ঢাকা, সোমবার 27 August 2018, ১২ ভাদ্র ১৪২৫, ১৫ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত মানিকগঞ্জ তেওতা জমিদার বাড়ি দর্শনার্থীদের আনন্দের খোরাক যোগায়

 

দর্শনার্থীদের কাছে মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার তেওতা জমিদার বাড়ির কদর দিন দিন বাড়ছে। সপ্তাদশ শতকের অপূর্ব এই প্রাসাদবাড়িতে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা। জমিদার বাড়ির পাশেই বহমান যমুনা নদী। জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত এই জমিদার বাড়িটি নিয়ে দর্শনার্থীদের আগ্রহেরও কমতি নেই।

জমিদার বাড়ি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন স্থানীয় বাসিন্দা তেওতা একাডেমীর সহকারী শিক্ষক এবং নজরুল-প্রমীলা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠার সভাপতি অজয় কুমার চক্রবর্তী। তিনিসহ স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সপ্তাদশ শতাব্দির শেষের দিকে ৭ দশমিক ৩৮  শতক জমির ওপর পঞ্চানন রায় চৌধুরী নামের এক ব্যক্তি জমিদার বাড়িটি তৈরি করেন। পঞ্চানন রায় দরিদ্র পরিবারে জন্মেছিলেন। কিশোর বয়সে পঞ্চানন রায় দিনাজপুরের তামাকের ব্যবসা শুরু করেন। এই ব্যবসার মাধ্যমে তিনি বিপুল ধনসম্পত্তি অর্জন করেন। এরপর শিবালয়ের তেওতা যমুনা নদীর পাশে প্রচুর জমি কেনেন এবং জমিদারী প্রতিষ্ঠা করেন। জমিদার বাড়িটি দুটি অংশ রয়েছে। উত্তর দিকের ভবনগুলো জমিদার পঞ্চানন রায়ের উত্তরাধিকার হেম শঙ্কর রায় চৌধুরী এস্টেট এবং দক্ষিণ দিকের ভবনগুলো জমিদার জয় শংকর রায় চৌধুরী এস্টেট। উত্তর দিকের এস্টেটের মুল ফটকের পাশেই রয়েছে গারদখানা। ভেতরে উত্তর পাশে নাটমন্দির এবং পূর্বপাশে অন্দর মহল। নাটমন্দির ও অন্দর মহলের মাঝে ফাঁকা স্থানে সে সময় যাত্রাপালা ও থিয়েটারের আয়োজন করা হতো। অন্দর মহলের দক্ষিণপাশের ভবনের নিচে রয়েছে চোরা কুঠুরি, যা স্থানীয় লোকজনের কাছে অন্ধকূপ নামে পরিচিত। অন্দর মহলের পূর্বপাশে মোগল আমলে নির্মিত কারুকার্য খচিত দ্বিতল ভবন। দক্ষিণ এস্টেটের মুল ফটকের সামনে দৃষ্টিনন্দন নবরতœ মঠ। মঠের পাশে বিশাল দিঘির পাড়ে শানবাঁধানো দুটি ঘাট। দক্ষিণ পাশের ঘাটটির পাশে দাঁড়িয়ে আছে সুউচ্চ তালগাছ। এই ঘাটটি জমিদারেরা তৈরি করেছিলেন। পরেরটি জেলা প্রশাসন নির্মাণ করে। দক্ষিণ এস্টেটের ভেতরে উত্তরপাশে নাটমন্দির এর সামনে পূর্ব ও দক্ষিণপাশে অন্দরমহল। এখানকার ভবনগুলোও কারুকার্যখচিত। দক্ষিণ এস্টেটের দক্ষিণ পাশে ছিল জমিদারদের বাংলোখানা। বর্তমানে এটি পাঠাগার হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে।

গণ রোববার বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, ঢাকা ও আশপাশের কয়েকটি এলাকা থেকে দর্শনার্থীরা জমিদার বাড়িতে দেখতে এসেছেন। দুই শিশুসন্তান এবং স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার বান্দুরা এলাকা থেকে জমিদার বাড়ি দেখতে আসেন ইমতিয়াজ হোসেন। তিনি বললেন, ‘প্রতœতত্ত্ব পুরাতন ভবন দেখতে আমার আগ্রহ বেশি। তাছাড়া এই জমিদার বাড়ি নিয়ে কবি নজরুলের স্মৃতি রয়েছে বলে শুনেছি। তাই ঘুরতে এলাম।’ তাঁর মতো আরও বেশকয়েক দর্শনার্থী পরিবার নিয়ে সেখানে ঘুরতে এসেছেন।

কবি নজরুলের স্মৃতি: এই জমিদার বাড়িটি ঘিরে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। কবিপুœী প্রমীলা দেবীর জন্মস্থান তেওতা গ্রামে জমিদার বাড়ির পাশে। নজরুল গবেষক আন্তর্জাতিক নজরুল চর্চা কেন্দ্রের গবেষণা সচিব রফিকুল ইসলাম চৌধুরীর মতে, পঞ্চাননের উত্তরসূরি জমিদার কিরণ শংকর রায় চৌধুরী ছিলেন উচ্চশিক্ষিত। তিনি কবি নজরুলকে তাঁর প্রসাদে আমন্ত্রণ জানান। কবি সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গান ও কবিতা পরিবেশন করেন। এই সময় জমিদার বাড়িতেই প্রমীলার সঙ্গে নজরুলের পরিচয় হয়। এরপর প্রমীলার প্রেমে পড়ে যান কবি নজরুল। এলাকায় জনশ্রতি আছে, এই জমিদার বাড়িতে বসে প্রমীলাকে উদ্বৃত করে নজরুল লিখেছিলেন, ‘তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয় সে কি মোর অপরাধ...’ গানটি। এ ছাড়া তালগাছের নিচে শানবাঁধানো ঘাটলায় বসে কবি লিখেছিলেন ‘লিচু চোর’ কবিতাটি। নজরুল বেশ কয়েকবার এই জমিদার বাড়িতে এসেছিলেন বলে জানা গেছে।  জমিদার বাড়ির ১৫০-২০০ গজ পশ্চিমে প্রবাহমান যমুনা। এখন বর্ষাকাল, যৌবন ফিরে পেয়েছে যমুনা। নদীর তীরে বসে সূর্যাস্ত দেখতে পাবেন দর্শনার্থীরা। নৌকায় নদীতে ঘুরতে পারবেন। 

যাতায়াত ব্যবস্থা: রাজধানী ঢাকা থেকে সড়ক পথে মানিকগঞ্জের শিবালয়ের আরিচা ঘাট যেতে হবে। এখানে সরাসরি বাস চলাচল করে। আরিচা থেকে ছায়ানিবীড় তিন কিলোমিটার পথ তেওতা জমিদার বাড়ি। আরিচা থেকে সিএনসিজ চালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক ও রিকশায় জমিদার বাড়ি যাতায়াত করা যায়।   এক দিনেই তেওতা জমিদার বাড়ি ঘুরে ঢাকায় পৌঁছানো যায়। তাছাড়া রাতে থাকার জন্য আরিচায় রয়েছে সরকারি ডাকবাংলা এবং বেশ কয়েকটি আবাসিক হোটেল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ