ঢাকা, বৃহস্পতিবার 30 August 2018, ১৫ ভাদ্র ১৪২৫, ১৮ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রোহিঙ্গা হত্যাকারীদের বিচার করতে হবে ॥ এ অবস্থা চলতে পারে না -জাতিসংঘ মহাসচিব

সংগ্রাম ডেস্ক : জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, রোহিঙ্গাদের হত্যার সঙ্গে জড়িতদের বিচার করতে হবে। বাংলাদেশ সময় গত বুধবার  রাত ১টায় নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে এক জরুরি বৈঠকে এ কথা বলেন তিনি।
মিয়ানমার বিষয়ক জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের প্রতি ইঙ্গিত করে এটাকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
জাতিসংঘ মহাসচিব নিরাপত্তা পরিষদকে সম্মিলিতভাবে এই সমস্যা সমাধান করতে বলেন।
অ্যান্তোনিও গুতেরেস বলেন, ‘এই সমস্যা অনাদিকাল চলতে পারে না।’ বৈঠকে জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, ‘রাখাইনে যতক্ষণ পর্যন্ত মিয়ানমার সহায়ক পরিবেশ তৈরি না করছে, সেখানে স্বেচ্ছায় রোহিঙ্গারা ফেরত যাবে না।’ তিনি দুঃখ প্রকাশ করে আরও বলেন, ‘জাতিসংঘের সংস্থাগুলোকে মিয়ানমার কাজ করতে দিচ্ছে না।’
গত মাসে বাংলাদেশ সফরের বিষয়ে তিনি বলেছেন, ‘সেখানে রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে আমি যে ভয়াবহ ঘটনার কথা শুনেছি, সেটি আমি জীবনে ভুলতে পারবো না।’
জাতিসংঘ তথ্য বিভাগ গত মঙ্গলবার রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর মায়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর সর্বাত্মক হামলা শুরুর প্রথম বার্ষিকীতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে আয়োজিত এক উন্মুক্ত বৈঠকে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, মায়ানমার যত যুক্তিই দেখাক না কেন, সে দেশের নিরাপত্তা বাহিনী ও তাদের দোসররা রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর যে নির্বিচার শক্তি প্রয়োগ ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন করেছে, কোনো যুক্তি দিয়েই তা ন্যায়সংগত প্রমাণ করা যাবে না।
এক দিন আগে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক তথ্য অনুসন্ধানী মিশনের প্রতিবেদনের বিষয় উল্লেখ করে মহাসচিব বলেন, এই মিশন মানবাধিকার লঙ্ঘনের যে প্রমাণ পেয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহই থাকে না, মায়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী আন্তর্জাতিক আইনের চোখে গুরুতর অপরাধ করেছে।
মহাসচিব বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয়প্রাপ্ত রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের স্বেচ্ছায় নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবর্তনের লক্ষ্যে মায়ানমার সরকার বাংলাদেশ সরকার ও জাতিসংঘ সংস্থাগুলোর সঙ্গে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেছে। কিন্তু এই চুক্তি বাস্তবায়নে যে অঙ্গীকার প্রয়োজন, তার কোনো লক্ষণ তিনি দেখেন না।
নিরাপত্তা পরিষদের আগস্ট মাসের সভাপতি যুক্তরাজ্যের অনুরোধে ও সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বিতর্কে অধিকাংশ বক্তাই মহাসচিবের বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করে রোহিঙ্গা জাতি নির্মূলকরণ বা এথনিক ক্লেনজিংয়ের অপরাধে অভিযুক্ত মায়ানমারের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের যথাযথ বিচারের দাবি তোলেন।
তারা এ কথাও বলেন, সংকট সমাধানের লক্ষ্যে উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের দেশে নিরাপদ প্রত্যাবর্তন ও তাদের সুরক্ষার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের দায়দায়িত্ব মিয়ানমার সরকারের। সেই অবস্থা সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত উদ্বাস্তুরা ফিরে যাবে তা আশা করা অন্যায়।
এদিনের বিতর্কে সবচেয়ে মর্মস্পর্শী বক্তব্যটি প্রদান করেন বিশিষ্ট চলচ্চিত্রশিল্পী ও জাতিসংঘ উদ্বাস্তু সংস্থার শুভেচ্ছাদূত কেট ব্লানচেট। তিনি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু শিবিরে তার সাম্প্রতিক সফরের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, ‘আমি একজন মা। উদ্বাস্তু শিশুদের চোখের দিকে তাকিয়ে আমি নিজের সন্তানদের দেখতে পেয়েছি।’
লায়লা নামের এক উদ্বাস্তু ও তার ছেলে ইউসুফের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে ব্লানচেট বলেন, তারা স্বচক্ষে নিজের ঘরবাড়ি পুড়ে যেতে দেখেছেন। মানুষকে আগুনকে পুড়িয়ে মারা ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন।
‘একজন মা কীভাবে নিজ চোখে তার সন্তানদের আগুনে পুড়িয়ে মারার ঘটনা দেখে তা সহ্য করবে, বলতে পারেন?’ তিনি প্রশ্ন রাখেন। বিতর্কে শেষে পরিষদের সভাপতি তারিক মাহমুদ আহম্মদ সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘উদ্বাস্তুদের নিরাপদে ফেরত পাঠানোর জন্য চাই প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি। যারা নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পাশের দেশে আশ্রয় নিয়েছে, তেমন পরিস্থিতি সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত তাদের ফেরত যেতে আমরা বলতে পারি না।’ তিনি বলেন, তেমন পরিস্থিতি সৃষ্টির দায়িত্ব অন্য কারও নয়, মায়ানমার সরকারের।

গত সোমবার মিয়ানমার বিষয়ক জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, মিয়ানমারের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা ও গণধর্ষণের দায়ে দেশটির সেনাপ্রধানসহ ছয় শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাকে অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।
গত বছরের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা অভিযানের নামে রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংসতা শুরু করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। সে সময়ও মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অভিযানকে জাতিসংঘ জাতিগত নিধনযজ্ঞ বলে অভিহিত করে বলেছিল, এটি মানবতাবিরোধী অপরাধ।
রাখাইনে সেনা অভিযান শুরুর পর থেকে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা মুসলমান প্রাণ বাঁচাতে রাখাইন থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের অভিযোগ, রাখাইনে সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের নির্বিচারে হত্যা ও ধর্ষণ করছে এবং তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান মিয়ানমারের
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে জাতিসংঘের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে মিয়ানমার সরকার। গত সোমবার (২৭ আগস্ট) প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা হত্যাযজ্ঞের জন্য দেশটির শীর্ষ সেনা কর্মকর্তাদের দায়ী করা হয়। জবাবে মিয়ানমারে মুখপাত্র জাও তায়ে বলেন, তারা জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের এই প্রতিবেদনের সঙ্গে একমত নন এবং সেটা গ্রহণও করছেন না।
গতবছরের ২৫ আগস্ট নিরাপত্তা চৌকিতে আরসার হামলাকে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাবিরোধী অভিযানের কারণ বলা হলেও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছিলো, রাখাইন থেকে রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দিতে এবং তাদের ফেরার সব পথ বন্ধ করতে আরসার হামলার আগে থেকেই পরিকল্পিত সেনা-অভিযান শুরু হয়েছিল। জাতিগত নিধনে হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রায় সাড়ে ৭ লাখ মানুষ। জাতিসংঘের করা প্রতিবেদনেও সেনাবাহিনীকে দায়ী করা হয়েছে। এছাড়া বেসামরিক সর্বোচ্চ নেতা অং সান সু চিরও সমালোচনা করে বলা হয়েছে রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ ঠেকাতে নিজের নৈতিক অবস্থান ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি।
জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। তবে এই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে মিয়ানমার। প্রতিবেদনের সমালোচনা করেছে চীনও। তারা জানায়, মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করে সংকটের সমাধান হবে না।
আর জাও তায় দাবি করেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে মিয়ানমার জিরো টলারেন্স নীতিতে বিশ্বাসী। তিনি বলেন, ‘আমরা জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনকে মিয়ানমারে প্রবেশের অনুমতি দেইনি। তাই আমরা তাদের প্রস্তাবও গ্রহণ ও সমর্থন করছি না। মুখপাত্র আরও বলেন, মিয়ানমারের নিজস্ব স্বাধীন কমিশন রয়েছে যারা তদন্ত করে জাতিসংঘসহ অন্যান্য সংস্থার মিথ্যা অভিযোগের জবাব দেবে।এর আগে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তদন্ত পরিচালনা করে নিজেদের নিন্দোষ দাবি করেছিলো।’
জাতিসংঘপ্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাখাইনে রোহিঙ্গা গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকায় মিয়ানমার সেনা কর্মকর্তাদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সেনাবাহিনীর সঙ্গে বেসামরিক কর্তৃপক্ষও এই নিধনযজ্ঞে ইন্ধন জুগিয়েছে। রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সু চিও তার সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে এই সহিংসতা থামাতে ব্যর্থ হয়েছেন। রাখাইনে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞ নিয়ে মিয়ানমার সরকারের প্রত্যাখ্যান ও অস্বীকারের মাত্রায় তারা অবাক হয়েছেন। এখন পর্যন্ত জাতিসংঘের তরফ থেকে এটাই মিয়ানমারের সংঘটিত রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কড়া হুঁশিয়ারি ও নিন্দা।
তবে বিপন্ন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনা হলেও চীনের অবস্থান মিয়ানমারের পক্ষে। রোহিঙ্গা নিপীড়নের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের একটি প্রস্তাব আটকে দিয়েছিল তারা। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সবচেয়ে বড় অস্ত্র সরবরাহকারী চীন। মিয়ানমারে তাদের বিপুল বিনিয়োগও রয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নারী মুখপাত্র হুয়া চুনিয়াং জানান, রাখাইনের ঐতিহাসিক, ধর্মীয় ও জাতিগত ইস্যু অনেক বেশি জটিল। তিনি বলেন, আমি মনে করি একতরফা সমালোচনা বা চাপ প্রয়োগ সংকট সমাধানে সহযোগিতা করবে না। আর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জাতিসংঘ প্রকাশিত তদন্ত প্রতিবেদন রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর ওপর মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপক মাত্রায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণকে আরও সংহত করেছে। আর যুক্তরাজ্যের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল বিষয়ক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মার্ক ফিল্ড বলেন, জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের প্রতিবেদনই আসলে বলে দেয় মিয়ানমারে ২০১১ সাল থেকেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে। গত বছর আগস্টে রাখাইনে হামলা ব্যতিক্রম কিছু নয়।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীন রাশিয়া মিয়ানমারের পাশে
১৫ সদস্যবিশিষ্ট এই পরিষদের প্রায় সব সদস্যই মায়ানমার সরকার ও তার নিরাপত্তা বাহিনীকে অভিযুক্ত করে বক্তব্য রাখলেও ভিন্ন সুরে কথা বলেন চীন ও রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত।
চীনা রাষ্ট্রদূত উ হাইতাও বাংলাদেশ ও মায়ানমারের মধ্যে সাম্প্রতিক আলাপ-আলোচনা ও সমঝোতার কথা উল্লেখ করে দাবি করেন, পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। তিনি যুক্তি দেখান, এটি বাংলাদেশ ও মায়ানমারএই দুই দেশের সমস্যা। তাদেরই দ্বিপক্ষীয়ভাবে এই সমস্যার সমাধান করতে হবে।
তিনি জানান, উভয় দেশকে সমানভাবে সাহায্য করতে চীন প্রস্তুত। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের প্রশ্ন, জাতিসংঘ যাকে এই সমস্যার একটি মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, সে প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত হাইতাও বলেন, সমস্যা সমাধানের একটি পূর্বশর্ত হিসেবে ধরা ঠিক হবে না, বরং উদ্বাস্তু প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই তার সমাধান খুঁজতে হবে।
রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভাসিলি নেবেনজিয়া চীনা প্রতিনিধির বক্তব্য সমর্থন করে বলেন, এটি একটি দ্বিপক্ষীয় সমস্যা।
বাংলাদেশ ও মায়ানমারকেই তার সমাধান করতে হবে। পরিস্থিতির ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, কফি আনান কমিশন যে ৮৮টি সুপারিশ করেছিলেন, তার মধ্যে ৮১টি সুপারিশ হয় ইতিমধ্যে অর্জিত হয়েছে অথবা অর্জনের পথে।
উল্লেখ্য, মায়ানমার সরকার বারবার এই দাবি করলেও জাতিসংঘ এই অগ্রগতির ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ