ঢাকা, মঙ্গলবার 28 August 2018, ১৩ ভাদ্র ১৪২৫, ১৬ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রোহিঙ্গা ইস্যুতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপ হতাশাব্যঞ্জক -মানবাধিকার কমিশন

সংগ্রাম ডেস্ক : জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিযাজুল হক বলেছেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে পদক্ষেপ নিয়েছে তাতে হতাশ হওয়া ছাড়া কিছুই নেই । বাংলাদেশ-মিয়ানমার চাপে পড়ে প্রত্যাবাসন চুক্তি করলে, তা বাস্তবায়নে উদাসীন। আমাদের সময়।
রিযাজুল হক বলেন, রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে উভয় দেশ যতই দীর্ঘ সময় নিবে এটাকে ঘিরে ব্যবসা ততটা বাড়বে। সংকট সমাধানে অগ্রগতি দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে মিয়ানমার। মিয়ানমারের ওপর বিশ্বাস নষ্ট হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকারের আরও শক্ত অবস্থান নিতে হবে। কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে। গত এক বছরে রোহিঙ্গা সংকটের দৃশ্যমান কোন অগ্রগতি হয়নি। আন্তর্জাতিক বিশ্ব রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ব্যর্থ হয়েছে।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনে মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের চুক্তি হয়েছে। তবে এর বাস্তবায়ন হয়নি। তাদের নিজ ভূমিতে ফেরাতে বাংলাদেশকে আরও অ্যাগ্রেসিভ (আক্রমণাত্মক) ভূমিকা নিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক। শীর্ষনিউজ।
গতকাল সোমবার জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি একথা বলেন। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের এক বছর উপলক্ষে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
কাজী রিয়াজুল হক বলেন, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে একটি চুক্তি প্রয়োজন ছিল, তাই চুক্তি হয়েছে। কিন্তু এই চুক্তির বাস্তবায়ন ও উদ্দেশ্যের দৃষ্টিকোণ দেখে আমরা হতাশ। চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারের মন্ত্রণালয় কতটুকু সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেছে তা আমার জানা নেই। তবে জাতিসংঘের কোনো দেশই সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেনি। এটা বলতে পারি রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশকে আরও ‘অ্যাগ্রেসিভ’ হতে হবে।
তিনি বলেন, মিয়ানমার সেনা কর্তৃক রোহিঙ্গাদের নির্যাতনের বিষয়ে আমরা গত বছরের সেপ্টেম্বরে মিয়ানমারের মানবাধিকার কমিশনকে চিঠি দিই। ১৫-২০ দিন পর তারা চিঠির উত্তর দেয়। তাদের উত্তর আমাদের কাছে ইতিবাচক মনে হয়েছিল। তবে এর কয়েকদিন পর তারা নিজেদের ওয়েবসাইটে একটি বিবৃতি দিয়ে জানায়, মিয়ানমারের জঙ্গিদের দায়-দায়িত্ব তারা নেবে না।
 চেয়ারম্যান বলেন, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে জাতিসংঘের কোনো সদস্য রাষ্ট্র এগিয়ে আসেনি। এমনকি বিশ্ব নেতারাও রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি বলেন, এদেরকে ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারকে বাধ্য করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, এক বছর হয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত সাড়ে ১১ লাখের মধ্যে একজন লোককেও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের লোকেরা এ ব্যাপারে আদৌ কোনো কাজ করেছেন বা করতে পেরেছেন কিনা- সে নিয়ে প্রশ্ন আছে।
গত কয়েকদিন আগে সিঙ্গাপুরে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি বক্তব্য দিয়েছেন- উল্লেখ করে মানবাধিকার চেয়ারম্যান বলেন, তিনি সব দোষ বাংলাদেশের ওপর চাপিয়েছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। কেন তারা এখনও এই বক্তব্যের প্রতিবাদ করেনি?
বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ের মধ্যে অন্যতম ঘটনা রাখাইনে রোহিঙ্গাদের অত্যাচার আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, আরসার (রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি) হামলার অজুহাতে মিয়ানমার যে গণহত্যা চালিয়েছে, সে বিষয়ে আমরা সার্ক, ওআইসি, আসিয়ান, জাতিসংঘ, মিয়ানমার-ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর মানবাধিকার কমিশনকে চিঠি দিয়ে অবগত করেছি। কিন্তু তাদের ফিরিয়ে নেয়ার জন্য যা করণীয় তা তারা সত্যি করতে পেরেছে কি?
তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে দেয়ার পাশাপাশি আমাদের মিয়ানমারকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। ফিরিয়ে দিয়ে তাদের নিরাপদে রাখা, মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং তারা যাতে তাদের নাগরিকত্ব ফিরে পায় সেই প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
মানবাধিকার কমিশনের সদস্য এনামুল হক চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনে সরকারের কোনো কিছুই হয়নি। আমরা সবাই বলেছি তবে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের মেরে তাড়িয়ে দিয়েছে। তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে সেগুলো ‘পুনর্বাসনের’ নামে তারা বিভিন্ন দেশ থেকে সাহায্য নিচ্ছে। তারা এটিকে এক ধরনের ব্যবসা হিসেবে নিয়েছে।
 রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার পাশাপাশি তাদের জমিজমা ফিরিয়ে দেয়া এবং নিরাপত্তা ও লেখাপড়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে তিনি বিশ্ব নেতাদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
মানবাধিকার কমিশনের আরেক সদস্য মেঘনা গুহ ঠাকুরতা বলেন, বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে ৫২ শতাংশ নারী। আমি তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের কেউ মিয়ানমারে মাছ ধরত, কেউ গৃহস্থালীর কাজ করত। এখন মানবেতর জীবনযাপন করছে। তারা সবাই মিয়ানমারে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চায়।
তিনি মিয়ানমারকে দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে জাতিসংঘের সহযোগিতা কামনা করেন।
এর আগে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে পুলিশ ও বিদ্রোহী গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে পুলিশ সদস্যসহ বহু রোহিঙ্গা হতাহত হন। ওই ঘটনার পর থেকেই মিয়ানমারের সেনাবাহিনী বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ‘শুদ্ধি অভিযান’র নামে রাখাইন রাজ্যে নিরীহ মানুষের ওপর বর্বর নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণ, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করেছে। সহিংসতা থেকে বাঁচতে প্রায় ৭ লাখের মতো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। ১৯৯১ সাল থেকে এ পর্যন্ত মোট ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ