ঢাকা, সোমবার 27 August 2018, ১২ ভাদ্র ১৪২৫, ১৫ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

চট্টগ্রাম রেল স্টেশন পথশিশু-পথের আলো

চট্টগ্রাম রেল স্টেশনে তিন নম্বর গাড়ি পাকিং এলাকাতে রবি, মঙ্গল, বুধ, শুক্রবার বিকালে বসে পথশিশুদের পাঠশালা

নুরুল আমিন মিন্টু, চট্টগ্রাম ব্যুরো : ওদের মা আছে, বাবা নেই! পথেই জন্ম, পথেই বসত। নির্দিষ্ট কোন ঠিকানা নেই। পেটে ভাত নেই, পরণে কাপড় নেই। অসুস্থ হলে নেই কোন ডাক্তার। সব ‘নাই’ এর মাঝেও তারা বাচঁতে চায়। আর বেঁচে থাকার জন্যই ওরা ছিন্ন নোংরা পোশাকে রেল স্টেশনে কেউ কুলির কাজ করে। কেউবা আবার ভিক্ষা করে। তাদের বয়সী শিশুরা যখন বাবা-মা’র হাত ধরে স্কুলে যায় তখন তারা শুধু তীর্ষক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। আর স্বপ্ন দেখে যদি ওদের মতো স্কুলে যেতে পারতাম! লেখাপড়া করে শিক্ষিত হতে পারতাম! হ্যাঁ তাদের সে স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে এসেছে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী। অগ্রসর এসব শিক্ষার্থীরা চট্টগ্রাম রেল স্টেশনে বসত করা পথশিশুদের পথের আলো দেখাচ্ছে।

চট্টগ্রাম রেল স্টেশনে তিন নম্বর গাড়ি পাকিং এলাকাতে রবি, মঙ্গল, বুধ, শুক্রবার বিকালে বসে পথশিশুদের পাঠশালা। শিশুদের কেউ চিৎকার করে বলছে, অ-আ-ক-খ, আবার কেউ এ-বি-সি-ডি বলে চিৎকার করছে। পথশিশুদের এমন অক্ষর জ্ঞানে সহায়তা করছে আলোর আশা ফাউন্ডেশনের ব্যানারে এক দল শিক্ষার্থী। রেলওয়ে স্টেশনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পথশিশুদের প্রতি সপ্তাহে চার দিন শিক্ষাদান করছেন তারা। শুধু অক্ষর জ্ঞান নয়, এসব পথশিশুদের বাংলা, গণিত, ইংরেজি, ধর্ম ও নীতি-নৈতিকতাও শিখানো হচ্ছে। থাকছে সাংস্কৃতিক বিনোদনও। শুধু কী তাই, তাদের পাঠশালা মুখি করতে দেয়া হয় খাবার।  

সরেজমিনে দেখা যায়, চট্টগ্রাম রেল স্টেশনে বসবাস করা ৭০ জন পথশিশু এই পাঠশালার শিক্ষার্থী। নিয়মিত ক্লাস করে ৩৫ থেকে ৪০জন। এরমধ্যে ৭জন মেয়ে শিশু রয়েছে। তাদের মধ্যে ৩ শিশু কুলি, অন্যরা করেন ভিক্ষা। শুধু বয়স্ক শিশু নয়, ৫জন আছে, ৩ মাস থেকে ১৮ মাস বয়সী শিশু। প্রতি পাঁচজনকে পড়ান একজন শিক্ষক। সুবিধা বঞ্চিত এসব পথশিশুকে বিনা পয়সায় পাঠদানের পাশাপাশি বিনামূল্যে দেওয়া হয় শিক্ষা উপকরণ।  

 খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আলোর আশা ফাউন্ডেশন নামে একটি অরাজনৈতিক,অলাভজনক, সামাজিক, শিক্ষা ও সাংষ্কৃতিক উন্নয়নমূলক স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের অন্যতম কার্যক্রম হচ্ছে সুবিধা বঞ্চিত পথশিশু পাঠদান। এর আওতায় পথশিশুদের শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় স্কুল অব হিউমিনিটি অ্যান্ড অ্যানিম্যাশন(সোহা)।  

আলোর আশা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ এর ব্যবস্থাপনা বিভাগের ছাত্র মুহাম্মদ আনোয়ার এলাহী ফয়সাল বলেন, ‘‘ভিক্ষা নয়, শিক্ষা চাই’’ এই শ্লোগানে ২০১৮ সালের ১৫ জানুয়ারি যাত্রা শুরু করে স্কুল অব হিউমিনিটি অ্যান্ড অ্যানিম্যাশন (সোহা)। রাস্তায় যাতে একটি শিশুও ভিক্ষা না করে, অনাহারে পড়ে না থাকে, তারাও যেন দেশ ও জাতি গঠনে অবদান রাখতে পারে সে সেই লক্ষ্যে আলোর আশা ফাউন্ডেশন কাজ করছে। গতানুগতিক দৃষ্টিভঙ্গি দূর করে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি  ও  স্টেশন এলাকার পথশিশুদের জন্য শিক্ষা, খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে চাই। এ কার্যক্রম ঢাকা, ফেনী, বরিশাল ও রাজশাহীতে প্রসারিত করার পরিকল্পনা রয়েছে বলেন এলাহী ফয়সাল। 

চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের ছাত্রী সাবরিনা দেওয়ান লুবনা বলেন, পড়ালেখার পাশাপাশি “খাদ্য এবং পুষ্টি চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে” প্রতিটি পথ শিশু শিক্ষার্থীকে এক গ্লাস দুধ ( প্রতি লিটারে ৫ জন ) দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে বিভিন্ন দিনে রুটিন করে দেয়া হয় ডিম, কেক, কলা, রুটি ও বাখরখানি। নানা উৎসব আয়োজনের থাকে মাংস, পোলাও বিরিয়ানি। 

বিবিএ পাশ করা আয়শা তাহরীম নিতু বলেন, এক গ্লাস দুধ খাওয়া এই শিশুদের কাছে আকাশ কুসুম স্বপ্ন ছিল। কিন্তু এখন রেল স্টেশনের শিশু পাচ্ছে সপ্তাহে চার দিন। আমরা মনে করি, ওরা পথশিশু নয়, ওরা রাষ্ট্রের সম্পদ! তাদের প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজের এলিট শ্রেণিকেও এগিয়ে আসতে হবে বলে মনে করেন নিতু।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ