ঢাকা, শুক্রবার 31 August 2018, ১৬ ভাদ্র ১৪২৫, ১৯ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কবি নজরুলের শুরুর দিকের রচনা

আখতার হামিদ খান : আমরা কি কেউ জানি নজরুলের প্রথম কবিতা কোনটি? আপনারা হয়ত সমন্বরে বলবেন, ‘মুক্তি’। কেন-না ‘মুক্তি’ তার মুদ্রিত প্রথম কবিতা। কিন্তু ‘মুক্তি’ পর্যন্ত পৌঁছতে, তাঁর যেসব সাহিত্যসৃষ্টি চিরকালের জন্য মুক্তি পেতে বসেছে, সেগুলোর কেউ কি সন্ধান রেখেছেন? রবীন্দ্রনাথের প্রথম কবিতা- ‘আমসত্ত্ব দুধে ফেলি, তাহাতে কদলী দলি’ ঐতিহাসিক মর্যাদা লাভ করেছে। আর সেই মর্যাদার পেছনে ছিল মহর্ষি পিতা, প্রিন্স পিতামূহের আভিজাত্য পরিবর্ধিত জমিদারী গৌরব। ঠিক সেখানেই ছাপার কালিতে অস্থায়ী হয় স্থায়ী।

কিন্তু যে ছেলেটি কলকাতা থেকে অন্তত ২০০ কি.মি. দূরে এক আজ পাড়াগাঁয়ে জন্মেছিল, বাপ ছিল দলিল লিখিয়ে, দুই মায়ের সংসারে যারা ছিল নয় ন’টি ভাই-বোন, মাত্র নয় বছরে বয়েসে যে হারাল পিতাকে, বড় দাদা সাহেবজান কাজ নিল কয়লাকঠিতে, আর তার নাম হল দুখু মিয়া। আর অনেক মেধা নিয়ে জন্মেও যাকে বাল্যেই ছাড়তে হয়েছিল গ্রামের পাঠশালা, বৃত্তি নিতে হয়েছিল শিশু শ্রমিকের- মসজিদের ইমামের কাজে, আজান দেওয়ার কাজে, কখনও হাজী পালোায়ানের সমাধি-ভক্তদের  দেখাশুনার কাজে- তারপর একটু বেশি রুটির আশায় গাঁ ছেড়ে যেতে হয়েছিল আসানসোলের একটি রুটির দোকানে- কি করে আমরা ভাবতে পারি তার প্রথম কবিতাকে বা পরবর্তী কবিতাগুলোকে ঐতিহাসিক মর্যাদা দেবার জন্যে হাত বাড়িয়ে রাখবে মহাকাল? সব গেছে, সব হারিয়ে গেছে। কুড়িয়ে বাড়িয়ে যা পাচ্ছি, তার সন তারিখ পাচ্ছি না। সাক্ষি কেউ বেঁচে নেই। দুখুর কবিতাকে ধরে রাখার লোক ছিল না। দারিদ্র্য- হিমশীতল দারিদ্র্য- দরিদ্র সন্তানের কাব্য প্রচারের বা কাব্য লিখে রাখার দায়িত্ব কেউ নেয় না। কোন যুগেই নেয় না। মহাকালই বা নেবে কেন?

কিন্তু মহাকাল না নিক শ্রমের মুখে কালিমা লেপন করে আমরা কেউ কেউ বর্জিত দুখু মিয়াকে আবিষ্কার করতে ব্রতী হয়েছি। দেখি না দুখুর মহেঞ্জোদাড়ো থেকে কী পাই? চুরুলিয়া ও তার আশেপাশের অঞ্চলে সেখানে দুখু মিয়ার সঙ্গী সাথী, সহপাঠীদের সন্তান-সন্ততিরা বসবাস করছেন, সেখানেই আমরা ছুটে যাচ্ছি। আসানসোলের যে রুটির দোকানে দুখু মিয়া কাজ নিয়েছিলেন, সে দোকান এখনও আছে। নাম এম এ বক্স....। এখনও আছেন বক্সের পুত্র আবদুল করিম। সেই দোকানে কিশোর দুখু মিয়া কাজের ফাঁকে ফাঁকে ধরতেন গান। গান লিখেছিলেন কাকা বজলে করিমের কাছে। 

সেই গান শুনে মুগ্ধ হতেন এক মৌন ফকিরও। ফকিরকে কিছু দিতে গেলেই মালিক তাঁকে তাড়িয়ে দিতেন চিৎকাার করে। আর তাঁরই মৃত্যুতে নজরুল লিখেছিলেন আশ্চর্য কবিতা- ‘মৌন ফকির’:

এই দোকানের সুমুখে পথের বাঁকে

তোমার সঙ্গে দেখা হত ফাঁকে ফাঁকে।

মোর গান শুনে থমকে দাঁড়াতে রাহে

দোকানী কহিত- ‘হট যাও, হিয়াঁ কাহে’।

মুখ ফিরাইয়া তুমি যেতে ধীরে সরে 

আমার চক্ষু আঁশুতে উঠিত ভরে।...

বুকের বেদনা বুকেতে রাখিলে ঢাকি

মরণের দিনে সেই বুকে হাত রাখি।

দেখাইয়া গেলে ওই স্থানে আছে লেখা,

ব্যথার কাহিনী যাহা যার নাকো দেখা॥

অনেকেই মনে করেন রাঢ় সন্তান নজরুলের এটিই প্রথম রচনা। প্রথম কিন্তু চমৎকার। নির্ভুল ছন্দ। গভীর ভাব। গভীর ভালবাসার বুক নিঙড়ানো কাহিনী। ছত্রে ছত্রে গভীর দরদ। তবে কবিতাটিতে কাকা বজলে করিমের সংশোধন ছিল। কিন্তু সন তারিখ নেই। দরিদ্র শিশু শ্রমিকের কবিতার কি সন তারিখ থাকে? তার ওপর দুখু নিজেই উদাসীন, আপনভোলা কিশোর। সন তারিখ লেখার প্রশ্নই ওঠে না।

কবি তখন রানীগঞ্জ স্কুলের ছাত্র। শৈলজানন্দ তাঁর সহপাঠী। একদিন হোস্টেলে কড়ি কাঠ থেকে একটি পাখির ছানা নিচে পড়ে গেল। তাকে ঘিরে হল্লা আরম্ভ করল ছেলেরা। পাখিছানার মা চিৎকার করে কাঁদতে লাগল কড়িতে বসে। শৈলজা বললেন, ‘লেখ তো একটা কবিতা।’ অমনি নজরুল লিখলেন- ‘চড়–ই পাখির ছানা’:

মস্ত বড় দালান বাড়ির উঁই-লাগা ঐ কড়ির ফাঁকে 

ছোট একটি চড়–াইছানা বারে বারে ডাকছে মাকে।

বুঝতে নারে কি সে ভাষায় জানায় মা তার হিয়ার বেদন

বুঝে না কেউ স্কুলের ছেলে মায়ের সে যে বুক ভরা ধন।

ভারী সুন্দর এই কবিতাটি অনেকেই জানে। নজরুলের সহপাঠী পঞ্চানন সিংহ। পানাগড়ের ছিলিমপুরে বাড়ি। তিনি ছিলেন এ কবিতার সবচেয়ে বড় প্রচারক। শৈলজানন্দও ঘটনাটি বলে গেছেন আমার বন্ধু নজরুল গ্রন্থে। কিন্তু রচনার সন তারিখ নেই। দরিদ্র বালকের লেখার সন তারিখ কি কোন দেশের ইতিহাসে আছে?

নজরুল তখন সিয়ারসোল স্কুলের ছাত্র। এখানেই নজরুল প্রতিভার বিকাশ। স্কুলের দেওয়াল পত্রিকার প্রতিটি সংখ্যাতেই তাঁর কবিতা থাকত। একবার এক পয়সার রাবণ রাজা নামের একটি গল্পও ছিল। ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে এই স্কুলের শতবর্ষ পূর্ণ হয়েছে। আর তখনই এই স্কুল কর্তৃপক্ষ ছাত্র দুখু মিয়ার প্রতিভা কাব্য রচনায় কতটা নিয়োজিত হয়েছিল, তার পরিচয় দিয়েছিলেন তাঁদের পত্রিকায়। এই স্কুলের অঙ্কের শিক্ষক ভোলানাথ স্বর্ণকার। ১৯১৬ সালে তাঁর বিদায় সংবর্ধনা উপলক্ষে দুখু মিয়া লিখলেন ‘করুণ গাথা’ নামে একটি কবিতা: 

নয়ন গলিয়া বয় তপ্ত অশ্রু নীর।

অশ্রু নয়, সে যে ভগ্ন মরম রুধির।

নয়গো চোখের দেখা,

হৃদয়ে হৃদয়ে আঁকা

ভিজাইয়ে ¯েœহতীরে

তৃষিত সোহাগ ভরে

ভকতি উথলি চিত্ত করিত অধীর।

এই স্কুলের আর এক শিক্ষক হরিশংকর মিশ্র। তাঁর বিদায় সংবর্ধনায় দুখু মিয়া লিখলেন ‘করুণ বিহাগ’:

ওগো বিদায় বেদনা বিজড়িত এই সেদিনের সেই স্মৃতি

না মুদিতে হায় পুনঃ জেগে উঠে, ওগো জেগে উঠে নিতি॥

মুরছি মুরছি সেই মূর্চ্ছনা, বিনায়ে করুণ সুরে।

হৃদি নিঙাড়িয়া রক্ত অশ্রু বক্ষ বহিয়া ঝরে।

থামে না তো হৃদি স্পন্দন ঘন দুহাতে বক্ষ চাপি

আকুলি বিকুলি দুরু দুরু ওগো থরথর উঠে কাঁপি।

চলে যেতে পারো চলে যেতে দেব কিছু বলিব না আর

হাসি কান্নায় ঢেলে দেব শিরে প্রাণের অর্ঘ্য ভার।

খাসা ছন্দ। ঠাসা শব্দ যোজনা। মুগ্ধ হৃদয়ের বিগলিত ভাব-দুটো কবিতাই চমৎকৃত করে।

নজরুল তখন নিমশা গ্রামে থাকতেন। সেখানে তার এক আত্মীয় ছিলেন নুরুল ইসলাম। পরে তিনি আসানসোলের ঝউঙ  অফিসের পেসকার হন। তার বাড়ির পাশেই ছিয় সৈয়দ সাহেবের সমাধি। সেই সমাধির পাশে ছিল একটা আশ্চর্য ফুলগাছ। তাতে ফুটত দু’রঙের ফুল। লোকে গাছটাকে খুব মানত। নজরুল এই সমাধিকে নিয়ে একটি চমৎকার কবিতা লিখেছিলেন- 

‘সৈয়দ সাহেব’:

কবি সৈয়দ সাহেবের কদমে হাজার সালাম

হুজরা লাইলেন তিনি আসিয়া নিমশা মোকাম॥

আশ্চর্য এক বৃক্ষ আছে

দুরঙা ফুল ধরে তাতে

কেহ নাহি পারে চিনিতে ভাবিয়া মোদাম॥

এরকম অনেক কবিতা আছে। কে আর সন্ধান রাখে বলুন?

এগুলির অনেক পরে ‘মুক্তি’ তাঁর প্রথম মুদ্রিত কবিতা। তার অংশবিশেষ হল:

রানীগঞ্জের অর্জুন পাটির বাঁকে

যেখায় দিয়ে নিতুই সাঁতে ঝাঁকে ঝাঁকে

রাজার বাঁধে জল নিতে যায় শহুরে বৌ

কলস কাঁখে। 

কিশোর নজরুলের একটি অসামান্য রচনা তাঁর কাকা ও গানের গুরু বজলে করিমের মৃত্যুতে লেখা। গানটি বহুবার বহু জনে গেয়েছেন, কিছুটা ছেপেছেন ড. রফিকুল ইসলাম। গানটি হল:

হায়! আমরা কি ভাগ্যহীন হেন ওস্তাদপ্রতিম

কাজী বজলে করিম হারিয়েছি।

ধিক এ পোড়া কপালে

হারায়ে রতন অকালে

শুনে বুক নয়নজলে ভাসিতেছি॥

বিদ্বানগণ হেরে যাঁহার রচনা কবিত্ব

ভূয়সী প্রশংসা করেন অবিরত

হায়! আমাদের সে নিধি

কেড়ে লয়েছে বিধি

মস্তকহীন দেহ আমি ধরিতেছি॥

আহা! তাঁর সে ধর্মভাব

দেখে প্রাণ হত শীতল

যাঁর গুণে বশীভূত শত্রু মিত্র সকল,

আহা শ্রবণে যাহা পাথর ফাটে হায় আহা

অকালে মৃত্যু তাঁর আহা শুনিতেছি॥

বলাবাহুল্য, এ হল নজরুল রচিত একটি উল্লেখ্য শোকগীতি। কাকা ও শিক্ষাগুরুর প্রতি দরদ ও আন্তরিকতায় পরিপূর্ণ এ গান। বজলে করিম যে সেকালে কত বড় গীতিকার ও শিক্ষক ছিলেন, শিষ্যের রচনাতেই তার প্রমাণ।

‘ক্ষীণপরমায়ু’ এসব গান। কিন্তু এগুলি তো ফেলে দিতে পারছি না। নজরুল যে একদিনে অমৃতফলের গল্পের মত আকাশ থেকে পড়েননি, ধীরে ধীরে সাধনার দুর্গম সিঁড়ি বেয়ে ‘নজরুল’ হয়েছিলেন, এগুলি তো তারই সাক্ষি। তাঁর আরও একটি গান উদ্ধৃত হল:

দিও না দিও না প্রাণে আর ব্যথা বিধুবদনী।

তোমায় কি ভুলিতে পারি তুমি মোর

হৃদয়ের মণি॥

দুই দেহ মোদের একই প্রাণ

বল না কিসের অভিমান

ইচ্ছা হয় বাঁধো মন-প্রাণ প্রেম-ধনে

হৃদয়ের ধনী॥

যদি হইতাম মন-চোর

নয়ন বাণে এ দেহ মোর

কর প্রেয়সী জর জর চোখের পানি

দাও মোহিনী॥

নজরুল এসলাম কয় প্রেয়সী

দেখে কমল হাসুক শশী

চোখে দাও প্রেমের কাজল লাগাও গলে গো ভামিনী॥

শ্রোতাদের মুগ্ধ করতেও নজরুল জানতেন। মুসলিম শ্রোতারা তাঁকে বারবার মারফতি গান লিখতে বলতেন। গানগুলিতে আরবি ফারসি শব্দের ছড়াছড়ি। এমনি কিছু গান দিয়েছেন বর্ধমান নিবাসিনী, কবির এক নিকট-আত্মীয়া সৈয়দ ফরিদুল হক-এর পতœী আলেয়া খাতুন (ডাকনাম টুসু):

মরে যে বা-ঈমান মোমিন-মুসলমান দুনিয়ায় পাবে সে নেক মরতবা ফেরেশতা করে মারহাবা মওতের সময়ে ফেরেশতা আসিবে ঘেরবেন তায়॥

রাঢ় ছাড়ার আগে নজরুল গানও লিখেছিলেন, লেটোর অনেক পালাও লিখেছিলেন। তাঁর কাকা কাজী বজলে করিমের লেটোর দল ছিল। তিনি ছিলেন স্বভাবকবি। গান বাঁধতেন। গান গাইতেন। নিজের দলকে শ্রেষ্ঠত্ব দেবার জন্যে তাঁর শ্রমের অন্ত ছিল না। গানের প্রতি আকর্ষণ দেখে সাত বছরের ভাইপো দুখুকে দলে নিয়েছিলেন। দুখ লেটোর নাচ করতেন, গান গাইতেন। কাকা যতœ করে হিন্দুর রামায়ণ, মহাভারত পুরাণ কাহিনী শেখাতেন। মুসলিম শরিয়তী শেখাতেন। ‘ব্যাঙাচি’র সংলাপ শেখাতেন। ব্যাঙাচি হল- লেটো পালার যে প্রধান গায়ক, তার কথাবার্তা ও কাজকর্মকে ব্যঙ্গ করে যে শ্রোতাদের হাসাতে পারে। দুখুর ছিল যেমন সুন্দর মুখ, তেমনি সুরেলা গলা। একবার গান ধরলে জনতা স্তব্ধ হয়ে যেত। আর ব্যাঙাচি সাজলে লোকে হেসে লুটোপুটি খেত।

দুখুর তখন এগারো-বারো  বছর বয়স। স্কুলে পড়েন। তখনি কাকার মতই গান বাঁধতে পারতেন। কাকা তাকে গান লিখতে উৎসাহিত করতেন। উৎসাহিত করতেন চুরুলিয়ার আরও ক’জন লেটো প্রধান- মশু মোল্লা, বাহালুদ্দিন, আইনুদ্দিন, জৈনুদ্দিন প্রমুখ। দুখুর গানের জন্য এঁরা কাড়াকাড়ি করতেন। কিন্তু দুখু লেটোর জন্য যেসব গান গান লিখেছিলেন, তার সব ক’টি পাওয়া যায়নি। মুহম্মদ আয়ুব হোসেন দুখুর বাল্যকালের চারটি অপ্রকাশিত গান আমাকে দিয়েছেন। বহু কষ্টে সংগৃহীত এই গানগুলি সেকালে খুব জমেছিল। বজলে করিমের পালা থেকে একটি গান এখানে তুলে ধরছি:

সখী একেলে যাব না যমুনা।

ও যে কালো ছোঁড়া, বাঁশী হাতে পিছু ছাড়ে না॥

যমুনাতে জল আনিতে

যাব কি করিতে মরিতে

বড়ায়ি গো-মনের কথাটা শোনো না, শোনো না, শোনো না।

যখন ভরেছি গাগরি

কাল ছোঁড়া ধরে বাঁশরি

বাঁশরির সুরে চলিতে না পারি হইলাম

আনমোনা।

সুরের তালে তালে চলি

গাগরি তালে তালে চলি

গাগরি পড়িছে উছলি

ভিজে যায় দেহ, ভিজে যায় নীল ওড়না।

ততই ছোঁড়াটা কাছে কাছে আসে- আমি তো এগোতে পারি না ॥

এই গানে বজলে করিমের হস্তক্ষেপ ছিল। পরবর্তীকালে এটি বারবার সংশোধিত হয়েছে। তাহলেও স্বভাবকবি দুখু মিয়া যে পরবর্তীকালে উৎকৃষ্ট গীতিকার হতে পারবেন, তার প্রচুর ইঙ্গিত আছে এ গানে।

কিশোর নজরুল এমন গান প্রচুর লিখেছেন। মুহম্মদ আয়ুব হোসেন প্রদত্ত লেটো পালা থেকে আর একটি গান উদ্ধার করছি, যাতে সমকালীন সমাজজীবন চমৎকার চিত্রিত হয়েছে। আধুনিক নারী বলছে:

আমি) সেয়ানা বিটি, 

মাথায় বেঁধেছি ঝুটি

মেঘ বরণ কালো চুল।

চুলেতে কিলিপ আঁটা

সুগন্ধী সুন্দা বাঁটা,

তাহে গুজেছি বকুল ফুল॥

নয়নে কাজল আঁকা,

এ ভুরু ধনুক বাঁকা,

বিন্ধিবে প্রেমিকের মনে।

মিষ্টি এক খিলি পান 

তার পাঁচ সিকে দাম

দেখ হে ঠোঁট রাঙা পানে-

কপালে টিপ আছে তাই

নাকেতে নোলক দোলাই,

দেখে কি পাবে মনের কুল॥

লেটো গানের জন্য নজরুল প্রচুর গান লিখেছেন। অনেক গানে ভণিতাও দিয়েছেন। ‘পয়সা যে পৃথিবী চালায়’ সে নিয়ে তাঁর একটি গান এখনও অনেকের মুখস্ত:

পয়সা হল দেশের রাজা, যাই বলিহারি

আমি কি প্রশংসা তার করিতে পারি।

পয়সাতে কত জনার মন হয় চুরি॥

পয়সাতে হয় দালান কোঠা

পয়সাতে হয় বাবুর বেটা

আয়রনরচেস্টে চাবি আঁটা দ্বারে প্রহরী॥

পয়সা কাছে যাহার আছে

সত্যকে, মিথ্যা করে সে 

পয়সা নাইকো যার হাতে

কি সুখ তার জীবনেতে

ভাবনা করে খেতে শুতে রব্বুল বারি॥

জেতে সে হাড়ির ছেলে

তার হাতে পয়সা থাকিলে

দেখে লোকে ভদ্র বলে, মান্য পয়সারই॥

দেখো হল রাজার জয়

পয়সাতে কি না হয়

নজরুল এসলাম কয়, কি বলিতে পারি॥

নজরুল তখন ‘এসলাম’ লিখতেন। এই সব গান ‘নজরুল সংগীতপঞ্জী’তে নেই। কল্পতরু সেনগুপ্ত, ড. ব্রহ্মমোহন ঠাকুর, ড. বাঁধন সেনগুপ্ত কেউই এসব গানের নামগন্ধ করেননি। কিন্তু এমনি বহু গান লেটো সা¤্রাজ্যে ছড়িয়ে আছে। লেটো  যাঁরা গাইছেন, তাঁদের কাছে গেলে পাওয়া যাবে। কেলেজোড়ার ফকির ম-ল, রামবাটির যতীন চক্রবর্তী, রাজীবপুরের সোলেমান, তুলসীডাঙ্গার আনোয়ার হোসেন, নানুরের সেখ ওয়াজেদ, রায়নার লুতুপ আলি, কেতুগ্রামের জিল্লাহার রহমান প্রমুখ বিখ্যাত লেটো গায়কের বংশধরদের খাতায় নজরুলের ভণিতাযুক্ত এমনি গান প্রচুর। কে যেন বলেছিলেন, শেকস্্পীয়রের কাব্যের জন্ম নাকি ‘ছেলে ভুলোনো’ ছড়া থেকে। বার্নস নাকি লোকসংগীতের সুরেই তাঁর গানগুলি লিখেছিলেন। আজ নজরুল যে গীতিস¤্রাট, তার মূলে কি এই লেটো গানগুলি ছিল না? লালবাজার, মদনপুর, দুমোহানী, বাসাজুড়ি, হিজলগড়া প্রভৃতি চুরুলিয়ার নিকটস্থ গ্রামে এসব গানের চল আছে। এ সন্ধান দিয়েছেন নজরুল একাডেমির সাধারণ সম্পাদক কাজী রেজাউল করিম।

 

তিন.

রাঢ় ছাড়ার আগেই নজরুল লেটো গানের ওস্তাদ হয়ে ওঠেন। গান বাঁধা, সুর দেওয়া, ব্যাঙাচি সাজায় তাঁর জুড়ি ছিল না। কাকা বজলে করিম তাকে নতুন পালা লিখতে শেখাতেন। আর পুরনো পালাকে সংস্কার করাতেন। নজরুল কাকার নির্দেশে বহু পালা লিখেছেন, অন্যের নির্দেশেও লিখেছেন।

এ পর্যন্ত নজরুলের নামে অনেকগুলি লেটো পালা মিলেছে। সেগুলির শিরোনাম: চাষার সঙ্, শকুনী বধ্, দাতা কর্ণ, রাজপুত্রের সঙ্, যুধিষ্ঠিরের ডাকাসুরা, আকবর বাদশার সঙ্, কবি কালিদাসের সঙ্, মেঘনাদবধের সঙ্, বুড়ো শালিকের ডাকাসুরা ইত্যাদি।

কিন্তু এসব রচনা বর্জিত হয়েছে। নজরুল নিজেই বর্জন করেছেন। গবেষকরাও ছেঁটে দিয়েছেন। কিন্তু আমার কাছে এগুলোর মূল্য বহু। নজরুল চাননি তাঁর এসব বাল্যরচনা লোকে জানুক। ১৯৪০ সালে ‘বিদ্রোহী কবি’ কাজোড়ার সভায় এইসব লেখাগুলিকে স্পষ্ট স্বরে বাদ দিয়েছিলেন। কিন্তু তারই একটা পালা আপনাদের শোনাই। তাতেই বুঝবেন আজ নজরুল যে মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছেন, তার ভিত রচনা করেছে এই পালাগুলি। একটি পুরনো পালাকে বজলে করিমের নির্দেশে কিশোর পালাকার নজরুল উপস্থাপন করলেন এইভাবে- পালার নাম ‘পান্তাভাতের ভাপ’:

[[ তিনটি চরিত্র ‘মা’, ‘বাবা’, ও ‘ছেলে’।]

প্রথমে মায়ের প্রবেশ। মা তার স্বামীকে চিৎকার করে ডাকছে-]

মা ॥ ওগো কুথায় গেলে গো-? কুথায় গেলে গো-?

[এবার বাবার প্রবেশ]

বাবা ॥ এমুন চেঁচাচ্ছিস কেনে?

ম ॥ চেঁচার না ত কি কাপড় খুলে নাচর? ঘরে একদানা চাল নাই। কেবল ঘুরেই মরছে। এখুনি  ছানাটা খেতে আসবেক। (কান্নার সুরে) হায় হায়। কী বংশে বৌ হয়ে এলাম গো-

বাবা ॥ (দর্শকদের দিকে তাকিয়ে) দেখছেন বংশের মহিলা বলে কিনা (ভেংচি) কী বংশের বৌ হয়ে এলাম গো- বলি তোর মা যে হাটে বেগুন বিকতো! আর বলবো-? না ছানাটা এসে গেছে। আর বলব নাই।

(ছেলের প্রবেশ। বাবা তাকে বলছে)- বলি হাঁ বাপ বিড়ি খাচ্ছিস?

ছেলে ॥ (মুখ বন্ধ করে ধুঁয়ে বেরোবার ভয়ে) না-

বাবা ॥ মার ত মাথায় চাটি (চাটি মারা- মুখ থেকে ধুঁয়ো বেরুতে লাগল) এত ধুঁয়া! তবে রে আঁটকুড়ির ব্যাটা? বলে বিড়ি খাই নাই?

নজরুলের এসব কৈশোর সৃষ্টি। তবে বয়সের তুলনায় যথেষ্ট পরিণতি রচনা। কিন্তু নজরুল রচনাবলীতে এগুলি স্থান পায়নি। বিদ্রোহী কবির খ্যাতির বন্যায় এসব হারিয়ে গেছে, তলিয়ে গেছে। কিন্তু নজরুলের কবি জীবনের এই ভিত্তিপ্রস্তর চেনা আজ বড় জরুরি।

ছেলে ॥ ধুঁয়া লয় বাবা। বেদম পান্তাভাত খেলাম ত তাই মুখে ভাপ বেরাচ্ছে ॥ সম্প্রতি অনেকেই লেটোগান সংগ্রহ করছেন। আমরাও ব্রতী হয়েছি। নজরুল গদ্যে-পদ্যে অনেক লেটো লিখেছেন। তন্মধ্যে একটি সম্পূর্ণ পালা প্রদত্ত হল। মধুসূদন দত্তের প্রহসন অবলম্বনে লেখা।

পালার নাম: বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ

প্রধান চরিত্র: বাচস্পতি, লোচন, লোচনের স্ত্রী, জমিদার।

 

(গান)

বড় লেগেছে মজা।

আমি ঘরে খাব এবার ম-া আর খাজা॥

দালান বসাব এবারে

বাগান দিব যতœ করে

আনন্দে দালান উপরে উড়াব ধ্বজা ॥

বাচস্পতি ॥ কি রে লোচন বাগদি যে, কিজন্য এসেছিস?

লোচন ॥ বাচস্পতি মহাশয় প্রণাম। বড় মজা লেগেছে, এবার লুচি ম-ার বরাদ্দ করব।

বাচস্পতি ॥ বড় মজা, সাবধান! ও কি হল ভাই বল না, শুধুই যে লাফাতে লাগলি।

লোচনা ॥ মহাশয়, আমাদের গ্রামের বুড়ো জমিদার আমার স্ত্রীর রূপে মজে ফুটনি পাঠিয়েছিল। তারপর আমার স্ত্রী আমাকে শুধায়। এখন বুড়াকে জব্দ করবার কি উপায় স্থির করে তাতেই সম্মত হয়েছি।

বাচস্পতি ॥ ছি ছি! এত বড় জমিদার সামান্য লোকের উপর নজর রাখে? সে বুড়ো হয়ে গেছে রে! বুড়াকালে সে প্রেম করতে ছুটে। আচ্ছা কি উপায় স্থির করেছিস?

লোচন,,,,,,, ॥ তা বলি শুনুন-

                                   

,(গান)

বুড়া ধাড়ায় জব্দ করতে মনের বাসনা 

উপযুক্ত শিক্ষা দিব জেনেও জানে না ॥

বৃক্ষ পরে থাকব আমি করে আরোহণ ॥

সামান্য অন্যায় দেখিলে করিব নিধন।

নাক ও কানে মলব টেনে আর ত ছাড়ব না ॥

প্রতিজ্ঞা করাবে স্ত্রী এই মর্মে তারে

ঘোড়া করে চাপবে অগ্রে তার পৃষ্ঠ পরে।

হয়ে ঘোড়া পুরাবে তার মনস্কামনা ॥

সেই সময় নেমে আমি লগুড়াঘাতে

চিহি শব্দ করাব তার চেপে পৃষ্ঠেতে।

বুড়াকালে তার কপালে আছে লাঞ্ছনা।

নজরুল এসলাম বলে বুড়ার নাই কিছুই জ্ঞান॥

বুড়াকালে প্রেম করিতে হারাবে সে মান

করে ঘোড়া মারব কোড়া শুনব না মানা ॥

বা”স্পতি ॥ বেশ উপায় হয়েছে। আমারও ভাল হয়েছে। সে আমার সমস্ত সম্পত্তি নষ্ট করে দিয়েছে। কুটুম্বদিগকে বলে দিব। এই ভয় দেখিয়ে নিজের পসারটা বাড়িয়ে নিব। চল আমি সঙ্গে যাব।

লোচন ॥ বেশ তো আসুন। আমি একবার গিন্নীর সঙ্গে দেখা করে দিই। গিন্নী বাড়িতে আছ?

স্ত্রী ॥ কেন হে ফিরে এলে কেন? যাও শীঘ্র যাও। ঐ ভগ্ন মন্দিরটার নিকটস্থ গাছে চড়ে থাক গে। আমি যেমন হাতে তালি দিব তেমনি নেমে আসবে।

লোচন ॥ সে তো হল গিন্নী। তোকে কেমন লাগছে। দেখিস সাবধান। আমি তো চললাম। (কতদূর গিয়ে) বাচস্পতি মহাশয় আসুন, এই মন্দিরটির নিকটস্থ গাছে চড়ে থাকি। (উভয়ে চড়ে) ঐ দেখুন, ঐ বুড়া জমিদার আর আমার স্ত্রী উভয়েই এই দিকে আসছে, দেখি কি করে। 

জমিদার ॥ প্রিয়ে, আর দেরী কেন, ঐ মন্দিরটার নিকটে চল।

স্ত্রী ॥ নাথ হে! আমার একটি প্রতিজ্ঞা আছে যে, আপনাকে ঘোড়া করে একবার পৃষ্ঠের উপরে চড়ি। এ গভীর রাত্রিতে কে দেখবে!

জমিদার ॥ বেশ ত! ক্ষতি কি। আমি ঘোড়া হই, তুমি আরোহণ কর।

 

(গান)

কলের ঘোড়া কে দেখবি দেখসে দৌড়ে আয়

কোড়া খেয়ে হিঁহি চিঁহি শব্দে কেমন ধায় ॥

লাগাম খাওয়াই এর মুখেতে

জিন দিয়েছি এর পৃষ্ঠেতে

কদম লাগাম ছাড় কতেতে কি বাহারে যায় ॥

চলিতে বলব যেভাবে

ঘোড়া সেই ভাবেতে চলিবে

নইলে টেনে কোড়া খাবে কে রক্ষিবে তায় ॥

কোড়ার চোটে ভাঙব গেজা

যেমন কর্ম তেমনি সাজা

নজরুল এসলাম বলে মজা আর কি 

ছাড়তে চায় ॥

স্ত্রী ॥ চল ঘোড়া, একবার কদমেতে চল।

লোচন ॥ (লগুড় হাতে) বাচস্পতি মহাশয়, নামুন, দেখুন, দেখুন কেমন মজা।

সাবাস স্ত্রী সাবাস। সাবাস সওয়ার সাবাস।

জমিদার ॥ প্রেসয়ী! ছেড়ে দাও শীঘ্র ছেড়ে দাও। ঐ দেখো যমদূতের মত তোমার স্বামী লগুড় হাতে এদিকে আসছে। সর্বনাশ আর রক্ষা নাই, ছাড়ো শীঘ্র ছাড়ো। 

লোচন ॥ রে নির্বোধঘ! আর পালাতে পারিস! প্রেম ভিক্ষা করতে এসে এবার জীবন ভিক্ষা কর বুড়া! কপালে তোর কত শাস্তি আছে, তার কণা চিন্তা কর।

ত্তোঁ-ত্তোঁ- ত্তোঁ-

বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ।

 

(গান)

বুড়া শালিক জব্দ এই বারে

রক্ষা কর বলে কাঁদে চরণ ধরে ॥

এইবার নিজ ইষ্টদেবে করহে স্মরণ

আর কি তোর সাধ্য আছে ছিন্ন করিতে বন্ধন।

স্বামী ও স্ত্রীতে মোরা দৌঁড়াব তোরে ॥

যেমন আত্মা তেমনি জন্ম তোর ললাটে ঘটেছে

অস্থি পাঁজর চূর্ণ করতে লগুড় এনেছে।

সাজা হয় যেমন হাঁড়ি-খেকো কুকুরে॥

হাঁড়ি-খেকো কুকুর দেখ পড়ে ফাঁদেতে

বৃথা চীৎকার কর গৃহস্বামীর কাছেতে। 

কোন বীর এসে মোদের কাছে রক্ষিবে তোরে ॥

শয়তারে শয়তানী অদ্য তোমায় ঘুচাব

মুখে থুতু দিয়ে মর্ত্যলোকে দেখাব।

নজরুল এসলাম ভাবে পাঠাব যম দুরাচারে ॥

লোচন ॥ প্রেয়সী! তুমি একবার নামো, আমি একবার চড়ি। (লাফিয়ে পৃষ্ঠে চড়ে) চল বাছা লাগামে চল। (লগুড় হাতে সজোরে মারে, জমিদার পড়ে যায় বাবারে। বাবারে। গেলাম। গেলাম।) যম কি একেবারেই ভুলে গেইছিস!

বাচস্পতি ॥ ওগো যদি আমাকে পাঁচশত টাকা আর আমার সমস্ত সম্পত্তি ফিরে দাও তবেই তোমার রক্ষা, নয় সমাজে গিয়ে বলে এর চেয়ে শতগুণ লাঞ্ছনা করব। আর এই সওয়ারকে নগদ দুশো টাকা দাও তাহলেই রক্ষা।

জমিদার ॥ বাচস্পতি মহাশয়। রক্ষা করুন। এই নেন পাঁচশত টাকা এবং সওয়ারকে দুশো টাকা। আর আপনার সমস্ত সম্পত্তি ফিরিয়ে দিচ্ছি। আমার বন্ধন খুলে দেন। 

বাচস্পতি ॥ লোচন এর বন্ধন খুলে দাও।

লোচন ॥ যা বেটা এবার ঘাস পানি খাগা। নজরুলের এসব কৈশোর সৃষ্টি। তবে বয়সের তুলনায় যথেষ্ট পরিণত রচনা। কিন্তু নজরুল রচনাবলীতে এগুলি স্থান পায়নি। বিদ্রোহী কবির খ্যাতির বন্যায় এসব হারিয়ে গেছে, তলিয়ে গেছে। কিন্তু নজরুলের কবি জীবনের এই ভিত্তিপ্রস্তব চেনা আজ বড় জরুরি। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ