ঢাকা, শুক্রবার 31 August 2018, ১৬ ভাদ্র ১৪২৫, ১৯ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

অসুস্থ নজরুলের সুস্থ অনুভব

শফি চাকলাদার : প্রিয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৯৪২ সালের ১০ জুলাই থেকে অসুস্থ। তার মৃত্যু হয় ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট (ক্যালেন্ডার তারিখ পরিবর্তনে ২৭ আগস্ট)। দীর্ঘ ৩৪ বছর এক মাস ১৯ দিন। বলতে হয় কবির অসুস্থতার কারণ তার মস্তিষ্কের পেছনে কে বা কারা লাঠির প্রচ- আঘাত করে এবং এই কারণেই কবির অসুস্থতা। এই দীর্ঘ অসুস্থতার সময়কালে কবি কিছু অনুভব করতেন? কিছু কি বুঝতেন? কবিকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয় ১৯৭২ এর ২৪ মে। এর কিছু মাস পর থেকেই আমি কবির কাছে থাকার সুযোগ পাই। কবির বড় পুত্র কাজী সব্যসাচী ইসলাম আমাকে এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেন পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকারও এ দায়িত্বভার আমায় দেয়। কবির কাছে থাকার ফলে কবির অনুভবগুলো ভালো করে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেয়েছে। 

আমার কাছে মনে হয়েছে নজরুল অনেক কিছু বুঝতেন। অনুভব করতেন। তার কিছু প্রকাশের মাধ্যমে আমার কাছে তেমনই মনে হয়েছে। যেমন সে রাতটি ছিল শব-ই-বরাতের। রান্না করতে একটু দেরী হয়েছিল। তাকে ৮ টা থেকে রাত ৯ টার মধ্যে রাতের খাবার দেয়া হতো। কিন্তু সেদিন ব্যস্ততায় তা হয়ে ওঠেনি। রাত প্রায় ১১ টার দিকে যখন রাতের খাবার নিয়ে যাওয়া হয়, পরিচারিকা লুৎফা তার নিকট খাবার নিয়ে গেলে কবি তা ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। আচমকা ধাক্কাতে হাতের প্লেট পড়ে ভেঙে যায়। ভেঙে যাওয়ার শব্দে আমরা ছুটে গেলাম। কবির চোখে মুখে অস্থিরতা। রেগে গেছেন কবি। কেন এত দেরী করে খাওয়া দেয়া হলো। কবির খুব ক্ষিধে পেয়েছিল, তাই অমন আচরণ। খাবার দেরীতে পরিবেশন, তার এতে করে ক্ষিধে পাওয়া এবং তার প্রকাশ, কবির অনুভবে যদি নাই অনুভব হতো তাহলে তো কবি এমন আচরণ করতেন না। দিনটি ছিল ১৯৭৪ এর ২রা সেপ্টেম্বর। 

এত এত স্মৃতি নজরুলকে নিয়ে। অম্লান হয়ে আছে স্মৃতিতে। কবি যখন ঘুম থেকে উঠতেন এবং যখন কবি ঘুমিয়ে পড়তেন সকল কিছুই আমি লক্ষ্য করতাম। কবি সকালে সেই ফজর ওয়াক্তেই ঘুম থেকে উঠতেন। শুয়েই থাকতেন। তার গা থেকে কম্বল সরিয়ে নিলেই কবি উঠে পড়তেন, অবশ্য হাত বাড়িয়ে সাহায্য করতে হতো। দাঁড়ালে অপেক্ষা করতেন কাপড় বদলাবার জন্য। পায়খানা-পেশাব বিছানাতে করতেন। হেঁটে চলতেন সারা ঘরময়। বিছানা করা শেষ হলে  বিছানায় গিয়ে বসতেন, নাস্তা করতেন। অপেক্ষা করতেন গান শোনার জন্য। এটা দৈনিকের অভ্যেস। কত স্মৃতি যে এই কবির গান শোনা এবং গান শোনানোর মধ্যে জমে আছে তার ইয়ত্তা নেই। সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা-রাত। কবি কখনো গান শুনে হাসতেন, হাতে তালি বাজাতেন। বসে শুনলে উরুতে হাত রেখে তাল দিতেন। কখনো হারমোনিয়ামের উপর রাখা গানের খাতা টেনে নিয়ে পৃষ্ঠা উল্টাতেন। বিঝে আঙ্গুল লাগিয়ে পৃষ্ঠা ওল্টাতেন। কখনো ওল্টানো থামিয়ে যে গানটি বের হতো তাই হারমনিয়ামের ওপর রেখে আঙ্গুল দিয়ে নির্দেশ করতেন, চোখের ইশারা করতেন খাতায় ওল্টানো গানটি গাইবার জন্য। আমার এবং আমরা যখন এমন অবস্থার সম্মুখীন হতাম তখন শিহরণ লাগত। কবির অনুভূতি তার মুখাবয়বে ফুটে উঠত। হাস্যোজ্জ্বল মুখম-ল। বেশি ভাল লাগলে কবি হাত দিয়ে মাথায় অঙ্গুলি চালনা করতেন। মুখে বিড়বিড় করতেন অস্ফুট সে শব্দ, কিন্তু বুঝে নিতাম কবির এমনতর প্রকাশকে। তবে জমজমাট গান যখন আমরা একাধিক শিল্পী মিলে পরিবেশন করতাম কবির তখন আনন্দ আর ধরে না। চঞ্চল হয়ে উঠতেন। মুখের বিড়বিড় করা বেগ আরো দ্রুততর হয়ে উঠত। অদ্ভুত সে সময় সে ক্ষণগুলো। কবি বুঝতেন। একদম যে বুঝতেন না এটা মোটেও ঠিক নয়। কারণ তার অভিব্যক্তি তার চোখের কোণে মুখম-লে ফুটে উঠত যে ‘আমার অনুভবে এই মুহূর্তগুলো ঠিকই আঘাত হানছে’। বিছানাতে বসে কবি যখন গান শুনতেন, তার হাতের আঙ্গুল দিয়ে হাঁটুর উপরে যখন তাল দিতেন তখন এটা বুঝতে একটু বাকি থাকত না যে, কবি গানগুলো বেশ নিবিড় আগ্রহে শুনছেন। আমি এবং আমরা যারা কবির এই বিস্ময়-ভরা মুহূর্তগুলো দেখতাম তখন বিস্মিত হতাম। আর ভাবতাম এমন একজন মানুষকে কারা এমন করল?

কবি গাড়িতে চড়তে ভালবাসতেন। ভকসওয়াগন হোক কিংবা মাইক্রো হোক গাড়িতে চড়েই কবি বেশ উৎফুল্ল হয়ে পড়তেন। ড্রাইভারের পাশের সীটেই কবিকে বসানো হতো। কবি যাতে ছুটন্ত গাড়ির গতির সাথে চলমান দৃশ্য দৃশ্যগুলো অবলোকন করেন। কবি খুশি হতেন। মুখের বিড়বিড় করার সাথে মনে হতো ঐ বিড়বিড় করণের সাথে কবি যেন কিছু বলতে চাইছেন। হয়তো তার অনুভবগুলোর সাথে শেয়ার করতে বলছেন? কখনো গাড়ির স্পীড বাড়াতে ড্রাইভারকে আঙ্গুল দিয়ে খোঁচাচ্ছেন। গাড়ির স্পীড বাড়ালে কবি আরো খুশি হতেন। অস্ফুট বিড়বিড়তার মাঝে তা স্পষ্ট প্রকাশ পেত। গাড়িতে ঘুরে বেড়ানো কবির আনন্দ নিয়ে একটি ঘটনা স্মৃতিতে অমলিন হয়ে রয়েছে। প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্ব কাদের সিদ্দিকী একবার কবিকে টাঙ্গাইলে নিয়ে যেতে দাওয়াত করলেন। দিনটি ছিল ১৯৭৪ সালের ১১ মে। ড্রাইভারের পাশে কবি এবং তার পাশে আমি। কবি সামান্য অসুস্থও ছিলেন। আগের রাতে কবির ডান চোখে ঠা-া লাগার ফলে লাল হয়েছিল। ঐ নিয়ে টাঙ্গাইল ভ্রমণ করেছিলাম কবি পরিবার, আমি এবং ক’জন। পুরো পথটায় কবি উৎফুল্ল ছিলেন। পথিপাশের মনোরম দৃশ্যাবলী কবিকে হয়তো আকৃষ্ট করেছিল। স্পীড বাড়ানোর জন্য বারংবার কবি ড্রাইভারকে খোঁচাচ্ছিলেন। খুশিতে মাথায় অঙ্গুলি চালনা করছিলেন, পাশে বসে থাকা একবার আমার দিকে আরেকবার ড্রাইভারের দিকে তাকাচ্ছিলেন। অব্যক্ত খুশিটা প্রকাশ পাচ্ছিল। গাড়ির স্পীডে একটি ঘুঘু পাখি গাড়ির সামনের কাঁচের সাথে ধাক্কা খেয়ে মরেছিল। টাঙ্গাইলে ঐ দিন বৃষ্টি হচ্ছিল। তবুও কবিকে টাঙ্গাইলের বিখ্যাত ‘নজরুল সেনারা’ যেভাবে গার্ড অব অনার’ দিয়েছিল তা মনে রাখার মত। ছাতার আড়াল করে কবিকে কিছুক্ষণের জন্য গাড়ি থেকে নামানো হয়। টাঙ্গাইলে বীর মুক্তিযোদ্ধা কাদের সিদ্দিকীর আতিথেয়তা ভুলবার নয়।

আরো একটি দৃশ্য আমাকে প্রায়ই দোলা দেয় যে, কবি গান শুনে হাসতেন। কিন্তু বেশি হাসলেই চোখের কোনে অশ্রু দেখা দিত এবং কখনো কখনো তা গড়িয়ে পড়ত। মাথায় আঙ্গুল বুলাতেন, এক্ষেত্রে ডান হাতটাই বেশি ব্যবহার করতেন। কবি যে কিছু বুঝতেন তা অনেক ক্ষেত্রেই আমি লক্ষ্য করেছি। যেমন গানের সময় তবলা-ডুগি পরে আছে কেউ সঙ্গত করছে না। তখন কবি ইশারা করতেন হাত দিয়ে কারো পানে এবং তবলার দিকে- সঙ্গত করবার জন্য। এটাও লক্ষ্য করা গেছে, শিল্পী গাইছেন কিন্তু তবলচী সঙ্গত না করে বসে আছেন তখনও হাত বাড়িয়ে ইশারা করতেন সঙ্গত করবার জন্য। কবির এই অনুভব দেখে দেখে আমারও মনে প্রশ্ন জাগত যে কবি একেবারেই যে বুঝতেন না এটা ঠিক নয়। শুনতাম কবি কারো হাতে ছাতি দেখলে ক্ষেপে উঠতেন কিংবা কারো চক্ষে চশমা বা গগলস সানগ্লাস দেখেও তেমনি রেগে উঠতেন। তবে আমার চোখে এমনটা কখনো ঘটেনি। তবে হাতিওয়ালা বা চশমা ওয়ালাদের তিনি পছন্দ করতেন না। মনে পড়ে এক ভদ্রলোক কবির ঠিক পাশে বসেই কবি যে রুমে টিভি দেখতেন সেখানে সিগারেট খাচ্ছেন, কবি এটা দেখে ধমক দিচ্ছিলেন। অবশেষে সিগারেটটা ভদ্রলোকটির হাত থেকে কবিই ফেলে দিয়েছিলেন। এরকম অনেক ঘটনাই মনে পড়ে। একদিন কবিকে নিয়ে কবি ভবনের সামনের লনে পায়চারি করছিলাম। এমন সময় একজন গাড়িওয়ালা এক ভক্ত কবিকে দেখতে এলেন। কবি এতক্ষণ লনের যে দিকটায় পায়চারি করছিলেন, গাড়ি দেখে সেদিক ছেড়ে আস্তে আস্তে গাড়ির পাশে এসে দাঁড়ালেন এবং ধীরে ধীরে কবি তার কাঁপা কাঁপা হাতের ছাপ গাড়ির দরজায় রাখলেন। কবির চোখের চাহনি তখন বলছিল ‘কই, কেউ দরজাটা খুলে দিচ্ছে না কেন? গাড়িতে চড়ব যে-। অবশেষে কবিকে নিয়ে আমি সরে এলাম অথচ গাড়িওয়ালা ভক্তটির প্রাণে কবির কাঁপা হাতের গাড়ির দরজা খোলার কম্পন এক মুহূর্তের জন্য দোলা দেয়নি। আমার তখন মনে হচ্ছিল কবিরওতো গাড়ি ছিল, তার মনে কি সেই সময়ের কথা দোলা দিচ্ছিল? কবির ডায়বেটিস ছিল বলে মিষ্টি তাকে অপারগ না হলে দেয়া হতো না। কবিকে শ্রদ্ধা জানাতে এসে কৌতূহলী ভক্তরা জিজ্ঞেস করতেন, কবি কি কি খেতে ভালোবাসেন। ফল-ফলাদি নিয়ে আসতে বলা হতো। একবার এক ভক্ত ছোট্ট একটি বাক্সে ৫টি সন্দেশ দেন কবিকে খাওয়াবার জন্য। তারিখটা ছিল ১৯৭৫ সালের ২৯ মে। সন্ধ্যার পর কবিকে নিয়ে টিভি দেখার সময় সিএন্ডবি থেকে নিযুক্ত দারোয়ান খালেককে সন্দেশের বাক্সটি কবিকে এনে দিতে বললাম। কবিকে ইঙ্গিতে বলা হলো কিভাবে খেতে হবে। কবির সামনে বাক্স তুলে ধরলে কবি নিজ হাতে একের পর এক সাধারণ সুস্থ মানুষের মত ৫টি সন্দেশই খেয়ে নিলেন। খাওয়া শেষে বাক্সের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়েও ছিলেন। যেন বলছেন, আরো দাও, আর নেই? ১৯৭৪ সালের ২৭ মে আফ্রিকা মহাদেশের দেশ সেনেগালের প্রেসিডেন্ট লিওপোল্ড সেডর সেনঘর বাংলাদেশ সফরে এসে কবিকে শ্রদ্ধা জানিয়ে যান ধানমন্ডির কবি ভবনে দুপুরের দিকে। সেনঘর স্বয়ং একজন কবি ছিলেন। নজরুলের পাশে প্রায় বিশ মিনিটের মত ছিলেন। সেনঘর এবং কবির দৃষ্টি বিনিময়ও হয়েছে। কবি তখন কি ভাবছিলেন তা কেবল অনুভবেই বুঝতে হয়। এমন করে ১৯৭৩ সালের ২৫ জানুয়ারি নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্ঞনেন্দ্র বাহাদুর কার্কি বাংলাদেশ সফরে এসে সস্ত্রীক কবিকে শ্রদ্ধা জানিয়ে গেছেন। ১৯৭৫ সালের ১৭ই এপ্রিল ভারতের কৃষি বিষয়ক স্টেট মন্ত্রী কে.এন. সিং কবিকে শ্রদ্ধা জানিয়ে গেছেন।

একবার এক বৃদ্ধ মুখে সাদা দাঁড়ি, লুঙ্গী পড়া পরণে পাঞ্জাবী, বয়স প্রায় সত্তুরের মত, এসেছিলেন কবিকে শ্রদ্ধা জানাতে। কবি সে সময় কবি ভবনের সামনে চেয়ারে রোদে বসেছিলেন। ফেব্রুয়ারি ১৯৭৫, শীতও ছিল। কাউকে কিছু না বলে বৃদ্ধ এসে কবির পায়ের কাছে বসলেন। কবির পায়ে তখন জুতা ছিল। হঠাৎ বৃদ্ধ লোকটি কবির পায়ের জুতার নিচে লেগে থাকা মাটি তুলে নিজের সারা মুখটাতে মেখে নিলেন। এরপর অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে আমায় বললেন, আমি কবির একজন ভক্ত। লেখাপড়া তেমন জানি না। তবুও ছোটকাল থেকে কবির লেখা কাগজে বেরুলে কেটে রাখতেন, এমনকি কবির ছবিও কেটে রাখতেন। আজো তিনি সেগুলো সংগ্রহে রেখেছেন। কবিকে দেখার অনেকদিনের সাধ পূরণ করলেন এবং কবিকে দেখতে পেয়ে এবং শ্রদ্ধা জানাতে পেরে তিনি কত যে খুশি সেটা তার মুখেই প্রকাশ পাচ্ছিল। অপরদিকে কবিও লোকটির দিকে তাকিয়ে কী ভাবছিলেন তা একমাত্র কবিই জানেন? 

একবার ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাই কমিশনার শ্রী সমর সেন একজন শিল্পী সমেত কবিকে দেখতে এলে সেই শিল্পী নজরুলের ‘আমার কালো মেয়ের পায়ের তলায়’ গাইলে আমি নজরুলের ‘মোহাম্মদের নাম জপেছিলি বুলবুলি তুই আগে’ গেয়েছিলাম। কবির অমর সৃষ্টি ইসলামী সঙ্গীত এবং শ্যামা সঙ্গীত কবির সম্মুখে পরিবেশিত হলে শ্রী সেন খুশী হয়েছিলেন।

পশ্চিম বঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী শ্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় স¤্রীক ১৯৭২ সালের জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে বাংলাদেশ সফর কালে কবিকে দেখতে এসেছিলেন কবি ভবনে। এত বড় বাড়ি কবি’র জন্য বরাদ্দ হয়েছে দেখে তারা অবাক এবং সাথে সাথে খুশীও হয়েছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের প্রখ্যাত রবীন্দ্র বিশারদ শ্রী কৈালজারজুন মজুমদারও আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন পুরো বাড়িটাই কবির জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে কি? সত্যি! আশ্চর্য হবার কথাই। কারণ কবির সুদীর্ঘ জীবনে এত এত কবির বন্ধু আপনজন বলে বিবেচিত স্বীকৃতরা পশ্চিমবঙ্গে কবির আশেপাশে থাকা সত্ত্বেও কবিকে সিআইটি বিল্ডিংসে চতুর্থ শ্রেণির অফিসারদের জন্য বরাদ্দ একটি ফ্ল্যাটে কবি-পুত্র কাজী সব্যসাচী ইসলামের নামে বরাদ্দ দোতলার ছোট্ট দুটো রুমের একটিতে শেষ দিনগুলোর অতিবাহিত করছিলেনÑ সেখানে এত বড় বাড়িÑ অবাক হবারই তো কথা?

যারা কবিকে দেখতে কিম্বা শ্রদ্ধা জানাতে আসতেন তাদের মধ্যে কেউবা গান শোনাতেন কেউবা আবৃত্তি করতেন, কেউবা প্রবন্ধ গল্প পড়ে শোনাতেন, কেউবা নাচ করতেন, কেউবা বাঁশী সেতার গীটার ম্যান্ডোলিন বেহালা বাজিয়ে শোনাতেন। কাউকে দেখা যেত কবির পা ছুঁয়ে কদমবুসি করতে, কেউ বা হাত মেলাতেন, কেউ বা কবির হাতে কিম্বা কপালে চুমো দিতেন, কেউবা দূর থেকেই অভিবাদন করে দাঁড়াতেন, কেউবা শুধু সেরেফ কবিকে এক পলক দেখে যেতেন। এদের মধ্যে অনেকেই কবির দৈনন্দিনের খোঁজ খবর নিতেন। প্রত্যেককেই জানাতে হতো কবির দৈনন্দিন ঘটনার কিছু কিছু। মাঝে মাঝে দু’একজন আসতেন যাঁরা গান জানতেন কিন্তু হারমোনিয়াম বাজাতে পারতেন না, সে অবস্থায় তাদের সঙ্গে হারমোনিয়াম বাজাতে হত। মাঝে মধ্যে তবলচী না থাকলে তবলাও সঙ্গত করতে হত আমাকে। এই সময়গুলোতে কবি গান শুনতেন, কাঁদতেন, হাসতেন, শিল্পীর সামনে হারমোনিয়ামের উপরে রাখা খাতা তুলে নিতেন, জিভে আঙ্গুল ভিজিয়ে পাতা ওল্টাতেন, দেখা শেষ হলে হয় শিল্পীর সামনে যথাস্থানে রেখে ইশারা করতেন খাতার গানটি গাইতে নয়তো খাটের মাথার পাশে ফেলে রাখতেন। এখানে বলা দরকার কবি যখনই হাসতেন কিম্বা বেশি খুশি হতেন তখনই মাথায় হাত দিয়ে চুলকাবার মত আঙ্গুল বুলাতেন, মুখ নাড়াতেন বেশি। অব্যক্ত এক রকমের শব্দ করতেন, নাকে মুখে বারে বারে হাত রাখতেনÑ অবশেষে চোখে মুখে কান্নার ভাব করতেন এবং অনেক সময় চোখের কোণে পানিতে ভিজে গড়িয়ে পড়ত। আবার হয়তো গানের সময় গানের মধ্যেই ধমকে উঠতেন, ভক্তদের আঙ্গুল দিয়ে হারমোনিয়াম-তবলা দেখাতেন গান পরিবেশন যখন না হত সে সময় এরকমটা করতেন। ভক্তদের চোখে চোখ রাখতেন। শুয়ে পড়তেনÑ গান নেইতো বসে থেকে কি হবে, এই যেন ভাবটা। আবার হয়তো উঠে পড়তেন, সামনের বারান্দায় চলে যেতেন, খানিকবাদেই ফিরে আসতেন। কখনো বরান্দায় চলে গেছেনÑ আসছেন না, দেরী করছেনÑ হারমোনিয়ামে আওয়াজ করলেই চলে আসতেন। এসে বসতেন, গানের জন্য অপেক্ষা করতেনÑ নয়তো উটে আবার চেয়ারে গিয়ে বসতেনÑ এমনি করে কেটে যেত কবির সময়। ভক্তরা আনন্দ পেতেন। যারা দেখতে আসতেন তাদের মধ্যে কেউ গান না জেনে থাকলে আমাকে গাইতে হত। গানের কবির গান শুনে কেমন ব্যাকুল হয়ে পড়তেন স্বচক্ষে দেখে তারা আনন্দ পেতেন। দোয়া করতেন ভক্তদের মধ্যে কেউ হয়েতো বলে যেতেন আপনি গান করলেন বলেই এ দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য হল নইলে এ দৃশ্য কথা শুধু পত্রিকা মারফত জানতানÑ স্বচক্ষে দেখার সৌভাগ্য হত না।

কবি তাঁর নাতি-নাতনীদের খুব ভালবাসতেন। একটি ঘটনা উল্লেখ করছি। সকালে কবি শুয়েছিলেন। আমরা গান শোনাবার জন্য তৈরি হচ্ছি ও দিকে নাস্তারও সময় হয়েছে। পাশের চেয়ারে বসে মিষ্টি কাজী এবং আমি গল্প করছিলাম। আমাদের গল্পের ফাঁকে কবি বিছানা ছেড়ে উঠলে মিষ্টি গিয়ে কবির বিছানায় শুয়ে পড়ল। কবি পায়চারি করে ফিরে এসে মিষ্টিকে তাঁর বিছানায় দেখে কাছে এসে প্রথমে নিজের মাথা চুলকালেন এবং বিড়বিড় করে স্বভাবগত ঠোঁট নাড়লেন মিষ্টির পায়ের কাছে বসে আবারও উঠেও গেলেন। মিষ্টিও উঠে এলে আমি গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। এবার কবি পায়চারি করে ফিরে এসে আমাকে বিছানায় দেখে আমার হাত ধরে টানাটানি করতেই আমি উঠে পড়লাম। এবং কবি বিছানায় শুয়ে পড়লেন। শোনা যায় মা-বাবার রাগের কারণে নাত-নাতনীরা দাদু (নজরুল)’র কাছে ছুটে এলে দাদু তাদের আড়াল করতেন।

কবি মাঝে মধ্যে নিজের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিতেন। বিশেষ করে, সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় ওঠার সময়। মাঝে মধ্যে কিছুতেই তিনি উঠতে চাইতেন নাÑ তখন তাঁর ইচ্ছাকেই রাখতে হত। এবং ইচ্ছে করেই ড্রইং রুমে গিয়ে বসতেন। সাধারণত ড্রইং রুমটার দরজা খোলা থাকলেই কবি এমনটা করতেন। তাই লনে পায়চারির পরপরই কবি’র উপরের তলায় ওঠার পূর্বে ড্রইং রুমের দরজা খোলা থাকলে বন্ধ করে দেয়া হত। কবি মাঝে মাঝে কবি ভবনের সামনের ২৮ নং রোড দিয়ে কিছুদূর হেঁটে আসতেন। সাথে আমি অথবা অন্য কেউ থাকত। তবে কেরার পথে কবিকে ছেড়ে তাঁর আগেই চলে আসলে লক্ষ্য করতাম কবি তাঁর বাড়ির দরজা চিনতে পারেন কিনা। প্রতিবারই তাঁর বাড়ির দরজা ঠিকই চিনতে পারতেনÑ ভুল করেননি কোনবারও। একবার রেডিও বাংলাদেশ থেকে ‘শাপলা-শালুক’ এর ছোট ছোট ভাই-বোনরা পহেলা বৈশাখ ১৩৮২ তে এসে কবিকে গান, কবিতা আবৃত্তি, নাচ করে বেশ আনন্দ দিয়েছিল। কবি বেশ উপভোগ করেছিলেন ছোটদের অনুষ্ঠানটি। অনেক ভক্তের দিকে কবি স্বেচ্ছায় হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন আবার এর বিপরীতও দেখা গেছে। কবি ভয় পেতেন অন্ধকারকেÑ পিজি হাসপাতালে (বর্তমানে বিএসএমএমইউ) ভর্তি হবার কিছুদিন পূর্ব থেকে এই অন্ধকারকে ভয় করা কমেছিলÑ অবশ্য ডা. বি. কে. পন্নীর হোমিওপ্যাথ চিকিৎসা চলছিল সে সময়। অন্ধকার ছাড়াও কবি ভয় পেতেন তাঁর দিকে কিছু ছুঁড়ে মারার ভঙ্গি করলে। যেমন তবলা বা বায়া হাতে তুলে তাঁর দিয়ে ছুঁড়ে মারার ভঙ্গি করলে তিনি দুই হাত দিয়ে তা ফেরাবার মতো করে উঠতেন। অন্যরকম ভয়ও পেতেন, যেমন একবার হাসপাতাল থেকে ক’জন ডাক্তার কবিকে ‘চেকআপ’ করার জন্যে একত্রে হঠাৎ করে রুমে ঢুকে ঝটপট কবিকে শুইয়ে ব্লাডপ্রেসার ইত্যাদি পরীক্ষা করার ফলে কবির প্রেসার বেড়ে গিয়েছিল উত্তেজনা ও ভয়ে। কারণ, হঠাৎ ৪/৫ জন অচেনা লোককে এমন করতে দেখেই অমন প্রতিক্রিয়া হয়েছিল নইলে অন্যান্য সময় ক্লাড প্রেসার যন্ত্র কবির হাতে লাগলেও কবি ভয় পেতেন না।

কবি রাগ করতেন। হাতের নথ পায়ের নখ কাঠার সময় হঠাৎ করে যদি কেটে যেত এবং রক্ত বের হত কিম্বা শেভ করার সময় যদি কেটে যেত এবং তা থেকে রক্ত বের হত তখন কবি রেগে যেতেন। বিশেষ করে সে ক্ষত দিয় রক্ত বেশি দেখলে রাগের মাত্রা একটু বেশি লক্ষ্য হত। ধমকে উঠতেন তবে সে রাগ বেশিক্ষণ থাকত না। অসুস্থতার কারণে কবির নখের ঠিক নীচের অংশ সামান্য বেড়ে যাওয়া নখও স্বাভাবিকের চাইতে একটু বেশি রাখতে হতÑ তবে এটা বাইরের কেউ বুঝতে পারত না।

কবি ফুল খুব ভালবাসতেন। এটা অবশ্য আমি কবির সাহিত্যÑ সঙ্গীত নিয়ে গবেষণা করে প্রায় ১৭৫ প্রকার ফুলগাছ, গাছ-গাছালি পেয়েছি, কবি’র উপমায়। ‘নজরুলের উপমায় ফুল’ আমার এই গ্রন্থটি পড়লে জানা যাবে। কবি মাঝে মাঝে কবি ভবনের ফুল বাগানের পাশে বসতেন, হাঁটতেন, ইশারা করে ফুল দেখিয়ে দিতেন। দেখিয়ে দেয়া ফুলটি ছিঁড়ে তাঁর হাতে দিলে তিন্নি একাগ্র মনে ফুলটি দেখতেনÑ চোখের কোণে হাসির রেখা ফুটে উঠত। এরপর ফেলে দিতেন। যেমন তাঁর গলায় মালা পরালে তিনি সে মালা সাথে সাথে ডান হাত দিয়ে খুলে ফেলতেন। খুলে ফেলার সময় মাথায় আটকে গেলে ‘দু’হাতই ব্যবহার করতেন। ফেলে দিয়ে আবার তা তুলে দিতে ইঙ্গিত করতেও দেখা গেছে। তুলে দিলে আবার ফেলে দিতেন। ফুলের তোড়াও তিনি এমনি গ্রহণ করে হাতে নিতেন এবং ফেলেও দিতেন।

এটাও লক্ষ্য করেছি যে হয়তো কবি যে রুমে থাকতেন তার পাশের রুমে আমরা ক’জন বসে গল্প করছি। আমাদের কথাবার্তা বা পড়ার আওয়াজ শুনে চলে আসতেন একাকীই। এসে বসতেন গল্প শুনতেন। কিছুপর একাকীই আবার নিজের রুমে চলে যেতেন। কবি টিভি দেখতেন এবং এই টিভি দেখাটা যখন অভ্যেসে পরিণত হল তখন সন্ধ্যের পর টিভি দেখাতে কেউ তাকে নিয়ে না এলে কবি একাকীই তার রুম থেকে চলে আসতেন দুটো দরজা পেরিয়ে টিভি রুমে। বসে পড়তেন সোফায়। মনযোগের সাথে টিভি দেখতেন। কেউ ডিস্টাব করলে তার পছন্দ হত না। টিভি দেখতে দেখেতে বসে বসেই তার শরীর সামনে ঝুঁকে পড়তো। Ñ আর এমনি সময় তাকে ছুঁলে কিম্বা আওয়াজ করলে তিনি তার থেকেও জোরে ধমক দিয়ে সেই দিকে তাকিয়ে থাকতেন পরে আবার মনোনিবেশ করতেন। একবার মিষ্টি কাজী জুতা পরে গান করছিলোÑ কবি বারংবার তালি দিয়ে ইশারা করে ঐ জুতার দিকে দেখাচ্ছেন অর্থাৎ খুলে ফেলতে বলছেন। আগের দিনে জুতা পরে গান করা হতো না। কবির সবচেয়ে নিদারুণ কষ্টের দিনগুলো ছিল শেষ জীবনের হাসপাতাল জীবন। সেখানে না ছিল গান, না ছিল খোলামেলা পরিবেশ না ছিল আনন্দদায়ক মুক্ত বাতাস। হাসপাতালে কবির ব্রনকাইটিস জাতীয় অসুখও একাধিকবার হয়েছিল। কবির মৃত্যুর মাস ছেড়েক পূর্বে একবার কবিকে দেখতে গিয়ে দেখি কবির বাম হাতখানা ফুলে আছে। কর্তব্যরত ব্রাদারকে জিজ্ঞেস করায় জানা গেলে ‘ম্যাসেজ’ এর জন্য টানাটানি করার ফলে আঘাত লেগে ফুলে গেছে। কবি কখনোই তার হাত টানাটানি করতে দিতেন নাÑ যার ফলে টানাটানিতে একটু জোর দেয়ায় মচকে সম্পূর্ণ হাতটাই ফুলেছিল। ঐ ফোলা হাতটায় স্পর্শ করায় কবির শরীর কেঁপে উঠেছিল। এত ব্যথা ছিল সে হাতে। এবং সেই হাত মৃত্যুর দুদিন পূর্বে শুক্রবারেও দেখেছিলাম ফোলা। হাসপাতালের অপর একটি ঘটনাÑ কবির মৃত্যু দিন বিশেক পূর্বে কবিকে দেখতে গিয়ে দেখেছিলাম ক’জন ব্রাদার মিলে কবিকে তাঁর বেডে শুইয়ে রেখে চিকিৎসা করবে। কর্তব্যরত ব্রাদারকে জিজ্ঞস করে জানলাম কবিকে ডিউটিরতরা ঠিকভাবে (রাথরুমে নিয়ে দাঁড় করিয়ে পেছন থেকে পানির ঝাটা দিয়ে পরিস্কার করা হত) পরিস্কার করা হত না। ফলে ময়লা জমতে জমতে দুপাশের ‘কুচকি’তে ঘা হয়েছিল। এই হাসপাতালে (১১৭ নং কক্ষ) ভর্তি করার পূর্বে কবি ভবন থেকে কবিকে নিয়ে আসার সময় আমায় একটি চিরকুট দেয় হাসপাতাল থেকে যারা এ্যাম্বুলেন্স নিয়ে গিয়েছিল তারা। আমার কথা শুনে তারা বলল আমাদের বলা হয়েছে কবি মাসাধিককাল যাবৎ অসুস্থ। আমি বললাম মাত্র কমিনিট আগে কবি ভবনের লনে পায়চারি করে রুমে বিশ্রাম করছেন। কিছুক্ষণ নাস্তা করবেনÑ সন্ধ্যের নাস্তা। তারা আবার কথা শুনে স্ট্রেচার তুলে নিল। কবি সিঁড়ি দিয়ে একাই নেমে গাড়িতে উঠবেন। আমরা দুপাশে যেমন থাকি তখনও থাকলাম এবং এক হৃদয় বিদারক দৃশ্য অবলোকন করলাম। কবি কিছুতেই নামবেন না। শক্ত রেলিং ধরছিলেন এবং মুখে অব্যক্ত চিৎকার করছিলেন। কবি বুঝতে পেরেছিলেন এবং ভালোও বেসেছিলেন যে বাড়িটিকেÑ সে বাড়িতে হয়তো তিনি আর ফিরবেন না। জীবনের শেষ দিন গুলো এমন হৃদয় বিদারকই ছিল। হাসপাতালে নেবার একমাসের মধ্যে কবি যথেষ্ট মুটিয়ে গিয়েছিলেন। এই মুটিয়ে যাওয়াই কবির মৃত্যুর কারণ হয়ে থাকল। নজরুল মানুষের কবি, মানবতার কবি। তার এমন মর্মান্তিক পরিণতি এমন হবে কেউ কখনো ভেবেছিল কি?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ