ঢাকা, শুক্রবার 31 August 2018, ১৬ ভাদ্র ১৪২৫, ১৯ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আসামে নজরুল চর্চার নতুন দিগন্ত

 মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন : নজরুল জ্যোতি মূলত একটি ত্রিভাষিক বার্ষিক পত্রিকা। অসমীয়, বাংলা ও ইংরেজি এ তিনটি ভাষায় প্রবন্ধ ও কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টিকর্মকে তুলে ধরছেন। নজরুলের কাব্য, গদ্য ও প্রবন্ধ অনেক আগ থেকেই ইংরেজিতে অনুবাদ হয়ে আসছে এবং সারা বিশ্বে এর মূল্যায়নও বেশ ইতিবাচক। আনোয়ার হোছেইনের বিশেষত্ব হলো তিনি কাজী নজরুল ইসলামকে অসমীয় ভাষায় পরিচিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন গত ছয় বছর ধরে। নজরুল জ্যোতি প্রকাশের পঞ্চম বছর ছিল তথা পঞ্চম সংখ্যা প্রকাশ পেয়েছে ২০১৮ সালে এখানেও যথারীতি অসমীয়, বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় নজরুলকে উপস্থাপন করেছেন। 

এ সংখ্যার শুরুতেই নজরুলের “আমার কৈফিয়ৎ” কবিতাটির অসমীয় ভাষান্তর করেন সম্পাদক নিজেই। এরপর অসমীয় ভাষায় ড. হাফিজ আমদের “নজরুলের ‘সাম্যবাদী’ : চিন্তাধারার স্বরূপ”, আনোয়ার হোছেইনের “নজরুল সাহিত্যে হিন্দু-মুসলিম সর্ম্পক”, ড. চুলতান আলী আহমদের “অক্টোবর বিপ্লব আর নজরুল ইসলামের একটি ছোট গল্প”, ও আবু আফাজ উদ্দিনের “কাজী নজরুল ইসলাম : সাম্প্রতিক চিন্তা” শীর্ষক প্রবন্ধ স্থান পায়, যা আসামে নজরুলকে নতুন করে জানবার এক অনন্য সুযোগ তৈরি করেছে।  

ড. হাফিজ আহমদ “নজরুলের সাম্যবাদী” শীর্ষক প্রবন্ধে সাহিত্যিক নজরুলের বাহিরে কিভাবে নিজেকে রাজনীতি ও সমাজ সংস্কারের কাজে নিয়োজিত করেছেন এর বিশদ বর্ণনা তুলে ধরেন। নজরুল মূলতঃ ১৯২৫ সালে সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে আসেন এবং তাঁর দীর্ঘ দিনের বন্ধু হেমন্ত কুমারসহ তিনি এ সময়ে ভারতীয় কংগ্রেসের সদস্য পদ লাভ করেন। কিন্তু কংগ্রেস বঞ্চিত কৃষকের অধিকার আদায়ে ব্যর্থ হওয়ায় ১৯২৫ সালে হেমন্তকুমার সরকার, কুতুব উদ্দিন আহমদ ও সামসুদ্দিন আহমদসহ কলকাতা ‘শ্রমিক প্রজা স্বরাজ দল’ নামক একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন এবং দলের মুখপাত্র হিসাবে লাঙল পত্রিকা প্রকাশ করে কৃষক-শ্রমিকের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে লিপ্ত হন। এরপর ড. আহমদ নজরুলের “সাম্যবাদী” কবিতার আলোকে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকা-ের মূল্যায়ন করেন। 

আনোয়ার হোছেইন “নজরুল সাহিত্যে হিন্দু-মুসলিম শীর্ষক” প্রবন্ধে ঐতিহাকি দৃষ্টিকোণ থেকে ভারতে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক ও বৃটিশ আমলে সা¤্রজ্যবাদীদের ষড়যন্ত্রের ফলে হিন্দু-মুসলিম বিভেদকে মূল্যায়ন করেছেন। পাশাপাশি বৃটিশ ভারতে কাজী নজরুল ইসলাম কিভাবে হিন্দু-মুসলিমকে জাগ্রত করে বৃটিশ অপকৌশলকে প্রশমিত করে ভারতে শান্তির পতাকা উড়াতে চেয়েছেন তার বিশদ আলোচনা করেছেন। জনাব হোছেইন নজরুলের বিভিন্ন কবিতা ও প্রবন্ধকে উদ্ধৃতি করে নজরুলের অবস্থানকে পরিষ্কার করেছেন। 

সমসাময়িক কালে কাজী নজরুল ইসলামের চেয়ে আর কোন লেখক বা রাজনৈতিক ব্যক্তি স্বাধীনতার জন্য এত সচেতন ছিলেন কিনা তা নতুন করে ভেবে দেখার প্রয়োজন আছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, তুরস্ক বিপ্লব ও রাশিয়ার বিপ্লব সম্পর্কে তিনি নিয়মিত খোঁজ খবর রাখতেন। এসব বিপ্লবে যেটুকু স্বাধীনতাকামীদের উদ্ধুদ্ধ করতো তাই তিনি তাঁর চিন্তা-চেতনা-লেখনিতে কাজে লাগিয়েছেন। ড. চুলতান আলী আহমদ রাশিয়ার অক্টোবর বিপ্লব প্রসঙ্গে নজরুলের চিন্তাধারা ও এর প্রভাব বিখাবে ভারতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করিয়েছেন, তা তুলে ধরেন। নজরুলের এ লড়াই আজো বিভিন্ন দেশে গড়ে ওঠা ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে আমাদের লড়তে উৎসাহ দেয়। 

অসমীয় ভাষায় এসব লেখা আসামের মানুষকে সাম্প্রদায়িক ও পুঁজিবাদীদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের জন্য নিজেদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের পথকে সুগম করবে। এরপরই বাংলা ভাষায় লিখিত মূল্যায়ন সমূহ স্থান পায়। সুজয় পালের “লাঞ্ছিত মানুষের কবি নজরুল”, ড. আসরফী খাতুনের “কথা সাহিত্যিক কাজী নজরুল”, জীবন কুমার সরকারের “নজরুলকে আমরা আজও ছুঁতে পারিনি”, হাবিব আর রহমানের “নজরুলের সর্বেশ্বরবাদী ও বাস্তববাদী চেতনার দ্বৈত এবং অতঃপর” খায়রুল আনামের “প্রেমিক কবি ঃ জীবনও সৃষ্টিতে বসন্তে প্রভাব”, জিয়াদ আলীর “নজরুল ও সাম্প্রতিক সংস্কৃতি চর্চার উপক্রমিকা”, নীলমণি দত্তের “রাজরোষে নজরুল” শীর্ষক প্রবন্ধ নজরুলের অনেক অজানা বিষয়ক তথ্য পাঠককূলকে উজ্জীবিত করেছে। এরপর এ অংশে নজরুলের কয়েকটি গান পুন:মুদ্রণ করেন। 

বাংলা প্রবন্ধগুলোর মধ্যে ড. আসরফী খাতুন-এর “কথা সাহিত্যিক কাজী নজরুল ইসলাম” বেশ ঋদ্ধ। নজরুল কেবল মাত্র একজন কবি হিসাবে আলোচিত হয় সবচেয়ে বেশি। এক্ষেত্রে ড. খাতুন নজরুল-এর কথা সাহিত্যের মূল্যায়ন করেন নিপুণতার সাথে। তিনি নজরুলের সম্পাদিত পত্রিকাগুলো জনজাগরণে কি ভূমিকা রেখেছিল তারও একটি সুন্দর আলোচনা সংক্ষিপ্ত কিন্তু প্রাণবন্ত তাৎপর্য করে তুলে ধরেন। 

জীবন কুমার সরকার “নজরুলকে আমরা আজও ছুঁতে পারিনি” প্রবন্ধে নজরুল-এর অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরেন এবং তিনি বাংলা সাহিত্যে কেন একক ও আজও অতুলনীয়, তা তুলে ধরার চেষ্টা করেন। এ প্রবন্ধটি বাংলা সাহিত্য সমালোচনায় নজরুলকে নিয়ে নতুন এক মাত্রা সংযোজন করতে সক্ষম হয়েছে। এভাবে বাংলা বিভাগের প্রতিটি প্রবন্ধ বেশ অসাধারণ।

এরপর ইংরেজি বিভাগ। ইংরেজি বিভাগের প্রথম প্রবন্ধটি ড. পার্থ ভট্রাচার্যের। তিনি নজরুলের ব্যক্তি জীবন ও সাহিত্য জীবনের সব নান্দনিক দিক তুলে ধরে নজরুল চর্চার এক নবতর দিক সংযোজন করেন পাঠক চিত্তে। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর জীবদ্দশায় সমসাময়িক প্রতিটি বিপ্লব ও তার নানা দিক সম্পর্কে বেশ সজাগ ছিলেন। তিনি সেসব বিপ্লবের মাত্রা ও জনমনে এর প্রভাব তাঁর সাহিত্যে কাজে লাগিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ বিনির্মাণে এক কার্যকর ভূমিকা রেখেছেন। মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন নজরুলের “কামাল পাশা” কবিতার এক দীর্ঘ নিগূঢ় পাঠ উপস্থাপনের মাধ্যমে নজরুলের এদিকটি তুলে ধরেছেন। 

এরপর কাজী নজরুল ইসলামের “মূলঃ মন্দির ও মসজিদ” প্রবন্ধটির যে অনুবাদ কবি মোহাম্মদ নুরুল হুদা করেন, তা আসামের অবাঙালি ও আসমীয়দের কাছে তুলে ধরেন। পরিশেষে নজরুলের বিখ্যাত কয়েকটি গান ও কবিতার ইংরেজি অনুবাদ স্থান পায়।

পরিশেষে এ কথা বলা যায় আনোয়ার হুছেইন নজরুল জ্যোতি সম্পাদিত করে বাংলাদেশের জাতীয় কবির যে ইচ্ছা-আকাক্সক্ষা তা আসামের জনসাধারণের মাঝে তুলে ধরে সমাজ থেকে নির্যাতন ও শ্রেণি বৈষম্যকে যেমন করে দূর করার চেষ্টা করছেন তেমনি নজরুলকে বিশ্ব দরবারে নতুনভাবে চিত্রায়িত করার কাজও করছেন। এ উদ্যোগটি নজরুলকে নতুনভাবে বিশ্ব দরাবারে আরো বেশি করে তুলে ধরার উৎসাহ দিবে প্রশ্নাতীতভাবে।

নজরুলের জ্যোতি

সম্পাদক/আনোয়ার হোছেইন

বরপেটা আসাম  

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ