ঢাকা, বুধবার 29 August 2018, ১৪ ভাদ্র ১৪২৫, ১৭ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

গ্রামগঞ্জ থেকে বিলুপ্তির পথে স্থপতি শিল্পী বাবুই পাখি ও তার শৈল্পিক বাসা

মুহাম্মদ নূরে আলম, ব্রাক্ষণবাড়িয়া থেকে : “বাবুই পাখিরে ডাকি বলিছে চড়াই, কুঁড়ে ঘরে থেকে কর শিল্পের বড়াই। আমি থাকি মহা সুখে অট্টালিকার পরে, তুমি কত কষ্ট পাও রোদ বৃষ্টি ঝড়ে”- কবি রজনীকান্ত সেনের কালজয়ী ছড়াটির নায়ক, আবহমান গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী নিপুণ বাসা তৈরির কারিগর বাবুই পাখি আজ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। মানুষকে মানবিকভাবে জাগ্রত করার জন্য কবি রজনীকান্ত সেন এ কবিতাটি রচনা করেন। তার এ কালজয়ী কবিতাটি এখনো মানুষের মুখে মুখে। বাবুই পাখিকে নিয়ে কবির ‘স্বাধীনতার সুখ’ কবিতাটি আজো মানুষ উদাহরণ হিসাবে ব্যবহার করলেও হারিয়ে যেতে বসেছে বাবুই পাখি ও বাবুই পাখির বাসা। বাবুই পাখির বাসা আজ অনেকটা স্মৃতির অন্তরালে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। অথচ আজ থেকে প্রায় ১৫/২০ বছর আগেও গ্রাম-গঞ্জে তাল, নারকেল ও সুপারি গাছে দেখা যেত বাবুই পাখির নিপুণ কারুকাজে তৈরি দৃষ্টিনন্দন বাসা। ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলায় আগের মত বাবুই পাখির দৃষ্টিনন্দন বাসা আজ আর তেমন চোখে পরে না। ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলার সবকটি উপজেলায় গ্রামগঞ্জের আনাচে-কানাচে তালগাছের পাতায় পাতায় একসময় দেখা যেত বাবুই পাখির দৃষ্টিনন্দন বাসা। কিন্তু এখন আর আগের মতো বাবুই পাখির বাসা চোখে পড়ে না। গত কয়েক দিন ধরে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ঘুরে এমনই চিত্র দেখা যায়।
কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে আবহমান গ্রাম-বাংলার সেই চিরচেনা ঐতিহ্যবাহী নিপুণ বাসা তৈরির কারিগর বাবুই পাখি ও তার বাসা। খড়ের ফানি, ধানের পাতা, তালের কচিপাতা, ঝাউ ও কাশবনের লতাপাতা দিয়ে উঁচু তাল গাছে চমৎকার আকৃতির বাসা তৈরি করত বাবুই পাখিরা। একমাত্র বাবুই পাখি ছাড়া আর কারো পক্ষেই যেন সেই বাসা তৈরি করা অসম্ভব। পুরুষ বাবুইতো রীতিমতো আদর্শ প্রেমিক। কারণ তার সঙ্গীর মন জয় করতেই কঠোর পরিশ্রম করে মনের মাধুরী মিশিয়ে তিলে তিলে সে নির্মাণ করে এক একটি বাসা। দৃষ্টিনন্দন সেই বাসা বাতাসে নাগরদোলার মতো দোল খেতো। বাবুই পাখির বাসা যেমন দৃষ্টিনন্দন তেমনি মজবুত। শক্ত বুননের এ বাসাটি সহজে টেনে ছেঁড়া খুব কঠিন। বাতাস কিংবা ঝড়ো হাওয়াতেও টিকে থাকতো সেই বাসা। সেই নিপুন বাসা তৈরির কারিগর বাবুই পাখি আজ খুব একটা দেখা যায় না।
বাবুই পাখির বাসা যেমন দৃষ্টিনন্দন তেমনি মজবুত। প্রবল ঝড়ে বাতাসে টিকে থাকে তাদের বাসা। বাবুই পাখির শক্ত বুননের এ বাসা টেনেও ছেঁড়া কঠিন। বাবুই পাখি একাধারে শিল্পী, স্থপতি ও সামাজিক বন্ধনের প্রতিচ্ছবি। এরা এক বাসা থেকে আর এক বাসায় যায় পছন্দের সঙ্গি খুঁজতে। সঙ্গি পছন্দ হলে স্ত্রী বাবুই পাখিকে সাথী বানানোর জন্য কত কিছুই না করে। পুরুষ বাবুই নিজের প্রতি আকর্ষণ করার জন্য খাল-বিল ও ডোবায় গোসল সেরে ফুর্তিতে নেচে নেচে বেড়ায় গাছের ডালে ডালে। এরপর উঁচু তাল গাছ, নারিকেল গাছ বা সুপারি গাছের ডালে বাসা তৈরির কাজ শুরু করে। বাসা তৈরির অর্ধেক কাজ হলে কাক্সিক্ষত স্ত্রী বাবুইকে ডেকে দেখায়।
বাসা পছন্দ হলেই কেবল পুরো কাজ শেষ করে। বাসা পছন্দ না হলে অর্ধেক কাজ করেই নতুন করে আরেকটি বাসা তৈরির কাজ শুরু করে। অর্ধেক বাসা তৈরি করতে সময় লাগে ৫/৬ দিন। স্ত্রী বাবুই পাখির বাসা পছন্দ হলে বাকিটা শেষ করতে সময় লাগে ৪ দিন। কেন না তখন পুরুষ বাবুই মহাআনন্দে বিরামহীনভাবে কাজ করে। স্ত্রী বাবুই পাখির প্রেরণা পেয়ে পুরুষ বাবুই খুবই শিল্পসম্মত নিপুণভাবে বাসা তৈরি করে। স্ত্রী বাবুই ডিম দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুরুষ বাবুই খুঁজতে থাকে আরেক সঙ্গীকে।
পুরুষ বাবুই এক মওসুমে ৬টি পর্যন্ত বাসা তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ এরা ঘর-সংসার করতে পারে ৬ সীঙ্গর সঙ্গে। তাতে স্ত্রী বাবুয়ের না নেই। প্রজন্ম প্রক্রিয়ায় স্ত্রী বাবুই ডিমে তা দেয়ার ২ সপ্তাহের মধ্যেই বাচ্চা ফুটে। ৩ সপ্তাহ পর বাবুই বাচ্চা বাসা ছেড়ে উড়ে যায়। বাবুই পাখির প্রজন্ম সময় হলো ধান ঘরে ওঠার মওসুম। স্ত্রী বাবুই দুধধান সংগ্রহ করে এনে বাচ্চাদের খাওয়ায়। বাবুই পাখি তাল গাছে বাসা বাঁধে বেশী। বাবুই পাখি সারাবিশ্বে ১১৭ প্রকার। তবে বাংলাদেশে ৩ প্রজাতির বাবুই পাখির বাসা দেখা যায়। বাবুই পাখির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো রাতের বেলায় ঘর আলোকিত করতে জোনাকি পোকা ধরে নিয়ে বাসায় রাখে এবং সকাল হলে ছেড়ে দেয়। প্রজনন সময় ছাড়া অন্য সময় পুরুষ ও স্ত্রী বাবুই পাখির গায়ে কালো কালো দাগসহ পিঠ হয় তামাটে বর্ণের। নিচের দিকে কোন দাগ থাকে না। ঠোঁট পুরো মোসাকার ও লেজ চৌকা। তবে প্রজনন ঋতুতে পুরুষ পাখির রং হয় গাঢ় বাদামি। বুকের ওপরের দিকটা হয় ফ্যাকাসে; অন্য সময় পুরুষ ও স্ত্রী বাবুই পাখির চাঁদি পিঠের পালকের মতই বাদামি হয়। বুকের কালো ডোরা ততটা স্পষ্ট নয়।
বাবুই পাখির সম্পর্কে নারায়ণপুর মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা রফিকুল ইসলাম বলেন, জীব-বৈচিত্র্য রক্ষা করা আমাদের প্রিয় নবী সা: এর পবিত্র সুন্নাত। এদিকে যেমন হারিয়ে যেতে বসেছে বাবুই পাখি, অন্যদিকে বিলুপ্ত হচ্ছে বাবুই পাখির দৃষ্টিনন্দন বাসা। অবাধে শিকারও হচ্ছে এসব বাবুই পাখি। গ্রামাঞ্চলে বাবুই পাখির আবাসস্থল হিসেবে ব্যবহ্যত বিভিন্ন গাছ ক্রমাগত কেটে ফেলা, জমিতে কীটনাশক ব্যবহার এবং প্রকৃতি ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি অনেক শিকারি বাসস্থল থেকে ধরে নিয়ে যাওয়ায় কমছে বাবুই পাখি। অপরদিকে আবহমান বাংলার ঐতিহ্যে লালিত বাবুই পাখিদের টিকিয়ে রাখার জন্য তাদের অভয়াশ্রম তৈরীসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া উচিত বলে জানান স্থানীয়রা।
স্থানীয় অধিবাসীদের অভিযোগ, তালগাছ ও বাবুই পাখি হারিয়ে যাওয়ার পিছনে জড়িত রয়েছে একশ্রেণীর অর্থলোভী মানুষ। যারা নির্বিচারে কেটে ফেলছে তালগাছ। তালগাছ কেটে ফেলায় এলাকার হাটবাজারে আগের মত তালও আর পাওয়া যায় না। যার দৃশ্য দেখা যেত ভোর সকালে তালগাছ তলায় গেলে।
তালগাছ নিয়ে কথা বলছিলাম স্থানীয় কিছু মুরুব্বির সাথে। এসময় তারা দুঃখ-প্রকাশ করে বললেন, নির্বিচারে তালগাছ কেটে ফেলার কারণে এলাকার হাটবাজারগুলোতে আগের মত তাল পাওয়া যায় না। হাটবাজারে আগের মত তাল না পাওয়ার ফলে মওসুমী তালপিঠাসহ আরো কতো কিছু থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা জানান। এসব আলাপচারিতার মাঝেই ক’জন মুরুব্বি এগিয়ে এসে বলেন, এ বছর দেখছি উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বিভিন্ন রাস্তার পাশে তালের চারা লাগানোর কথা থাকলেও তা এখনও লাগানো হয়নি। যেটা অতীতে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে উঠেছে বিভিন্ন বন বাদাড়ে। তেমন ক্ষতিও করত না তখন তালগাছগুলো। যেটা বর্তমান বিভিন্ন জ্বালানির জন্য চলে গেছে ইট ভাটাসহ বিভিন্ন জ্বালানি খাতে। সামান্য অর্থের লোভে বন বাদাড় উজাড় হয়েছে। তবে প্রশাসনের উদ্যোগে তালের চারা রোপই করা হলে আবারও বাবুই পাখি দেখা যাবে বলে আশা করা যায়।
বাংলা পিডিয়া সূত্রে জানা যায়, বাবুই পাখি (Weaver bird)  Passeriformes বর্গের Passeridae গোত্রের চড়ুই সদৃশ পাখি। চমৎকার বুনটের ঝুড়ির মতো বাসা তৈরির জন্য পাখিটি সুপরিচিত। এজন্য বাবুই পাখিকে অনেকে তাঁতী পাখিও বলে। ঝুলন্ত বাসার প্রবেশের সুড়ঙ্গপথ বেশ আঁকাবাঁকা। পৃথিবীতে বাবুই প্রজাতির সংখ্যা ১১৭।
বাংলাদেশে আছে তিন প্রজাতির বাবুই পাখি: বাবুই/বাওই (Baya Weaver (Ploceus philippinus): প্রজনন ঋতু ছাড়া অন্য সময় পুরুষ ও স্ত্রী পাখির কালো কালো দাগসহ পিঠ হয় তামাটে বর্ণের, নিচের দিকে দাগ নেই, শুধুই তামাটে। ঠোঁট পুরু, মোচাকার; লেজ চৌকা, প্রজনন ঋতুতে পুরুষ পাখির পিঠ হয় গাঢ় বাদামি। হলুদ বুকের উপরের দিক ফ্যাকাশে। দেশের সর্বত্র বিস্তৃত। Black-breasted Weaver (Ploceus benghalensis):  প্রজনন ঋতুতে পুরুষ পাখির মাথার চাঁদি উজ্জ্বল সোনালি-হলুদ, গলা সাদা এবং তা একটি কালো ডোরা দ্বারা নিচের তামাটে-সাদা রঙের অংশ থেকে পৃথক। অন্য সময় স্ত্রী ও পুরুষ পাখির চাঁদি পিঠের পালকের মতোই বাদামি।
বুকের কালো ডোরা ততটা স্পষ্ট নয়। প্রকট ভ্রূরেখা, কানের পেছনে একটি ফোঁটা। এরা দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বিস্তৃত। Streaked Weaver (Ploceus manyar): বুক তামাটে, তাতে স্পষ্ট দাগ। প্রজনন ঋতুতে পুরুষ পাখির মাথার চাঁদি হলুদ, স্ত্রী পাখি ও পুরুষ পাখিতে তা অন্য ঋতুতে বাদামি। এরা দেশের সর্বত্র বিস্তৃত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ