ঢাকা, বুধবার 29 August 2018, ১৪ ভাদ্র ১৪২৫, ১৭ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

পরিচালনা পর্ষদের অযাচিত হস্তক্ষেপে লোকসানে বিপর্যস্ত রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংক

সংগ্রাম রিপোর্ট : ২০০৯ সালের আগে সরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো ব্যাংক ছিল বেসিক ব্যাংক। বর্তমানে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বেসিক ব্যাংক ঋণ কেলেঙ্কারিতে ধুঁকছে। ব্যাংটির সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর সময়ের দুর্নীতি আর অনিয়মের কারণে ব্যাপক সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আগের পর্ষদ ভেঙে নতুন করে পুনর্গঠন হলেও অবস্থার উন্নতি হয়নি আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির। আবারও পরিচালনা পর্ষদের অযাচিত হস্তক্ষেপে লোকসানে বিপর্যস্ত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এ ব্যাংকটি। বাড়ছে খেলাপি ঋণের পরিমাণও। সম্প্রতি এমডির পদত্যাগে সঙ্কট আরও ঘনিভূত হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মুহাম্মদ আউয়াল খানের পদত্যাগে বেসিক ব্যাংক নতুন করে সঙ্কটে পড়বে না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মুহাম্মদ আউয়াল খানের পদত্যাগের ঘটনায় ফের অস্থিরতা শুরু হয়েছে। ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের প্রভাবশালী সদস্যরা ব্যাংক ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অযাচিত হস্তক্ষেপ করছেন সে বিষয়টি সামনে চলে আসলো। ফলে ব্যাংকটির প্রতি নতুন করে গ্রাহকদের আস্থার সঙ্কট তৈরি হবে। 
জানা গেছে, ব্যাংকটিতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। দিনদিন বাড়ছে লোকসানের পরিমাণ। কোনো সূচকেরই উন্নতি হয়নি। এরমধ্যে নতুন করে শুরু হয়েছে ঋণ অনুমোদন এবং ঋণ পুনঃতফসিলের লবিং। এনিয়ে পর্ষদ সদস্যদের সঙ্গে এমডির (ব্যবস্থাপনা পরিচালক) বনিবনা হচ্ছিল না। ব্যাংক পর্ষদের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত যোগদানের ১০ মাসের মাথায় এমডি আউয়াল খান পদত্যাগ করলেন বলে মন্তব্য করেছেন আর্থিক খাত বিশেষজ্ঞরা।
ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঋণ অনুমোদন এবং কিছু ঋণ পুনঃতফসিলের মতো ব্যাংক ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পেরে তিনি পদত্যাগ করেছেন। আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, সুদহার কমে যাওয়া, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কারণে চলতি বছর বেসিক ব্যাংক ৮০-৯০ কোটি টাকা লোকসান করবে- এমন পরিস্থিতি বুঝেই সমালোচনা এড়াতে আগেই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন তিনি।
সরকারি খাতের সবচেয়ে ভালো এ ব্যাংকটির ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ছিলেন শেখ আবদুল হাই বাচ্চু। সিএজির প্রতিবেদনে ঋণ বিতরণে অনিয়মের জন্য তৎকালীন চেয়ারম্যানসহ পর্ষদকে দায়ী করা হয়। বেসিক ব্যাংকের ঋণ বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম খুঁজে পায় কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল বা সিএজি কার্যালয়। রাষ্ট্রের সাংবিধানিক এ সংস্থাটি বলেছে, ব্যাংকটি যে প্রক্রিয়ায় ঋণ অনুমোদন দিয়েছে তা বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে নজিরবিহীন। কোনো রকম বাছ-বিচার ছাড়াই স্বেচ্ছাচারীভাবে যাকে খুশি তাকে ঋণ দেয়া হয়েছে। যে কারণে এক সময়ের সবচেয়ে লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত এই ব্যাংকটি লোকসানে পড়েছে। যার বিরূপ প্রভাবে বেসিক ব্যাংক বর্তমানে গভীর সংকটে। সিএজির এই প্রতিবেদনে মোট ৫ হাজার ৩৯৯ কোটি  টাকার গুরুতর অনিয়ম উঠে এসেছে। এতে অবৈধ ঋণ প্রস্তাব অনুমোদনের ক্ষেত্রে ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুর সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। এদিকে ক্রাউন প্রোপার্টিজ নামে এক কোম্পানির স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের হিসাবে ৮ কোটি টাকা জমা হয় ডেল্টা সিস্টেমসের হিসাব থেকে। এই ক্রাউন প্রোপার্টিজের মালিক আবদুল হাই বাচ্চুর আপন ছোট ভাই শেখ শাহরিয়ার পান্না।
২০০৮ সালের ডিসেম্বরে বেসিক ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল দুই হাজার ৭০০ কোটি টাকা। ২০০৯ সালে শেখ আবদুল হাই বাচ্চু চেয়ারম্যান হওয়ার পর ২০১৩ সালের মার্চ পর্যন্ত ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা। ওই সময়ে ব্যাংকটি ছয় হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা ঋণ দেয়, যার প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকাই নিয়ম ভেঙে দেয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানে ঋণ বিতরণে অনিয়মের বিষয়টি ধরা পড়ার পর প্রথমে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ফখরুল ইসলামকে অপসারণ করা হয়। ২০১৪ সালের ২৯ মে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর ৪ জুলাই অর্থমন্ত্রীর বাসায় গিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেন শেখ আবদুল হাই বাচ্চু।
পরে বেসিক ব্যাংকের অনিয়ম নিয়ে তদন্ত শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সর্বমোট ৫৬টি মামলা করে দুদক। যদিও ওইসব মামলায় বাচ্চুকে আসামি করা হয়নি। পরে আদালতের নির্দেশে বাচ্চুর বিষয়ে নতুন করে তদন্ত শুরু করে দুদক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ বছরে বেসিক ব্যাংকের লোকসান হয়েছে, ২ হাজার ৬৫৪ কোটি টাকা। শুধু তাই নয়, ব্যাংকটির ৬৮টি শাখার মধ্যে ২১টিই লোকসান গুনছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর আমলের চার বছরে বেসিক ব্যাংক থেকে ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বের করে নেওয়া হয়। বর্তমানে ব্যাংকটির ৫৯ দশমিক ২২ শতাংশই খেলাপি ঋণ। ব্যাংকটির এখন মোট খেলাপি ঋণ ৮ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা। বেসিক ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুসহ তখনকার ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বেনামে প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করে। এটাকে দিবালোকে ডাকাতি বলে উল্লেখ করেছেন অর্থমন্ত্রী।
গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন। ব্যাংকটিতে এমনিতেই সমস্যা রয়েছে এর মধ্যে এমডির পদত্যাগে একটা নেগেটিভ বার্তা আসছে কি-না জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, না পদত্যাগের জন্য ব্যাংকটির কোনো সমস্যা হবে না। পদত্যাগের বিষয়টি অপ্রাসঙ্গিক। এতে আমি মোটেও বিচলিত নই।
শোনা যাচ্ছে চেয়ারম্যান- এমডির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণেই তিনি পদত্যাগ করেছেন এমন প্রশ্নে মুহিত বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। আমি চেয়ারম্যানকে কিছু জিজ্ঞাসাও করিনি। এমডির পদত্যাগের বিষয়টি খবরের কাগজ থেকেই জেনেছি। এর চেয়ে বেশি কিছু জানি না।
বেসিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মুহাম্মদ আউয়াল খান গত ১৪ আগস্ট পদত্যাগ করেন। তিনি শারীরিক অসুস্থতা ও ব্যক্তিগত বিষয়ের কথা উল্লেখ করে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন এ মজিদের কাছে তার পদত্যাগপত্র জমা দেন। যোগদানের ১০ মাসের মাথায় পদত্যাগ করেন তিনি। পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করে ব্যাংকের চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন এ মজিদ বলেন, এমডির পদত্যাগপত্র পেয়েছি। বিষয়টি ৩০ আগস্ট পরিচালনা পর্ষদের সভায় উপস্থাপন করা হবে। আলাউদ্দিন এ মজিদকে চেয়ারম্যান এবং খোন্দকার মো. ইকবালকে এমডি করে নতুন পর্ষদ গঠন করা হয়েছিল। এমডি খোন্দকার মো. ইকবালের মেয়াদ শেষ হয় ২০১৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর। পরে ২৩ অক্টোবর আউয়াল খানকে এমডি পদে নিয়োগ দেয়া হয়।
উল্লেখ্য, মুহাম্মদ আউয়াল খান ২০১৭ সালের ১ নবেম্বর বেসিক ব্যাংকে এমডি হিসেবে যোগ দেন। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ তাকে তিন বছরের জন্য এ পদে তাকে নিয়োগ দেয়। তার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৯ সালের ১ নবেম্বর।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ