ঢাকা, মঙ্গলবার 28 August 2018, ১৩ ভাদ্র ১৪২৫, ১৬ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

“নজরুল ও তার নায়িকারা”

রহিমা আক্তার মৌ : প্রেমের, বিরহের, বিদ্রোহের সাম্যবাদের কবি একজনই, তিনি নজরুল। তার শিল্প-সাহিত্যে যেমন প্রেম রয়েছে তেমনি রয়েছে বিরহ। কারণ বিরহ ছাড়া প্রেমের আনন্দ উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। তার রচিত অসংখ্য গান ও কবিতায় বিরহ, অভিমান ও অতৃপ্তর রূপ পরিলক্ষিত হয়। প্রেমিক নজরুলের আসল পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর রচিত গানগুলিতে।

‘মোর প্রিয়া হবে এসো রানী, দেব খোঁপায় তারার ফুল’-
আলগা কর গো খোঁপার বাঁধন-,
প্রিয় যাই যাই বলো না-,
‘আলগা করো গো খোঁপার বাঁধন’ কিংবা ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রানী, দেব খোঁপায় তারার ফুল’- এ ধরনের গানে তার অপার্থিব প্রেমের উৎসরণ লক্ষ্য করা যায়। এ ক্ষেত্রে তাকে প্রেমিক কবি হিসেবে আখ্যায়িত করলেও অত্যুক্তি করা হবে না। বিদ্রোহী রূপের আড়ালে তার চিরায়ত কামনা-বাসনা-প্রেমকে ঢেকে রাখার সাধ্য আছে কার? কবি এও বলেছেন-
‘নারীর বিরহে, নারীর মিলনে, নর পেল কবি প্রাণ,
যত কথা তার হইল কবিতা, শব্দ হইল গান।’
নারীর উৎসাহ-প্রেরণা ও প্রেমের মহিমা তাকে বিদ্রোহী হতে উৎসাহ জুগিয়েছে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায়ও তার প্রেম প্রকাশিত হয়েছে। নারী হৃদয়ের ব্যর্থতা, ক্ষোভ ও বাসনাকে কবি নিজের বিদ্রোহের উপাদান হিসেবে গ্রহণ করেছেন। নজরুলের সর্বাপেক্ষা অমূল্য সৃষ্টি ‘বিদ্রোহী’ কবিতা এর উদাহরণ।
‘আমি বন্ধনহারা কুমারীর বেণী, তন্বী-নয়নে বহ্নি,/ আমি ষোড়শীর হৃদি-সরসিজ প্রেম উদ্দাম, আমি ধন্যি!/ আমি উন্মন মন উদাসীর,/ আমি বিধবার বুকে ক্রন্দন-শ্বাস, হা-হুতাশ আমি হুতাশির।’
অনেকের মতে নজরুলের জীবনে প্রেম মূলত তিনবার এসেছিল। প্রথম প্রেম নার্গিস, দ্বিতীয় স্ত্রী প্রমীলা দেবী এবং তৃতীয় বেগম ফজিলাতুন্নেসা। তবে অনেক ক্ষেত্রে উমা মৈত্র’র নাম ও উঠে এসেছে। নজরুলের প্রথম প্রেম সৈয়দা খানম, নজরুল ভালোবেসে নাম দেন নার্গিস। ফারসি ভাষায় যার অর্থ গুল্ম। নার্গিস কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর থানার দৌলতপুর গ্রামের মেয়ে ছিলেন। কারো কারো মতে কুমিল্লার দৌলতপুরে এক বিয়ে বাড়িতে প্রথম তাদের দেখা। সেই থেকে ভালোলাগা, ভালোবাসা। তার রূপে মুগ্ধ হয়ে কবি তাকে ১৯২১ সালে বিয়েও করেন। কিন্তু বিয়ের রাতে বাসর হবার আগেই নজরুল চলে আসেন নার্গিসকে ফেলে। কারণ ছিল তাকে ঘর-জামাই থাকতে বলা হয়েছিলো। বিয়ের রাত্রি থেকে নার্গিস নজরুলের জন্য অপেক্ষা করেছিলো ১৬টি বছর। ১৬ বছর অপেক্ষার পর তার ফিরবার কোন আশা আছে কিনা জানতে চেয়ে নার্গিস নজরুলকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। কিন্তু নজরুল ফেরেননি নার্গিসের কাছে। চিঠির উত্তরে তিনি লিখেছিলেন-
‘যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পারো নাই, কেন মনে রাখো তারে, ভুলে যাও ভুলে যাও তারে একেবারে’।
নজরুলের বিরহের বিখ্যাত অনেক গানের মাঝে এটি একটি। নার্গিসকে উদ্দেশ্য করে কবি চক্রবাক কাব্যে বেশ কয়েকটি বিরহের কবিতা লিখেছিলেন। চক্রবাক কাব্যগ্রন্থই সেই বিরহ সত্তার জ্বলন্ত ও জীবন্ত নিদর্শন। এই কাব্যের প্রায় প্রতিটি কবিতার অভিব্যক্তি ও বিরহের সুর হৃদয়কে স্পর্শ করে। এর প্রথম কবিতা ‘তোমারে পড়িছে মনে’ কবির গভীর বিরহানুভূতির প্রকাশ। লিখেছেন ‘হার-মানা-হার’। তাদের প্রেমের বয়স ছিলো মাত্র দু’মাস। এই দু’মাসের প্রেমের সময়কালে তিনি নার্গিসকে নিয়ে লিখেছিলেন ১৬০টি গান ও ১২০টি কবিতা।
আবার অন্য তথ্য মতে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণকালে নার্গিসের মামা ক্যাপ্টেন আলী আকবর খানের সঙ্গে পরিচয় ঘটে নজরুলের। নজরুল তখন মুসলিম সাহিত্য সমিতির কলকাতার অফিসে আফজালুল হকের সঙ্গে থাকতেন। ওই সময় আলী আকবর খানের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে নজরুলের। আকবর খান নজরুলের প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তাকে কুমিল্লায় গ্রামের বাড়িতে ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানান। আলী আকবর খানের আমন্ত্রণ রক্ষা করতে কলকাতা থেকে কুমিল্লা আসেন।
লেখাপড়া পাঠ চুকিয়ে ময়মনসিংহের ত্রিশালে দরিরামপুর থেকে আসানসোলে যাওয়ার পর নজরুলের এটাই ছিলো পূর্ববঙ্গ আসা। নজরুলকে নিয়ে আলী আকবর খান যায় তার স্কুলের বন্ধু বীরেন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের বাসায়। চার-পাঁচ দিন সেখানে কাটিয়ে কবি রওনা দেন দৌলতপুরের খাঁ বাড়ির উদ্দেশে। নার্গিসের মায়ের নাম আসমাতুন্নেসা, স্বামী হারা আসমাতুন্নেসা মেয়েকে নিয়ে ভাই ক্যাপ্টেন আলী আকবর খানের বাড়িতেই থাকতেন। ১৯২১ সালের এপ্রিলে কুমিল্লার দৌলতপুরে আলী আকবর খানের বাড়িতে অতিথি হয়ে আসেন নজরুল। বাড়ির জ্যেষ্ঠ আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে খুব অল্প সময়ের মধ্যে গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে নজরুলের। কবিতা শুনিয়ে, গান গেয়ে তাদের তো বটেই, দূর-দূরান্ত থেকেও লোকজন ছুটে আসত কবির নৈকট্য লাভের আশায়।
নার্গিসের সঙ্গে আলোচনার সূত্রপাত ঘটেছিল কবির বাঁশি বাজানো নিয়ে। এক রাতে কবি খাঁ বাড়ির দিঘির ঘাটে বসে বাঁশি বাজাচ্ছিলেন, সেই বাঁশির সুরে মুগ্ধ হন নার্গিস। খাঁ বাড়ির মুরব্বিরা নার্গিসের বর হিসেবে নজরুলকে তেমন পছন্দ করতেন না। নজরুলকে তারা ছিন্নমূল বাউ-ুলে হিসেবেই দেখেছিলেন। কিন্তু গ্র্যাজুয়েট আলী আকবর খানের চাপে তারা প্রতিবাদ করতেন না। এক পর্যায়ে নজরুল নিজেই বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। কবির বিয়ে হলো ঠিকই, বাসর রাতেই নজরুল বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেন। কেউ কেউ বলেন বিয়েই হয়নি, বিয়ের আসর থেকে নজরুল অভিমান করে উঠে চলে যান। সেই অভিমানের কারণ কবি কোনো দিন কাউকে মুখ ফুটে বলেননি। ইতিহাসও তা স্পষ্টভাবে খুঁজে বের করতে পারেনি।
আলী আকবর খান নজরুল-নার্গিসের বিয়ের আয়োজন করলেন জাঁকজমকের সঙ্গে। যখন কাবিন নামায় আলী আকবর খান একটি শর্ত রাখতে চাইলেন, শর্ত হল- ‘বিয়ের পরে নজরুল নার্গিসকে অন্য কোথাও নিয়ে যাবেন না, দৌলতপুরেই তার সঙ্গে বাস করবে।’ এ অপমানজনক শর্ত মেনে না নিয়ে নজরুল ইসলাম বিয়ের মজলিশ থেকে উঠে গিয়েছিল। তার মানে, সৈয়দা খাতুন ওরফে নার্গিস বেগমের সঙ্গে নজরুল ইসলামের ‘আকদ’ বা বিয়ে একেবারেই হয়নি। (কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা- মোজাফফর আহমদ পৃষ্ঠা-৬৭)।
নার্গিসের বিয়ের খবর শুনে নজরুল তাকে উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন-
‘পথ চলিতে যদি চকিতে, কভু দেখা হয় পরাণ প্রিয়’ গানটি। নজরুলের জীবনের বিরহী প্রেম নিয়ে লিখার কারণ হচ্ছে কখনো কখনো বিরহ ও জীবনে পাল্টে দেয়। নজরুলের জীবনে এই বিরহী পর্ব না থাকলে আমরা হয়তো কালজয়ী কিছু রচনা থেকে বঞ্চিত হতাম। বারবার নজরুল প্রেমে পড়েছিলেন বলেই দ্রোহ, সাম্য ও মানবতার কবি বলার পাশাপাশি তাকে প্রেমের কবি ও বিরহের কবি বলা হয়।
নার্গিসকে ভালোবেসে নজরুল লিখেছিলেন ১৬০টি গান ও ১২০টি কবিতা। সেই ভালোবাসার মানুষের সাথে বিয়ের অনুষ্ঠান দৌলতপুর থেকে অভিমান করে নজরুল উঠে যান। শেষ রাতেই তিনি কুমিল্লার সেনগুপ্ত বাড়িতে এসে উঠেন। নজরুল দীর্ঘ পথ অতিক্রমের পরিশ্রম ও মানসিক কষ্টে খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেনগুপ্ত পরিবারের সবাই কবিকে সেবাযতœ করে সারিয়ে তুলতে নেমে পড়েন। কিশোরী প্রমীলাই মূলত নজরুলের শুশ্রূষার দায়িত্ব পান। দু’জনের মধ্যে প্রণয়ের সম্পর্ক সেসময়ই দানা বাধে। তাঁর এই প্রেমের কথা তাঁর বিজয়ীনি কবিতায় তিনি এভাবে প্রকাশ করেন :
‘হে মোর রানী! তোমার কাছে হার মানি আজ শেষে। আমার বিজয়-কেতন লুটায় তোমার চরণ-তলে এসে।’
প্রমীলাকে নিয়েও নজরুল অনেক বিরহের গান ও কবিতা রচনা করেন। ধর্ম, বিবাহ-আইনের নানা চড়াই-উতরাই পার হয়ে, ধর্মীয় বাধা ডিঙিয়ে ১৯২৪ সালের এপ্রিল মাসে ১৪ বছর বয়সী  প্রমীলার সাথে ২৩ বছরের নজরুলের বিয়ে হয়। অবশ্য এর আগেই ১৯২৩ সালের ১৫ অক্টোবর প্রকাশিত দোলনচাঁপা কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত ‘দোদুল দুল’ নামক কবিতায় প্রমীলার সৌন্দর্য বর্ণনা করেছেন নজরুল। তাঁদের বিয়েটা হয়েছিল স্ব-স্ব ধর্মপরিচয় বহাল রেখেই।
নজরুলের সুস্থ অবস্থাতেই তাঁর স্ত্রী প্রমীলা পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে অচল হয়ে পড়েছিলেন। তখন দুজনের কারও বয়সই বেশি হয়নি। আর নজরুল প্রমীলাকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন এবং তাকে সারিয়ে তোলার জন্য সব ধরনের চেষ্টা করেছিলেন এবং প্রেমময় সঙ্গ দিয়ে গেছিলেন সর্বোতভাবে।
কিছু জায়গায় পাওয়া যায়,
 ‘অরুণ তুমি, তরুণ তুমি, করুণ তারও চেয়ে/ হাসি দেশের তুমি যেন বিষাদলোকে মেয়ে’ এই গানটি সেই রোগগ্রস্ত শয্যাশায়ী প্রমীলাকে নিয়েই লেখা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের প্রথম স্নাতকোত্তর মুসলমান ছাত্রী এবং সওগাত পত্রিকার একজন বিশিষ্ট লেখিকা ফজিলাতুন্নেসাকে ভালোবেসে ছিলেন নজরুল। ফজিলাতুন্নেসার প্রতি কবির গভীর অনুরাগ যা একান্তই গোপন ছিল। নজরুলের এই প্রেমের কথা মাত্র দুজন জানতেন-কাজী মোতাহের হোসেন ও ফজিলতুন্নেসা নিজে।
১৯২৭ সালে নজরুল বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমাজের অধিবেশনে যোগদান করতে প্রথমবারের মত ঢাকায় আসেন তখন মোতাহের হোসেনের বাড়িতে উঠেন। মোতাহের হোসেনের স্ত্রী ও শ্বাশুড়ীর সাথে ফজিলতুন্নেসার খুব ভালো সখ্যতা ছিলো। মোতাহের হোসেন নিজেও ফজিলতুন্নেসাকে আপন বোনের মত মনে করতেন। এই বাসাতে তার আসা যাওয়া ছিলো।
১৯২৮ সালে দ্বিতীয়বার আবার যখন কবি ঢাকায় আসেন তখন ফজিলতুন্নেসা জানতে পারেন নজরুল হাত দেখতে জানেন। তাই তিনি মোতাহের হোসেনকে অনুরোধ করেন কবিকে নিয়ে তার বাসায় যাবার জন্য। ফজিলতুন্নেসা তখন ঢাকার দেওয়ান বাজারস্থ হাসিনা মঞ্জিলে থাকতেন। সেই বাসাতেই মোতাহের হোসেন কবিকে নিয়ে যান এবং তাদের দুইজনের পরিচয় হয় এই দেখাতেই নজরুল ফজিলতুন্নেসার প্রেমে পড়ে যান। ফিরে এসে সেদিন রাতেই কবি আবারো ফজিলতুন্নেসার বাসায় যান এবং প্রেম নিবেদন করেন। ফজিলতুন্নেসার কোন অনুরাগ ছিলোনা কবির প্রতি। তিনি কবির প্রেম নিবেদন প্রত্যাখ্যান করে তাকে  ফিরিয়ে দেন। এরপর নজরুল  কলকাতায় ফিরে যান এবং ফজিলতুন্নেসাকে চিঠি লিখেন কিন্তু কোন উত্তর পাননি। একইসাথে তিনি মোতাহের হোসেনকে একের পরে এক চিঠি লিখতে থাকেন, যার বর্ণে বর্ণে ছিলো ফজিলতুন্নেসার প্রতি তার আকুলতার কথা। কবির প্রেমের চিঠিগুলো কাজী মোতাহার হোসেন বন্ধুর হয়ে ফজিলাতুন্নেসাকে পৌঁছে দিতেন। এই চিঠিগুলোর একটি থেকে জানা যায় নজরুল তার “সঞ্চিতা” কাব্যসংকলনটি ফজিলতুন্নেসাকে উৎসর্গ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ফজিলতুন্নেসা অনুমতি দেননি। এটি পরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে উৎসর্গ করা হয়। শেষ পর্যন্ত ফজিলতুন্নেসা নজরুলকে একটি চিঠি লিখে তাকে আর চিঠি না লিখবার অনুরোধ করেন।
কলকাতা ফিরে গিয়ে নজরুল ফজিলতুন্নেসাকে একটি কাব্যিক চিঠি লেখেন। সেই কাব্যিক চিঠির নাম ছিল রহস্যময়ী’। পরে এই চিঠিটি ‘তুমি মোরে ভুলিয়াছ’ নামে প্রকাশিত হয়। ১৯২৮ সালে ফজিলতুন্নেসার বিলেত গমন উপলক্ষে ‘সওগাত’ কার্যালয়ে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে ফজিলতুন্নেসার উদ্দেশ্যে একটি গান পরিবেশন করেন-‘জাগিলে পারুল কিগো ‘সাত ভাই চম্পা’ ডাকে, উদিলে চন্দ্র-লেখা বাদলের মেঘের ফাঁকে। চলিলে সাগর ঘু’রে অলকার মায়ার পুরে,ফোটে ফুল নিত্য যেথায়জীবনের ফুল্ল-শাখে।
লন্ডনে পিএইচডি করাকালীন সময়ে ফজিলতুন্নেসার সাথে খান বাহাদুর আহসানউল্লাহ পুত্র শামসোদ্দোহার সাথে পরিচয় ঘটে এবং পরে প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁর তত্ত্বাবধানে ফজিলতুন্নেসা ও শামসোদ্দোহার বিয়ে হয়। বিয়ের খবর শুনে নজরুল লিখেছিলেন-
বাদল বায়ে মোর 
নিভিয়া গেছে বাতি।
তোমার ঘরে আজ 
উৎসবের রাতি।।
ফজিলতুন্নেসার প্রতি কবির ভালোবাসা বছর দু’য়েকের মতো ছিল। নজরুলের এই একপেশে গোপন  ভালোবাসার কথা কেউ জানতে পারতো না যদি না কাজী মোতাহের হোসেনকে লেখা নজরুলের সাতটি চিঠি পাওয়া না যেত। ফজিলতুন্নেসার কাছ থেকে কোন ধরণের সাড়া না পেয়ে নজরুল একাই নিরবে ভালোবেসে গেছেন।
ঢাকা কলেজের সেসময়কার প্রিন্সিপাল ছিলেন সুরেন্দ্রনাথ মৈত্র, তার মেয়ে উমা। উমা মৈত্র’র ডাক নাম ছিল নোটন। কবি তাকে গান শেখাতেন। গান শিখাতে গিয়ে নজরুল নোটনের প্রতি দূর্বল হয়ে পড়েছিলেন বলে অনেকের ধারণা। কেননা কবির বিরহী প্রেমে নার্গিস-ফজিলতুন্নেসার পাশাপাশি উমা মৈত্রের কথাও উঠে এসেছে। উমা মৈত্রের কথা কবি তার ‘শিউলিমালা’ গল্পটিতে বর্ণনা করেছেন। শিউলি মুলত উমা মৈত্রের কাল্পনিক চরিত্র।
 এ প্রসঙ্গে গল্পটিতে লিখা আছে-“শিউলি আমার কাছে গান শিখতে লাগল। কিছুদিন পরেই আমার তান ও গানের পুঁজি প্রায় শেষ হয়ে গেল। মনে হল আমার গান শেখা সার্থক হল। আমার কন্ঠের সকল সঞ্চয় রিক্ত করে তার কন্ঠে ঢেলে দিলাম। আমাদের মালা-বিনিময় হল না-হবেও না এ জীবনে কোন দিন- কিন্তু কন্ঠ বদল হয়ে গেল। আর মনের কথা সে শুধু মনই জানে। ওদের বাড়িতে ছিলাম। কত স্নেহ, কত যত্ম, কত আদর। অবাধ মেলা মেশা- সেখানে কোন নিষেধ, কোনো গ্লানি, কোন বাধা বিঘ্ন, কোন সন্দেহ ছিল না। আর এসব ছিল না বলেই বুঝি এতদিন ধরে এত কাছে থেকেও কারুর করে কর স্পর্শ-টুকুও লাগেনি কোনদিন। এই মুক্তিই ছিল আমাদের সবচেয়ে দুর্লঙ্ঘ্য বাধা। কেউ কারো মন যাচাই করিনি। কোন প্রশ্ন জিজ্ঞাসার কথাও উদয় হয়নি মনে। একজন অসীম আকাশ, একজন অতল সাগর। কোন কথা নেই-প্রশ্ন নেই, শুধু এ ওর চোখে, ও এর চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে আছে”।
লেখক- সাহিত্যিক কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ