ঢাকা, মঙ্গলবার 28 August 2018, ১৩ ভাদ্র ১৪২৫, ১৬ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আন্দোলনের সাত কাহন

মানসুরা রহমান : যুগে যুগে বিভিন্ন জাতি/ দল রাষ্ট্রের নানা রকম ইস্যু নিয়ে দলমত নির্বিশেষে আন্দোলনের ধারা বিদ্যমান। নানা বিষয়ে উঠে আসে নাগরিকদের ক্ষোভ। কথা হয় বিচার নিয়ে কিন্তু সেই বিচার যখন জাস্টিস হয়ে সবার সামনে আসে তখন তা চরম পর্যায়ে চলে যায়।
স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের আবির্ভাব  ঘটেছে বেশি দিন হয় নি। ’৪৭ এর দেশ ভাগ এর পর থেকেই এ দেশের জনগণ জাস্টিসের সাথে পরিচিত। এটি একটি ঐতিহাসিক এবং ঐতিহ্য বহুল শব্দ। যা আন্দোলনকে মহীরুহ রুপ দেয়।
গত ২৯ জুলাই  বিমানবন্দর রোডে দুই বাসের রেষারেষিতে রমিজ উদ্দিন কলেজের দুই শিক্ষার্থী ঘটনাস্থলে প্রাণ হারায়। বাকি ৫ জন হাসপাতালে। আহত হয়েছে ১৬ জনের মত।
এ দেশের সড়ক ব্যবস্থাপনার যা দশা তাতে হরহামেশাই এই ঘটনা ঘটে। এতে আরো বেশি ইন্ধন যোগায় কিছু বেপরোয়া অনভিজ্ঞ ড্রাইভার।
আমরা এই দূর্ঘটনার সাথে মানিয়ে গিয়েছি। কিন্তু বিপত্তি বাধে সাংবাদিক সম্মেলনে সদ্য এই দূর্ঘটনার কথা জানতে চাইলে মন্ত্রীর দাত কেলানো হাসি জাতিকে হতবিহবল করে দিয়েছে। উনি ভারতের ৩৩ জনের দূর্ঘটনার কথা উল্লেখ করে ভারতবাসীদের সহনশীলতার প্রশংসা করলেন। এ দেশের জনগণ কেনো এটা বুঝতেছেনা সেটা  নিয়ে ও মন্ত্রী মহদোয় বেজায় চিন্তিত। পরবর্তীতে তিনি তার হাসির জন্য মাফ চেয়ে নেন।এ মনকি ওনার হাসি যদি এতটাই সমস্যা সৃষ্টি করে তবে তিনি হাসিই বন্ধ করে দিবেন বলে হুমকি দেন। আরো বলেন-তিনি শ্রমিকদের নেতা হওয়া সত্ত্বেও  অপ্রস্তুত ছিলেন এই প্রশ্নের জন্য। কিন্তু ঠান্ডা মেজাজে ভারতের কথা উল্লেখ করা ওনার অপ্রস্তুতি প্রকাশ করেনি।
শুরু হয় রাগ  ক্ষোভ এবং জনপ্রতিনিধিদের উপর অভিমান। সেই থেকেই ছাত্র আন্দোলন শুরু হলো।
গোটা আন্দোলনে কিছু বিষয় স্পষ্ট-
আত্মনিয়োগ -অর্থনিয়োগ :
নানা ভাবে জাতির সামনে বারংবার প্রমাণিত হয়েছে যারা রাষ্ট্র বিনির্মাণের কাজে নিয়োজিত তারা রাষ্ট্র এর সেবা নেন নি। তাদের অসুস্থতায় বিদেশী চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং সন্তানদের পড়াশুনার জন্য অন্য দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাই উৎকৃষ্ট। তাই রাষ্টের কর্ণধারেরা দেশকে সমস্যাহীন করতে আত্মনিয়োগ এবং অর্থনিয়োগ কোনটাই করছেন না আন্তরিকতা দিয়ে। তার প্রমাণ মিলেছে আন্দোলনের সবটা সময় জুড়ে বড় বড় কর্তাদের উদ্ধত্যপূর্ণ উক্তি।
এমনকি রাষ্টের আইনকেও তোয়াক্কা করছেন না তার।
ছাত্রদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মন্ত্রী, এমপি, সচিব, পুলিশদের লাইসেন্সবিহীন গাড়ি।
দেশপ্রেমিক হওয়ার অন্যতম দিকই হলো দেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া।
রাজনৈতিক ইস্যুর ঘ্রাণ-
আন্দোলন রাজনীতির একটা সেক্টর। তাই বলে দেশের যেকোন আন্দোলনকে রাজনৈতিক ইস্যুতে চিন্তা করা ব্যর্থ সরকারের বৈশিষ্ট। জনগণের সাথে সরকারের সম্পর্ক কোন পর্যায় উপনীত হয়েছে তা এই কিশোর আন্দোলন দিয়েই জনসম্মুখে প্রমাণিত।
সাধারণদের আন্দোলনে খুজে খুঁজে তৃতীয় পক্ষের ঘ্রাণ নেয়া যোগ্য সরকারের কাজ নয়। তৃতীয় পক্ষ নিশ্চই এ দেশেরই নাগরিক। তবে তাতে ষড়যন্ত্রের কি আছে?
মিডিয়ার মেপে কথা
যেকোন দেশের সুশাসন  প্রতিষ্ঠায় প্রত্যক্ষ ভাবে  না হলেও পুর্ব শর্ত হিসেবে কাজ করে সে দেশের মিডিয়া। ঠিক অন্য দিকে একটা রাষ্ট্র তখনি স্বৈরাচারে পরিণত হয় যখন একপাক্ষিক কিবা স্বার্থের দিকে ঝুকে পরে। এত বিশাল  এই আন্দোলনে ন্যাক্কারজনক ভাবে সাংবাদিকদের উপর হামলা করা হলো যা ইতিহাসে বিরল। তবে আশ্চার্যের ব্যাপার হলো হামলাকারীদের পরিচয় জানা সত্ত্বেও  সন্ত্রাসী বলে উল্লেখ করা। টিভিতে লাইভ টেলিকাস্ট করার সময় সাংবাদিকদের হাত থেকে ক্যামেরা, মাইক্রোফোন নিয়ে গেলো। টিভি উপস্থাপক তখন বললেন কে বা কাহারা নিয়ে গেছেন।
এই যে, মিডিয়ার স্কেল-কম্পাস দিয়ে মাপ ঝোপ করা কথা এটা জাতির অশুভ ভবিষ্যতের ইঙ্গিত বহন করে।
কালো চশমাধারী জনগণ-সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক এখন প্রতিবাদের একটি মাধ্যম। মনের কথা প্রকাশ করার মাধ্যম। বাংলাদেশের চৌহদ্দি পার করে যখন বিশ্ব মিডিয়াও নাজেহাল বর্বর পরিস্থিতিতে কাতর হয়ে পরে। সেখানে আমাদের দেশের একশ্রেণীর জনগণ আমরা খুব ভালো আছি টাইপ বাতাস গায়ে জড়িয়ে কালো চশমা চোখে চলাফেরা করেন। এটা আমাদের দেশপ্রেমকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
আস্থার ষোলকলা অপুর্ণ —রাজনীতির মধ্য দিয়ে জনগনের নেতা হন বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিবর্গ। রাষ্টের সর্বোচ্চ নেতা থেকে ছোট নেতা ও জনগণের প্রতিনিধি। জনগণের নানা রকম চাহিদা প্রতিনিধিদের কাছে থাকে। তবে প্রতিশ্রুতি দেয়া কথা থেকে যখন রাষ্টের সর্বোচ্চ আসনধারীরা পিছু হটেন তখন জনগণের আস্থায় মাটি চাপা পরে বৈ কি”! তা যদি হয় দেশের সব জনগণকে স্বাক্ষী রেখে জাতীয় সংসদ থেকে।
ছাত্ররা এই বয়সে এতো বেপরোয়া কিভাবে হলেন এতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী পুত্র।
আমরা দেখেছি আস্থা অর্জনের জন্য রমিজ উদ্দিন কলেজ কে পাঁচটি বাস এবং নিহত দুই পরিবারে ২০ লাখ টাকা দিয়েছেন রাষ্ট্র। কথা হলো-এই তিন বছরে ১ হাজার ছাত্র সড়ক দূর্ঘটনায় প্রাণ দিয়েছে। তারা কোথায়???
এটা কোন সমাধান নয়।
সমস্যাকে শিকড় থেকে নির্মুলই হতে পারে সমাধান। জন্ম দিতে পারে আস্থার!!
বহির্বিশের প্রতিক্রিয়া—পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মত পার্থক্য থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। এ গোটা আন্দোলনে বহির্বিশ্বের প্রতিবাদের যে ধরন বিশ্ববাসীর সম্মুখে প্রকাশ পেয়েছে তা দুঃখজনক।
দেশের মিডিয়া যখন চুপ ছিলো বিবিসি থেকে শুরু করে আমেরিকা, আল জাজিরা ও সেখানে নিজেদের দায়িত্ববোধ এড়িয়ে যান নি। বিশ্ব মিডিয়ায় সাক্ষাৎকার দেয়ার ফলে অবিশ্বাস্য পরিস্থিতি ফেস করছেন সাংবাদিক। কুকুরের গলায় ঝুলতে দেখা গেছে রাষ্টের মুল ব্যাক্তি এবং উত্তরসূরীদের ছবি।
সরকার পতনের শ্লোগানে মুখরিত হতে দেখেছি আকাশ বাতাস।
আন্দোলনে কামিনীরা-
আন্দোলনে একজন নারীর আংশগ্রহণ কতটা বিপজ্জনক তা আমরা দেখলামই। এমন কোন আন্দোলন নেই যেখানে নারীকে হেনস্থা করা হয়নি। তাছাড়া ইসলাম নারীকে দেশপ্রেমে উজ্জিবীত করেনি তা নয়। সবার জন্যই দেশকে ভালোবাসা ঈমানের অংশ।
নারীর জন্য দেশপ্রেম সেটাই যেখানে নারী পুরুষকে মানসিক ভাবে সাপোর্ট দিয়ে আন্দোলনমুখি করে তোলবে। পরিবারের অন্যান্য সদস্য দের দেশের কল্যাণের জন্য সচেতন করবে। সশরীরে আন্দোলনে নারীর নেমে আসা তার নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি এবং ক্ষতিকর।
নারীদের শারীরিক অবকাঠামো, সক্ষমতা আন্দোলন উপযোগী করে গঠিত নয়। পুরুষদের তুলনায় অনেকাংশেই নারী দুর্বল।
কিন্তু তাই বলে একটা যৌক্তিক আন্দোলনে অংশ নিয়ে মায়ের জাতিকে এভাবে অপমানিত হতে হবে, তাও আবার জনসম্মুখে!!
সর্বোপরি, লাঠিপেটা, গ্রেফতার, রিমান্ড, গুম, খুন এসব কোন আন্দোলন দমানোর হাতিয়ার হতে পারে না।
সরাকারি আমলা মন্ত্রীদের কা-জ্ঞানহীন কথা বার্তা দেশের প্রতি  তাদের দায়িত্ববোধ কে খাটো করে ফেলে।
মতের অমিল হলেই তাকে শেষ করে ফেলতে হবে এটা আন্দোলন কিবা রাজনীতিরর ডেফিনেশন নয়, ইতিহাসে কখনোই এই ডেফিনেশন ছিলো না।
সরকারকে হতে হবে সহনশীল এবং জনগনের কল্যাণকামী। যেহেতু তাদের নির্বাচিত সরকার। সব আন্দোলনের জবাবই মারমুখি হয় না। এটা অসুস্থ সরকারের মানসিকতা।
আমরা অনুরোধ করবো আশা রাখবো  সরকার জনগণের ভাষা বুঝবেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ