ঢাকা, শুক্রবার 31 August 2018, ১৬ ভাদ্র ১৪২৫, ১৯ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

খুলনা বিআরটিএ অনিয়ম-দুর্নীতির আখড়া

খুলনা অফিস : নগরীর শিরোমণি বাদামতলায় অবস্থিত বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি-বিআরটিএ খুলনা দপ্তরটি নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। ড্রাইভিং লাইসেন্স, যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন ও রুট পারমিটসহ সংশ্লিষ্ট কাজ করিয়ে দেয়ার নামে এ অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে যোগসাজশে চিহ্নিত দালাল সিন্ডিকেট বেশ তৎপর রয়েছে। বিনিময়ে গ্রাহক হয়রানি এবং নির্ধারিত ফি’র বাইরেও নেয়া হচ্ছে মোটা অঙ্কের অর্থ।

এদিকে, মাত্র ৭ মাসের ব্যবধানে এ অফিসে ঘটেছে বড় ধরনের তুঘলকি কান্ড। সরকারি রাজস্ব জমা না দিয়ে পকেটস্থ করে প্রদান করা হয়েছে ভুয়া লাইসেন্স। বিনিময়ে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকা। বিষয়টি উল্লেখ করে সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, ভুয়া লাইসেন্স চক্রের মূল হোতা ছিলেন খুলনা বিআরটিএ’র মোটরযান পরিদর্শকের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা সাইফুর রহমান। যদিও এ সংক্রান্ত নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে ইতোমধ্যেই তাকে ম্যাকানিক্যাল এ্যাসিসটেন্ট পদে রাজশাহী এবং কিছু দিনের ব্যবধানেই ঢাকায় বদলি করা হয়।

অভিযুক্ত সাইফুর রহমান দাবি করেছেন-‘তিনি কোনো ভুয়া লাইসেন্স করেননি। তবে, সবার সঙ্গে সু-সম্পর্ক রেখে চলার চেষ্টা করেছেন, সহযোগিতার রোল ছিল তার। তিনি আরও বলেন, তিনি অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকলেও ঘটনার সময়ে মোটরযান পরিদর্শক ছিলেন রামকৃষ্ণ পোদ্দার, যিনি বর্তমানে চট্টগ্রাম বিআরটিএতে কর্মরত রয়েছেন’।

সম্প্রতি দুদক চেয়ারম্যান বরাবর পাঠানো অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, সাইফুর রহমান খুলনা বিআরটিএতে কর্মরত থাকাকালে ২০১৭ সালের ১ জুন মাস থেকে চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রতি মাসে সরকারি রাজস্ব বাদে আনুমানিক এক হাজার করে ভুয়া লাইসেন্স ও লার্নার দিয়েছেন। এমনকি প্রার্থী অনুপস্থিত থাকার পরও লার্নার পাস করিয়ে দেন। বিনিময়ে প্রতি প্রার্থীর কাছ থেকে আনুমানিক ৮ হাজার থেকে ৯ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন। এছাড়া প্রতিটি পেশাদার লাইসেন্সের পুলিশ ভেরিফিকেশনও ভুয়া। উল্লিখিত সময়ের ড্রাইভিং লাইসেন্সের প্রতিটি রেজুলেশন থেকে ই-লার্নার নম্বর নিয়ে বিআরটিএ’র কম্পিউটারে এবং অফিসে রিসিভকৃত প্রতিটি আবেদন যাচাই করলেই ভুয়া লাইসেন্স সংক্রান্ত তথ্যের সত্যতা পাওয়া যাবে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। ভুয়া লাইসেন্স সিন্ডিকেট’র হোতা সাইফুর রহমানকে সহযোগিতা করে বিআরটিএ’র কম্পিউটার অপারেটর মামুন (ছোট মামুন গেটিস) ও স্থানীয় দালাল মাসুদ ও কামাল। এর বাইরেও তিনি ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরের জুন মাসে স্থানীয় দালাল চক্রের হোতা সুজনের মাধ্যমে রূপসা-মংলা রুটে চলাচলরত রূপসা মালিক সমিতির আওতাধীন ৫০-৬০টি বাস পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ফিটনেস সনদ প্রদান করেন।

অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, সাইফুর রহমান এভাবে একের পর এক অনিয়ম-দুর্নীতি করে অঢেল অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছেন। খুলনা, বরিশাল ও মাদারিপুরে তিনি সম্পত্তি ক্রয় করেছেন। তিনটি প্রাইভেটকার ও আইফোন ব্যবহারসহ অত্যন্ত বিলাসবহুল জীবনযাপন করেন তিনি। অভিযোগে এসব ঘটনার যথাযথ তদন্তপূর্বক কঠোর শাস্তির দাবি জানানো হয়।

এদিকে খুলনা বিআরটিএ’র সূত্র জানান, সাইফুর রহমান ২০১১ সাল থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন দফায় বিআরটিএ খুলনা ও বাগেরহাটে কর্মরত ছিলেন। সর্বশেষ তিনি খুলনা বিআরটিএ’র মোটরযান পরিদর্শকের অতিরিক্ত দায়িত্বে থেকে বড় ধরনের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। এ কারণে তাকে মোটরযান পরিদর্শকের অতিরিক্ত দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে বিআরটিএ’র রাজশাহী অফিসে তার মূলপদ ম্যাকানিক্যাল এ্যাসিসটেন্ট পদে বদলি করা হয়। সেখান থেকেও কিছু দিনের ব্যবধানেই তাকে ঢাকায় বিআরটিএ’র সদর দপ্তরে বদলি করা হয়। অভিযোগের বিষয়ে সাইফুর রহমান অকপটে স্বীকার করেন, ‘বিআরটিএ’র দালালরা এমন কারও সাক্ষর নেই যে জাল করতে পারে না, অফিসের সীল ম্যাকানিক মাসুদও এ কাজে সহায়তা করে থাকে। এছাড়া মোটরযান পরিদর্শকরা যে কোনো স্থানে বসেই ফিটনেস সনদ দিতে পারে বলেও দাবি করেন তিনি। রূপসায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ গাড়ির ফিটনেস সনদ নেই স্বীকার করে ‘স্বজ্ঞানে তিনি কোনো অনিয়ম করেননি’ বলেও দাবি করেন সাইফুর রহমান।

সূত্র জানান, খুলনা বিআরটিএতে বর্তমানে জহির উদ্দিন বাবর ও সাইফুল ইসলাম নামে দু’জন মোটরযান পরিদর্শক কর্মরত রয়েছেন। তারাও দালাল নির্ভর হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে দালাল ও কথিত কম্পিউটার অপারেটর গেটিস মামুনকে দিয়ে তারা অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন ধরনের কাজ করে থাকেন। অনেক সময় দালাল মামুনকে তাদের অফিসেও অবস্থান করতে দেখা যায়।

এ ব্যাপারে বিআরটিএ খুলনার সহকারী পরিচালক আবুল বাসার বলেন, নির্ধারিত রাজস্ব জমা ছাড়া কোনোভাবেই লাইসেন্স করা সম্ভব না। কারণ অফিসের কম্পিউটারের সফটওয়ারে ওই আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে না। তবে, দালালের মাধ্যমে ভুয়া স্লিপের মাধ্যমে কেউ অর্থ হাতিয়ে নিতে পারে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ