ঢাকা, শনিবার 1 September 2018, ১৭ ভাদ্র ১৪২৫, ২০ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

স্কুলের ম্যানেজিং কমিটিতে কি মধু

ইবরাহীম খলিল : স্কুলের অবস্থা জরাঝীর্ণ। শিক্ষার্থীর সংখ্যাও তেমন একটা নেই। কিন্তু স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি নিয়ে চলছে রীতিমত যুদ্ধ। এজন্য স্কুলের শিক্ষক থেকে শুরু করে সবাই দৌড়াদৌড়িতে ব্যস্ত। এই অস্থিরতার মধ্যে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। তাতেও তোয়াক্কা নেই কারো। ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও উপজেলার পাগলা থানাধীন তললী উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি নিয়ে চলা এই অচলাবস্থা কোনদিন শেষ হবে কেউ জানে না।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান পরিচালনা কমিটির বিরুদ্ধে নির্বাচন ছাড়াই অবৈধভাবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কমিটি গঠনসহ বিধিবহির্ভূত নানা কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি সরকারি নানা দফতর হয়ে উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। এলাকার লোকজন বলছেন বেতন নেই, ভাতা নেই; অথচ এই কমিটিতে থাকার জন্য রাজনৈতিক প্রভাব থেকে শুরু করে অর্থ খরচও করা হচ্ছে প্রচুর। নিশ্চয় এখানে কোন মধু আছে।
জানা গেছে, গ্রামের স্কুলগুলোতে নিয়োগ বাণিজ্য হয়। রাজনৈতিক এবং প্রশাসনের সঙ্গে যোগসাজস করে অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। একারণে লোভনীয় হয়ে উঠেছে কমিটিতে জায়গা করে নেওয়া। এছাড়া এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতেও অনেকেই এই পদ ব্যবহার করে থাকেন। একই ঘটনা ঘটেছে এই তললী উচ্চ বিদ্যালয়ের কমিটি নিয়ে। এর অংশ হিসেবে কমিটিতে অবস্থান নিয়েই প্রতিষ্ঠানটির তিনজন শিক্ষককে বহিষ্কার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানা গেছে। তবে কমিটির লোকজন বিষয়টি মানতে নারাজ। তারা বলছেন অর্থের বিনিময়ে এখানে শিক্ষক কর্মচারী নেওয়ার সুযোগ নেই। 
তললী গ্রামে বাড়ি এবং ঢাকার উত্তরার দৌড় এলাকায় ব্যবসা করেন মোহাম্মদ আলী সায়েম। তিনি একবার এই স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ছিলেন। আবারো তললী উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি থাকতে মরিয়া তিনি। আলী সায়েমের বিরুদ্ধে অভিযোগ, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেনকে প্রভাবিত করে ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে গত ০৩/০৬/১৮ ইং তারিখে বিধি বহির্ভূতভাবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। এতে সহযোগিতা করেছেন বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম মো: বজলুর রহমান।
০৩/০৬/১৮ ইং তারিখে কমিটি গঠনের রেজ্যুলেশনে দেখা যায়, কমিটি গঠনের দিন হাবিবুর রহমান মীর মোহাম্মদ আলী সায়েমকে সভাপতি করার প্রস্তাব করেন। কিন্তু প্রশ্ন দেখা দিয়েছে হাবিবুর রহমান মীর নিজেই অবৈধ অভিভাবক সদস্য। তার প্রস্তাবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় পুরো কমিটির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। 
এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম মো: বজলুর রহমানের সাথে কথা হলে তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, অভিভাবক সদস্য হাবীবুর রহমান মিরকে অবৈধভাবে অবৈধ প্রতিনিধি বানানো হয়নি। কিন্তু ডকুমেন্ট প্রমাণ করে যে তাকে অবৈধভাবে বানানো হয়েছে এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি  ফোন কেটে দেন।
প্রাপ্ত তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে , ২০১৮ সালে বিধি অনুযায়ী নবগঠিত ম্যানেজিং কমিটি গঠনের লক্ষ্যে কোন বৈধ নির্বাচনই হয়নি। কাগজপত্রে কমিটিকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত দেখানো হয়েছে। তাছাড়া তারা আইন ও বিধির তোয়াক্কা না করে কমিটি নির্বাচনের যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্মন্ন করে এবং কোন প্রকার ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও প্রকাশ করেনি। এজন্য কমিটির বিরুদ্ধে একটি মামলাও হয়েছে আদালতে। মামলাটি করেছেন আবদুর রশিদ নামের এক ব্যক্তি। তার ৪ সন্তান এই স্কুলে পড়াশোনা করে।
তিনি অভিযোগ করেন, মো. আলী সায়েম ইচ্ছে মত বিধি ভঙ্গ করে হাবীবুর রহমান মীরকে অভিভাবক সদস্য বানিয়েছেন। ২৮/০৫/২০১৮ইং তাকে কমিটির সদস্য মনোনয়নের সময় তার কোন শিক্ষার্থী অত্র বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছিল না। বিষয়টি জানার জন্য এই প্রতিবেদক গত ২২/০৭/ ২০১৮ ইং তারিখে সরেজমিনে পরিদর্শন করতে যান। সেখানে গিয়ে হাবীবুর রহমান মীরের কোন শিক্ষার্থীকে পাওয়া যায়নি। তার ছেলে নাহীদ মীরকে পাওয়া যায় পার্শ্ববর্তী আনোয়ারা মডেল হাইস্কুলে। ঐ স্কুলের প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম খান জানিয়েছেন নাহীদ মীর তার স্কুলে ৬ষ্ট শ্রেণি থেকে পড়াশোনা করেন। এই প্রতিবেদক আনোয়ারা মডেল স্কুলে গিয়ে নাহীদ মীরকে নবম শ্রেণির ক্লাসে দেখতে পান। সেদিন নবম শ্রেণির ক্লাস নিচ্ছিলেন প্রধান শিক্ষক নিজে। প্রমাণ হিসেবে বিদ্যালয়টির অফিস রুমে  প্রধান শিক্ষকের পাশে নাহীদ মীর দাঁড়িয়ে আছেন এমন একটি ছবি রয়েছে এই প্রতিবেদকের কাছে।
মজার বিষয় হলো- এই প্রতিবেদক বিদ্যালয় পরিদর্শনের পরদিন ২৩/০৭/১৮ ইং তারিখে নাহীদ মীরকে ট্রান্সফার সার্টিফিকেট (টিসি) নিয়ে তললী উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি দেখানো হয়। যার সম্পূর্ণ ডকুমেন্ট দৈনিক সংগ্রামের কাছে রয়েছে।
বিধিমালায় উল্লেখ রয়েছে ‘স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির অভিভাবক সদস্য হতে হলে তার কোন শিক্ষার্থী সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ে নিয়মিত অধ্যয়নরত হইতে হবে।’ কিন্তু কমিটির সদস্য হওয়ার সময় হাবিবুর রহমান মীরের কোন শিক্ষার্থী এই স্কুলে ছিল না।
এদিকে, বর্তমান কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আলী সায়েম ক্ষমতার অপব্যবহার করে অনৈতিকভাবে স্কুলের প্রধান শিক্ষক রুবেল ইসলাম খানকে গত ২১/০৬/১৮ ইং তারিখে চূড়ান্ত বরখাস্ত এবং ২৩/০৬/১৮ সহকারী শিক্ষক  মো. ছাইদুর রহমান এবং শরীর চর্চা শিক্ষক কেবিএম জিল্লুর রহমানকে কোন প্রকার কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়াই সাময়িক বরখাস্ত করেন। বরখাস্তকৃত শিক্ষকদের অভিযোগ, বর্তমান কমিটি তাদের স্কুলে যেতে নিষেধ করে দিয়েছে। ফলে তারা স্কুলে যেতে নিরাপত্তাহীনতা ভোগছেন। 
বরখাস্তকৃত সহকারী শিক্ষক সাইদুর রহমান জানান, বোর্ড কর্তৃক কমিটি ভেঙ্গে দেয়ার সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে আমাদেরকে কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়াই বরখাস্ত করা হয় । কিন্তু বরখাস্তের কারণটি যথাযথ নয়।
এব্যাপারে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. বেলায়েত হোসেন দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, বর্তমান সভাপতি একজন দানশীল মানুষ। তার বিরুদ্ধে ষড়ন্ত্র হচ্ছে। আর শিক্ষকদের অপরাধ গুরুতর হওয়ায় তাদের নোটিশ ছাড়াই বরখাস্ত করা হয়েছে। স্কুলে উপস্থিত না থাকার কারণে খোরপোষ বন্ধ রাখা হয়েছে। 
এ বিষয়ে স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আলী সায়েম শুক্রবার তার ঢাকার নুতন বাজার এলাকার নিজ বাসায় আলাপকালে এই প্রতিবেদককে বলেন, গ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনেকটা সিলেক্টিভ (বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা) পদ্ধতিতে কমিটি হয়ে থাকে। গ্রামের স্কুলগুলোতে ঢাকা শহরের মত নির্বাচনের মাধ্যমে হয় না। রাজনৈতিকভাবেই সিলেকশন (নির্ধারণ) হয়ে থাকে। আর ষড়যন্ত্র  করে আগের কমিটি ভেঙ্গে দেওয়ার কারণে তিনজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ