ঢাকা, বুধবার 29 August 2018, ১৪ ভাদ্র ১৪২৫, ১৭ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

চৌগাছায় পুলিশের গুলীতে পা হারানো ইস্রাফিল ও রুহুল আমিন অপেক্ষার প্রহর গোনে সোনালী দিনের

চৌগাছা (যশোর) সংবাদদাতা: যশোরের চৌগাছা উপজেলার উদীয়মান দুই তরুণের নাম ইস্রাফিল হোসেন আর রুহুল আমিন। ইনসাফ আর ন্যায়ভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের দুই অকুতোভয় সৈনিক। নতুন নতুন স্বপ্ন দেখে নিজের জন্মভূমি আর সমাজ নিয়ে। সারাদিন কেটে যায় দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে তুরুণদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে ঘুরতে। আর অপেক্ষার প্রহর গোনে কখন আসবে সেই হেরার আলো। রুহল আমিন উপজেলার ঐতিহ্যবাহি নারায়ণপুর গ্রামের ইমদাদুল হকের ছেলে। আর ইস্রাফিল একই উপজেলার চুটারহুদা গ্রামের আব্দুর রহমানের ছোট ছেলে। দুইজনই যশোর এমএম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের সম্মান শ্রেণির ছাত্র। রুহল আমিন পড়তো বাণিজ্য বিভাগের ব্যবস্থাপনা বিষয়ে আর ইস্রাফিল ছিল অর্থনীতি বিষয়ের ছাত্র। রুহুল আমিন ২০১৩ সালে নারায়ণপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে জিপিএ- ৪.৩১ পেয়ে এ গ্রেডে এসএসসি পাশ করে, পরবর্তীতে ২০১৫ সালে এবিসিডি কলেজ থেকে জিপিএ- ৪.৬৭ পেয়ে এ গ্রেডে এইচএসসি পাশ করে। এরপর যশোর এমএম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সন্মান শ্রেণিতে ভর্তি হয়। ইস্রাফিল ২০১৩ সালে খড়িঞ্চা দাখিল মাদরাসা থেকে জিপিএ - ৪.৬৯ পেয়ে এ গ্রেডে দাখিল পাশ করে। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে কাটগড়া কলেজ থেকে জিপিএ - ৪.৪২ পেয়ে এ গ্রেডে এইচএসসি পাশ করে। এরপর যশোর এমএম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে অর্থনীতি বিষয়ে সন্মান শ্রেণিতে ভর্তি হয়। এমএম কলেজে পড়ার সময় দুইজনের পরিচয় একসময় বন্ধুত্বে পরিনত হয়। লেখাপড়ার সাথে সাথে ছাত্রদের মাঝে দ্বীনের দাওয়াত পৌছানোর কাজে ব্যস্ত থাকে দুই বন্ধু। দুই বন্ধুর সাথে এ প্রতিবেদকের সাক্ষাৎ হলে তারা জানান সেই বিভীষিকাময় রাতের লোমহর্ষক কাহিনী আর পুলিশের সাজানো নাটক। কিভাবে দুইজন নীরিহ ছাত্র রাতারাতি হয়ে যায় পুলিশের উপর হামলাকারী অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী। তারা জানান সেদিন ছিল ২০১৬ সালের ৩ আগস্ট কাজ শেষে দুই বন্ধু এক মটরসাইকেল যোগে নারায়ণপুর রুহুল আমিনের বাড়িতে যাচ্ছিল। তারা বন্দুলীতলা শফি মল্লিকের ইট ভাটার নিকট পৌঁছালে চৌগাছা থানার পুলিশ তাদেরকে আটক করে। ঐ রাতে তাদেরকে থানার হাজতখানায় রাখে। ৪ আগস্ট সকালে চৌগাছায় কর্মরত দুইজন সংবাদকর্মী পেশাগত কাজে থানায় গেলে তাদের সাথে এদের সাক্ষাৎও হয়। এরপর নারায়ণপুর গ্রামের বেশ কয়েকজন আওয়ামীলাগের কর্মিও থানা হাজতে তাদের সাথে সাক্ষাৎ করে তাদেরকে সকালের নাস্তা খেতে দেয়। এরপর বেলা ১২ টার দিকে তাদেরকে যশোর ডিবি পুলিশের কার্যালয়ে  জিজ্ঞাবাদের জন্য নিয়ে যায়। সেখানে একজন এসআই তাদেরকে নাম ঠিকানাসহ দুইএকটি কথা জিজ্ঞেস করে। এরপর সন্ধ্যার দিকে চৌগাছা থানার একজন এসআই তাদেরকে নিয়ে চৌগাছা থানার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। পথিমধ্যে কয়ারপাড়া নামক স্থানে পৌঁছিয়ে তাদেরকে চোখ বেঁধে হাত পিছনে দিয়ে হ্যান্ডকাপ লাগিয়ে দেয়। এরপর তাদেরকে নিয়ে পুলিশের জীপ ছুটে চলে চৌগাছা মহেশপুর সড়ক ধরে পশ্চিম দিকে। এরপর রাত গভীর হলে নির্জন মাঠের মধ্যে নিয়ে গিয়ে দুইজনকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে দেয়। তখন আমরা মনে করি আমাদেরকে গুলী করে হত্যা করবে। কিন্তু যখন হাঁটুতে রাইফেলের নলের স্পর্শ পাই তখন মনে হয় তারা আমাদের পায়ে গুলী করবে। মুহুর্তের মধ্যে গর্জে ওঠে দুটি রাইফেল আর সাথে সাথে মনে হলো পা উড়ে গেছে। পুলিশ চোখের গামছা খুলে হাটুতে বেঁধে দেয়। তারপর প্রথমে চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেখানে চৌগাছা থানার একজন এসআই এমন ভাবে নাম ঠিকানা জিজ্ঞেস করছিল তাতে মনে হলো তিনি আমাদেরকে প্রথম দেখছেন অথচ ৩ আগস্ট তারিখ থেকেই তিনি আমাদের সাথেই ছিলেন। এরপর ঐ রাতেই  আমাদেরকে  যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে ভর্তি করে। পরদিন সকালে আমরা জানতে পারি পুলিশের সাথে আমাদের বন্দুক যুদ্ধ হয়েছে তাতে পুলিশও আহত হয়েছে আর আমাদের হাটুতে গুলী লেগেছে। টিভিসহ বিভিন্ন মিডিয়ায় ব্রেকিং নিউজ আসছে। দুইদিন চিকিৎসা দেওয়ার পর কোন উন্নতি না হওয়ায় আমাদেরকে ঢাকার একটি বেসরকারী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ভর্তি হওয়ার সাত দিনের মধ্যে আমাদের পায়ে পচন ধরলে চিকিৎসকরা আমাদের দুজনের একটি করে পা কেটে ফেলে। পা কেটে ফেলার সাথে সাথে জীবনের সব স্বপ্ন যেন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল। সেখানে পুলিশ পাহারায় প্রায় দুই মাস চিকিৎসা চলে আমাদের। এরপর পুলিশের উপর হামলার অপরাধে আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা দিয়ে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পেয়ে বাহিরে আসি। কথা বলতে বলতে বার বার আবেগ আপ্লুত হয়ে চোখ মুছতে থাকে তরুই দুই মুজাহিদ। তারা বলতে থাকে এদেশে যারা সন্ত্রাসের রাজনীতি চালু করে তারা সবাই নিরাপদ আছে। যারা সমাজতন্ত্র কায়েমের নামে এদেশের হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছে তারা দেশপ্রেমিক আর আমরা যারা মানুষকে আল্লাহর দ্বীনের দিকে ডাকি তারা হয়ে গেলাম সন্ত্রাসী। এরপর আবেগ আপ্লুত হয়ে তারা জানায় এখনো স্বপ্নগুলোকে ক্রাচে ভর দিয়ে বয়ে নিয়ে বেড়াই। আর অপেক্ষার প্রহর গুনতে থাকি কবে আসবে সেই সোনালী দিন....।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ