ঢাকা, শুক্রবার 31 August 2018, ১৬ ভাদ্র ১৪২৫, ১৯ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রেমিট্যান্স প্রবাহে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হলেও পিছিয়ে পড়ছে শহর

 

স্টাফ রিপোর্টার: নিত্য পণ্য আর আবাসন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সংকটে শহুরে নাগরিক। অর্থনীতির নানা সূচকে পিছিয়ে পড়ছে তারা। রেমিট্যান্স আর কৃষিতে চাঙ্গা গ্রামীণ অর্থনীতি। ব্যাংকে হিসাব খোলার ক্ষেত্রে শহরের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে গ্রামাঞ্চলের মানুষ। ব্যাংকিং সেবা নিতে শহরের তুলনায় সাড়ে ৬ গুণ বেশি ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে গ্রামে। ফলে এক সময় পিছিয়ে থাকা এসব মানুষের হিসাবে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার কোটি টাকারও বেশি। যা গতি এনে দিচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতিতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং সংক্রান্ত এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এজেন্ট ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ১৭ ব্যাংকের মাধ্যমে ব্যাংক হিসাব খুলেছেন মোট ১৭ লাখ ৭৭ হাজার ৪০০ জন। এর মধ্যে গ্রামের মানুষ ১৫ লাখ ৪০ হাজার ৩৭৭ জন। আর শহরের ২ লাখ ৩৭ হাজার ২৩ জন। এই হিসাবে শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে খোলা ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৬ গুণ।

তবে নারী হিসাবধারীর চেয়ে পুরুষ হিসাবধারীর সংখ্যা প্রায় ২ গুণ বেশি। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের জন্য ১১ লাখ ৫৪ হাজার ৭৮৪ জন পুরুষ ব্যাংক হিসাব খুলেছেন। ব্যাংক হিসাব খোলা নারী রয়েছেন ৬ লাখ ৯ হাজার ৮২৪ জন ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রামে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছাতে এজেন্ট ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং ও ব্যাংকের শাখা বাড়াতে বেশ কয়েকটি উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এ কারণে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী ব্যাংকিং সেবার আওতায় আসছে।

জানা গেছে, শহুরে বসবাসরত নাগরিকরা বেশি টাকা আয় করলেও অর্থনৈতিক নানা হিসেবে পিছিয়ে পড়ছে তারা। একজন নিম্ম কিংবা মধ্যম আয়ের লোক প্রতি মাসে যে টাকা আয় করে তার ৫০% ভাগ চলে যায় বাসা ভাড়ায়। যাতায়াত, চিকিৎসা, শিক্ষা আর ভোগ বিলাসে চলে যায় বাকি টাকা। এতে করে প্রতি মাসে ঋণের জালে আটকে যাচ্ছে তারা।

এতে করে অনেকেই বাধ্য হয়ে শহর ছাড়ছেন। কিন্তু অনেকে আবার সন্তান্তে উচ্চ শিক্ষার কারনে গ্রামের জমি বিক্রি করে হলেও শহরে বসবাস করছেন। এমন বাস্তব হিসেবে গ্রামের তুলনায় শহরের মানুষরা পিছিয়ে পড়ছেন। এখানে সম্পাদের নিরাপত্তাও অনেক কম। তাই এখানে টাকা আয় করলেও গ্রামেই তা সঞ্চয় করছেন। এসব কারনে এক সময়ে পিছিয়ে পড়া গ্রাম শহরকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। যা অর্থনীতিতে নতুন করে ভাবনার বিষয় হয়ে  দাড়িয়েছে।

জানা গেছে, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে ২০১৩ সালে এজেন্ট ব্যাংকিং নীতিমালা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর ২০১৪ সালে প্রথম এ সেবা চালু করে ব্যাংক এশিয়া। ওই সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গর্বনর ড. আতিউর রহমানের উদ্যোগেই এই কার্যক্রম শুরু হয়।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, এর মাধ্যমে গ্রামের মানুষ ব্যাংকিং সেবার আওতায় আসছে। মানুষ উপকৃত হচ্ছে। যেমন অনেক দুরে ব্যাংকে না গিয়ে নিকটবর্তী এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ইউটিলিটি বিল জমা, ব্যাংক হিসাব খোলা, ঋণ নেয়া, রেমিট্যান্স উঠানো, আমানত রাখা ও প্রয়োজনে উত্তোলন করতে পারে। সেজন্য গ্রাহকদের ব্যয় সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর হওয়ায় প্রতিনিয়ত এর প্রসার ঘটছে।

তিনি বলেন, গ্রামের উন্নতি হলে দেশেরও উন্নতি হবে। এ কারণেই গ্রামাঞ্চলে ব্যাংকের শাখা স্থাপন, এজেন্ট ব্যাংকিং ও মোবাইল ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

তবে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে শুধু গ্রাহক নয় স্বয়ং ব্যাংকও উপকৃত হচ্ছে জানিয়ে সিরাজুল ইসলাম বলেন, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে লোকবল কম লাগে না। তাই ব্যাংকগুলো তাদের কর্মীদের ঋণ আদায়ে কিংবা অন্য কাজে লাগাতে পারে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১৭ সালের জুন শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে গ্রাহক ছিল ৮ লাখ ৭২ হাজার ৮৬৫ জন। এই হিসাবে গত এক বছরে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে নতুন গ্রাহক হয়েছেন ৯ লাখ ৪ হাজার ৫৩৫ জন। আর গত ৩ মাসে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে নতুন গ্রাহক হয়েছেন ৩ লাখ ৮ হাজার ৬০৩ জন। মার্চ শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে নিবন্ধিত গ্রাহক ছিলেন ১৪ লাখ ৬৮ হাজার ৭৯৭ জন। ৬ মাসের ব্যবধানে নতুন গ্রাহক হয়েছেন ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৩৩ জন। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে নিবন্ধিত গ্রাহক ছিলেন ১২ লাখ ১৪ হাজার ৩৬৭ জন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩ হাজার ৫৮৮টি এজেন্টের আওতায় ৫ হাজার ৩৫১টি আউটলেটের মাধ্যমে সারাদেশে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা দেয়া হচ্ছে।

এর মধ্যে ব্যাংক এশিয়া, মধুমতি ব্যাংক ও এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ব্যাংক এশিয়ার ২ হাজার ২৪২টি আউটলেটের মধ্যে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের সংখ্যা ১ হাজার ৮২৮টি। ৩ মাস আগে অর্থাৎ মার্চে ৩ হাজার ২১৬ এজেন্টের আওতায় আউটলেট ছিল ৪ হাজার ৯০৫টি।

আমানত বাড়ছে এসব হিসাবে। ২০১৮ সালের ৩০ জুনের পর এজেন্ট ব্যাংকিং হিসাবে মোট জমার পরিমাণ (আমানত) দাঁড়ায় ২ হাজার ১২ কোটি টাকায়। ৩ মাস আগে অর্থাৎ মার্চের শেষে এজেন্ট ব্যাংকিং হিসাবে মোট জমার পরিমাণ (আমানত) ছিল ১ হাজার ৬৩৪ কোটি টাকা। এই হিসাবে আমানতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৩ দশমিক ১৫ শতাংশ।

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে গ্রাহক তার চলতি হিসাবে সর্বোচ্চ ৪ বার ২৪ লাখ টাকা নগদ জমা এবং সর্বোচ্চ ২টি লেনদেনে ১০ লাখ টাকা উত্তোলন করতে পারেন। সঞ্চয়ী হিসাবে সর্বোচ্চ ২ বার ৮ লাখ টাকা নগদ জমা এবং সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা করে ২ টি লেনদেনে ৬ লাখ টাকা তুলতে পারেন। তবে রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে উত্তোলনসীমা প্রযোজ্য হয় না। দিনে ২ বার জমা ও উত্তোলন করা যায়।

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ঋণও বিতরণ করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতের ৬ টি ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মোট ১৩৭ কোটি ৩২ লাখ ৯৪ হাজার টাকার ঋণ বিতরণ করেছে। এর মধ্যে শহর অঞ্চলে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ২৩ কোটি ৭৮ লাখ ৭৮ হাজার টাকা এবং গ্রামাঞ্চলে ঋণ বিতরণ হয়েছে ১১৩ কোটি ৫৪ লাখ ১৬ হাজার টাকা।

জানা গেছে, এ পর্যন্ত ২০টি বাণিজ্যিক ব্যাংককে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার লাইসেন্স দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে ১৭টি ব্যাংক মাঠপর্যায়ে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ