, প্রেসিডেন্ট এরশাদ, প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ইতিহাসবিদ আব্বাস আলী খানের স্বপ্নের সোনার বাংলা সত্যিকারের সোনার বাংলায় রূপান্তরিত হবে। সেই সাথে সহজ হবে বাংলাদেশের নদীগুলো নাব্যতা আর প্রাপ্যতার হিসাব-নিকাশ। (সমাপ্ত)

লেখক : জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ