ঢাকা, শুক্রবার 31 August 2018, ১৬ ভাদ্র ১৪২৫, ১৯ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

দেশে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী

 

স্টাফ রিপোর্টার : দেশে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সার্বিক পর্যবেক্ষণে সর্বোচ্চ দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হিসেবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থায় দুর্নীতির শিকার হয়েছেন ৭২.৫ শতাংশ মানুষ। ঘুষ দিয়েছেন ৬০.৭ শতাংশ মানুষ, যার পরিমাণ ২ হাজার ১শ ৬৬ কোটি টাকা। দেশের ৮৯ শতাংশ মানুষ মনে করেন ঘুষ না দিলে কোনো সেবা খাতে সেবা মেলে না। ২০১৭ সালে প্রাক্কলিত ঘুষের পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ৬৮৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা। আর সার্বিকভাবে সেবাখাতগুলোতে দুর্নীতির শিকার হয়েছেন ৬৬.৫ শতাংশ মানুষ।  দুর্নীতিবিরোধী সংগঠন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশের (টিআইবি) খানা জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। 

গতকাল বৃহস্পতিবার ধানমন্ডিতে মাইডাস ভবনে টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়। সাংবাদিক সম্মেলনে ‘সেবাখাতে দুর্নীতি : জাতীয় খানা জরিপ ২০১৭’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদন প্রকাশকালে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন ও গবেষণা উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপদেষ্টা নির্বাহী ব্যবস্থাপনা পরিষদ ড. সুমাইয়া খায়ের ও রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম।

২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত এই জরিপ করেছে টিআইবি। জরিপে ১৫ হাজার ৫৮১টি খানা অংশ নেয়। এর আগে ২০১৫ সালে একই জরিপ চালায় টিআইবি। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, ২০১৫ সালের তুলনায় সেবা খাতে ২০১৭ সালে দুর্নীতির শিকার খানার হার প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। ২০১৫ সালে যা ছিল ৬৭ দশমিক আট শতাংশ, গতবছর তা দাঁড়িয়েছে ৬৬ দশমিক পাঁচ শতাংশে। কিন্তু জাতীয়ভাবে প্রাক্কলিত মোট ঘুষের পরিমাণ ২০১৭ সালে ১ হাজার ৮৬৭ কোটি টাকা বেড়েছে। গতবছর ২০১৭ সালে প্রাক্কলিত ঘুষের পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ৬৮৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এটি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ এবং জাতীয় বাজেটের ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। এছাড়া ২০১৫ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে কোনো কোনো খাতে দুর্নীতি উল্লেখ্যযোগ্য হারে বেড়েছে এরমধ্যে গ্যাস, কৃষি, বিআরটিএ, বিচারিক সেবা খাত অন্যতম।

ব্যক্তিস্বার্থে ক্ষমতার অপব্যবহারকে দুর্নীতির সংজ্ঞা হিসেবে উল্লেখ করেছে টিআইবি। সেই সংজ্ঞা অনুযায়ী, সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষ যেসব দুর্নীতির শিকার হয়েছেন সেগুলো হচ্ছে- ঘুষ, সম্পদ আত্মসাত, প্রতারণা, দায়িত্বে অবহেলা, স্বজনপ্রীতি ও প্রভাব বিস্তার। এ ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়েছে তাদের। দুর্নীতিতে দ্বিতীয় স্থানে পাসপোর্ট, তৃতীয় বিআরটিএ ও চতুর্থ স্থানে রয়েছে বিচারিক সেবাখাত। ২০১৭ সালে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার প্রশাসন, ভূমি সেবা, কৃষি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, বিচারিক সেবা, বিদ্যুত, ব্যাকিং, বিআটিএ, কর ও শুল্ক, এনজিও, পাসপোর্ট, বীমা, গ্যাস সেবাখাতের ওপর জরিপ চালিয়ে এ তথ্য পেয়েছে টিআইবি।

দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা পাসপোর্ট খাতে দুর্নীতির শিকারে হয়েছেন ৬৭.৩ শতাংশ মানুষ। এ খাতে মোট ঘুষ দিয়েছেন ৫৯.৩ শতাংশ সেবাগ্রহীতা, যার পরিমাণ ৪৫১ কোটি টাকার বেশি। তবে জাতীয়ভাবে প্রাক্কলিত মোট ঘুষের দিক থেকে সবার ওপরে ভূমি সেবা খাত। এ খাতে দুর্নীতি হয়েছে ২ হাজার ৫শ ১২ টাকার। 

টিআইবি বলছে, ২০১৭ সালে বিভিন্ন খাত থেকে সেবা গ্রহণকারীরা গড়ে পাঁচ হাজার ৯৩০ টাকা ঘুষ দিয়েছে। ২০১৫ সালে মাথাপিছু প্রাক্কলিত ঘুষের পরিমাণ ছিল ৫৩৩ টাকা, যা ২০১৭ সালে দাঁড়িয়েছে ৬৫৮ টাকা। গত বছর সর্বোচ্চ ঘুষ আদায় করা হয়েছে গ্যাস খাতে (৩৩ হাজার ৮০৫ টাকা), বিচারিক সেবা খাতে (১৬ হাজার ৩১৪ টাকা) ও বীমা খাতে (১৪ হাজার ৮৬৫ টাকা)।

জরিপে দেখানো হয়েছে, ঘুষ প্রদানকারী খানার ৮৯ শতাংশ ঘুষ দেয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন ঘুষ না দিলে সেবা পাওয়া যায় না অর্থাৎ ঘুষ আদায়কে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা হয়েছে; যা ২০১৫ সালে ছিল ৭০.৯ শতাংশ। হয়রানি বা জটিলতা এড়াতে ঘুষ দিয়েছেন ৪৭.১ শতাংশ সেবাগ্রহীতা, নির্ধারিত ফি জানা না থাকায় অতিরিক্ত অর্থ দিয়েছেন ৩৭ শতাংশ, নির্ধারিত সময়ে সেবা পেতে ২৩.৩ শতাংশ, আরও দ্রুত সময়ে সেবা পেতে ঘুষ দিয়েছেন ৪.৩ শতাংশ, অবৈধ সুবিধা বা সুযোগ প্রাপ্তির জন্য ঘুষ দিয়েছেন ২ শতাংশ সেবাগ্রহীতা।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সেবাখাতে দুর্নীতিতে কিছুক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আসলেও সার্বিক তথ্য উদ্বেগজনক। ঘুষের শিকার হওয়ার হার কমলেও পরিমাণ বেড়েছে। বিচারিক খাতের দুর্নীতিও উদ্বেগজনক। যারা অনিময় করছেন, তারা ঘুষকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করেছে। যারা দিচ্ছে তারা জীবনযাপনের অংশ করে নিয়েছে।

সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আমরা আশা করেছিলাম, বেতন বৃদ্ধির পরে দুর্নীতি কমবে। কিন্তু যারা দুর্নীতি করেন তাদের জন্য বেতন বৃদ্ধি কোন উপাদান নয়। 

সম্প্রতি মন্ত্রিসভায় সরকারি কর্মচারী আইনের খসড়া অনুমোদনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্ত অগ্রণযোগ্য, অসাংবিধানিক। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। দুদকের যে ক্ষমতা তাতে যে কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারে। জনপ্রতিনিধি এমনকি প্রধানমন্ত্রীকেও গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা আছে, কিন্তু সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে অন্য নিয়ম হচ্ছে। দুদকের চেয়ারম্যানও এটিকে সমর্থন করেছেন- আমরা হতাশ হয়েছি। এই আইন প্রণয়ন হলে দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ বাড়বে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশে দুর্নীতি প্রতিরোধে যে আইনি কাঠামো রয়েছে তা আগে চেয়ে সামর্থ্যবান। কিন্তু আইন প্রয়োগে ঘাটতি রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান সুলতানা কামাল বলেন, দুর্নীতি কমাতে হলে দেশ পরিচালনায় যারা আছেন, তাদের সদিচ্ছা জরুরি। ঘুষ না দিলে সেবা দেয় না যারা, তারা জবাবদিহিতার সম্মুখীন হচ্ছে না। এই জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের তারা দায়িত্ব পালন করছে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ