ঢাকা, বুধবার 29 August 2018, ১৪ ভাদ্র ১৪২৫, ১৭ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

চৌগাছায় ভিজিএফএর চাল বিতরণে অনিয়ম

চৌগাছা সংবাদদাতা: যশোরের চৌগাছার স্বরূপদাহ, সিংহঝুলির এবং  নারায়ণপুর ইউনিয়নে ভিজিএফ এর চাল বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরেজমিনে পরিদর্শনে এ সকল অভিযোগের সত্যতা মিলেছে।
 সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায় চৌগাছার স্বরূপদাহ ইউনিয়নে পাঁচ হাজার ৭’শত ৫ জন কার্ডধারী দুঃস্থ ব্যক্তিকে ২০ কেজি করে ঈদ উল আযহার ভিজিএফ চাল বিতরণ করার কথা। সে হিসেবে উপজেলা খাদ্য গুদাম থেকে ৩০ কেজি ওজনের ৩ হাজার ৮’শত ৪ বস্তা চাল ইউনিয়ন পরিষদে নিয়ে গিয়ে কার্ডধারীদের মধ্যে বিতরণের কথা। কিন্তু ইউপি চেয়ারম্যান শেখ আনোয়ার হোসেন খাদ্যগুদাম থেকে সকল চাল উত্তোলন করলেও ইউনিয়ন পরিষদে নেন ২ হাজার ৮’শত বস্তা। শনিবার ইউনিয়ন পরিষদে খড়িঞ্চা ও মাধবপুর ওয়ার্ডের কার্ডধারীদের মধ্যে ভিজিএফএর চাল বিতরণ করা হয়। জনপ্রতি ২০ কেজি করে চাল বিতরণের কথা থাকলেও তা না দিয়ে কার্ডপ্রতি ৪ থেকে ৫ কেজি চাল কম দেয়া হচ্ছে এমন অভিযোগের ভিত্তিতে শনিবার বেলা ১১টার দিকে চৌগাছার কয়েকজন সাংবাদিক স্বরূপদাহ ইউনিয়ন পরিষদের উদ্দেশ্যে রওনা হন। পথিমধ্যে স্বরূপদাহ গ্রামে পৌছলে খড়িঞ্চা ওয়ার্ডের ভিজিএফএর চাল পাওয়া কয়েকজন কার্ডধারী তাদের চাল কম দেয়া হয়েছে বলে সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন। এক পর্যায়ে তাদের চাল পার্শ্ববর্তী একটি দোকানে মেপে দেখান তারা। এসময় দেখা যায় কার্ডধারী আনোয়ারুলকে দেয়া হয়েছে ১৬ কেজি ৮’শ গ্রাম, ফাতেমাকে ১৮ কেজি ১’শ গ্রাম, শাহানাজ খাতুনকে ১৭ কেজি ২’শ গ্রাম, আবুল কাশেমকে ১৫ কেজি ৮’শ গ্রাম, লিয়াকত আলীকে ১৮ কেজি ৫’শ গ্রাম এবং রাবেয়া খাতুনকে ১৭ কেজি ১’শ গ্রাম চাল দেয়া হয়েছে। চালপ্রাপ্তরা অভিযোগ করেন আমাদের চাল কম দেয়া হচ্ছে। প্রতিবাদ করলে ইউপি মেম্বার আব্দুল মান্নানের নেতৃত্বে চৌকিদার দফাদাররা আমাদের মারতে তেড়ে আসে। এসময় সাংবাদিকরা তাদের নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে ইউপি মেম্বার আব্দুল মান্নানকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন। পরে তাদের চাল মেপে দেখানো হলে তিনি সাংবাদিকদের সামনে চৌকিদার-দফাদারদের গালি দিয়ে বলেন আমি তাদের (কার্ডধারীদের) বলেছি আপনাদের চাল বুঝে নেবেন। একগ্রাম কম হলেও নেবেন না। পরে সাংবাদিকরা কমপড়া চাল তাদের দিয়ে দিতে বললে তখন তিনি বলেন ১৯ কেজি করে চাল তাদের বুঝিয়ে দিচ্ছি। চালপাওয়া কার্ডধারীরা বলেন তাদের পূর্বে যাদের চাল দেয়া হয়েছে সবাইকেই এভাবে ৩ থেকে ৪ কেজি করে চাল কম দেয়া হয়েছে।
চাল বিতরণের সময়ে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের ট্যাগ অফিসার উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আকরাম হোসেনের উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও তাকে পাওয়া যায়নি। সেলফোনে তার কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন আমার অফিসের অফিস সহকারি (আইসিটি) মাসুদের সেখানে থাকার কথা। কিন্তু সেখানে মাসুদের দেখা মেলেনি। আর অফিসারের থাকার কথা থাকলেও অফিস সহকারী কেন থাকবে প্রশ্নে তিনি কোন জবাব দিতে পারেন নি।
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ আনোয়ার হোসেন বলেন যাদের চাল কম দেয়া হয়েছিল তাদের পরে পূর্ণ করে দেয়া হয়েছে। সেটাতো সাংবাদিকরা নিয়ে যাওয়ার পরে দেয়া হয়েছে প্রশ্নে তিনি কোন জবাব দেননি। তাছাড়া ৩ হাজার অটশত বস্তা চাল ইউপি ভবনে নেয়ার কথা থাকলেও ২ হাজার আটশত বস্তা চাল নেয়া হয়েছে কেন জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন সব চাল পরিষদে আনা হয়েছে। তাহলে ওজনে কম দেয়া হচ্ছে কেন প্রশ্নে তিনি কোন উত্তর দেননি।
একইদিনে উপজেলা সিংহঝুলি ইউনিয়নের চাল বিতরণেও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ইউনিয়নটিতে ৩ হাজার ১২ জন কার্ডধারীকে চাল বিতরণ করার কথা। শনিবার দুপুর সাড়ে বারটার দিকে ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে দেখা যায় ভিজিএফএর বিতরণকৃত চাল কিনেছেন স্থানীয় এক ব্যবসায়ী। তার হিসেবের খাতায় দেখা যায় ইউনিয়নের জাহাঙ্গীরপুর গ্রামের আব্দুস সালামকে দেয়া হয়েছে ১৭ কেজি, বাবুকে ১৬ কেজি, ঝর্ণার ২টি কার্ডের বিপরীতে ৩৩ কেজি, মুজামকে ১৬ কেজি। সিংহঝুলি গ্রামের লিটনকে ৪টি কার্ডের বিপরীতে ৬৮ কেজি, পলিমকে দুটি কার্ডের বিপরীতে ২৬ কেজি, অমলকে ১৭ কেজি, আব্দুর রাজ্জাককে ১৬ কেজি ৫’শ গ্রাম, আলীকে ১৭ কেজি, মিলনকে ছয়টি কার্ডের বিপরীতে ৯৫ কেজি ৫’শ গ্রাম, মনিরুলকে ৩টি কার্ডের বিপরীতে ৬ কেজি চাল দেয়া হয়েছে। তবে ওই চাল ক্রেতা জানিয়েছেন বিক্রেতাদের বেশিরভাগই তাদের আসল নাম গোপন করে চাল বিক্রি করেছেন। সেখানে উপস্থিত কয়েকজন চাল পাওয়া ব্যক্তি নাম প্রকাশে অনিচ্ছার শর্তে বলেন তাদেরকেও একই ভাবেই ১৪ থেকে ১৬ কেজি করে চাল দেয়া হয়েছে। সকাল থেকে যাদের দেয়া হয়েছে সবাইকেই এভাবেই দেয়া হয়েছে বলে তারা জানান। ওই ইউনিয়নেও চাল বিতরণের সময়ে ট্যাগ অফিসার উপস্থিত ছিলেন না। ভুক্তভোগীরা বলেন, চাল কম দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে ইউনিয়নের একজন গ্রাম পুলিশ তাদেরকে বলে,“নালিশ করে কোনো লাভ নেই। উপর পর্যন্ত ঠিক করা আছে’। তখন গ্রামের দুঃস্থরা বাধ্য হয়েই সেই কম দেওয়া চাল নিয়েই বাড়িতে ফিরেছেন। এদিকে নারায়ণপুর ইউনিয়নে চাল কম পাওয়া ব্যক্তিরা গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে যে বিবরণ দিয়েছেন তাতে ওই ইউনিয়নে চাল বিতরণে তুঘলকি কা- ঘটে গেছে। সূত্রমতে নারায়ণপুর ইউনিয়নে ৫ হাজার ৪’শত ২০ ব্যক্তিকে ২০ কেজি করে ঈদ উল আযহার ভিজিএফ চাল দেয়ার কথা। সে হিসেব করে উপজেলা খাদ্যগুদাম থেকে সম্পূর্ণ চাল উত্তোলন করা হলেও সম্পূর্ণ চাল ইউনিয়ন পরিষদে নেয়া হয়নি। চাল পাওয়া নারায়ণপুর গ্রামের ওহিদুল ইসলাম, মহিদুল ইসলাম, বাদশা, সবুজ হোসেন, বাজেখানপুর গামের হাসান, বাবুল, আলাউদ্দিন প্রত্যেকেই জানিয়েছেন তাদের ১৫ থেকে ১৭ কেজি করে চাল দেয়া হয়েছে। তারা এর প্রতিবাদ করলে বাদেখানপুর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি আমিন উদ্দিন বলেছেন ভিজিএফএর চাল বিক্রি করে দিলে কিছু হয় না।
ভুক্তভোগিরা বলছেন সরকারি আইনকে তোয়াক্কা না করে ইউপি চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদিন মুকুল একটি কার্ড দু’জন ব্যক্তিকে ভাগ করে প্রত্যেককে ৭ থেকে ৮ কেজি করে চাল দিয়েছেন।
এছাড়া দলীয় নেতাকর্মীদের জন্য বেশ কিছু কার্ডের চাল রেখেছেন তাদের দেয়ার জন্য। কিন্তু সে চালও তাদের না দিয়ে তিনি বিক্রি করে দিয়েছেন। তারা বলেন চেয়ারম্যান যাদের কাছে চাল বিক্রি করেছেন তারা নছিমন, আলমসাধুতে করে সেই চাল নিয়ে গেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ