ঢাকা, শুক্রবার 21 September 2018, ৬ আশ্বিন ১৪২৫, ১০ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

রোহিঙ্গা প্রতিবেদন গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করুন: নিরাপত্তা পরিষদকে জাতিসংঘ মহাসচিব

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের উন্মুক্ত ব্রিফিং মুহুর্ত

সংগ্রাম অনলাইন ডেস্ক:

আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য জবাবদিহীতাকে পূর্বশর্ত গণ্য করে রোহিঙ্গা সংকাট নিয়ে মিয়ানমারের ওপর ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন কর্তৃক প্রকাশিত প্রতিবেদন নিরাপত্তা পরিষদকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তেনিও গুতেরেস।

তিনি বলেন, কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে জবাবদিহিতা ব্যবস্থাকে বিশ্বাসযোগ্য, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ, স্বাধীন এবং আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে মিয়ানমারকে দায়বদ্ধতার সাথে মেনে চলতে হবে।

মঙ্গলবার নিরাপত্তা পরিষদের এক উন্মুক্ত ব্রিফিং-এ গুতেরেস বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সকল সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা রক্ষায় সহায়তা করার জন্য গত এক বছর ধরে জাতিসংঘের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, এটা স্পষ্ট যে রোহিঙ্গাদের সেখানে নিরাপদ, স্বেচ্ছায় এবং টেকসইভাবে প্রত্যাবাসনের জন্য এখনো অনুকুল নয়।

জাতিসংঘ মহাসচিব এক বছর আগে হওয়া মিয়ানমারের রাখাইনে সরকারি বাহিনী কর্তৃক হামলার কথা নিরাপত্তা পরিষদকে আবারো ব্রিফ করেন। যে হামলার কারণে খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম শরণার্থী সংকটের সৃষ্টি হয়।

গুতেরেস তার বক্তেব্যে জাতিসংঘের স্বতন্ত্র তদন্তের মাধ্যমে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের পাশাপাশি গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের জন্য মিয়ানমারের সামরিক নেতাদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচারের কথা বলেন।

নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান সভাপতি জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধি ও কমনওয়েলথ বিষয়ক পররাষ্ট্র মন্ত্রী লর্ড আহমাদের সভাপতিত্বে ব্রিফিং-এ অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন অস্কার বিজয়ী অভিনেতা ও জাতিসংঘ শরণার্থী সংগঠনের (ইউএনএইচসিআর) শুভেচ্ছা দূত ক্যাট ব্ল্যানচেট এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সহকারী প্রশাসক তেগেগেনেওয়ার্ক গেত্তু।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে সামরিক বাহিনী দ্বারা অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার হয়ে এক বছরে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা সীমান্ত অতিক্রম করে প্রতিবেশি বাংলাদেশের কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার প্রধান জেইদ রাদ আল হুসাইন এই ঘটনাকে জতিগত নিধন বলে আখ্যায়িত করেছেন।

গত জুলায়ে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের কথা স্মরণ করে জাতিসংঘ মহাসচিব গুতেরেসে বলেন, তিনি সেখানে রোহিঙ্গাদের থেকে ভয়ঙ্করসব দুঃখ দুর্দশা ও অত্যাচারের কথা শুনেছেন।

তিনি আরো বলেন, একজন বাবা আমাকে কান্নাজড়িত অবস্থায় জানান কীভাবে তার চোখের সামনে তার ছেলেকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তার মাকেও নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয় এবং তাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়।

মিয়ানমার সেনাদের দ্বারা ধর্ষিতা এক নারী মহাচিবকে বলেন, মিয়ানমারে আমাদের নিরাপত্তা এবং নাগরিকত্ব প্রয়োজন। সেখানে আমাদের সাথে, আমাদের মেয়েদের সাথে, আমাদের মা-বোনদের সাথে যে নিষ্ঠুর আচরণ করা হয়েছে আমরা তার বিচার চাই।

একজন বিক্ষোভকারী মহিলা যিনি ধর্ষণের ফলে গর্ভধারণ করেছিলেন এবং আমাকে বলেছিলেন: "মায়ানমার ও নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তা দরকার। এবং আমরা আমাদের বোন, আমাদের কন্যাদের, আমাদের মায়ের জন্য ন্যায়বিচার ভোগ করতে চাই।

ইউএনএইচসিআর’র আমন্ত্রণে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্পি পরিদর্শন করে যাওয়া ব্ল্যানচেট জানান, তিনিও মহাসচিবের মতো রোহিঙ্গাদের দুঃখ দুর্দশা প্রত্যক্ষ করেছেন।

তিনি বলেন, ‘সেখানে মুখে দুঃখ দুর্দশা নির্যাতন ও অত্যাচারের কথা শুনেছি, তাদের চোখে মুখে আমি তা প্রত্যক্ষ করেছি।

নিরাপত্তা পরিষদকে প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘আমি একজন মা, প্রত্যেকটি শরণার্থী শিশুর মধ্যে আমি আমার সন্তানকে দেখেছি। তাদের মা-বাবার কাছে নিজেকে ভেবেছি। একজন মায়ের সামনে তার শিশুকে আগুনে ফেলা হচ্ছে, এটা কোনো মায়ের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব?

‘আমরা যেন আর ব্যর্থ না হই’ এই আহ্বান জানিয়ে ব্ল্যানচেট বলেন রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে নিরাপত্তা পরিষদকেই দায়িত্ব নিতে হবে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক মতভেদের উর্ধ্বে উঠে নিরাপত্তা পরিষদের সকল সদস্যকে কাজ করতে হবে।

ব্রিফিং-এ জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন গত এক বছর ধরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গা ইস্যুটি সামনে রেখে এর সমাধানে কাজ করে যাওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি ধন্যবাদ জানান।

রাষ্ট্রদূত মাসুদ গত বছর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উত্থাপিত পাঁচ দফা সুপারিশের কথা উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রীর এই সুপারিশমালার ভিত্তিতেই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হতে পারে মর্মে উল্লেখ করেন তিনি।

রাষ্ট্রদূত আরো বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের মানবিক সহযোগিতা প্রদানের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের পদক্ষেপসমূহের টেকসই বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরো উদারভাবে এগিয়ে আসতে হবে তা না হলে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা ও আশ্রয়দানকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য এটি মারাত্মক হুমকি হয়ে দেখা দিবে।’

‘গণহত্যার উদ্দেশ্যে নিয়ে পূর্ব-নির্ধারিত এবং সুপরিকল্পিত পদ্ধতি অনুসরণ করেই অপরাধীরা এই হীন অপরাধ সংঘটিত করেছে’ -মানবাধিকার কাউন্সিলের স্বাধীন ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের রিপোর্টের এই উদ্বৃতি উল্লেখ করেন রাষ্ট্রদূত মাসুদ।

তিনি বলেন, মিয়ানমারের ফেরত যাওয়ার ব্যাপারে রোহিঙ্গাদের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাস তৈরি করার জন্য মিয়ানমারকেই এগিয়ে আসতে হবে। রাখাইন প্রদেশে স্থায়ী প্রত্যাবসনের পরিবেশ তৈরি হলেই কেবল বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা ফিরে যাওয়ার জন্য স্বপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে আসবে।-ইউএনবি

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ