ঢাকা, শুক্রবার 31 August 2018, ১৬ ভাদ্র ১৪২৫, ১৯ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

শিউলির এক সকাল

হেলাল আরিফীন : রুনুদের বাসার পাশেই একটি শিউলি ফুল গাছ। শরতের এই সময়টিতে গাছটিতে অনেক ফুল ফোটে। সারা রাতভর ফুলগুলো ঝরে ঝরে ভোর বেলায় সাদা হলুদে ছেয়ে যায় গাছতলা। রুনু ওর ছোট ভাই মিশুকে নিয়ে ফুল কুড়োতে এসেছে। ভোরের সতেজ হাওয়ায় ফুল কুড়োতে ওদের খুব ভাল লাগছে। 

ফুল কুড়িয়ে নেয়ার জন্য রুনু বাসা থেকে একটা ছোট ঝুড়ি নিয়ে এসেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ভাইবােন মিলে শিউলি ফুলে প্রায় ভরিয়ে ফেলল ছোট ঝুড়িটা। মিশু গাছতলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল, আপু, আরও ফুল কুড়োব?

রুনু বলল, না, আজ আর কুড়োব না। চল, বাসায় ফিরে যাই।

মিশু বলল, হ্যাঁ, তাই চল।

শিউলি গাছটি থেকে ওদের বাসার দিকে কিছুটা দূরেই সড়ক ঘেঁষে একটি ডাস্টবিন। ডাস্টবিনটি ময়লা আবর্জনায় পূর্ণ হয়ে আছে। ডাস্টবিনটিতে রুনুর বয়সীই একটা মেয়েকে ময়লা ঘাঁটতে দেখে মিশু বলল, আপু, ওই মেয়েটা ওখানে কী করছে?

মিশুর কথায় রুনু সেদিকে তাকিয়ে বলল, জানি না তো। চল, ওর কাছে যাই। দেখে আসি ও কী করছে?

ওরা ডাস্টবিনটির কাছে গিয়ে দাঁড়াল। রুনু মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল,তুমি এখানে কী করছ?

মেয়েটি অদ্ভুত চোখে ওদের দিকে তাকাল। তারপর চোখটা ফিরিয়ে নিয়ে ও যা করছিল তাতে মন দিল। রুনু আবারও বলল, তুমি এখানে কী করছ বললে না?

মেয়েটি মুখটা না তুলেই বলল, বোতল কুড়াইতেছি। ভাঙ্গাচুরা জিনিস খুঁজতাছি।

রুনু বলল, ওগুলো কুড়িয়ে কী করবে?

মেয়েটি এবার মুখ তুলে ওদের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বলল, এইগুলান ভাঙ্গারির দোকানে বেইচা টেহা পামু। আমার ভাইও গ্যাছে এইগুলান টোকাইতে। এইগুলানের টেহা দিয়া মায়ে বাজার সদাই করে। তোমাগো ঝুড়িতে কী কুড়াইয়া আনছো?

রুনু খুশি হয়ে বলল, শিউলি ফুল, নেবে?

মেয়েটি মন খারাপ করা গলায় বলল, না, শিউলি ফুল দিয়া কী অইব? ওগুলান কেউ কিনব না। ওগুলান লইয়া গ্যালে আমার মায়ে বকবো।

রুনু বলল, তোমার নাম কী?

মেয়েটি এবার কী ভেবে খিলখিল করে হেসে দিল। এবং হাসতে হাসতেই বলল, আমার নাম শিউলি !

রুনু মনটা কেমন খারাপ করে বলল, ও, এজন্যই তুমি হাসছ? তোমার নাম শিউলি, অথচ, তুমি ডাস্টবিনের ময়লা ঘেঁটে বোতল কুড়াচ্ছো ! তুমি স্কুলে পড়ালেখা কর না?

না, আমরা তোমাগো মতন স্কুলে যাই না।

রুনু অবাক হয়ে বলল, কেন, স্কুলে যাও না কেন? তোমার পড়ালেখা করতে ভাল লাগে না?

সারাদিন ভাঙ্গারির লাইগা গুরতে গুরতেই আমাগো দিন চইলা যায়, স্কুলে যামু কহুন?

রুনু মেয়েটির মুখের দিকে মায়াময় চোখে তাকিয়ে বলল, তুমি আমাদের সাথে যাবে?

কই যামু?

আমাদের বাসায়।

ক্যান?

আমাদের বাসায় প্লাস্টিকের অনেক বোতল আছে, ভাঙ্গাচুরা অনেক জিনিস আছে। আম্মুকে বলে তোমাকে ওগুলো দিয়ে দেব।

মেয়েটি খুশি হয়ে বলল, তোমার মায়ে কি ওগুলান আমারে দিব?

রুনু জোর গলায় বলল, আমি বললে আম্মু অবশ্যই তোমাকে ওগুলো দেবে।

রুনুর কথায় মেয়েটির মলিন মুখমন্ডলে ভোরের শিউলি ফুলের স্নিগ্ধতা ফুটে উঠল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ