ঢাকা, মঙ্গলবার 28 August 2018, ১৩ ভাদ্র ১৪২৫, ১৬ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কন্ট্রোল টাওয়ারকে অসত্য তথ্য দেয়ায় ইউ.এস-বাংলা বিমান বিধ্বস্ত

সংগ্রাম ডেস্ক : নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলার উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় গঠিত নেপাল সরকারের একটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার দাবি করেছে দেশটির সংবাদমাধ্যম কাঠমান্ডু পোস্ট। প্রতিবেদনের বরাতে পত্রিকাটি দাবি করেছে, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিএস২১১ ফ্লাইটের পাইলট আবিদ সুলতান প্রচ- ব্যক্তিগত মানসিক চাপ ও উদ্বেগের মধ্যে ছিলেন। তার ধারাবাহিক কয়েকটি ভুল সিদ্ধান্ত ও কন্ট্রোল টাওয়ারকে অসত্য তথ্য দেওয়ার কারণে বিএস২১১ ফ্লাইটটির বিমান বিধ্বস্ত হয়। শীর্ষ নিউজ
কাঠমান্ডু পোস্ট লিখেছে, ফ্লাইটের পুরো সময় জুড়ে সুলতান অস্বাভাবিক আচরণ করছিলেন যা তার স্বাভাবিক আচরণের সঙ্গে যায় না। আর সেকারণেই তাৎক্ষণিকভাবে লাল পতাকা উড়িয়ে দিয়েছিলেন বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন নেপালের তদন্তকারীরা।
অবতরণের ছয় মিনিট আগে সুলতান নিশ্চিত করেছিলেন বিমানের ল্যান্ডিং গিয়ার নিচে নেমে আটকে গেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, বিমানের ককপিটের ইলেকট্রিক নির্দেশক লাইটের উল্লেখ করে পাইলট বলেন, ‘গিয়ার নিচে নেমেছে, তিনটি সবুজ বাতি জ্বলছে’। সহকারী পাইলট পৃথুলা রশিদ যখন চূড়ান্ত ল্যান্ডিং পরীক্ষা করছিলেন তখন ধরা পড়ে গিয়ার নিচে নামেনি। কয়েক মিনিট পর দ্বিতীয় অবতরণ চেষ্টার সময় ৬৭ জন যাত্রী ও চার ক্রু সদস্য বহনকারী বিমানটি রানওয়েতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে আগুন ধরে যায়।
 নেপালের তদন্ত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, পাইলট কন্ট্রোল টাওয়ারকে অসত্য তথ্য দিয়েছেন। ককপিটে অনবরত ধূমপান করেছেন। ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নারী সহকর্মীকে নিয়ে অপমানজনক কথা বলেছেন। কয়েকবার কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। পদত্যাগের পরিকল্পনা করেছিলেন একদিন আগে।
তদন্তকারীরা বলছেন, এক ঘণ্টার ওই ফ্লাইটে সুলতান ক্রমাগত ধূমপান করেছিলেন। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক এই পাইলটের সাড়ে ৫ হাজার ঘণ্টার উড্ডয়নের রেকর্ড ছিল। তবে তিনি তার ধূমপানের অভ্যাস থাকার তথ্য বিমানসংস্থাকে জানাননি। এ থেকে তদন্তকারীরা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন ককপিটে থাকার সময়ে তিনি মানসিক চাপে ছিলেন।
তদন্তকারীরা ওই রিপোর্টে লিখেছেন, ‘ককপিটের ভয়েস রেকর্ডারের তথ্য বিশ্লেষণ করে আমরা দেখেছি ক্যাপ্টেন প্রচ- মানসিক চাপ মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। এছাড়া তাকে বিষন্ন ও কম ঘুমের সমস্যায় থাকা মানুষ মনে হয়েছে। কয়েকটি ক্ষেত্রে তিনি কেঁদে ফেলেছিলেন।’ ওই ভয়েস রেকর্ডারে ককপিটে তার ও তার সহকারী পাইলটের মধ্যে এক ঘণ্টার কথোপকথন রেকর্ড হয়েছিল। কথোপকথনের এক পর্যায়ে দেখা গেছে চিন্তিত সুলতান পরিস্থিতিগতভাবেও সচেতন ছিলেন না বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে তদন্তকারীরা।
ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, ফ্লাইটের সময় সুলতান এয়ারলাইন্সের অপর এক নারী সহকর্মীর বিরুদ্ধে অবমাননাকর বক্তব্য রেখেছেন। ওই নারী সহকর্মী ইন্সট্রাক্টর হিসেবে সুলতানের সুনাম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। এক ঘণ্টার ওই আলাপে দুইজনের সম্পর্কই ছিল আলাপের অন্যতম বিষয়বস্তু। রেকর্ড অনুযায়ী সহকারী পাইলট পৃথুলা পুরো ঘণ্টাব্যাপী ফ্লাইটে শুধু পরোক্ষ শ্রোতা হিসেবে তার আলাপ শুনে গেছেন।
অডিও রেকর্ডারের তথ্য অনুযায়ী, ফ্লাইটের এক পর্যায়ে পাইলট ভেঙে পড়েন। বলেন, তিনি ওই নারী সহকর্মীর আচরণে খুবই আঘাত পেয়েছেন ও হতাশ হয়েছেন। আর ওই নারীই একমাত্র কারণ যার জন্য তিনি কোম্পানি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। সুলতান দুর্ঘটনার একদিন আগে কোম্পানি থেকে পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন বলে রিপোর্টে বলা হয়েছে। তবে তিনি কোনও লিখিত নথি জমা দেননি। সহকারী পাইলটের প্রশিক্ষণ চালিয়ে যেতে আরও তিনমাস কাজ চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছার কথাও বলেছিলেন তিনি।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০০২ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মেডিক্যাল পরীক্ষার সময়ে কোনও ধরনের মানসিক ইস্যুও দেখাননি সুলতান। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০১২ থেকে ২০১৭ সালের মেডিক্যাল রিপোর্টগুলো কমিটি পর্যালোচনা করে দেখেছে এর কোনওটিতেই উদ্বেগের লক্ষণের কোনও উল্লেখ নেই। এছাড়া নিয়মিত মেডিক্যাল মূল্যায়নের সময়েও তাকে উপযোগী ঘোষণা করা হয়েছে আর বলা হয়েছে যাবতীয় উদ্বেগের লক্ষণ থেকে তিনি মুক্ত। দেশের সব পাইলটের মেডিক্যাল মূল্যায়ন করে থাকে বাংলাদেশের সিভিল এভিয়েশন অথরিটি বা বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। এছাড়া যেকোনও সমস্যায় বিমান সংস্থার কর্মীরা নিজস্ব চিকিৎসকদের পরামর্শও নিতে পারে।
পাইলট সুলতানের মেডিক্যাল রিপোর্টের কথা তুলে ধরে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিজের ধূমপানের অভ্যাস নিয়ে অসত্য তথ্য দিয়েছেন সুলতান। ২০১২ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত নিজের দেওয়া ঘোষণায় তিনি বলেছেন, কখনোই ধূমপান করেননি। ২০১৫ সালে তিনি লিখেছেন, ধূমপান করতেন কিন্তু ২০১০ সালে ছেড়ে দিয়েছেন। এরপর সর্বশেষ ২০১৬ এবং ২০১৭ সালের মেডিক্যাল মূল্যায়নে তিনি লিখেছেন, কখনো ধুমপান করেননি তিনি।
২০১৫ সালে ইউএস বাংলায় যোগ দেন সুলতান। বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালানোর আগে বাংলাদেশ বিমানের পাইলট ছিলেন। রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, সুলতানের মানসিক চাপে থাকার ইতিহাস রয়েছে। মানসিক মূল্যায়নের পর ১৯৯৩ সালে তাকে বিমানবাহিনীর সক্রিয় দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তবে ২০০২ সালের ৯ জানুয়ারিতে তার মানসিক পরিস্থিতি পুনর্মূল্যায়নের পর তাকে ফ্লাইট চালানোর উপযোগী বলে ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক এই পাইলটের সাড়ে ৫ হাজার ঘণ্টার উড্ডয়নের রেকর্ড ছিল। দুর্ঘটনায় তিনিও নিহত হন।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, সুলতানকে নিয়োগের সময়ে তার মেডিক্যাল ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখেনি ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স। নেপালের এই প্রতিবেদনের বিষয়ে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের মুখপাত্র ও ব্যবস্থাপক কামরুল ইসলামের কাছে কাঠমান্ডু পোস্ট যোগাযোগ করলেও তিনি কোনও মন্তব্য করেননি।
তবে নেপালের এই তদন্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে মহাব্যবস্থাপক কামরুল ইসলাম বাংলাদেশি গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘ক্যাপ্টেনের কোনও প্রবলেম আমরা খুঁজে পাইনি। তার কোনও মানসিক ও স্বাস্থ্যগত সমস্যা ছিল না।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ