ঢাকা, মঙ্গলবার 28 August 2018, ১৩ ভাদ্র ১৪২৫, ১৬ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ইমরান খানের নতুন পাকিস্তান ও বাস্তবতা

পাকিস্তানে একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটেছে। প্রায় অর্ধ-শতাব্দী ধরে চলে আসা দুইদলীয় শাসনব্যবস্থা থেকে সরে এসে দেশটি এখন দেশ শাসনের জন্য তৃতীয় ও নতুন একটি দলকে বেছে নিয়েছে। বলাবাহুল্য, পাকিস্তান মুসলিম লীগ ও পাকিস্তান পিপলস পার্টি এতদিন ধরে পর্যায়ক্রমে নির্বাচিত হয়ে দেশ শাসন করে আসছিল। দু’টি দলই তাদের দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়, ক্ষমতার অপব্যবহার প্রভৃতি কারণে জনগণের বিরাগভাজন হয়ে পড়েছিল। এ দুটি রাজনৈতিক দলের বাইরে দেশটির সেনাবাহিনীও ক্ষমতা দখল করে স্বৈরতান্ত্রিক পদ্ধতিতে দেশ শাসন করেছে। এবার প্রথমবারের ন্যায় কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে পাকিস্তান তাহরিক-এ-ইনসাফ পার্টি বিজয়ী হয় এবং এই দলের নেতা ক্রিকেট জগতের সাবেক তারকা ইমরান খান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ফলে দ্বিদলীয় শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটে। সারা দুনিয়ার দৃষ্টি এখন পাকিস্তান তাহরিক-এ-ইনসাফ পার্টি বা পিটিআই-এর ওপর। দলটির সাফল্যের ওপর এখন শুধু পাকিস্তান নয়, দুইদলীয় ব্যবস্থাধীন দুনিয়ার দেশগুলোর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপ্রবাহও নির্ভর করবে। অনেকে বলে থাকেন যে, ইমরান খানের বিজয়ের পেছনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর শক্তিশালী একটা ভূমিকাও ছিল।
এখন অন্য প্রসঙ্গে আসি। নাদিয়া জিসান পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের একজন সিনিয়র সদস্যা। বর্তমানে লিয়েন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি মানবাধিকার ও ত্রাণ সংস্থায় কাজ করছেন। এ মাসের ৮ তারিখে তিনি ঢাকা এসেছিলেন। ১৯ তারিখে ঢাকাস্থ একটি ত্রাণ সংস্থার অফিসে তার সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল। পাকিস্তানের নির্বাচনে ইমরান খানের বিজয়ে তাকে অনেক উচ্ছ্বসিত দেখলাম। তিনি আমাকে ইমরান খানের কাছ থেকে আমার প্রত্যাশার কথা জানতে চাইলেন। ইমরান খানকে আমি রাজনীতিক হিসেবে যত চিনি তার থেকে বেশি চিনি বড় মাপের একজন ক্রিকেট তারকা হিসেবে। পাকিস্তানের রাজনীতির প্রতি আমার আকর্ষণ খুব কম। বললাম সারা দুনিয়ার মুসলমানদের প্রত্যাশাকে পদাঘাত করে পাকিস্তানের রাজনীতিক ও সামরিক জান্তারা গত প্রায় সাত দশকে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে তার প্রেক্ষাপটে ইমরান খানের কাছ থেকে কিছু প্রত্যাশা করা একটি দুরাশা মাত্র। আবার অন্যদের ন্যায় আমারও ধারণা ছিল যে, সেনাবাহিনীর ছত্রছায়ায় ক্ষমতায় এসে তিনি আর কিইবা করবেন? কিন্তু দেখলাম নাদিয়া ইমরানের একজন শক্ত ভক্ত। তিনি বললেন, সিভিল সোসাইটিসহ পাকিস্তানের বেশির ভাগ মানুষই ইমরান খানের বিজয়ে উল্লসিত; এতদিন যারা মনে করতেন দুই দলের বলয় থেকে বের হওয়া যাবে না এবং দেশবাসী তাদের পর্যায়ক্রমিক দুঃশাসন ও দুর্নীতির জালে আবদ্ধ তারা তাদের ধারণা পাল্টাতে পেরেছেন। তিনি ইমরানের ক্লিন ইমেজ এবং চারিত্রিক সংহতি এবং পারিবারিক ঐতিহ্যের কথাও বললেন এবং বললেন যে, পাকিস্তানের রাজনীতির মোড় পরিবর্তন যদি কেউ করতে পারেন তাহলে ইমরানই করতে পারবেন। সৎ, যোগ্য ও শিক্ষিত লোকসমৃদ্ধ স্বচ্ছ ও অভিজ্ঞ দল হিসেবে জামায়াতের প্রতি শ্রদ্ধা থাকলেও ক্ষমতার রাজনীতিতে তারা তত সক্রিয় না থাকার কারণে মানুষ তৃতীয় শক্তি হিসেবে ইমরানের দলকে বেছে নিয়েছে বলে তিনি মনে করেন। ইমরান খানের উত্থানের সাথে সেনাবাহিনীকে জড়ানো হলেও এই বাহিনী কোথাও পিটিআই-এর পক্ষে ভোট কারচুপি অথবা ঐ দলের কাউকে ভোট দেয়ার জন্য ভোটারদের বাধ্য করেছে এমন নজির নাই। তার যুক্তি এড়িয়ে যাবার মত নয়।
প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণের আগে ইমরান খান মদীনা সনদের ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা এবং পাকিস্তানকে একটি ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্রে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছিলেন, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টারা একই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বলাবাহুল্য, দুনিয়াতে আদর্শভিত্তিক মাত্র দু’টি রাষ্ট্র আছে, একটি পাকিস্তান, যার আদর্শ ইসলাম, আরেকটি ইসরাইল যার আদর্শ ইহুদী ধর্ম, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এই দেশটিকে ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্রে রূপান্তরের জন্য অনেক চেষ্টা হয়েছে, আন্দোলন হয়েছে কিন্তু ইসলামী অনুশাসন কায়েম হয়নি। দেশের নাম ইসলামী প্রজাতন্ত্র পাকিস্তান হলেও তার সংবিধান ইসলামী হয়নি। আদর্শের অনুপস্থিতি, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের উৎখাত, শোষণ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও দুর্নীতি, স্বৈরাচারের প্রভাব এবং আল্লাহর প্রভুত্বের পরিবর্তে মনুষের প্রভুত্বের লড়াইয়ে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। এর পর পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে পাকিস্তান সীমিত হয়ে পড়ে। লোভ-লালসা, ক্ষমতার লিপ্সা, অন্যায় অবিচার এবং আদর্শচ্যুতি এর প্রধান কারণ ছিল। কিন্তু এই বিপর্যয়ের পরও দেশটির রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন হয়নি, রাষ্ট্রীয় জীবনে আদর্শও ফিরে আসেনি।
ইমরান খান ক্ষমতা গ্রহণ করে জাতির উদ্দেশে দেয়া তার প্রথম ভাষণে পাকিস্তানকে পাল্টে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি গত দশ বছরে দেশটির ঋণ খাতে জমা ২৮ ট্রিলিয়ন রুপির কথা উল্লেখ করে বলেছেন যে, এ বিশাল ঋণের শুধু সুদ পরিশোধের জন্য দেশটিকে নতুন ঋণ নিতে হচ্ছে, তিনি ধনী দরিদ্রের জীবনযাত্রার মধ্যে বিরাজিত পার্থক্যের উল্লেখ করে জানান যে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর ৫২৪ জন কর্মচারী আছে এবং তার ৩৩টি বুলেটপ্রুফ গাড়িসহ ৮০টি গাড়ি আছে। এছাড়াও আছে হেলিকপ্টার ও বিমান এবং প্রধানমন্ত্রী ও গবর্নরদের জন্য বিলাসবহুল বিশাল বিশাল বাড়ি। জনাব ইমরান এগুলোকে বিলাসিতা ও অপব্যয় আখ্যায়িত করে ঋণের চাপ কমানোর উদ্দেশ্যে তিনি দ্রুত দেশব্যাপী কৃচ্ছ্রতা অভিযান শুরু করার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের বুলেটপ্রুফ গাড়ি বহরের বেশিরভাগ বিক্রি করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয়া এবং প্রধানমন্ত্রী ভবনকে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরেরও প্রতিশ্রুতি দেন। নিজের বাসভবন হিসেবে তিনি মিলিটারী সেক্রেটারির তিন বেড রুমের একটি বাড়িই পছন্দ করেছেন। ঋণের মাত্রা ও দারিদ্র্য কমিয়ে ইসলামী কল্যাণমূলক ব্যবস্থায় নতুন পাকিস্তান গড়ে তোলারও তিনি ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ঋণ নিয়ে জীবন যাপন ও অন্য দেশের কাছ থেকে সহায়তা নিয়ে চলার মাধ্যমে কোনো দেশ উন্নতি করতে পারে না।
প্রধানমন্ত্রী ইমরানের প্রাথমিক বক্তব্য অত্যন্ত সুন্দর ও হৃদয়গ্রাহী। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের ৫২৪ জন কর্মচারীর মধ্য থেকে ২জনকে রেখে তিনি বাকি ৫২২ জনকে ফেরত দিচ্ছেন। অর্থাৎ এই ৫২২ জন কর্মচারী রাষ্ট্রের অন্যান্য সেক্টরে কাজ করলে রাষ্ট্র উপকৃত হবে। দরিদ্র দেশের একজন প্রধানমন্ত্রীর জন্য ব্যক্তিগত কর্মচারীর এত বিরাট বহর মানায় না।
আমরাও তো পাকিস্তান থেকে গরিব, আমাদের অবস্থা কি? আমাদের প্রধানমন্ত্রী আইন করে বিশাল এক ভবনের (প্রধানমন্ত্রী ভবনের) মালিক হয়েছেন এবং তার ব্যক্তিগত কর্মচারীর সংখ্যাও ৫ শতাধিক। ইমরান খান যদি তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন তাহলে গরিব দেশের সকল প্রধানমন্ত্রীর জন্য এটি একটি দৃষ্টান্ত হতে পারে।
পাকিস্তানের প্রদেশ ছিল ৫টি। তার মধ্যে বাংলাভাষী পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশ ১৯৭১ সালে নয় মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হয়ে গেছে। বাকি প্রদেশগুলো নিয়ে এখন পাকিস্তান। এদের ভাষা সিন্ধি, পাঞ্জাবী, পুশত্ ও বেলুচি। একমাত্র ইসলামী আদর্শই তাদের এক করে রেখেছে, যেমন রেখেছে ভারতের প্রায় ১০০ ভাষাভাষী অঞ্চলকে হিন্দুত্ববাদ বা হিন্দু ধর্ম। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মূল আদর্শ ইসলাম যদি রাষ্ট্রীয় জীবনের পরিচালিকা শক্তি না হয় তাহলে দেশটির পক্ষে টিকে থাকা ও সমৃদ্ধশালী হওয়া অত্যন্ত কঠিন হবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। ইমরান খান পাকিস্তানের শিক্ষাব্যবস্থায় পবিত্র কুরআনকে বাধ্যতামূলক করার ঘোষণা দিয়েছেন। এটি একটি শুভ সূচনা। তার ইসলামীকরণের এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য তিনি বিশ্বব্যাপী আলেম-ওলামা, ইসলামী বিশেষজ্ঞ এবং দায়ীদের কাছ থেকে সহযোগিতা নিতে পারেন বলে আমি মনে করি। তার প্রচেষ্টা যদি সফল হয় তাহলে পাকিস্তান ও মুসলিম উম্মাহর জন্য তা মঙ্গলজনক হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ