ঢাকা, বুধবার 29 August 2018, ১৪ ভাদ্র ১৪২৫, ১৭ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বাস চালকের নিষ্ঠুরতা

সড়ক দুর্ঘটনার আড়ালে আরো একটি হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে চট্টগ্রামের এক বাস চালক। গত সোমবার প্রকাশ্য দিবালোকে এবং শত শত মানুষের সামনে রেজাউল করিম নামের ৩৫ বছর বয়স্ক এক যাত্রীকে বাসের চাকায় পিষ্ট করে হত্যা করেছে ওই চালক। প্রত্যক্ষদর্শীদের উদ্ধৃত করে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, সীতাকুন্ডের ভাটিয়ারী থেকে জিইসি পর্যন্ত চলাচলকারী লুসাই পরিবহন লিমিটেডের বাসটিতে চড়ে নিহত রেজাউল সিটি গেট এলাকায় ফিরছিলেন। পথে ভাড়া নিয়ে বাসের হেল্পারের সঙ্গে তার ঝগড়া হয়। বিষয়টি সম্পর্কে পরিচিত একজনকে মোবাইল ফোনে জানিয়েছিলেন রেজাউল। এর ঠিক পাঁচ মিনিট পরই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের গ্ল্যাক্সো অফিসের সামনে হঠাৎ তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় হেল্পার। যাত্রীদের চিৎকার ও অনুরোধে কান না দিয়ে চালক প্রথমে বাসটিকে পিছিয়ে আনে এবং তারপর সোজা রেজাউলের শরীরের ওপর দিয়ে বাস চালিয়ে দেয়। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে মৃত্যু ঘটে ওই যাত্রীর। ঘটনার আকস্মিকতায় স্তম্ভিত যাত্রীরা প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠলে চালক এবং তার হেল্পার বাস থামিয়ে মুহূর্তের মধ্যে পালিয়ে যায়। যাত্রীদের অনেকে ধাওয়া করলেও দু’জনের কাউকেই আটক করা সম্ভব হয়নি। যাত্রী হত্যার এ ঘটনার প্রতিবাদে সাধারণ মানুষ ওই সড়ক অবরোধ করেছে। অন্যদিকে নিহত রেজাউলের পরিবার সদস্যরা শোকে ভেঙে পড়েছেন।
উল্লেখ্য, ধাক্কা দিয়ে ফেলার এবং হত্যা করার এটাই প্রথম ঘটনা নয়। মাত্র মাস খানেক আগে, গত ২১ জুলাই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কেরই গজারিয়া এলাকায় বাস থেকে ফেলে হত্যা করা হয়েছিল ঢাকার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সাইদুরকে। তার বাড়ি চট্টগ্রামের হালিশহরে। এর পরদিন ধাক্কা দেয়ার প্রতিবাদ করায় চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট এলাকায় এক ট্রাক চালক একজন বেকারি শ্রমিককে ইচ্ছাকৃতভাবে চাপা দিয়ে হত্যা করেছে। কিন্তু তারও কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, এভাবেই সড়ক-মহাসড়কে মৃত্যুর তথা হত্যাকান্ডের ঘটনা বেড়ে চলেছে। সোমবার নিহত সাতজনসহ মঙ্গলবার পর্যন্ত বিগত ৫৫০ দিনে মারা গেছে চার হাজার ৯৮৩ জন। দুর্ঘটনাকে দৃশ্যমান কারণ বলা হলেও অনেক ক্ষেত্রেই চালক ও হেল্পাররা প্রথমে ধাক্কা দিয়ে ফেলে এবং তারপর গাড়ি চাপা দিয়ে যাত্রীদের হত্যা করেছে। প্রতিবাদ জানানোর কারণে অনেক পথচারীর ওপর দিয়েও গাড়ি উঠিয়ে দিয়েছে চালকেরা।
বলার অপেক্ষা রাখে না, চট্টগ্রামে রেজাউল নামের বাসযাত্রীকে যে নিষ্ঠুরতার সঙ্গে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করা হয়েছে তা সকল বিচারেই ক্ষমার অযোগ্য। দুর্ঘটনার পাশাপাশি ইচ্ছাকৃত হত্যাকান্ড বেড়ে চলার কারণে শুধু নয়, অন্য একটি বিশেষ কারণেও আমরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ না করে পারি না। সে কারণটি হলো, গত ২৯ জুলাই কুর্মিটোলায় একজন ছাত্র ও একজন ছাত্রীকে বাস চাপা দিয়ে হত্যার প্রতিবাদে রাজধানীসহ সারাদেশে গড়ে ওঠা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে আশা করা হয়েছিল, একদিকে চালকরা যথেষ্ট সতর্ক ও মানবিক হবে, অন্যদিকে সরকারও নেবে কঠোর ব্যবস্থা। ফলে দুর্ঘটনা এবং হত্যাকান্ড অনেক কমে যাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, দুটি আশার কোনোটিই বাস্তবে পূরণ হয়নি। শুধু তা-ই নয়, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর চালকরা বরং আরো বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলেই মনে হচ্ছে। উচিত যখন ছিল শিক্ষার্থীদের দাবি ও আহ্বানের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব দেখানো, বিশেষ মহলের ইন্ধনে চালকরা তখন হঠাৎ ধর্মঘট করে বসেছে। তিনদিনের সে ধর্মঘটে শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষের কষ্ট ও ভোগান্তি সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এরপর এসেছে সরকারের পালা। সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে সরকার এমন একটি আইন তৈরি করেছে, যাকে চালকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে প্রণীত বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এর কারণ, শিক্ষার্থীদের উপস্থাপিত নয় দফার প্রথম দফাতেই দুর্ঘটনার মাধ্যমে হত্যার জন্য চালকের মৃত্যুদন্ডের বিধান করার দাবি জানানো হয়েছিল। অন্যদিকে সরকার বিধান করেছে মাত্র পাঁচ বছরের কারাদন্ড দেয়ার। আইনটিতে আরো বলা হয়েছে, মৃত্যুদন্ডের বিধান প্রযোজ্য হবে শুধু সেই সব ক্ষেত্রে, যেগুলোতে চালক ‘ইচ্ছাকৃতভাবে’ কাউকে হত্যা করবে।
সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠেছে, কোনো দুর্ঘটনা ‘ইচ্ছাকৃত’ কি না তা কিভাবে প্রমাণ করা যাবে? কারণ, আমাদের দেশে ওকালতির মারপ্যাঁচ বলে একটি বহুবার প্রমাণিত প্রবাদবাক্য রয়েছে। নিজের মক্কেল চালককে বাঁচানোর জন্য আইনজীবীরা অবশ্যই প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীসহ নানা ধরনের তথ্য-প্রমাণ চেয়ে বসবেন। একযোগে চলবে পুলিশকে ঘুষ দেয়াসহ টাকা ছড়ানোর এবং সাক্ষীদের ভয়-ভীতি দেখানোর তৎপরতা। এসব কারণে খুব কম ক্ষেত্রেই ‘ইচ্ছাকৃত’ হত্যার অভিযোগ প্রমাণ করা সম্ভব হবে। সুতরাং ‘ইচ্ছাকৃতভাবে’ কাউকে হত্যা করলেও আইনের ফাঁক গলিয়ে পার পেয়ে যাবে ঘাতক চালকরা।
মৃত্যুদন্ডের বিধান না থাকার কারণে শুধু নয়, সার্বিক মূল্যায়নেও নতুন আইনটিকে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধের জন্য মোটেও ফলপ্রসূ বলে মনে করা হয়নি। সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষ এ কথাও বলেছেন, মাত্র পাঁচ বছরের কারাদন্ড সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়ায় চালকরা বরং ক্রমাগত আরো বেপরোয়া হয়ে উঠবে। পরিণতিতে প্রতিরোধ দূরে থাকুক, সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনাও অসম্ভব হয়ে পড়বে। সড়ক-মহাসড়কেও হতাহত মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকবে। আমরা মনে করি, চট্টগ্রামের সর্বশেষ হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়েও সে আশংকাই সত্য প্রমাণিত হয়েছে। এমন অবস্থা অবশ্যই চলতে দেয়া যায় না। সরকারের উচিত অবিলম্বে ওই ঘাতক বাস চালক ও তার হেল্পারকে গ্রেফতার করে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান অনুয়ায়ী ব্যবস্থা নেয়া। কারণ, চট্টগ্রামের ঘটনায় অসংখ্য প্রত্যক্ষদর্শী রয়েছেন যারা সাক্ষ্য দেবেন যে, ওটা ছিল একটি ‘ইচ্ছাকৃত’ হত্যাকান্ড। সরকারকে একই সঙ্গে শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষের দাবি অনুযায়ী হত্যার জন্য দায়ী চালক ও হেল্পারদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড করার পদক্ষেপ নিতে হবে। এ উদ্দেশ্যে ইতিমধ্যে প্রণীত আইন সংশোধন করতে হবে। এভাবে সব মিলিয়ে আমরা চাই যাতে সড়ক-মহাসড়কে আর কোনো প্রাণবিনাশী দুর্ঘটনা না ঘটে। কোনো চালক ও হেল্পার যাতে যাত্রীদের ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়ার এবং তার ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে হত্যা করার কথা কল্পনাও না করতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ