ঢাকা, সোমবার 27 August 2018, ১২ ভাদ্র ১৪২৫, ১৫ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বিক্রি না হওয়ায় নষ্ট হয়েছে ১ লাখ গরু ১০ লাখ ছাগলের চামড়া

 

এইচ এম আকতার: নানামুখী চক্রান্তে কুরবানির পশুর চামড়ার দরে ধস নামায় পাচারের আশঙ্কা ব্যবসায়ীদের। বাংলাদেশে প্রতি বর্গফুট কাঁচা চামড়া ১২-২০ টাকায় বিক্রি হলেও প্রতিবেশী ভারতে তা বিক্রি হচ্ছে ৮০-১১০ টাকা বর্গফুটে। বিক্রি মূল্যের এই বিরাট ব্যবধানের কারণে পাচারের আশঙ্কা বাড়ছেই। তবে মূল্য নির্ধারণ সঠিক ছিল বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। চামড়া দাম কম হওয়ার কারণেই ইতোমধ্যে ১ লাখ গরু এবং প্রায় ১০ লাখ ছাগলের চামড়া নষ্ট হয়ে গেছে। সময় মতো বিক্রি না হলে আরও নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা চামড়া আড়ৎদারদের। 

জানা গেছে, আর্ন্তজাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে চামড়ার দাম কমানো হয়েছে। এর সাথে আবার যুক্ত হয়েছে স্থানীয় সিন্ডিকেট। এতে করে সরকার নির্ধারিত মূল্যে চামড়া বিক্রি হয়নি। নামে মাত্র মূল্যে চামড়া ছিনিয়ে নেয় এই চক্র। এতে করে চামড়ার বাজারে বড় ধরনের ধস নামে। অথচ প্রতিবেশি দেশে কাচা চামড়ার দাম এখনও ৮০ টাকা থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর্ন্তজাতিক বাজারে দাম কম হলে ভারত বেশি দামে চামড়া ক্রয় করে কি করে। ভারতে একটি কাঁচা চামড়া এখনও বিক্রি হয় আড়াই হাজার টাকা থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকায়। অথচ বাংলাদেশে তা বিক্রি হয়েছে মাত্র ৩০০-৭০০ টাকায়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দরে নেতিবাচক ধারা না থাকলেও বাংলাদেশে কমানো হয়েছে। প্রতিবছরের মতো এবারও কুরবানির ঈদের আগে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে গরু ও খাসির চামড়ার দর নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও একটি মহল তা মানেনি। চামড়া ভালো দরে বেচতে ব্যর্থ হলে তা ভারতীয় মাড়োয়ারিদের কাছে পাচার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়ার বাজার ও বিক্রেতাদের ক্ষতিগ্রস্ত করছেন।

ভারতের সাথে আমাদের প্রতিটি চামড়ার মূল্যে পার্থক্য প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা। এত বড় ব্যবধানে কীভাবে পাচার রোধ করা সম্ভব হবে। দাম কমিয়ে সীমান্তে কড়া নজর দারি করে কি চামড়া পাচার ঠেকানো সম্ভব। সংশ্লিষ্টরা বলছেন,দাম না পাওয়া গেলো কোনভাবেই চামড়ার পাচার ঠেকানো যাবে না।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশে চামড়া মূল্য আর্ন্তজাতিক বাজারে এমনিতেই ভারতের তুলনায় বেশি। কারণ ভারতে গরু কম জবেহ হওয়ার কারণে তারা মৃত গরুর চামড়া ব্যবহার করে থাকে। জীবিত গরুর চামড়ার চেয়ে মৃত গরুর চামড়ার মূল্য এবং মান অনেক কম। আর এ কারণেই ভারতের চামড়ার ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশের প্রতি নজর বেশি রয়েছে।

সূত্র জানায়, সারা দেশেই এ বছর চামড়ার দাম কম হওয়ার কারণেই কদর কমেছে। গরুর দামড়ার যেখানে মূল্য নেই সেখানে ছাগলের চামড়ার অবস্থা কি তা ডাস্টবিনে গেলেই দেখতে পাওয়া গেছে। গরুর চামড়া এক বার দাম বলে তা কিনতে না পারলে পরে আর সে চামড়া কিনতে আসেনি ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা। এতে করে অনেকই চামড়া মাটিতে পুতে ফেলতে কিংবা ডাস্টবিনে ফেলে দিতে বাধ্য হয়েছে। একইভাবে সংরক্ষণের অভাবেই সারাদেশে চামড়া নষ্ট হয়েছে। সব মিলে এখন পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ গরুর চামড়া নষ্ট বা পচে গেছে। শুধু তাই নয় প্রায় ১০ লাখ ছাগলের চামড়াও নষ্ট হয়েছে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।

এদিকে গতকাল এক সাংবাদিক সম্মেলনে চামড়ার দাম কমানোর সিদ্ধান্ত ভুল ছিল না বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। সেই সঙ্গে তিনি জানান, তিন কারণে কুরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ নিয়ে জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে।

তিন কারণে এবার চামড়া কম বিক্রি হচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, দাম কমানোর পরও বিক্রি হচ্ছে না এর কারণ হল এক নম্বর- গতবারের চামড়া রয়ে গেছে, দুই- যারা ট্যানারি মালিক, তারা বলছে ব্যাংকের ঋণ সঠিক সময়ে পায়নি, তিন- সাভারে যে কারখানাগুলো হওয়ার কথা সেগুলো গড়ে ওঠেনি।

এসব কারণেই এবার চামড়া কেনা-বেচায় সঙ্কট দেখা দিয়েছে মন্তব্য করে মন্ত্রী বলেন, ব্যবসায়ীরা গতকাল আশ্বাস দিয়েছেন এটা থাকবে না, ঠিক হয়ে যাবে। আমরা যে দামটা কমিয়েছিলাম আমাদের সিদ্ধান্তটা সঠিক ছিল।

প্রশ্ন হলো এই তিন কারণেই জন্য কে দায়ী। যারা পশু কুরবানি দিয়েছে তারা নাকি ট্যানারি মালিকরা। না কি সরকার। ট্যানারি হস্তন্তর সময় মতো ঋণ দেয়া এবং আর্ন্তজাতিক বাজার তৈরি করা এই তিনটি কাজই হলো সরকারের। এতে কারো কোনো হাত নেই। কিন্তু তিনি সেই ব্যর্থতা কোনো ভাবেই স্বীকার করলেন না।

জানা গেছে, সিটি কর্পোরেশনের ডাস্টবিনে হাজার হাজার ছাগলের চামড়া পাওয়া গেছে। ডলারে  বিক্রি হওয়া এসব চামড়া এখন কুকুরে খাচ্ছে। আসলে কি হবে চামড়া শিল্পের। এ খাতটিও কি প্রতিবেশী দেশের হাতে জিম্মি হয়ে যাবে। না কি আমাদের এ শিল্প রক্ষা করতে পারবো।

সূত্র আরও জানায়, অর্থ সংকটের কথা বলছে ট্যানারি মালিকরা। আসলে কি এখানে কোন অর্থ সংকট ছিল । না কি তারা সংকট তৈরি করেছে। সরকারি চার ব্যাংক এখাতে ঋন দেয় ৬’শ কোটি টাকা। এর বাহিরে চামড়ার আড়ৎদাররা বেসরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ নেয় প্রায় ৪’শ কোটি টাকা। তার সাথে যুক্ত হয়েছে ফড়িয়া এবং মওসুমী ব্যবসায়ীদের আরও প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। সব মিলে ২ হাজার কোটি টাকা গেলো কোথায়? এতে বুঝতে কোন অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে এখানে ইচ্ছা করেই সংকট তৈরি করা হয়েছে। এর জন্য আসলে কে দায়ী।

জানা গেছে সরকার  এ খাতে ঋণ দিলেই এর কোনো মনিটরিং নেই। ঋণ নিয়ে কেউ চাইলে চামড়া কিনতে পারে। আর না চাইলে চামড়া এখাতে বিনিয়োগ না করলেও কোনো অসবিধা নেই। আর এ কারণেই চামড়ায় সিন্ডিকেট স্বক্রিয় রয়েছে। একই ভাবে এখানে পাচার কারিরাও সমানভাবে স্বক্রিয় রয়েছে। সরকার চাইলেই তাদের রোধ করতে পারবে না।

ট্যানারি সূত্র জানায়, প্রতি বছরই ঈদের আগে ভারত থেকে সীমান্তবর্তী ব্যবসায়ীরা দাদন হিসেবে টাকা এনে থাকে। ঈদের পরে তারা সময় সুযোগ মতো চামড়া পাচার করে থাকে। এ কারণে আমাদের চেয়ে ভারতে চামড়া দাম সব সময়ই বেশি থাকে। তাছাড়া আমাদের চামড়ার মানও তাদের থেকে অনেক ভালো।

এখন আবার নতুন করে বিদেশীদের হাতে তুলে দিতে চামড়া শিল্প নিয়ে এই চক্র মেতে উঠেছে। তারই  অংশ হিসেবে তারা গত কয়েক বছর ধরে চামড়া শিল্পে নানাভাবে প্রভাবিত করেছে। গত পাঁচ বছরেই চামড়ার দাম কমেছে অর্ধেক। অথচ চামড়া এবং চামড়াজাত সকল পণ্যের দাম বেড়েছে কয়েকগুণ। তাহলে দাম কমছে কেন।

প্রশ্ন হচ্ছে ব্যাংক ঋণ নিয়ে ট্যানারি মালিকরা কেন চামড়া কিনছে না। কেন তারা আড়তদারদের বকেয়া পরিশোধ করছে না। আর সরকার কেন জোর করে প্রস্তুত নয় এমন স্থানে ট্যানারি শিল্প স্থানান্তর করলো। এসব প্রশ্নের জবাব কে দেবে।

ট্যানারি শিল্প প্রস্তুত বিসিকের এমন রিপোর্টের ভিত্তিতে তখন আদালত রায় দিলো কারখানা স্থানান্তর না হলে প্রতি দিন ১ লাখ টাকা জরিমান দিতে হবে। বাধ্য হয়ে তারা সাভারে কারখানা স্থানান্তর করলো। কিন্তু সেখানে তারা এখনও কারখানা চালু করতে পারেনি। আর কারখানা স্থানান্তরের আজুহাতে গত কয়েক বছর ধরে তারা চামড়া কিনতে পারছে না। এতে করে চামড়ার দাম কমে যাচ্ছে। প্রতিবেশি দেশে চামড়া পাচার হয়ে যাচ্ছে।

ট্যানারি মালিকরা বলছে,বিসিকের বিরুদ্ধে মামলা করা ছাড়া আমাদেও কোন উপায় নেই। তাদেও রিপোর্টেও কারণেই আজ আমাদের এই  অবস্থা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দাম কমিয়ে কোনভাবে পাচার ঠেকানো যাবে না। যেখানেই দাম পাওয়া যাবে সেখানে চামড়া চলে যাবে। এতে আমাদের কিছুই করার নেই। উদাহরণ হিসেবে তারা বলেন, সারা বিশ্বে কোথায় স্বর্ণ আমদানি হয় না। যেখানে দাম বেশি সেখানে স্বর্ণ পাচার হয়ে যাচ্ছে। তা কিভাবে কেউ জানে না। আর এই পাচার কোন দেশের সরকার ঠেকাতেও পারছে না।

অভিযোগ উঠেছে, কম দামে কেনার উদ্দেশ্যে তাদের একটি চক্র  মাঠে নেমেছে। এই চক্রের কারসাজিতে এ বছর পাড়া-মহল্লায় ঘুরে ঘুরে যারা চামড়া কিনেছেন তারা পড়েছেন বিপাকে। তাই বিক্রি করতে নিয়ে আসা চামড়া পড়ে আছে রাজধানীর লালবাগের পোস্তা এলাকার রাস্তার মোড়ে-মোড়ে।

পোস্তায় এলাকায় প্রবেশ করলেই ছোট-বড় চামড়ার স্তুপ চোখে পড়ছে। বিক্রেতাদের আশঙ্কা, সময়মতো লবণ দিতে না পারলে বা বিক্রি করতে না পারলে এই চামড়া নষ্ট হয়ে যেতে পারে। 

রাজধানীর মাতুয়াইল এলাকার বাসিন্দা রিয়াজ হোসেন আলী বলেন, ৯০ হাজার টাকা মূল্যের গরুর চামড়া বিক্রি করলাম মাত্র সাড়ে চারশ’ টাকায়। উপায় নেই। বেশি সময় রাখলে চামড়া নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই অল্পমূল্যেই বিক্রি করতে বাধ্য হলাম।

বাড্ডা এলাকার বাসিন্দা বরকত আলী কুরবানির জন্য গরু কেনেন ৬০ হাজার টাকা দিয়ে। কুরবানিও দিয়েছেন। মহল্লায় চামড়া কিনতে যারা এসেছেন, তারা এই চামড়ার মূল্য বলেছেন মাত্র ৩০০ টাকা। উপায় না দেখে তিনি এই চামড়া দান করেছেন স্থানীয় নুরানি মাদরাসায়।

অভিযোগ পাওয়া গেছে, একটি সিন্ডিকেট ছল-চাতুরীতে কম দামে চামড়া কেনার চক্রান্ত করছে। গত বছর এক কোটি পিস চামড়া কিনলেও এ বছর ট্যানারি ব্যবসায়ীরা সোয়া কোটি পিস পশুর চামড়া কিনবে বলে নির্ধারণ করছেন। তবে বেমালুম চেপে যাচ্ছেন সেই বিষয়টি। উল্টো তারা বলছেন, গত বছরের চামড়ার ৫০ শতাংশ রয়ে গেছে। নতুন করে চামড়া কেনার আগ্রহ নেই। এসব অজুহাতে তারা সরকারের কাছ থেকে গত বছরের দরেই চামড়া কেনার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছেন।

 গতবছর প্রতি ফুট গরুর চামড়া ঢাকায় ৫০ টাকা, ঢাকার বাইরে ৪০ টাকা ও খাসির চামড়া সারাদেশে ২২ টাকা দরে কিনেছেন। এবার তারা প্রতি বর্গফুট চামড়ার দাম চার টাকা কমিয়ে দর নির্ধারণ করেছেন। পাশাপাশি শর্ত দিয়ে রেখেছেন, চামড়ায় লবণ মাখানো হতে হবে। ঢাকার বাইরে এই চামড়ার দর হবে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। লবণ মাখানো প্রতিফুট খাসির চামড়ার মূল্য ধরা হয়েছে সর্বোচ্চ ১৮ থেকে ২০ টাকা। এভাবেই দেশের চামড়া খাত এখন পুরোপুরি সিন্ডিকেটের দখলে চলে গেছে বলে অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।    

বাংলাদেশ ট্যানার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন মাহিন সিন্ডিকেটের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, হাজারীবাগ থেকে আমাদের চামড়া কারখানাগুলো গুটিয়ে ফেলা হয়েছে। এখনও সাভারের স্থানান্তরিত কারখানাগুলো পুরোপুরি কাজ করা যায়নি। ফলে কুরবানির পশুর সব চামড়া সেখানে নিয়ে প্রক্রিয়াজাত করার মতো জায়গা, ব্যবস্থা বা সক্ষমতা আমাদের নেই। এ কারণে আমরা এবার চামড়া কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছি না।  

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ