ঢাকা, বৃহস্পতিবার 30 August 2018, ১৫ ভাদ্র ১৪২৫, ১৮ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ইভিএম প্রসঙ্গে

পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম ব্যবহারের জন্য নির্বাচন কমিশন ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেছে। কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবরে জানানো হয়েছে, সবদিক থেকে প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার আগেই কমিশন তিন হাজার ৮২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রায় দেড় লাখ ইভিএম কেনার তথা আমদানি করার কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে শুরু করেছে।
কারণ জানাতে গিয়ে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের হিসাবে তিনশ সংসদীয় আসনে সম্ভাব্য ভোটকক্ষ হতে পারে দুই লাখ ২০ হাজারটি। সে হিসাবে নির্বাচনের সময় প্রতি কেন্দ্রে একটি করে বাড়তি মেশিনসহ দুই লাখ ৬৪ হাজারটি ইভিএম-এর দরকার পড়বে। আর যদি অর্ধেকসংখ্যক আসনে ইভিএম ব্যবহার করা হয় তাহলে দরকার পড়বে এক লাখ ৩২ হাজার মেশিনের। জানা গেছে, ইভিএম ব্যবহার করতে হলে আরো কিছু বিষয়ের সঙ্গে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ বা আইপিও সংশোধন করতে হবে। সেটাসহ অন্য কিছু প্রস্তুতি বাকি থাকায় কমিশন প্রাথমিক পর্যায়ে ৫০ শতাংশ আসনে ইভিএম ব্যবহার করতে চাচ্ছে বলেই আপাতত দেড় লাখ মেশিন কেনার প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে।
প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে দেড় লাখ মেশিন কেনার প্রক্রিয়া তথা কার্যক্রমে নিয়ম মানা এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখা হচ্ছে কি না, নাকি সুচিন্তিত তাড়াহুড়োর অজুহাতে আরো একটি বড় ধরনের হরিলুটের আয়োজন করা হচ্ছেÑ এ ধরনের প্রশ্ন যেমন উঠেছে, সঙ্গত বিভিন্ন কারণে তেমনি দেখা দিয়েছে অনেক সন্দেহ ও সংশয়ও। এটাই অবশ্য স্বাভাবিক। কারণ, গত বছরের জুলাই মাসে একাদশ সংসদ নির্বাচনের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে নানামুখী পরিকল্পনা পেশ করা হয়েছিল। তখনও ইভিএম-এর ব্যবহার প্রসঙ্গে সুনির্দিষ্টভাবে কিছুই জানানো হয়নি। কমিশন অবশ্য স্বীকার করেছিল যে, ইভিএম ব্যবহারের জন্য তাদের কারিগরি সামর্থ্যসহ যথেষ্ট প্রস্তুতি নেই। এসবের জন্য সময়, লোকবল এবং প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।
এটুকুই সব নয়, কথা আরো আছে। ইভিএম কেনার এবং ভোটকেন্দ্রে ব্যবহার করারও আগে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ বা আরপিও সংশোধন করতে হবে। কিন্তু বিষয়টি মোটেই সহজ নয়। কারণ, এ বিষয়ে সংশোধনের জন্য প্রথমে কমিশনকে একটি খসড়া প্রস্তুত করতে হবে। কমিশনের ভেতরে পাস বা গৃহীত হলে খসড়াটিকে ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হবে। এ ধরনের বিষয়ে মন্ত্রণালয় সাধারণত কিছু না কিছু যোগ-বিয়োগ করার জন্য খসড়া ফেরৎ পাঠিয়ে থাকে।
ফেরৎ পাঠালে মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ ও নির্দেশনা অনুসারে কমিশনকে প্রয়োজনীয় সংশোধন এবং/অথবা পরিমার্জনা করতে হবে। তারপর সেটাকে আবারও পাঠাতে হবে আইন মন্ত্রণালয়ে। মন্ত্রণালয় যদি আর কোনো পরিমার্জনা না করে তাহলে আরপিওর খসড়াটিকে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করতে হবে। এতে যে কোনো সংশোধনী আনার এবং/অথবা পরিমার্জনা করার প্রশ্নাতীত অধিকার রয়েছে মন্ত্রিসভার। তেমন কিছু করলে আবারও সেটা আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনে ফেরৎ আসবে। আর ফেরৎ যদি না আসে তাহলে খসড়াটিকে আইন হিসেবে অনুমোদনের জন্য জাতীয় সংসদে পেশ করতে হবে। সংসদে পাস হলেই কেবল সংশোধিত আরপিওর ভিত্তিতে ইভিএম-এর ব্যবহারসহ কমিশনের পক্ষে পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হবে।
বলা বাহুল্য, সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য বেশ কয়েক মাসের, এমনকি বছরেরও বেশি সময় দরকার। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি এখনও শূন্যের ঘরেই রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, ইভিএম-এর ব্যবহার প্রসঙ্গেও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক ও বিরোধিতা রয়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং তার জোটের সঙ্গীরা ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে থাকলেও দেশের জনপ্রিয় প্রধান দল বিএনপিসহ অধিকাংশ দলের পক্ষ থেকেই অন্তত আগামী নির্বাচনে ইভিএম-এর ব্যবহার করার কঠোর বিরোধিতা করা হয়েছে। বিএনপি স্পষ্ট ভাষায় আশংকা প্রকাশ করে বলেছে, এতদিন দলীয় লোকজন এবং গুন্ডা-সন্ত্রাসীদের দিয়ে জাল ভোট দেয়ার মাধ্যমে জিতে আসার ফলে বিষয়টি এখন বিশ্ববাসীর সামনেও প্রকাশিত হয়ে পড়েছে। এজন্যই নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে ক্ষমতাসীনরা যান্ত্রিক জালিয়াতির ফন্দি এঁটেছেন। সে লক্ষ্যে ষড়যন্ত্রও শুরু হয়ে গেছে। একই কারণে হঠাৎ করে কমিশন ইভিএম-এর জন্য ব্যতিব্যবস্ত হয়ে উঠেছে।
এ ধরনের কোনো বিতর্কে না গিয়েও আমরা মনে করি, কারিগরি সামর্থ্য, যথেষ্ট সংখ্যক জনবল এবং প্রশিক্ষণ ছাড়া সংসদ নির্বাচনে এখনই ইভিএম-এর ব্যবহার করা উচিত হবে না। বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন নির্বাচনের বাকি রয়েছে মাত্র চার মাসেরও কম। এজন্যই এবারের মতো প্রচলিত নিয়মে সংসদ নির্বাচন করা দরকার। পরবর্তীকালে যথেষ্ট প্রস্তুতি ও সময় নিয়ে ইভিএম সম্পর্কে চিন্তা করা ও সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে। তারও আগে কমিশনকে এই সত্যও মাথায় রাখতে হবে যে, উন্নত বিশ্বের দোহাই দেয়াটাই সব নয়। ইভিএম-এর ব্যবহার পরিত্যাগ করেছে সে কথাটাও জনগণকে জানাতে হবে। এসব কারণেই আমরা অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ইভিএম কেনার নামে নতুন কোনো হরিলুটের আয়োজন করার তীব্র বিরোধিতা করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ