ঢাকা, বৃহস্পতিবার 30 August 2018, ১৫ ভাদ্র ১৪২৫, ১৮ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সাংবাদিক নদী হত্যায় সাবেক স্বামীসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা

স্টাফ রিপোর্টার : বেসরকারি টেলিভিশন আনন্দ টিভির পাবনা প্রতিনিধি সুবর্ণা আক্তার নদী হত্যার ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। গতকাল বুধবার দুপুরে নিহত সুবর্ণা আক্তার নদীর মা মর্জিনা বেগম বাদী হয়ে পাবনা সদর থানায় মামলাটি করেন। এদিকে বেসরকারি টিভি চ্যানেল আনন্দ টিভির পাবনা জেলা প্রতিনিধি সুবর্ণা নদীকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত করে হত্যাকারীদের দ্রুত আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। গতকাল বুধবার পাবনা সদর হাসপাতালে পোস্টমর্টেম শেষে সুবর্ণা আক্তার নদীর দাফন সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল বুধবার আছরের নামাযের পর পাবনা অ্যাডওয়ার্ড কলেজ মাঠ প্রাঙ্গণে জানাযা শেষে বালিয়া হালট গোরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
গতকাল বুধবার করা মামলায় শিল্পপতি আবুল হোসেন, তার ছেলে রাজিব ও রাজিবের সহকারী মিলনসহ অজ্ঞাত ৬/৭ জনকে আসামী করা হয়েছে। পাবনা সদর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওবাইদুল হক মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, মামলার প্রধান আসামী আবুল হোসেনকে (৬০) গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। তিনি ইড্রাল ফার্মাসিউটিক্যালস (ইউনানী) ও শিমলা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং নিহত নদীর ২য় স্বামী রাজিবের বাবা। গত মঙ্গলবার রাতে নিজ বাসার সামনে নদীকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। স্বামী রাজীব হোসেন ও শ্বশুর আবুল হোসেনের হাত থেকে বাঁচতে অনেক আগেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা চেয়েছিলেন তিনি। এনিয়ে পাবনা ও ঢাকায় একাধিক সাংবাদিক সম্মেলন করেছিলেন সুবর্ণা নদী।
পাবনায় সাংবাদিক সম্মেলন করে সুবর্ণা নদী বলেছিলেন, স্বামী রাজীব হোসেন ও শ্বশুর আবুল হোসেনের ভাড়াটিয়া গু-াবাহিনী তাকে নির্যাতন ও হত্যার চেষ্টা করছে। ২০১৬ সালের ৬ জুন পাবনার শহরের রাজীব হোসেনের সাথে ৫ লাখ ১ টাকা দেনমোহর ধার্য করে বিয়ে হয় তার। একপর্যায়ে তার কাছে ৫ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করে স্বামী। দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় তাকে প্রচ- মারধর করে। ২০১৭ সালের ৩১ মে  স্বামী তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। ৪ জুন পাবনা সদর থানায় নারী-শিশু ও যৌতুক আইনে মামলা করেন তিনি। এছাড়া পাবনা জজ কোর্টে যৌতুক মামলা করেন।
 সেখানে তিনি বলেন, ২০১৭ সালের ৩ অক্টোবর রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্র্যাব) মিলনায়তনে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে একই অভিযোগ করে সুবর্ণা বলেন, ‘মামলা করার পর আমার শ্বশুর-শাশুড়ি ও স্বামী প্রচ-ভাবে আমার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে সব মামলা তুলে নেয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ ও হুমকি প্রদর্শন করছেন। মামলা তুলে না নিলে আমাকে জানে মেরে ফেলার হুমকিও দেয়া হচ্ছে। রাস্তায় ভাড়াটিয়া গুন্ডা দিয়ে গলায় চাকু ধরে মামলা তুলে নেয়ার জন্য শাসিয়েছে। এ অবস্থায় আমি ভয়ে পাবনা ছেড়ে ঢাকায় পালিয়ে বেড়াচ্ছি।’ তিনি বলেন,‘ এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি। একই সঙ্গে আসামীদের গ্রেফতারসহ উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানাচ্ছি।’ এ মামলার কারণেই সুবর্ণাকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন বড় বোন চম্পা খাতুন। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আনন্দ টিভির পাবনা প্রতিনিধি সুবর্ণা নদীকে হত্যার ঘটনায় অভিযোগের তীর ইদ্রাল ইউনানি ফার্মাসিটিউক্যালের মালিক ও তার ছেলের দিকে। এই হত্যাকা-ের পর বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে তদন্তে নেমেছে পুলিশ। দেড় বছর আগে ওই প্রতিষ্ঠানের মালিকের ছেলের সঙ্গে নদীর ডিভোর্স হয়। এ ডিভোর্সের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আদালতে একটি মামলা চলছে।
নদীর বোন চম্পা খাতুন বলেন, আমার বোন মৃত্যুর আগে আমাদের বলে গেছেন, তার সাবেক স্বামীর বিরুদ্ধে গত বছরের ৪ জুন থানায় একটি মামলা করেছিল। মামলাটি আদালতে বিচারাধীন। ঘটনার দিন আদালতে শুনানি শেষে সাবেক স্বামী রাজীবের লোকজন নিশ্চিত ছিলেন যে তারা মামলায় হেরে যাবেন। আর এই কারণেই সুবর্ণা নদীকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেন তার বড় বোন।
তিনি আরো বলেন, ইদ্রাল ইউনানি ফার্মাসিটিউক্যাল ও শিমলা ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড হাসপাতালের মালিক আবুল হোসেনের ছেলে রাজীবের সঙ্গে বছর দুয়েক আগে বিয়ে হয়। বছর দেড়েক আগে তাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। এরপর সুবর্ণা নদী পাবনার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে আদালতে একটি যৌতুক মামলা করেন। এ মামলায় সুবর্ণা তার সাবেক স্বামী রাজীব ও তার বাবা আবুল হোসেনসহ তিনজনকে আসামী করেন।
নদীর বোন আরো বলেন, গতকাল মঙ্গলবার (২৮ আগস্ট) এ মামলার সাক্ষ্য দেয়ার দিন ছিল। এতে সুবর্ণা তার পক্ষে আদালতে সাক্ষ্যও উপস্থাপন করেন। মামলায় ফেঁসে যাওয়ার আশঙ্কায় আসামীরা পরিকল্পিতভাবে সুবর্ণাকে হত্যা করেছে। ইতিপূর্বেও নদীকে বিভিন্নভাবে ভয় ভীতি দেখিয়ে আসছিলেন তারা। গত বছরের জুন মাসে শহরের আব্দুল হামিদ রোডে প্রকাশ্যে তাকে গলায় চাকু চালানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। পরে সুবর্ণা নদী জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে পাবনা সংবাদপত্র পরিষদ মিলনায়তনে ২২ জুলাই একটি সাংবাদিক সম্মেলন করেন। পরে ওই বছরেই ৩ অক্টোবর একই দাবিতে ঢাকার ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন মিলনায়তনে একটি সাংবাদিক সম্মেলন করেন তিনি। এতেই প্রমাণিত হয় যে তাকে হত্যার উদ্দেশে কারা দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা করে আসছিল।  সুবর্ণা নদী আনন্দ টিভির পাবনা প্রতিনিধির পাশাপাশি অনলাইন পোর্টাল দৈনিক জাগ্রত বাংলার সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলেন। রাজীবের সঙ্গে বিয়ের আগেও তার আরেকটি বিয়ে হয়েছিল। সেই ঘরে তার একটি কন্যা সন্তান রয়েছে। সুবর্ণা নদী জেলার আটঘরিয়া উপজেলার একদন্ত গ্রামের মৃত আইয়ুব আলীর মেয়ে।
সাংবাদিক নদী হত্যায় তদন্তের দাবিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি: গতকাল বুধবার জনসংযোগ কর্মকর্তা ফারহানা সাঈদ স্বাক্ষরিত এক বার্তায় এ তথ্য জানায় সংস্থাটি। ওই বার্তায় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক, আনন্দ টিভির পাবনা জেলা প্রতিনিধি সুবর্ণা নদীকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘সাংবাদিক নদী হত্যার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। হত্যাকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।
পাবনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস বলেন, গতকাল দুপুরে শহরের শিমলা ডায়াগনস্টিক ও ওষুধ প্রস্তুকারী কোম্পানি ইড্রাল ফার্মার (ইউনানি) মালিক শিল্পপতি আবুল হোসেনকে গ্রেফতার করেছেন। তিনি বলেন,পুলিশ সন্দেহভাজনদের নজরে রেখেছে। শুধু একটি বিষয় নয়, কয়েকটি ইস্যু নিয়ে পুলিশ গত মঙ্গলবার রাত থেকেই মাঠে কাজ করছে।
অপরদিকে নদী হত্যার প্রতিবাদে এবং হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে বুধবার দুপুরে পাবনা শহরে মানববন্ধনসহ সমাবেশ করেন সংবাদকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ। এ সময় ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকারীদের গ্রেফতারের দাবি জানানো হয়। এ সময়ের মধ্যে হত্যাকারীদের গ্রেফতারে ব্যর্থ হলে বৃহত্তর কর্মসূচি দেয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ। পাবনা প্রেস ক্লাবের সামনে শহরের আব্দুল হামিদ সড়কে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে পাবনা প্রেস ক্লাব, সংবাদপত্র পরিষদ, টেলিভিশন সাংবাদিক সমিতি নেতৃবৃন্দসহ পাবনায় কর্মরত সর্বস্তরের গণমাধ্যম কর্মীরা অংশ নেন। এছাড়া সাংস্কৃতিক কর্মী, মানবাধিকার সংগঠন, নারী নির্যাতন  প্রতিরোধ নেটওয়ার্ক, নদীর স্বজনেরাসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ অংশ নেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ