ঢাকা, বৃহস্পতিবার 30 August 2018, ১৫ ভাদ্র ১৪২৫, ১৮ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

শিরোপা না জিতলেও মেয়েদের ফুটবলে আশা বাড়ছে

মাহাথির মোহাম্মদ কৌশিক : ২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো আয়োজিত সাফ অনুর্ধ্ব-১৫ ফুটবলের শিরোপা জিতেছিল বাংলাদেশ। ফাইনালে ভারতে হারিয়েছিল ১-০ গোলের ব্যবধানে। এবার এক বছরের ব্যবধানে আরো একটি শিরোপা লড়াইয়ে নামতে হয়েছিল কিশোরী ফুটবলারদের। ফাইনালের পুরনেসা প্রতিপক্ষ ভারত এবার আর হারেনি বাংলাদেশের কাছে। বাংলাদেশকে পরাজিত করে প্রতিশোধ নিয়ে শিরোপা জিতেছে দেশটির বালিকারা। এই টুণামেন্টে জিততে না পারলেও বেশিকিছু রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশের মেয়েরা। সেগুলো নিয়ে এবারের প্রতিবেদন। বালিকাদের দক্ষিণ এশিয়ার টুর্নামেন্টে গোল না খাওয়ার রেকর্ড আরো মজবুত করেছিল বাংলাদেশ। যা অব্যহত ছিল সেমিফাইরালে ভুটারে বিপক্ষে ম্যাচ পর্যন্ত। ভুটানকে ৫-০ গোলে হারিয়ে টানা ৭ ম্যাচ নিজেদের পোস্ট অক্ষত রাখে বাংলাদেশের কিশোরীরা। ফাইনালে এসে আর তা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। প্রথম আসরে বাংলাদেশ হয় অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন। বাংলাদেশ প্রথম রাউন্ডে ৩ ম্যাচে করেছিল ১২ গোল। প্রথম ম্যাচে নেপালকে ৬-০ গোলে, দ্বিতীয় ম্যাচে ভুটানকে ৩-০ গোলে, তৃতীয় ম্যাচে ভারতকে ৩-০ গোলে হারিয়ে শীর্ষে থেকে ফাইনালে উঠেছিল বাংলাদেশের কিশোরীরা। ফাইনালে ভারতকে ১-০ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ। ভুটানে শিরোপা ধরে রাখার লক্ষ্যে ভালোভাবেই এগিয়ে গিয়েছিল লাল-সবুজ জার্সিধারী কিশোরীরা। প্রথম ম্যাচে নবাগত পাকিস্তানকে ১৪-০ গোলে বিধ্বস্ত করে দ্বিতীয় ম্যাচে নেপালকে হারালো ৩-০ ব্যবধানে। পাকিস্তানের বিপক্ষে ১৪-০ গোলের জয় দিয়ে সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ নারী চ্যাম্পিয়নশিপ মিশন শুরু করেছিল বাংলাদেশ। তবে ফাইনালে জিততে না পারলেও মেয়েদের এমন পারফরম্যান্সে দারুণ খুশি ফিফা সদস্য এবং বাফুফের নারী উইংয়ের চেয়ারম্যান মাহফুজা আক্তার কিরণ। খুশি মেয়েদের সাবেক কোচ সৈয়দ গোলাম জিলানীও। মেয়েরা জয়ের ধারা অব্যাহত রাখবেন বলে বিশ্বাস তাদের। এদিকে বাংলাদেশের আট ম্যাচে গোলের হাফসেঞ্চুরি করা হয়ে গেছে। ফাঁকা পোস্টে ছক্কার মতো বল হাঁকিয়ে বাইরে পাঠাচ্ছেন জাতীয় দলের ফুটবলাররা। গোল খরা কোনোভাবেই কাটছে না অথচ শেষ মুহূর্তে গোল খেয়ে হারের গ্লানি নিয়ে মাঠ ছাড়ছে জাতীয় দল। এভাবেই আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে ব্যর্থতার বৃত্তেই আটকিয়ে আছে পুরুষ জাতীয় দল। গোল যেন সোনার হরিণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ঘরোয়া আসরে লাখ লাখ টাকা পারিশ্রমিক পাওয়া ফুটবলারদের জন্য। গোলের খরা কিভাবে কাটবে এ নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে টানা তিন আসরে সেমিফাইনাল খেলতে পারেনি বাংলাদেশ। শিরোপা যেন স্বপ্নে পরিণত হয়েছে। হবেই না কেন গোলের খেলায় গোল করতেই ভুলে গেছে জাতীয় দল। সেখানে সাফল্য আসবে কিভাবে? পুরুষ ফুটবলে জুনিয়র লেভেলে কিশোররা অবশ্য ঠিকই গোলের দেখা পাচ্ছে। গেলবার অনূর্ধ্ব-১৯ সাফ ফুটবলে প্রথমার্ধে শক্তিশালী ভারতের বিপক্ষে ৩-০ ব্যবধানে পিছিয়ে থেকেও বাংলাদেশ জিতেছিল ৪-৩ গোলে। যা বাংলাদেশের ফুটবলে নতুন রেকর্ডই ছিল। কিশোরদের দাপট ম্লান হয়ে গেছে বাংলাদেশের কিশোরী ফুটবলারদের নৈপুণ্য। জাতীয় দলের তারকারা যেখানে গোল করতে ভুলে গেছেন সেখানে ১৫ বয়সী মেয়েরা প্রতিপক্ষদের গোলের বন্যায় ভাসিয়ে রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়ছে। ক্রিকেট ও হকিতে এগিয়ে থাকলেও ফুটবলে মানের দিক দিয়ে বাংলাদেশর তুলনায় পাকিস্তান এখনো পিছিয়ে আছে। যদিও তারা সাফ গেমসে বাংলাদেশের অনেক আগেই সোনা জিতেছে। তবু ফুটবলে এগুতে পারেনি পাকিস্তান। যাক মান যাই হোক না কেন এখনো ফুটবলে কোনো ম্যাচে বাংলাদেশ জাতীয় দল পাকিস্তানকে হারাবে তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। আসন্ন সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে গ্রুপে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ নেপাল ও পাকিস্তান। সে কারণেই কারো কারো ধারণা তিন আসরে না পারলেও এবার ঘরের মাঠে বাংলাদেশ সেমিফাইনাল খেলবেই। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন নেপাল না বাংলাদেশ হয় সেটাই অপেক্ষা। অর্থাৎ পাকিস্তানকে সেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। বাস্তবে কিন্তু ফুটবল বিশ্লেষকরা পাকিস্তানকে হালকা করে দেখছেন না। তাদের কথা তিন দলের মধ্যে নেপালকে ফেবারিট বলা গেলেও সেমিতে জায়গা করতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। তবে তা আর হয়নি। ব্যবধান ৫-০ তা অবিশ্বাস্যই মনে হতো। অনূর্ধ্ব-১৫ নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে উদ্বোধনী ম্যাচে পাকিস্তানের বিপক্ষে লড়েছিল বাংলাদেশ। মারিয়াদের এর আগে তাদের বিপক্ষে খেলার অভিজ্ঞতা ছিল না। ২০১৭ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। চার ম্যাচে ১৩ গোল দিলেও হজম ছাড়াই চ্যাম্পিয়ন। বাংলাদেশের এমন রেকর্ড ফুটবলে কোনো আসরেই নেই। তারপরেও প্রতিপক্ষ অচেনা পাকিস্তান বলেই অনেকে শঙ্কিত ছিলেন চ্যাম্পিয়ন মারিয়াদের যাত্রা জয় দিয়ে হবে কি না? কেউ কেউ বলেছিলেন ১ গোলে হলেও উদ্বোধনী ম্যাচে বাংলাদেশের জয়টা জরুরি। তানা হলে চাপে পড়ে যাবে। শুরুতেই কি না পাকিস্তানের জালে ১৪ গোল দিয়ে বাংলাদেশের ফুটবলে নতুন এক ইতিহাস লিখে ফেলল মারিয়ারা। যদিও নারী ফুটবলে এর চেয়েও বড় ব্যবধানে জয়ের রেকর্ড আছে বাংলাদেশের। কিন্তু পাকিস্তানকে এভাবে লজ্জায় ডোবানোর রেকর্ড  কোনো খেলাতেই নেই। পুরুষ জাতীয় দল যেখানে গোল করতে ভুলে গেছে সেখানে কি না এক বছরের মধ্যে কিশোরী ফুটবলাররা ৮ ম্যাচ খেলে ছাড়িয়ে গেছে অর্ধশতক গোল। যা বাংলাদেশের ফুটবলে নতুন এক ইতিহাস গড়লো মারিয়া, শামসুন্নাহার, আঁখিরা। ১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক হয় পুরুষ জাতীয় দলের। ৪৫ বছরের বিভিন্ন টুর্নামেন্ট খেলে প্রতিপক্ষের জালে হয়তোবা শত গোল দিয়েছে। বাফুফের কাছে পরিসংখ্যান নেই বলে সঠিক তথ্য দেওয়াটাও মুশকিল। ১ বছরে ৮ ম্যাচে ৫১ গোল দিয়ে কিশোরীরা প্রমাণ করেছে ফুটবল আসলেও গোলের খেলা। ভুটানে প্রথম ম্যাচ খেলেই ১৪ গোলের উৎসব করেছে। এছাড়া এবারের আসরে আলো কেড়েছেন বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়। তাদের মধ্যে অন্যতম শামসুন্নাহার। জীবনের গল্পটা তার সিনেমার মতো। এই অল্প বয়সেই অনেক চড়াই-উতরাই পেরোতে হয়েছে তাকে। মাত্র ১০ বছর বয়সে প্রেরণাময়ী প্রিয় মাকে হারানোর পর যেন পথটাই হারিয়ে ফেলেছিল। দিকভ্রান্ত শামসুন্নাহার শুধুই আকাশের পানে তাকিয়ে থাকত। হয়তো মাকে খুঁজত। কারণ ফুটবলকে ভালোবাসতে শিখিয়েছিলেন তো মমতাময়ী মা-ই। বাবার পিটুনি থেকে মা-ই তো সবসময় বাঁচিয়েছিলেন। শোকের সাগরে ভাসতে থাকা শামসুন্নাহার কূল ফিরে পায় ফুটবলের মাধ্যমে। কান্না আর কষ্ট ভুলে ফুটবলই এখন তার জীবন। এই ফুটবলই বদলে দিয়েছে তার ক্যারিয়ার। বাংলাদেশের কিশোরী ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকা ময়মনসিংহের ধোবাউড়ার মুক্তাগাছার ‘ছোট মেসি’। ময়মনসিংহের আরেক মেয়ে তহুরা খাতুনকে এলাকায় সবাই ‘মেসি’ নামে ডাকে। চমৎকার ড্রিবলিং এবং পাস দেওয়ার অসাধারণ সামর্থ্য থাকায় শামসুন্নাহারকেও তার এলাকায় ডাকে ‘ছোট মেসি’ বলে। ছোটখাটো গড়নের। ছোট বলে তাকে শেষ ৫-১০ মিনিট খেলানো হতো। কলসিন্দুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হয়ে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ফুটবলে উত্থান শামসুন্নাহারের। কিন্তু বয়স কম হওয়ায় গায়ে জার্সিও লাগত না। শুরুর একাদশে সুযোগও মিলত না। তবে যেটুকু সময় মাঠে থাকত, দর্শকদের মনজয় করত অনায়াসেই। বদলি হিসেবে নেমেই স্কোরশিটে নাম লেখাত। তাই শামসুন্নাহার জুনিয়রকে সবাই ‘সুপার সাব’ বলেই ডাকত। আসলেই তো বদলির সেরা তারকা সে। থিম্পুর চাংলিমিথাং স্টেডিয়ামে নারী সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ চ্যাম্পিয়নশিপে পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের ১৪-০ গোলের জয়ে জুনিয়র শামসুন্নাহার একাই করে চার গোল। তহুরা খাতুনের বদলি হিসেবে নেমেই বাজিমাত করে সে। বাংলাদেশের বয়সভিত্তিক নারী দলে এখন দু’জন শামসুন্নাহার। ২০১৪ সালে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে জড়ায় সিনিয়র শামসুন্নাহার। এখন কিশোরী দলে অন্যতম সেরা তারকাও সে। পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে এক গোলও করে সিনিয়র শামসুন্নাহার। এই ম্যাচে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, একাই ৫ গোল করেছে শামসুন্নাহার। শেষ পর্যন্ত জানা যায়, জুনিয়র শামসুন্নাহার একাই থিম্পু মাতিয়েছে। হংকংয়ে অনুষ্ঠিত জকি কাপেও ৪ গোল করে টুর্নামেন্ট সেরা খেলোয়াড় হয়েছিল সে। এবার এক ম্যাচেই ৪ গোল। এতটা ভাল খেলার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে শামসুন্নাহার বলেন, ’যখন যেখানেই খেলি না কেন চেষ্টা করি সেরাটা মেলে ধরতে। ৪ গোল করতে পেরেছি এ জন্য অনেক ভালো লাগছে। হংকংয়ে যেভাবে দলকে জিতিয়েছি, সাফেও তা করতে চাই।’ ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে কলসিন্দুর প্রাথমিক বিদ্যালয় বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। ২০১৪ সালে সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং ২০১৫ সালে সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়ে নিজের জাত চেনায় ছোটখাটো গড়নের শামসুন্নাহার। গত বছরের ডিসেম্বরে জাতীয় দলে প্রথম সুযোগ পাওয়ার পরই পাদপ্রদীপের আলোয় আসতে থাকে এ ফরোয়ার্ড। তবে তহুরা এবং সে একই পজিশনে খেলে বলে বদলি হিসেবেই নামতে হয় শামসুন্নাহারকে। তাতে অবশ্য কোনো আফসোস নেই তার, ‘বদলি হিসেবে খেলছি বলে খারাপ লাগে না। দেশের জন্য কিছু করতে পেরেছি বলেই আনন্দিত।’ এই শামসুন্নাহারের ফুটবলার হওয়ারই কথা ছিল না। সামাজিক বাধ্যবাধকতা তো ছিলই, রক্ষণশীল পরিবারের হওয়ায় ফুটবল খেলা আরও কঠিন হয়ে পড়েছিল তার জন্য। বাবা নেকবর আলী কখনোই চাইতেন না মেয়ে ফুটবল খেলুক। বড় ভাই হাদিউল ইসলামও বাধা দিতেন। আর শামসুন্নাহারদের বাড়িকে এলাকায় বলা হয় ‘জুম্মা বাড়ি’। বাড়ির সঙ্গেই মসজিদ। তাদের বাবা-কাকারা সবাই নামাজ পড়তেন। সেই ঘরের মেয়ে ফুটবল খেলুক এটা কোনোভাবেই চায়নি শামসুন্নাহারের পরিবার। সব বাধা জয় করে শামসুন্নাহার এখন বাংলাদেশের জাতীয় দলকে প্রতিনিধিত্ব করছে। ফুটবল খেলে যেটুকু আয় হয়, সব দিয়ে দেন বাবার হাতে। বাবাও এখন আর মেয়েকে ফুটবল খেলতে বাধা দেন না, বরং উৎসাহ দেন। এই টুকরো টুকরো ছবিই এখন মেয়েদের ফুটবলের প্রতীকি হয়ে আছে। তাহলে যে এগিয়ে যাবে মেয়েরা সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ