ঢাকা, শুক্রবার 21 September 2018, ৬ আশ্বিন ১৪২৫, ১০ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

চামড়ার বাজারে ধস ও ভারতে পাচার : চামড়া শিল্পের জন্য অশনি সংকেত

সংগ্রাম অনলাইন ডেস্ক:

বাংলাদেশের চামড়ার মান সারা বিশ্বের মধ্যে দ্বিতীয়।বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের সম্ভাবনাও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।কারণ অনুসন্ধানে জানা গেছে, চামড়ার জুতা উৎপাদনকারী প্রধান দেশ চীন, ভিয়েতনাম এবং ব্রাজিল এ খাত থেকে ধীরে ধীরে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে। যার ফলে বাংলাদেশ হয়ে ওঠছে বিদেশি ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের প্রধান আকর্ষণ। কারণ এ শিল্পের জন্য পর্যাপ্ত কাঁচামাল, চামড়া প্রক্রিয়াজাত করার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, সস্তা শ্রম এবং জুতা তৈরির জন্য যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা।সব মিলিয়ে চামড়া শিল্প বাংলাদেশের জন্য একটি বিরাট সম্ভাবনা দরজা খুলে দিতে পারে।ব্যবসায়ীরা বলছেন, সঠিকভাবে বিনিয়োগ করতে পারলে এ খাতে বছরে কমপক্ষে ১৫ বিলিয়ন ডলার আয় হতে পারে।

কিন্তু গত কয়েক বছর যাবৎ চামড়ার বাজারে যেভাবে ধস নামা শুরু হয়েছে তাতে এই সম্ভাবনাপূর্ণ খাতটি ধ্বংস হওয়ার যোগার হয়েছে। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের সম্ভাবনাপূর্ণ চামড়ার বাজারটি হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে প্রতিবেশি দেশ ভারত।

গত কয়েক বছরের মত এ বছরও কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারে ধস নেমেছে।ঢাকায় এক লাখ টাকা দামের গরুর চামড়া ১ হাজার টাকায়ও বিক্রি হয়নি। অথচ তিন-চার বছর আগেও ৫০ হাজার টাকা দামের গরুর চামড়াই কেনাবেচা হতো ২ থেকে ৩ হাজার টাকায়। ঢাকার বাইরে পরিস্থিতি আরো খারাপ। খুলনার শেখপাড়া চামড়া পট্টিতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ছোট-বড় আকারভেদে প্রতিটি চামড়া মাত্র ১শ’ থেকে সর্বোচ্চ ৫শ’ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। এ অবস্থা প্রায় সারা দেশে।

বিভিন্ন মাদরাসায় দান করা চামড়া বিক্রি করতে হতাশায় পড়েছেন কর্তৃপক্ষ।

গত কয়েক বছর যাবৎ কোরবানির চামড়ার দাম ক্রমান্বয়ে কমিয়ে দিয়েছে সরকার।এ বছর সরকারের বেঁধে দেওয়া দাম হচ্ছে ঢাকায় প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়া ৪৫ থেকে ৫০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। এ ছাড়া সারা দেশে খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ১৮ থেকে ২০ টাকা এবং বকরির চামড়া ১৩ থেকে ১৫ টাকা।

অথচ কোরবানির পর এমন হয়েছে যে সেই দরও ঠিক থাকেনি। অর্থাৎ কোরবানির পশুর চামড়া কেনাবেচা হয়েছে সরকার-নির্ধারিত দরের চেয়েও কমে। ময়মনসিংহ, খুলনা ও রংপুরসহ দেশের বিভাগীয় এবং জেলা শহরে চামড়া বেচাকেনায় মন্দাভাব দেখা দিয়েছে। সরকার নির্ধারিত দাম কম থাকায় ক্ষতির মুখে পড়েছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা।ময়মনসিংহের পাইকার ব্যবসায়ীদের দাবি, সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া কেনা হলেও এখন তা বিক্রি হচ্ছে প্রায় অর্ধেক দামে। এ কারণে চামড়া বিক্রি না করে ফিরে যাচ্ছেন অনেকে।রংপুরেও চামড়া নিয়ে বিপাকে পড়েছেন পাইকারি ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চামড়া কিনে সেই দামে বিক্রি করতে পারছেন না তারা। গেল বছর যে চামড়া এক হাজার থেকে ১২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে এবার তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায়।

আর এ অবস্থার সুযোগ গ্রহণ করছে ভারতীয় ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারিরা।তারা বেশি দাম ও নগদ টাকা দিয়ে বাংলাদেশের চামড়া হাতিয়ে নিচ্ছে।প্রতিবছরই কোরবানির পশুর চামড়া ভারতে পাচার হয়ে যায়। পুলিশ কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, নগদ ও অতিরিক্ত মূল্য পাওয়ার কারণেই ভারতে পাচার হয় কোরবানির পশুর চামড়া।

কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে সারা দেশে কয়েক লাখ মৌসুমি ব্যবসায়ী চামড়ার ব্যবসায় নামেন। তাদের বেশিরভাগই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।দেশীয় চামড়ার বাজারে ধস নামায় এসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েন। বাধ্য হয়ে তারা বেশি দাম আর নগদ টাকার আশায় ভারতীয় চোরাকারবারিদের শরণাপন্ন হন।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জানান, ঈদ মৌসুমে নগদ টাকায় চামড়া কিনতে হয় তাদের। কিন্তু সেগুলো বড় ট্যানারি মালিকদের কাছে বিক্রি করে মাসের পর মাস ও টাকার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। হয়রানি হতে হয় নানা ক্ষেত্রে। অন্যদিকে ভারতের ব্যবসায়ীদের কাছে চামড়া বিক্রি করলে বেশি লাভ এবং নগদে টাকা পাওয়া যায়। যে কারণে সীমান্তবর্তী জেলাগুলো থেকে সীমান্তে চামড়া পাচার হয়ে যায়। এছাড়া বাংলাদেশে কোরবানির একদিনে যত গরু জবাই হয়, ভারতের সীমান্ত এলাকায় কয়েক বছরেও এত গরু জবাই হয় না। সে কারণেও সেখানকার চামড়া ব্যবসায়ীরা অপেক্ষায় থাকে বাংলাদেশের ভালো মানের চামড়া সংগ্রহ করতে।

ভারতে কোরবানির চামড়া পাচার হওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ট্যানারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, ‘ভারতে চামড়া পাচার হওয়ার মূল কারণ অর্থ সংকট। এই মৌসুমে দেড় দুই হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়। সেক্ষেত্রে ট্যানারি মালিকদের তো এত টাকা নেই। আর এতটাকা ঋণও পাওয়া যায় না। ব্যাংক সাধারণত দুই তিন শ কোটি টাকা আমাদের ঋণ দেয়। যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। তখন দেখা যায় যে, মৌসুমি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সঠিক সময়ে ট্যানারি মালিকরা চামড়াটা কিনতে পারেন না। এ কারণে সীমান্ত দিয়ে চামড়াগুলো ভারতে পাচার হয়ে যায়। এছাড়া মৌসুমি চামড়াটা ভালো হওয়ায় ভারতের বড় ব্যবসায়ীরা এ সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন।’

এদিকে চামড়ার দাম কমার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আজ রোববার সংবাদ সম্মেলনে শাহীন আহমেদ জানান, এবার মাত্র ৪২ ট্যানারিকে ঋণ দিয়েছে ব্যাংক। বাকিরা বকেয়া পরিশোধ করতে না পারায় ঋণ পায়নি। এ অবস্থায় অনেক ট্যানারি মালিক আড়তদারদের পাওনা পরিশোধ করতে পারেনি। অন্য দিকে বিশ্ব বাজারে চাহিদা কম থাকায় কাঁচা চামড়ার দাম কমে গেছে।

শাহীন আহমেদ বলেন, বর্তমানে বেশির ভাগ ট্যানারি উৎপাদনে নেই। গত বছরের ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ চামড়া এখনো অবিক্রীত রয়েছে। সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরের কারণে গত দুই বছর চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন হয়নি। ফলে রফতানিও কমেছে। এ ছাড়া নিজস্ব অর্থে ট্যানারি স্থানান্তরের কারণে পুঁজি সঙ্কটে রয়েছে ট্যানারি মালিকেরা।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিটিএ সভাপতি বলেন, সাভারে পরিকল্পিত ট্যানারি শিল্প গড়ে না ওঠার দায় বিসিকের। ভুল তথ্য দিয়ে ট্যানারি মালিকদের সেখানে স্থানান্তরে বাধ্য করা হয়েছিল। ট্যানারি মালিকেরা সেখানে যে বিনিয়োগ করেছিল তা মাঠে মারা গেছে। আগামীতে এ অবস্থা চলতে থাকলে বিসিকের বিরুদ্ধে মামলা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না বলেও জানান তিনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ