ঢাকা, মঙ্গলবার 28 August 2018, ১৩ ভাদ্র ১৪২৫, ১৬ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থ সুরক্ষার জন্যই বাপেক্সকে দুর্বল করে রাখা হচ্ছে

* ১৫টি কূপের মধ্যে অধিকাংশই নষ্ট, পাওয়া যায়নি কোনো গ্যাস
* বাপেক্সের প্রতিটি কূপ খননে খরচ ১১০ কোটি টাকা ॥ বিদেশী কোম্পানীতে ৯শ’ কোটি টাকা
কামাল উদ্দিন সুমন : ভারতীয় ওমনজিসি, মালয়েশিয়ার পেট্রোনাস কিংবা ভেনিজুয়েলার পিডিভিএসএ তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের ক্ষেত্রে প্রথমেই দক্ষ ছিল না, কিন্তু রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতায় উপযুক্ত যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি আমদানি ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্থলভাগ এবং সমুদ্রবক্ষে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে আন্তজার্তিকভাবে দক্ষ হয়ে উঠেছে। অথচ বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থ সুরক্ষার জন্যই জাতীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে দুর্বল করে রাখা হচ্ছে। এর অন্যতম দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে দেশের স্থলভাগে (অনশোরে) প্রায় ১৫টি কূপ খননের দায়িত্ব পাওয়া রাশিয়ার গ্যাজপ্রম এনার্জি কোম্পানীর কাছে। বাপেক্স কর্তৃক প্রতিটি কূপ খননে ভূমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়নসহ ব্যয়ের পরিমাণ ৭০-৮০ কোটি টাকা। আর ভাড়া করা রিগের মাধ্যমে খনন করলে এ ব্যয় দাঁড়ায় ১০০-১১০ কোটি টাকা। সেখানে বিদেশী কোম্পানীর মাধ্যমে প্রতিটি গ্যাসকূপ খননে ব্যয় হচ্ছে ৯০০ কোটি টাকা।
সূত্র জানায়, এ কোম্পানীর পেছনে সরকার ১৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করার পরও কোনো গ্যাস পায়নি। এদের খননকৃত অধিকাংশ কূপই নষ্ট হয়ে গেছে। যেগুলো চালু আছে, সেগুলোতেও কাঙ্খিত গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে না। ফলে ১৩ হাজার কোটি টাকা একেবারেই পানিতে ফেলে দিয়েছে পেট্রোবাংলা।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আবুল মনসুর মো. ফয়েজউল্লাহ দাবি করেন, গ্যাজপ্রম আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। তাদের এক্ষেত্রে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে গ্যাসের কূপ মানেই অনিশ্চয়তা। এদিক থেকে আমরা তাদের দোষারোপ করতে পারি না। আর কোন কূপ খনন করতে হবে, সেটা আমরাই নির্ধারণ করে দিই। বাপেক্সের সে ধরনের জনবল ও সামর্থ্য থাকলে বাইরের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়া হতো না।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাজপ্রম অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠান হলেও বাংলাদেশে এর নাম ব্যবহার করে তৃতীয় একটি পক্ষ কাজ করছে, অভিজ্ঞতা ও কারিগরি দিক থেকে যারা অনেক পিছিয়ে। এই তৃতীয় পক্ষই অধিক ব্যয়ে কূপ খননের সুবিধা নিচ্ছে। যদিও জানা গেছে, ১৫টি কূপ খননে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গ্যাজপ্রমের সঙ্গে ঠিকাদারি চুক্তি স্বাক্ষর করে পেট্রোবাংলা। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০-এর আওতায় এ চুক্তি করা হয়। প্রতিটি কূপ খননে ব্যয় হয় গড়ে ৯০০ কোটি টাকা।
পেট্রোবাংলার ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৪ সালে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিএফসিএল) চারটি কূপ খননে কাজ করে কানাডার সিনোপেক। এতে ব্যয় হয় বাংলাদেশী মুদ্রায় ৪৫০ কোটি টাকার মতো। এ হিসাবে প্রতিটি কূপখনন খরচ দাঁড়ায় ১১৫ কোটি টাকার কিছু বেশি। একইভাবে বাপেক্স কর্তৃক প্রতিটি কূপ খননে ভূমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়নসহ ব্যয়ের পরিমাণ ৭০-৮০ কোটি টাকা। আর ভাড়া করা রিগের মাধ্যমে খনন করলে এ ব্যয় দাঁড়ায় ১০০-১১০ কোটি টাকা।
চুক্তি অনুযায়ী, গ্যাজপ্রম পেট্রোবাংলার আওতাধীন বিজিএফসিএলের তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে চারটি, সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের (এসজিএফএল) রশিদপুর গ্যাসক্ষেত্রে একটি উন্নয়ন কূপ, বাপেক্সের সেমুতাং ক্ষেত্রে একটি, শাহবাজপুরে দু’টি, শ্রীকাইলে একটি ও বেগমগঞ্জে একটি কূপ খনন করে। এর মধ্যে ২০১৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ২১ নম্বর কূপে। কূপটি থেকে সে সময় দেড় কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। কিন্তু পরের বছরই ২০১৪ সালের জুনের শুরুতে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। তিতাসের ২০ নম্বর কূপটির খননের স্থান ঠিক না হওয়ায় পানি চলে আসে সেটিতেও। তিতাসের এ দুটি কূপই কেবল নয়, বাংলাদেশে কাজ শুরুর পর গ্যাজপ্রম প্রথম যে ১০টি কূপ খনন করে, তার পাঁচটিই নষ্ট হয়ে যায়।
ব্যর্থতার পরও ২০১৫ সালের জুনে গ্যাজপ্রমকে নতুন করে আরো পাঁচটি কূপ খননের কাজ দেয় জ্বালানি বিভাগ। শ্রীকাইল-৪, বাখরাবাদ-১০, রশিদপুর-৯, ১০ ও ১২ কূপগুলো খননে ব্যয় হয় ৭৫০ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে রশিদপুর-৯ নম্বর কূপ খননে শুধু গ্যাস উন্নয়ন তহবিল থেকেই ব্যয় করতে হয়েছে ১৯৮ কোটি টাকা।
জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, এসজিএফএলের আওতাধীন রশিদপুর-৯ নম্বর কূপ থেকে দৈনিক এক কোটি ঘনফুট গ্যাস উত্তোলনের আশ্বাস দেয় গ্যাজপ্রম। এজন্য খনির গভীরে ৩ হাজার ৪০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ মিটার পর্যন্ত খননের বিষয়ে চুক্তি হয়। কিন্তু ৩ হাজার ৩০৯ মিটার খননের পর কাজ সমাপ্ত ঘোষণা করে গ্যাজপ্রম। নির্ধারিত গভীরতায় কূপ খননে ব্যর্থ হলেও পুরো অর্থই তুলে নেয় রুশ প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে কূপটি অকেজো অবস্থায় রয়েছে।
এসজিএফএলের ব্যবস্থাপক ও রশিদপুর-৯ নম্বর কূপ খনন প্রকল্পের পরিচালক মো. রায়হানুল আহমেদ বলেন, ৩ হাজার ৩০৯ মিটার খননের পর ভূমির গঠনগত কারণে গ্যাজপ্রম খননকাজ চালাতে অসম্মতি প্রকাশ করে। অনেক চাপ প্রয়োগ করেও এর বেশি খনন করতে আর রাজি হয়নি তারা। কিন্তু টার্ন কি বেসিসে চুক্তির কারণে পুরো অর্থই গ্যাজপ্রমকে পরিশোধ করতে হয়েছে।
এদিকে গ্যাজপ্রমের খননকৃত প্রথম পাঁচটি কূপের সবগুলোই ওয়ার্কওভার করতে হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে। পরবর্তীতে ওয়ার্কওভার করতে হয়েছে ভোলাসহ আরো কয়েকটি কূপও। ওয়ার্কওভার করলেও এসব কূপ থেকে গ্যাস মিলছে সামান্য।
শ্রীকাইল গ্যাসকূপ থেকে দৈনিক গ্যাস উত্তোলন হওয়ার কথা ৪০ মিলিয়ন ঘনফুট। অথচ উত্তোলন হচ্ছে ৩০ মিলিয়ন ঘনফুটের কম। একই অবস্থা সুমেতাং, রশিদপুর ও তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের। কোনো গ্যাসক্ষেত্রই সক্ষমতা অনুযায়ী গ্যাস উত্তোলন করতে পারছে না। অথচ শেভরন তাদের কূপ থেকে সক্ষমতার চেয়ে বেশি গ্যাস উত্তোলন করছে। এসবের মধ্যে গ্যাস অনুসন্ধানে ব্যর্থতার নজির সৃষ্টি হচ্ছে বলে জানান জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, গ্যাস খাতের অগ্রগতি দেখাতে কূপ খননের সংখ্যা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে। ফলে পেট্রোবাংলার দেখিয়ে দেয়া কূপে খননকাজ পরিচালনা করতে নিয়োগ করা হচ্ছে গ্যাজপ্রমকে। ফলে কূপের সার্বিক পরিস্থিতি ও তথ্য-উপাত্ত না জেনেই খনন শুরু করছে গ্যাজপ্রম।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম বলেন, তাদের পিএসসির আওতায় চুক্তি করে অনুসন্ধানে নিয়োগ করা যেতে পারে। ড্রিলিং কাজে নিয়োজিত করা বোকামি। গ্যাজপ্রমকে যদি যথাযথভাবে ব্যবহার করতে হয়, তাহলে অনুসন্ধানে ব্যবহার করতে হবে খননে নয়।
গ্যাসের দাম ও কস্ট রিকভারির হার (অনুসন্ধান উত্তোলনের ব্যয়) পরিমাণ বাড়িয়ে সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের উৎপাদন বন্টন চুক্তি (পিএসসি) সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। এরইমধ্যে এই সংশোধিত পিএসসির খসড়া অনুমোদনের জন্য জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। নতুন পিএসসি অনুমোদন পেলেই আবার নতুন করে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করবে পেট্রোবাংলা।
পেট্রোবাংলার একজন কর্মকর্তা জানান, পিএসসির দুটি জায়গায় পরিবর্তন আনার কথা বলেছেন পরামর্শকরা। একটি হচ্ছে গ্যাসের দাম, অন্যটি হচ্ছে কস্ট রিকভারির হার। তিনি বলেন, বিদেশী কোম্পানিগুলো শুরু থেকেই ১০০ ভাগ কস্ট রিকভারি দাবি করছে। অর্থাৎ তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে তারা যে অর্থ ব্যয় করবে তার পুরোটাই তারা তুলে নেবে। কিন্তু এমন হলে পেটোবাংলা কোনও গ্যাস পাবে না।
ওই কর্মকর্তা জানান, ‘সর্বোচ্চ কস্ট রিকভারির পরিমাণ ৬৫ থেকে ৮০ শতাংশের মধ্যে রাখার পক্ষে পেট্রোবাংলা। এখন গভীর সমুদ্রে প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম সাড়ে ৬ ডলার। বাংলাদেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আগ্রহী কোম্পানিগুলো চাইছে, এই দাম বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারের এলএনজির সমান করতে। একবারে দাম বাড়িয়ে ৮ থেকে ৯ ডলার করার দাবি করেছে তারা। কিন্তু পেট্রোবাংলা এই দাম এতো বেশি বাড়াতে চাচ্ছে না।’
পেট্রোবাংলার জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) শাহনেওয়াজ পারভেজ এ বিষয়ে বলেন, ‘সংশোধিত মডেল পিএসসি ২০১৮ নামে অভিহিত হবে। পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে সংশোধনীর কাজ শেষ করা হয়েছে। এখন অনুমোদনের জন্য জ্বালানি বিভাগে পাঠানো হয়েছে। চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার পরপরই আমরা আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করতে চাই। এমনিতেই সাগরে একটি কূপ খনন করে সেখান থেকে গ্যাস পেতে কমপক্ষে ৯ থেকে ১০ বছর সময় প্রয়োজন। অন্যদিকে দেশীয় কোম্পানি বাপেক্সের পক্ষে সাগরে গ্যাস অনুসন্ধানের মতো অভিজ্ঞতা ও যন্ত্রাংশ নেই। পাশাপাশি অনুসন্ধানে যে পরিমাণ খরচ হবে, বাপেক্সের পক্ষে সেই ঝুঁকি নেয়াও সম্ভব নয়। তাই বিদেশী কোম্পানিগুলোকে আমরা এই কাজে আগ্রহী করতে চাই।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ