ঢাকা, সোমবার 27 August 2018, ১২ ভাদ্র ১৪২৫, ১৫ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সীমান্ত দিয়ে পাচারের শংকা ব্যবসায়ীদের

মোহাম্মদ নুরুজ্জামান, রংপুর অফিস : এবারের পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে রংপুর অঞ্চলে কুরবানির চামড়ার বাজারে অস্বাভাবিক দাম কমে যাওয়ায় বিপর্যয় নেমে এসে স্বরণকালের ভূমিধ্বসে পরিণত হয়েছে চামড়ার কেনা-বেচায়।  এই সংকটময় পরিস্থিতিতে বেশি দামে বিক্রির আশায় রংপুর বিভাগের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে চামড়া পাচারের আশংকা করছেন রংপুর অঞ্চলের চামড়া  ব্যবসায়ীরা। ফলে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে প্রকৃত চামড়া ব্যবসায়ীরা মারাতœকভাবে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখিন হবেন বলে তারা শংকা প্রকাশ করেছেন।  

উল্লেখ্য, সরকার গত বছরের তুলনায় এবারে চামড়ার দাম প্রতিবর্গ ফুটে ১০ থেকে ১৫ টাকা কমিয়েছে। এই দামে এবারে বাজারে চামড়া পাওয়া যায়নি। নগরীর শাপলা চত্তর এলাকার মওসুমী চামড়া ব্যবসায়ী কানু মিয়া দূঃখ করে জানালো, এবারে চামড়ার দাম এত কমেছে যে, সোয়া লাখ টাকা মূল্যের একটি গরুর চামড়া মাত্র ১ হাজার ২শ টাকায় বিক্রি হয়েছে। মাঝারী মানের একটি গরুর চামড়া মাত্র ৪শ টাকায় বিক্রি  হয়েছে। ব্যাংক কর্মকর্তা আবু তালেব জানালেন, তাঁর ১০ হাজার টাকা মূল্যের খাশির চামড়া ৫০ টাকায় বিক্রি করতে পারেন নি। শেষে সন্ধায় একটি হাফেজিয়া মাদরাসায় সেটি দান করেছেন।  অনেক মওসুমী চামড়া ব্যবসায়ী এবং সাধারণ বিক্রেতাকে ঈদের দিন সন্ধার পর পর্যন্ত নগরীর শাপলা চত্বর এলাকার চামড়ার আড়তে কুরবানির গরু-ছাগলের চামড়া নিয়ে এসে চরম বিপাকে পড়তে দেখা গেছে। এই অভিন্ন চিত্র ঈদ উত্তর রংপুর অঞ্চলের সবত্রই বিরাজ করেছে।    

চামড়ার নির্ধারিত বাজার এবং আড়তে এই আস্বাভাবিক দাম কম হওয়ায় প্রত্যন্ত পল্লী এলাকার অনেক মওসূমী চামড়া ব্যবসায়ী এবারে এসব স্থানে আসেনি। তাঁরা নিজ নিজ এলাকায় গরু-ছাগলের কুরবানির চামড়া ক্রয় করে লবন দিয়ে সে সব সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন। চামড়া ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে ধারনা করা হচ্ছে- ঐসব কুরবানির পশুর চামড়া গোপনে বিভিন্ন সীমান্ত পথে ভরতে পাচার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া ব্যবসায়ীদের চামড়া কেনার জন্য এবারে ব্যাংক থেকে কোন ঋণ দেয়া হয়নি। এর উপর এবারে প্রতিবস্তা লবণ দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত দরে ক্রয় করতে হয়েছে। এত টাকা খরচ করে চামড়া সংরক্ষণে লাভের চেয়ে লোকসানের আশঙ্কা বেশি। রংপুর নগরীর শাপলা চত্বর এলাকায় অবস্থিত অতি প্রাচীণ চামড়া বাজারে বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে এমন বিপর্যস্তকর তথ্য পাওয়া গেছে।  একদিকে চামড়া ব্যবসায়ীদের পূর্বের বকেয়া টাকা পাওনা রয়েছে। অন্যদিকে সরকার গতবছরের তুলনায় গরু-ছাগলের চামড়ার দাম কম নির্ধারণ করায় চামড়া ব্যবসায়ী ও ফড়িয়ারা চরম  হতাশার পড়েছে।  

চামড়া ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা গেছে, উত্তরাঞ্চলের প্রত্যক জেলায় সাধারণ ভাবে প্রতিদিন গড়ে ৪ থেকে ৫ হাজার পিস গরুর চামড়া আমদানি হয়।  একইভাবে প্রতি বছর কুরবানির সময় প্রতিটি জেলায় দুই থেকে আড়াই লাখ পিস চামড়া আমদানি হয়ে থাকে। ব্যবসায়ীরা জানান, এবার সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। ক’বছর আগেও উত্তরাঞ্চলে ২’শর উপর চামড়ার গোডাউন ছিল। চামড়া ব্যবসার বিপর্যয়ের কারণে বর্তমানে তা নেমে এসেছে ৪০টিতে। 

চামড়া ব্যবসায়ীরা জানান, রংপুরে অন্তত ৫০ জন ব্যবসায়ীর ৭ কোটির বেশি টাকা ঢাকার বিভিন্ন ট্যানারি মালিকদের নিকট পাওনা রয়েছে। এ টাকা তারা গত এক বছর ধরে ধর্ণা দিয়েও আদায় করতে পারেননি। ফলে অনেকেই চামড়ার ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে বিকল্প ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করছে। ঐ বাজারের চামড়া ব্যবসায়ীরা জানান, তারা বংশ পরম্পরায় দীর্ঘকাল ধরে পশুর চামড়া ব্যবসা করে আসছেন। কিন্তু বর্তমান বাজারে পশুর চামড়ার ব্যবসায় চরম মন্দা দেখা দিয়েছে। তাই প্রায় সময় এই ব্যবসায় লাভের বদলে লোকসান গুনতে হচ্ছে। এছাড়া ট্যানারিগুলো থেকে বকেয়া আদায় না হওয়ায় তারা তাদের ব্যবসা পরিবর্তনে বাধ্য হচ্ছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন ট্যানারির নিকট কোটি কোটি টাকা বকেয়া পড়ে আছে। তবে অনেকেই জানান, বাপ দাদার এই পেশাটিকে ধরে রাখতে ধার দেনা করে এবারে তারা চামড়া ক্রয় করেছেন। সে পূঁজি খুঁজে পাবেন কিনা সন্দেহ। 

এ প্রসঙ্গে রংপুর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আব্দুল লতিফ খান ও সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী জানান, গত বছর প্রতিবর্গফুট চামড়ার দাম ছিল ৫০ টাকার ওপর। এবার তা কমিয়ে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা করা হয়েছে। এ কারনে গত বছর গরুর যে চামড়া প্রতি পিস ২ হাজার টাকায় ক্রয় করা হয়েছে। সেই চামড়া এবারে ৭শ টাকায় কিনতে হয়েছে। রংপুরের বাজারে এবারে ৫০ হজারের মত গরু এবং প্রায় ৩০ হাজার পিসের মত ছাগলের চামড়া পাওয়া গেছে। আমদানী অস্বাভাবিক কম হওয়ায় ঈদের দিন রাত ৩ টার মধ্যেই চামড়া কেনা-বেচার কাজ শেষ হয়েছে। ঈদুল আজহার পরদিন রংপুর নগরীর শাপলা চত্বর এলাকায় অবস্থিত অতি প্রাচীণ চামড়া বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতা শূন্য খাঁ খাঁ করতে দেখা গেছে। অথচ ইতোপূর্বে ঈদুল আযহা উপলক্ষ্যে চামড়ার বাজার ২/৩ দিন ধরে জমজমাট থাকতো। তারা আশংকা প্রকাশ করে বলেন, আমাদের স্থানীয় বাজারে এবারে চামড়ার দাম কম। অথচ প্রতিবেশী দেশ ভারতে চামড়ার দাম সেই তুলনায় অনেক বেশি। ফলে বেশি দাম পাওয়ার আশায় এসব চামড়া রংপুর বিভাগের বুড়িমাড়ি, মোগলহাট, জয়মনিরহাট, সোণাহাট, ভুরুঙ্গামারী, রাজিবপুর, রৌমারী, হিলি, বাংলাবান্ধাসহ দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, লালমনিরহাট এবং কুড়িগ্রাম জেলার বিভিন্ন সীমান্ত পথে অবৈধ ভাবে ভারতে পাচার হওয়ার আশংকা রয়েছে। ফলে এই অঞ্চলে এবারে বিপুল পরিমাণ চামড়া হাতছাড়া হওয়ার কারণে লোকসানের আশঙ্কা প্রবল হয়ে উঠেছে।  তিনি আরো জানান, উত্তরাঞ্চলের চামড়া ব্যবসায়ীদের ২’শ কোটির বেশি টাকা ট্যানারীগুলোতে বকেয়া পাওনা রয়েছে। সরকার বড় বড় ট্যানারিদের কোটি কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ দেয়। কিন্তু চামড়া ব্যবসায়ীদের কোন প্রকার ব্যাংক ঋণ দেয়া হয় না। ফলে চামড়া ব্যবসায়ীরা ধার দেনা করে অতি কষ্টে এ ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছেন। এ বারের চামড়ার বাজারের সৃষ্ট বিপর্যয়ে সেই ধার-দেনার টাকা পরিশোধ করা সম্ভব হবে কিনা তা নিয়ে দূঃশ্চিন্তায় পড়েছেন তাঁরা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ