ঢাকা, বৃহস্পতিবার 30 August 2018, ১৫ ভাদ্র ১৪২৫, ১৮ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

৫০ ভাগ চামড়া পাচারের আশঙ্কা সাতক্ষীরাসহ সীমান্তে রেড এলার্ট

স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট (যুগ্ম জেলা জজ) জাহানারা ফেরদৌস ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আফয়া আকতারের নেতৃত্বে নগরীর হামজা খাঁ লেনে আবাসিক এলাকায় কাঁচা পশুর চামড়া মজুদ রেখে পরিবেশ দূষণের দায়ে চামড়া ব্যবসায়ী মেসার্স আবুল হোসেনের মালিককে জরিমানা করেছে চসিক ভ্রাম্যমাণ আদালত

আবু সাইদ বিশ্বাস সীমান্ত অঞ্চল থেকে: কুরবানীর পশুর চামড়া সীমান্ত দিয়ে প্রতিবেশী দেশে পাচার হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সরকারের দূর্বল বাণিজ্যনীতি ও ট্যানারির মালিকদের করা সিন্ডিকেট এর কারণে গত  সাত বছরের মধ্যে এবার চামড়ার দাম দেশে সবচেয়ে কম নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে ৫০ ভাগ চামড়া পাচারের আশঙ্কা করা হচ্ছে। পাচার রোধে সাতক্ষীরাসহ সীমান্তে রেড এর্লাট জারি করা হয়েছে। গত কয়েক দিনে সীমান্ত অঞ্চল সমূহে অচেনা মানুষের আনাগোনার খবর পাওয়া গেছে। সাতক্ষীরা ও যশোরের তিনশ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন বাসা বাড়ি,মসজিদ,হেফজোখানা,দোকান পাট,বাসাবাড়িতে চামড়া লবন জাত করতে দেখা গেছে। ফলে যে কোন মুহূর্তে তা পার্শ্ববতি দেশ ভারতে পাচার হতে পারে।
পানির দামে সাতক্ষীরায় চামড়া বেচা কেনা হয়েছে। ছাগলের চামড়া ২০ থেকে ৪০ টাকা আর গরুর চামড়া একশ থেকে ৫শ টাকায় বিক্রি হয়েছে। দাম না পেয়ে বেশির ভাগ কুরবাণিদাতারা কওমিয়া মাদ্রাসা সমূহে চামড়া দান করেছে। ঢাকাতে যে চামড়া এক হাজার থেকে বারশ টাকায় কিক্রি হচ্ছে সাতক্ষীরাতে সে চামড়া ৪শ থেকে ৫শ টাকা দাম দিয়েঠে মৌসুমি ব্যবসায়িরা। 
সাতক্ষীরা বাঙ্গালের মোড়ে অবস্থি কওমিয়া মাদ্রাসার কয়েক জন হুজুরের সাথে কথা হয়,তারা জানান, তারা এক হাজারটি চামড়া সংগ্রহ করছে।  পানির দরে সেগুলা বিক্রি করে দিয়েছি।
মাওলানা মাসুম বিল্লাহ। পাটকেলঘাটার খলিষখালি মঙ্গলানন্দকাটি ঈদগা মাঠের ইমাম। তিনি জানান, এবছর ১৯টি গরু ও ২৮টি ছাগল সেখানে কুরবাণি হয়েছে।  সব মিলিয়ে ৪৭টি পশুর চামড়া বিক্রি হযৈছে নয় হাজার টাকা। যা গত ৩০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। সরকারের বেঁধে দেয়া দরের অর্ধেক দাম  ও পাননি তারা।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম বৃহত্তম চামড়ার মোকাম যশোরের রাজারহাটে ঈদ পরবর্তী প্রথম হাট ছিল শনিবার। হাটে এসে ব্যবসায়ীরা পুরোপুরি হতাশ বলে জানিয়েছেন। তাদের দাবি প্রতিটা চামড়া তারা কেনা মূল্যের চেয়ে এক থেকে দেড়শ'টাকা কমে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন।
তবে, ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, চীনা পণ্যের উপর আমেরিকা যে ২৫ শতাংশ ভ্যাট বসিয়েছে সে কারণে চামড়ার বাজারে এই অস্থিরতা। কেননা আমাদের চামড়ার বড় বাজার চীন। বাংলাদেশের প্রায় ৬০ শতাংশ চামড়ার ক্রেতা চীন।
বৃহত্তর যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন মুকুল বলেন,‘ঈদ পরবর্তী প্রথম হাটে প্রায় ৬০ হাজার গরু ও ৪০ হাজার ছাগলের চামড়া উঠেছে। আজকের হাটে প্রায় ৫ কোটি টাকার বেচাকেনা হবে। হাট ঘুরে দেখা গেছে, এদিন গরুর চামড়া ৩৫-৪০ টাকা ও ছাগলের চামড়া ১৫-১৮ টাকা বর্গফুট হারে বিক্রি হয়েছে। সাতক্ষীরার শ্যামনগর থেকে হাটে এসেছিলেন শ্রীকান্ত বাবু । তিনি বলেন, ‘হাটে ২০০ পিস বড় সাইজের গরুর চামড়া এনেছি। এগুলো ৮০০-৯০০ টাকা দরে কিনেছি। সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করতে ও পরিবহন খরচও লেগেছে। কিন্তু হাটে দাম করছে ৭০০-৮০০ টাকা। চামড়া বিক্রি না করে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়াই শ্রেয়
 ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, আরও অন্তত দুই হাটে কোরবানির পশুর চামড়া বেচাকেনা হবে। আগামী শনিবারের হাটে কাঙ্খিত লাভের মুখ দেখতে পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন।
এবছর ঢাকায় লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়া ৪৫ থেকে ৫০ টাকা; ঢাকার বাইরে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার। এছাড়া খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ১৮-২০ টাকা এবং বকরির চামড়া ১৩-১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
গতবছর প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়া ৫০ থেকে ৫৫ টাকা; ঢাকার বাইরে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা এবং খাসির চামড়া ২০-২২ টাকা এবং বকরির চামড়া ১৫-১৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
ট্যানারি মালিকদের দাবি গত বছরের ঈদুল আযহার সময়ে সংগৃহীত চামড়ার ৪০ শতাংশের বেশি এখনও মওজুদ রয়েছে।  এছাড়া মওসুমী ব্যবসায়ীরা ট্যানারি মালিকদের কাছে গত বছরের টাকা পাবে। এ অবস্থায় চামড়ার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা চামড়া নিয়ে এবার বিকল্প চিন্তা করছে। এমন অবস্থায় প্রতিবেশী দেশের ব্যবসায়ীরা সীমান্ত জেলাগুলোতে বিপুল অংকের টাকা বিনিয়োগ করেছে। স্থানীয়ভাবে নির্ধারিত দামের চেয়ে দ্বিগুণ দাম দিয়ে তারা চামড়া কিনেছে। ফলে এবার কুরবানীর চামড়া দেশে ধরে রাখা কঠিন হবে। গত ছয়দিন ধরে চামড়া লবণজাত করে রাখা হয়েছেচ। সুযোগ বুঝে তা পাচার করা হবে।
চামড়া পাচার রোধে সীমান্তের ১১টি পয়েন্ট শনাক্ত করা হয়েছে। সাতক্ষীরার ভোমরা ও যশোরের বেনাপোল এর অন্যতম। এদিকে চামড়া পাচার রোধে ভোমরা ও বেনাপোল সীমান্তে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। সিন্ডিকেটের কবলে সাতক্ষীরা, পিরোজপুর, রাজশাহী, যশোর সিলেট মৌলভীবাজারসহ বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে কুরবানীর পশুর চামড়া ভারতে পাচার হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সক্রিয় হয়ে উঠেছে দেশী-বিদেশী চামড়া পাচার সিন্ডিকেট। 
কুরবানীর পশুর উন্নতমানের চামড়া সংগ্রহে ভারতের মাড়োয়ারী এজেন্টরা ইতোমধ্যে সাতক্ষীরার বিভিন্ন সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। চামড়ার মূল্য পরিশোধে মোবাইলে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়ে ভারত থেকে হুন্ডির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা নিয়ে এসেছে বাংলাদেশে বলে অভিযোগ উঠেছে। ভারতীয় চামড়ার ব্যবসায়ীরা দেশীয় ব্যবসায়ী ও আত্মীয়তার সুযোগ নিয়ে এ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
 সীমান্তের চোরাচালানী সিন্ডিকেট সূত্রে জানা যায়, সুযোগ বুঝে কলারোয়ার কেড়াগাছির চারাবাড়ী ঘাট, কুটিবাড়ী ঘাট, রথখোলা ঘাট, গাড়াখালী ঘাট, দক্ষিণ ভাদিয়ালী ঘাট, চান্দা স্লুইস গেট ঘাট, বড়ালী ঘাট, হিজলদী ভদ্রশাল ঘাট, হিজলদী শিশুতলা ঘাট, সুলতানপুর ঘাট, গোয়ালপাড়া ঘাট, চান্দুড়িয়া ঘাট দিয়ে মাড়োয়ারীদের অনেক এজেন্ট বাংলাদেশে প্রবেশ করে।
মাড়োয়ারী এজেন্টরা সীমান্তবর্তী কলারোয়া, সাতক্ষীরা, দেবহাটা, কালিগঞ্জ, শার্শা, ঝিকরগাছা উপজেলার গ্রাসে গ্রামে ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সর্ববৃহৎ চামড়ার বাজার সাতক্ষীরার পারুলিয়া ও যশোরের রাজারহাটে চামড়া কেনার জন্য মওসুমী ব্যবসায়ীর হাতে টাকা তুলে দিচ্ছে। সরকারের বেধে দেয়া নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা বেশি দামে চামড়া কিনেছে। 
সাতক্ষীরার ১৩৮ কিলোমিটার সীমান্ত দিয়ে যাতে কুরবানীর চামড়া ভারতে পাচার না হতে পারে সেজন্য বিজিবি কঠোর অবস্থানে।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্যাহ  বলেন, এবছর ৯০০ থেকে ১১০০ টাকার মধ্যে গরুর লবণবিহীন কাঁচা চামড়া বেচাকেনা হচ্ছে। সরকার নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী এবছর চামড়ার দাম গতবছরের তুলনায় একটু কম।
সাতক্ষীরা ৩৩ বিজিবি’র ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ল লে. কর্নেল সরকার মোস্তাফিজুর রহমান জানান, চামড়া আমাদের একটি জাতীয় সম্পদ তাই সাতক্ষীরায় সীমান্ত দিয়ে যাতে কোন চোরাচালানী ভারতে চামড়াসহ কোন ধরনের চোরাচালানী পণ্য পাচার না করতে পারে সেজন্য সমগ্র সীমান্ত এলাকাজুড়ে বিজিবি বিশেষ সতর্কাবস্থাসহ গোয়েন্দা নজরদারীতে রয়েছে। 
সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার মো. সাজ্জাদুর রহমান জানান, সাতক্ষীরা সীমান্ত দিয়ে যাতে কোন চোরাচালানী পরিবহন যোগে চামড়া সীমান্ত এলাকায় নিয়ে পাচার করতে না পারে সেজন্য পুলিশের কঠোর নজরদারী রয়েছে।
 চামড়া শিল্পের বর্তমান দুরবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, গত বছর যেসব কারখানা বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল তারা এখনো উৎপাদনে যেতে পারেনি। আর আস্থার সঙ্কটের কারণে দীর্ঘদিনের বিদেশী ক্রেতারা অন্য দেশে চলে গেছেন। সর্বপরি সরকারের দুর্বল বাণিজ্য ও পররাষ্ট্রনীতির কারণে চামড়া শিল্প আজ ধ্বংসের পথে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ