ঢাকা, বৃহস্পতিবার 30 August 2018, ১৫ ভাদ্র ১৪২৫, ১৮ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনই ইমরান খানের বড় চ্যালেঞ্জ

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : নানা কারণে আলোচনা সমালোচনায় থাকা পাকিস্তান ক্রিকেটে সুদিন আসছে বলে মনে করছেন অনেকেই। কারণ দেশটির সব্বোচ্চ আসনে যিনি বসে আছেন তিনি নিজেও একজন ক্রিকেটার। শুধু ক্রিকেটারই নন, পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক এবং বিশ্বকাপ জয়ী দলপতি। তিনি হচ্ছেন ইমরান খান। তার নেতৃত্বেই প্রায় অর্ধ-শতাব্দী ধরে চলে আসা দুইদলীয় শাসনব্যবস্থা থেকে সরে এসে দেশটি এখন দেশ শাসনের জন্য তৃতীয় ও নতুন একটি দলকে বেছে নিয়েছে। এবার প্রথমবারের ন্যায় কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে পাকিস্তান তাহরিক-এ-ইনসাফ পার্টি বিজয়ী হয় এবং এই দলের নেতা ক্রিকেট জগতের সাবেক তারকা ইমরান খান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ফলে সারা দুনিয়ার দৃষ্টি এখন পাকিস্তান তাহরিক-এ-ইনসাফ পার্টি বা পিটিআই-এর ওপর। দলটির সাফল্যের ওপর এখন শুধু পাকিস্তান নয়, দুইদলীয় ব্যবস্থাধীন দুনিয়ার দেশগুলোর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপ্রবাহও নির্ভর করবে। যেহেতু ইমরান একজন তারকা ক্রিকেটার তাই সবার আগে তাকে ক্রিকেট নিয়েই ভাবতে হবে। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বি দেশ ভারতের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং নিজ দেশে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আয়োজনই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ইমরান খান ক্ষমতা গ্রহণ করে জাতির উদ্দেশে দেয়া তার প্রথম ভাষণে পাকিস্তানকে পাল্টে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ক্ষমতা আসার পরপরই বড় যে পদে পরিবর্তন হলো সেটি দেশটির ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যানের পরিবর্তন। ইমরান খান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই নাজাম শেঠির ভবিষ্যত নিয়ে চলছিল আলোচনা। গুঞ্জনগুলোই সত্যি হলো গেল সোমবার। পিসিবি চেয়ারম্যানের পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করলেন শেঠি। এর খানিকপরই টুইট করে ইমরান জানিয়ে দিলেন, পিসিবির নতুন চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পাচ্ছেন সাবেক আইসিসি প্রেসিডেন্ট এহসান মানি। যদিও আরেক সাবেক গ্রেট ওয়াসিম আকরামের নামও আলোচনায় ছিল সবার মুখে মুুখে। কারণ ওয়াসিনম আকরাম ইমরান খানের বিশ্বকাপ জয়ী দলের সদস্য ছিলেন।
ইমরানের সঙ্গে শেঠির সম্পর্কের তিক্ততা বেশ পুরোনো। পাকিস্তানের ক্রিকেটাঙ্গনে সেই শীতল সম্পর্কের কথা প্রকাশ্যও। পিসিবির গঠনতন্ত্রেই আছে, দেশের প্রধানমন্ত্রী চাইলে পিসিবি চেয়ারম্যানের পদে পরিবর্তন আনতে পারবেন। নির্বাচনে ইমরানের জয়ের পরই তাই অনেকটা নিশ্চিত হয়ে যায় শেঠির ভাগ্য। পদত্যগের আগে তৃতীয় দফায় পিসিবি চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন শেঠি। ২০১৩ ও ২০১৪ সালে ছিলেন প্রথম দুই দফায়। এরপর এবার দায়িত্বে ছিলেন গতবছর থেকে। তার নিয়োগও ছিল রাজনৈতিক। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিতি আছে তার। ক্রিকেট প্রশাসক হিসেবে এহসান মানির পথচলা দীর্ঘদিনের। ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত তিনি ছিলেন আইসিসিতে পিসিবির প্রতিনিধি। পরে আরও বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের পর ২০০৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ছিলেন আইসিসির প্রেসিডেন্ট। ২০১৪ সালে ক্রিকেট বিশ্বের আর্থিক ও প্রশাসনিক কাঠামো বদলে ‘বিগ থ্রি’-র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সময়টায় এটির কড়া সমালোচনা করে ক্রিকেট বিশ্বে আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন মানি।
ইমরান খানের আরেক চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নিজ দেশে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে ফেরানো। ২০০৮ সালে এক সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে দীর্ঘ প্রায় একযুগ ধরে দেশটিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অনুপস্থিত। দেশে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ফেরাতে চেষ্টার ত্রুটি রাখছে না পাকিস্তান। ছোট দলগুলোকে রাজি করিয়ে দুই একটা সিরিজ আয়োজন করেছে তারা। বড় দলের মধ্যে ওয়েস্ট ইন্ডিজও গত এপ্রিলে একটি টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলেছে। ওই সিরিজের সাফল্যের পর নিউজিল্যান্ডকে রাজি করানোর চেষ্টায় ছিল পাকিস্তান। ১৫ বছর পর প্রথমবারের মতো কিউইদের বিপক্ষে সিরিজ আয়োজনের সম্ভাবনাও ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো ধরণের ঝুঁকি না নেয়ারই সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডকে (পিসিবি) হতাশ করে তারা জানিয়ে দিয়েছে, এই মূহুর্তে সফরে যাওয়া সম্ভব নয়।
দেশে ক্রিকেট নির্বাসিত হবার পর সংযুক্ত আরব আমিরাতকেই হোম ভেন্যু বানিয়ে খেলছে পাকিস্তান। অক্টোবরে এখানে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তিনটি করে টেস্ট, ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলার কথা তাদের। পিসিবি খুব করে চাইছিল, অন্ততপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজটা যাতে পাকিস্তানে আয়োজন করা যায়। তবে নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট (এনজেড) জানিয়ে দিয়েছে, এটা সম্ভব নয়। এনজেডের চেয়ারম্যান গ্রেগ বার্কলে বলেছেন, দিনশেষে আমাদের উপদেষ্টা আর নিরাপত্তা রিপোর্টের কথাই মানতে হয়। সন্দেহ নেই, তারা (পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড) খুব হতাশ হবে। আমার মনে হয়, নিউজিল্যান্ডের মতো একটি দেশকে সফরে নিতে পারলে তাদের দেশে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ফেরার পথ সুগম হতো। তারা অবশ্যই হতাশ হবে। তবে তারা খুব ভালো মানুষ। আমাদের সঙ্গে পাকিস্তানের খুব ভালো সম্পর্ক। আমার মনে হয়, তারা আমাদের এই সিদ্ধান্ত মেনে নেবে। সর্বশেষ ২০০৩ সালে পাকিস্তান সফরে গিয়েছিল নিউজিল্যান্ড। ওই সময় করাচিতে টিম হোটেলের বাইরে বোমা বিস্ফোরণের পর সফর শেষ না করেই দেশে ফিরে যায় কিউইরা।
ক্রিকেটার থেকে প্রধানমন্ত্রী হওয়া ইমরান খানের আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যকার নিয়মিত ক্রিকেট ম্যাচ আয়োজন। দুই দেশের রাজনৈতিক ৗৈবরিতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে সেটি অনুপস্থিত। তবে বিশ্বকাপ এবং বিভিন্ন সিরিজে দেশ দুটি একে অপরের মুখোমুখী হয়েছিল। দেশ দুটির মধ্যে নিয়মিত ম্যাচ আয়োজনে ভারতের চেয়ে পাকিস্তানই ছিল বরাবর এগিয়ে। সম্প্রতি পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড বলেছে, ভারতের মাটিতে গিয়ে হলেও খেলতে রাজি পাকিস্তান। শুধু রাজিই নয়, তারা প্রস্তুত বলেও জানিয়েছেন পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি)। করাচি প্রেস ক্লাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনাকালে সাবেক পিসিবি চেয়ারম্যান জানিয়েছিলেন, শুধু ভারতে কেন, যে কোনো নিরপেক্ষ ভেন্যুতে গিয়ে হলেও খেলতে রাজি আছি আমরা।
২০১২ সালে সর্বশেষ ভারতের মাটিতে দু’দেশের মধ্যে কোনো দ্বি-পক্ষীয় ক্রিকেট সিরিজ আয়োজন হয়েছিল। এরপর থেকে দু’দেশের মধ্যে রাজনৈতিক সম্পর্ক অবনতি হওয়ার কারণে ক্রিকেট সম্পর্কও বলতে গেলে ছিন্ন হয়ে যান। পাকিস্তান সর্বদা চেষ্টা করে যাচ্ছে দু’দেশের মধ্যে সিরিজ আয়োজন করতে, কিন্তু ভারত কোনোভাবেই পাকিস্তানের সঙ্গে খেলতে রাজি নয়। সরকারের অনুমতি মিলছে না, এ অজুহাতে বার বারই তারা পাকিস্তানের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিচ্ছিল।
সম্প্রতি লাহোরে পিএসএলের ফাইনাল আয়োজন করে যেন পাকিস্তানের সাহস বেড়ে গিয়েছিল। তারা বড় গলায় বলতে পারছেন- আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য এখন প্রস্তুত পাকিস্তান। পিসিবি বাংলাদেশ, শ্রীলংকা, ভারতসহ বিশ্বের নানান ক্রিকেট খেলুড়ে দেশকে আমন্ত্রণ জানিয়েই যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ভারতের কাছে আইনী নোটিশও পাঠিয়ে দিয়েছে পাকিস্তান। তাদের দাবি ভারত দ্বি-পাক্ষিক সিরিজ খেলতে রাজি না হওয়ায় পাকিস্তানের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এ জন্যই তারা আইনি নোটিশ পাঠিয়েছে। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডও (বিসিসিআই) তাদেরকে সেই আইনী নোটিশের জবাব দিয়েছে।
এদিকে দেশটির ক্রিকেটারদের উজ্জীবিত করতে ক্রিকেটারদের বেতন ভাতা বাড়িয়েছে দেশটির সরকার। নতুন বার্ষিক চুক্তিতে পাকিস্তানী ক্রিকেটারদের বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে দিয়েছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি)। নতুন চুক্তিতে বেতন কমপক্ষে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পাচ্ছে তাদের। এছাড়া ম্যাচ ফিও বাড়ছে আগের চেয়ে ২০ শতাংশ। পাঁচ ক্যাটাগরিতে ৩৩ জন খেলোয়াড়কে রেখে কেন্দ্রীয় চুক্তি ঘোষণা করেছে পিসিবি। একদিকে যখন দেশের ক্রিকেটকে এগিয়ে নিতে নানা আয়োজন চলছে তখন অবহেলার অভিযোগ এনে অবসরেরও ঘোষণা আসছে। নতুন করে সাজানো বোর্ডের কেন্দ্রীয় চুক্তিতে মোহাম্মদ হাফিজকে ‘এ’ থেকে নামিয়ে ‘বি’ ক্যাটাগরিতে দেয়ার অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। যার ফলশ্রুতিতে কেন্দ্রীয় চুক্তিতে স্বাক্ষরও করেননি এই ব্যাটসম্যান।
ইমরান খানের জন্য স্বস্তির সংবাদ নিয়ে এসেছেন পাকিস্তানের কিংবদন্তি ক্রিকেটার মোহাম্মদ ইউসুফ। বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ১২তম আসর শুরু হচ্ছে আগামী ২০১৯ সালে। আর এরই মধ্যে এ নিয়ে চর্চা শুরু হয়ে গেছে ক্রিকেটারদের। তিনি বলেছেন, ২০১৯ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে হট ফেবারিট পাকিস্তান। ফখর-ইমামরা যেভাবে খেলছে, সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হবে তারাই। আগামী ২০১৯ সালের ৩০ মে উঠে ১৫ জুলাই পর্দা নামবে ওয়ানডে বিশ্বকাপের। মোহাম্মদ ইউসুফ বলছেন, ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় মঞ্চে শিরোপা উঁচিয়ে ধরবে পাকিস্তান। সরফরাজ বাহিনীর সেই সম্ভাবনা প্রবল। আগামীর ক্রিকেট শাসন করবে পাকিস্তানিরাই। নেপথ্যে জোরালো যুক্তি দেখিয়েছেন এ টেস্ট স্পেশালিস্ট, গেল চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জিতেছে পাকিস্তান। সেটি হয়েছিল ইংল্যান্ডেই। প্রথমত, এ কারণেই টুর্নামেন্টে এগিয়ে থাকবে সরফরাজরা। দলের পারফরম্যান্স এখন নজরকাড়া। প্রতিটি ডিপার্টমেন্টের মধ্যে ব্যালান্স আছে। বিশেষ করে বোলিং অ্যাটাক দুর্দান্ত। পেস-স্পিনের মধ্যে দারুণ সমন্বয় আছে। ব্যাটাররাও উন্নতি করছে। হালের ক্রিকেটের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে। পাকিস্তান ছাড়া ভারত-ইংল্যান্ডকে ফেবারিট মানছেন ইউসুফ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ