ঢাকা, বৃহস্পতিবার 30 August 2018, ১৫ ভাদ্র ১৪২৫, ১৮ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ইভিএম নিয়ে নির্বাচন কমিশনের তোড়জোড় দুরভিসন্ধিমূলক

স্টাফ রিপোর্টার : ইভিএম নিয়ে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তোড়জোড় দুরভিসন্ধিমূলক ও হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আবারো অভিযোগ করেছে বিএনপি। গতকাল বুধবার বেলা সোয়া ১১টার দিকে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এ অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন কাজ করছে। নির্বাচন কমিশন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) নামে এক বিতর্কিত মাধ্যম ব্যবহারের চিন্তা করছে, যা জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে।
বিএনপির সিনিয়র এ নেতা বলেন, ইসিও দীর্ঘদিন ধরে বলে এসেছে সব দল না চাইলে ইভিএম ব্যবহার করা হবে না। একমাত্র সরকারী দল ছাড়া নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সুধীজন, পেশাজীবী সংগঠনগুলোর অধিকাংশই আগামী জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার জন্য মতামত পেশ করেছিল। অথচ এখন বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল ও শ্রেণি পেশার মানুষের মতামতকে উপেক্ষা করে তড়িগড়ি করে আরপিও সংশোধনের মাধ্যমে ইভিএম ব্যবহারের উদ্যোগ ও নানা ষড়যন্ত্রের কথা শোনা যাচ্ছে। মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনের সচিব হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১০০টি আসনে ইভিএম ব্যবহারের পরিকল্পনা নিয়েছে ইসি।
এ ব্যাপারে রিজভী বলেন, নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের দুরভিসন্ধিমূলক পরিকল্পনা মূলত ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং রচনার পটভূমি। ইভিএম নিয়ে বিশ্বজুড়ে যখন হতাশা ও সমালোচনার ঝড় বইছে তখন এই ধরনের উদ্যোগ কার ইশারায় এবং কীসের ইঙ্গিত বহন করে তা জাতির কাছে সুস্পষ্ট। তিনি বলেন, জনগণের দল হিসেবে জনমতের প্রতি বিএনপির চিরন্তন দায়বদ্ধতা রয়েছে। তাই আমরা এমন একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দাবি করছি, যেখানে জনগণের স্বপ্ন, আকাক্সক্ষা ও দাবির প্রতিফলন ঘটবে।
রিজভী বলেন, ইভিএম-এ ভোট জালিয়াতি ও ভোট চুরির অফুরন্ত সুযোগ থাকবে বলেই বাংলাদেশের অবৈধ সরকার নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে ইভিএম ব্যবহারে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ভোটারবিহীন সরকারের দিক থেকে ভোটাররা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে বলেই এখন ডিজিটাল কারচুপির ওপর নির্ভর করছে অবৈধ শাসকগোষ্ঠী।
বিশ্বের ২০০টি দেশের মধ্যে মাত্র ৪টি দেশে ইভিএম ব্যবহার করা হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেসব দেশেও ইভিএম ব্যবহার নিয়ে তুমুল সমালোচনা চলছে। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে আজ পর্যন্ত ইভিএম গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। যে অল্প সংখ্যক দেশে ইভিএম  আংশিকভাবে ব্যবহার করা হয় সেখানেও ভোট প্রক্রিয়ায় ও ফল নির্ধারণে ভয়াবহ কারচুপির প্রমাণ মিলেছে। ভোট গ্রহণের এই পদ্ধতিতে ইন্টারনেট সিকিউরিটি ও তথ্যের গোপনীয়তা নিয়েও গণতান্ত্রিক বিশ্বে সার্বজনীন ভীতি ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তাই প্রায় সব দেশেই নির্বাচনে ইভিএমকে ইতিমধ্যে নিষিদ্ধ ও জনবিরোধী মাধ্যম হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
ইভিএম-এর ক্ষতির দিকগুলো তুলে ধরে বিএনপির এ নেতা বলেন, আয়ারল্যান্ডে ইভিএম ব্যবহার নিয়ে গবেষণার পেছনে ৫১ মিলিয়ন ইউরো খরচ করবার পর এটিকে অবৈধ নির্বাচনী যন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়। জার্মানির সুপ্রিম কোর্ট ইভিএমকে অসাংবিধানিক ও জনস্বার্থবিরোধী ঘোষণার মাধ্যমে এর ব্যবহারকে নিষিদ্ধ করে। হল্যান্ডে নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও ফলাফলের স্বচ্ছতার অভাবে ডাচ কাউন্সিল আইন করে ইভিএম ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। এ ছাড়াও ইতালি ও প্যারাগুয়েতে ইভিএম নিষিদ্ধ করা হয়।
রিজভী বলেন, যুক্তরাজ্যেও অনেক গবেষণা ও আলোচনার ভিত্তিতে ভবিষ্যতে নির্বাচনে বিতর্কিত ইভিএম ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ক্যালিফোর্নিয়াসহ যুক্তরাজ্যের অধিকাংশ অঙ্গরাজ্যে, সুইজারল্যান্ড-স্পেন-রোমানিয়াসহ বেশ কিছু দেশে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর আশাব্যঞ্জক ফল না পাওয়ায় এর আর প্রয়োগ ঘটেনি। নরওয়েতে কোন ভোটার কাকে ভোট দিচ্ছে, এই গোপনীয়তা ভঙ্গের ভয়ে পরীক্ষামূলক নির্বাচনে ভোটের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। এটিকে গণতন্ত্রের জন্য হুমকি ও জনস্বার্থের পরিপন্থী বিবেচনা করে সেখানে ইভিএম প্রত্যাহার করা হয়।
তিনি বলেন, বিভিন্ন গবেষণা ও অনুসন্ধানের রিপোর্ট থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, ইভিএম সহজে হ্যাক করা যায়, চাইলে এক মুহূর্তের মধ্যে ইভিএম-এর সবগুলো ফলাফল পরিবর্তন করা সম্ভব। ভোটারের সংখ্যা বাড়ানো-কমানো থেকে শুরু করে যেকোনো প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোটকেও পাল্টে দেয়া যায়। ইভিএম-এ দূর থেকেও ম্যানিপুলেট করা যায়। ইভিএম দিয়ে ভোটারের নাম, বয়স, ঠিকানা, মোবাইল, পরিবার ইত্যাদিসহ যাবতীয় তথ্য একেবারেই পাওয়া যায়। এর অপব্যবহারের মাধ্যমে হুমকি-ভীতি প্রদান থেকে শুরু করে ভোটারের অনুপস্থিতিতে তার নামেও জালভোট দেয়া সম্ভব। নির্বাচনের সাথে জড়িত ব্যক্তিরা সরকারের চাহিদা মতো ইভিএম-এর তথ্য বা ফল রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে এমনকি দলীয় লোকদের হাতেও এই ক্ষমতা চলে যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ইভিএম-এর সফটওয়ার পরিবর্তন বা বন্ধ করে নির্বাচনে অস্থিতিশীলতা ও শূন্যতা সৃষ্টি করা সম্ভব। অনেক স্বৈরতান্ত্রিক দেশে নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করে প্রহসন ও নির্লজ্জ কারচুপির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ভোটারদের ইভিএম স্ক্রিনে দেখানো হয় তাদের ভোট সঠিক প্রার্থীর নামে যাচ্ছে। কিন্তু ইভিএম-এর ভেতর তথ্য হিসেবে ভোট চলে যায় অন্য প্রার্থীর নামে।
একমাত্র সরকারীদল ছাড়া নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপে বিভিন্ন রাজনৈতিকদল, সুধীজন, পেশাজীবী সংগঠনগুলোর অধিকাংশই আগামী জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার জন্য মতামত পেশ করেছিল। ইসিও দীর্ঘদিন ধরে বলে এসেছে সব দল না চাইলে ইভিএম ব্যবহার করা হবে না। কিন্তু বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল ও শ্রেনী পেশার মানুষের মতামতকে উপেক্ষা করে তড়িগড়ি করে আরপিও সংশোধনের মাধ্যমে ইভিএম ব্যবহারের উদ্যোগ ও নানা ষড়যন্ত্রের কথা শুনা যাচ্ছে। ইভিএম নিয়ে নির্বাচন কমিশনের তোড়জোড় দুরভিসন্ধিমূলক ও হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
রিজভী বলেন, বিবিসির একটি রিপোর্ট থেকে জানা যায় যুক্তরাস্ট্রের গবেষকরা মোবাইল মেসেজের মাধ্যমে ভারতের ইভিএম প্রক্রিয়া হ্যাক করে কয়েকটি কেন্দ্রের ফলাফল পরিবর্তন করা হয়। এবছরের মে মাসে ভারতের একটি স্থানীয় নির্বাচনে ১৫% এর বেশি ভোটিং মেশিন অকার্যকর হয়ে পড়ে। টাইমস অফ ইন্ডিয়া পত্রিকার ভোটারদের সাক্ষাতকার নিয়ে দেখে অধিকাংশ বুথেই ভোটের দিন ইভিএম নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হয়। বিতর্কের মুখে ভারতের নির্বাচন কমিশন দাবি করে, গরমে উচ্চমাত্রার কারণে তাদের ইভিএমগুলো হঠাৎ করে নষ্ট হয়ে যায়। এই ব্যাখ্যা নিয়ে সর্বত্র হাস্যরসের সৃষ্টি হয়।  গত বছরেই ভারতের আরেকটি নির্বাচনে হিন্দুস্থান টাইমস পত্রিকার অনুসন্ধানে নতুন বিতর্ক বেরিয়ে আসে। সেখানে স্বতন্ত্র প্রার্থীর সবগুলো ভোট চলে যায় সরকার দলীয় প্রার্থীর নামে। বিভিন্ন গবেষণার ও অনুসন্ধানের রিপোর্ট থেকে এটি সুস্পস্ট যে ইভিএম সহজে হ্যাক করা যায়, চাইলে একমূহুর্তের মধ্যে ইভিএম এর সবগুলো ফলাফল পরিবর্তন করা সম্ভব। ভোটারের সংখ্যা বাড়ানো-কমানো থেকে শুরু করে যে কোন প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোটকেও পাল্টে দেয়া যায়। ইভিএম-এ দূর থেকেও ম্যানিপুলেট করা যায়।
সারদেশে নেতাকর্মীদের ধরপাকড় করা হচ্ছে অভিযোগ করে রিজভী বলেন, রাজধানীসহ সারাদেশে বিএনপি নেতাকর্মীদের বাড়িতে-বাড়িতে পুলিশ হানা দিচ্ছে ও পরিবারের লোকজনের সাথে খারাপ ব্যবহার করছে এবং যাদেরকে পাচ্ছে তাদেরকে আটক করে মিথ্যে মামলায় গ্রেফতার দেখানো হচ্ছে। গণতন্ত্রের অবশিষ্ট ক্ষীণ দিগন্ত রেখাকে অন্ধকারে ঢেকে দেয়ার জন্যই রাষ্ট্রযন্ত্রের জান্তব অত্যাচার নামিয়ে আনা হয়েছে বিএনপি’র নেতাকর্মীদের উপর। বিরোধীদলহীন একনায়কোচিত একদলীয় রাজত্বে যেমন প্রতিদ্বন্ধি দল ছাড়া নির্বাচন হয় সেই রকম নির্বাচন করার জন্যই বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের নিবাস করা হয়েছে দেশের কারাগারগুলোতে। ঈদের পরে রাজধানীসহ দেশের সকল থানায় বিএনপি নেতাদের নামে এবং অজ্ঞাত নামা ব্যাক্তির নামে মামলা দেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে অনেক নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে। আটকের পরে রিমান্ডে নিয়ে চালানো হচ্ছে অকথ্য নির্যাতন। যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালা উদ্দিন টুকুকে কয়েকমাস আগে গ্রেফতারের পর তাকে বার বার রিমান্ডে নিয়ে জুলুম করা হচ্ছে। সর্বশেষ তার ওপর ১৩ দিনের রিমান্ড দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকার নিজেদের পতন ঠেকাতে আতঙ্ক তৈরি করতেই দেশব্যাপী ধরপাকড় শুরু করেছে। মঙ্গলবার রাতে ভাটারা থানায় নতুন মামলা দায়ের করে ভাটারা থানা বিএনপি’র সভাপতি আতাউর চেয়ারম্যান ও যুবদল সহ সভাপতি  জামির হোসেন সহ অনেক নেতার বাড়িতে পুলিশ হানা দেয়। এসময় তাদেরকে না পেয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে।  মিরপুর থানা বিএনপির সিনিয়র সহ সভাপতি মজিবুর রহমান নয়ন ও প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক পলাশকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।  তুরাগ থানা বিএনপির ৫৪ নং ওয়ার্ড বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মোতালেব হোসেনকে গত রাত তিনটায় গ্রেফতার করেছে পুলিশ। কেরানিগঞ্জ দক্ষিণ থানা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক অসুস্থ গুলশান আরাকে দেখতে গেলে থানা বিএনপির সভাপতি নিপূণ রায় চৌধুরিসহ ৪০জন নেতা-কর্মীকে প্রায় সোয়া এক ঘন্টা অবরুদ্ধ করে রাখে পুলিশ। জামিনে থাকা মামলায় হাজিরা দিতে গিয়ে শেরপুর জেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক হযরত আলীকে জামিন না দিয়ে কারাগারে প্রেরণ করে। শেরপুর জেলা যুবদল সভাপতি শফিকুল ইসলাম মাসুদ সহ তিন বিএনপি নেতাকে গ্রেফতার করেছে ডিবি পুলিশ। ঈদের পর দিন নারায়নগঞ্জে আড়াইহাজার থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমানসহ ৭ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। আমি পুলিশি হয়রানীর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং গ্রেফতারকৃত নেতৃবৃন্দের মুক্তি দাবি করছি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ