ঢাকা, শনিবার 1 September 2018, ১৭ ভাদ্র ১৪২৫, ২০ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ডিজিটাল কারচুপির কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিতর্কিত ইভিএম নিষিদ্ধ

#  আবিষ্কারক দেশ আমেরিকায় নিষিদ্ধ
#  ইভিএম বর্জন করতে যাচ্ছে ভারত
#  আয়ারল্যান্ড ২০০৬ সালেই পরিত্যাগ করেছে
#  ২০০৯ সালে জার্মানিতে অসাংবিধানিক ঘোষণা
মিয়া হোসেন : বিশ্বের বিভিন্ন দেশ কারচুপি ও বড় ধরনের ত্রুটির কারণে নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার বর্জন করেছে। বিভিন্ন দেশের আদালত এ মেশিনে ভোট গ্রহণের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে। এমনকি আবিষ্কারক দেশ আমেরিকায় এই ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আর বাংলাদেশে হঠাৎ করেই সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করার জন্য আইন সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোটের পক্ষ থেকে বিরোধিতা করা হলেও নির্বাচন কমিশন তা আমলে নেয়নি। এমনকি খোদ নির্বাচন কমিশনের একজন কমিশনার এ বিষয়ে আপত্তি জানালেও তাতে কর্ণপাত করা হয়নি।
গত বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশনের সভায় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করার জন্য নির্বাচনী আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-এর সংশোধনী খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। সেই সাথে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১০০টি আসনে ইভিএম ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে বলে কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এই ইভিএম ব্যবহার নিয়ে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও বিশেষজ্ঞরা সমালোচনা করছেন।
বিভিন্ন বিদেশী পত্রিকার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ১৯৬০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সর্বপ্রথম এই পদ্ধতি চালু হয়, কিন্তু বর্তমানে পৃথিবীর ৯০ শতাংশ দেশে ইভিএম তথা ই-ভোটিং পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয় না। শুধু তাই নয়, যে কয়েকটি দেশ তা চালু করেছিল তারা এখন নিষিদ্ধ করছে। বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে বিগত বিশ বছর ধরে ইভিএম চালু রয়েছে কিন্তু ২০০৯ সাল হতে এই পদ্ধতির বিরুদ্ধে ব্যাপকহারে অভিযোগ উঠতে থাকে। ভারতের আদালতে ইভিএম এর বিরুদ্ধে একাধিক পিটিশন রয়েছে। সম্প্রতি দেশটির সিংহভাগ রাজনৈতিক দল এ পদ্ধতির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে। কংগ্রেস দলের মুখপাত্র অভিষেক মনু সিংভি গত সপ্তাহে জানান যে, শুধু তাদের দলই নয় দেশের অন্তত ৭০ শতাংশ রাজনৈতিক দলই মনে করে যত দ্রুত সম্ভব কাগজের ব্যালট আবার ফিরিয়ে আনা উচিত। এ দাবিতে তারা অনড়। ইভিএমের প্রতি তাদের বিশ্বাস নেই।
আয়ারল্যান্ড ই-ভোটিং পরিত্যাগ করেছে ২০০৬ সালেই। ২০০৯ সালে জার্মানির ফেডারেল কোর্ট ইভিএমকে অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করেছে। ২০০৯ সালে ফিনল্যান্ডের সুপ্রিমকোর্ট তিনটি মিউনিসিপ্যাল নির্বাচনের ফলাফল অগ্রহণযোগ্য বলে ঘোষণা করে। নেদারল্যান্ডে ই-ভোটিং কার্যক্রম শুরু হলেও জনগণের আপত্তির মুখে তা প্রত্যাহার করা হয়।
ইভিএম বিশেষজ্ঞ ড. অ্যালেক্স হালডারমেন আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে ইভিএমের ওপর গবেষণা করে প্রমাণ পেয়েছেন যে, ইভিএম টেম্পারপ্রুফ নয়। আমেরিকায় ২২টির বেশি অঙ্গরাজ্যে ইভিএম-কে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং বাকিগুলোতেও নিষিদ্ধ করার পথে। ভারতের কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ ভরদ্বাজ মনে করেন যে, একটি গোপন কোড জানা থাকলেই ই-ভোটিং মেশিনের গণনাপদ্ধতি সম্পূর্ণ পাল্টে দেওয়া সম্ভব। মেশিনের মাদারবোর্ড তখন সে অনুযায়ীই কাজ করবে। মেশিন আগে হাতে পেলে এ কাজ খুবই সহজ। এমনকি মেশিন আগে হাতে না পেলেও ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া চলাকালীন মাঝপথে মাত্র ৯০ সেকেন্ডে এ কাজ করা যায়।
ভারতের ইকোনোমিক টাইমস পত্রিকার অনুসন্ধানের রিপোর্টে জানা যায়, বিশ্বের ২০০টি দেশের মধ্যে মাত্র ৪টি দেশে ইভিএম ব্যবহার করা হয়। সেসব দেশেও ইভিএম ব্যবহার নিয়ে তুমুল সমালোচনা চলছে। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে আজো পর্যন্ত ইভিএমের গ্রহণযোগ্য ব্যবহার ঘটেনি। যে অল্পসংখ্যক দেশে ইভিএম আংশিকভাবে ব্যবহার করা হয় সেখানেও ভোট প্রক্রিয়ায় ও ফল নির্ধারণে ভয়াবহ কারচুপির প্রমাণ মিলেছে। ভোট গ্রহণের এই পদ্ধতিতে ইন্টারনেট সিকিউরিটি ও তথ্যের গোপনীয়তা নিয়েও গণতান্ত্রিক বিশ্বে সার্বজনিন ভীতি ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তাই প্রায় সব দেশেই নির্বাচনে ইভিএমকে ইতিমধ্যে নিষিদ্ধ ও জনবিরোধী মাধ্যম হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
আয়ারল্যান্ডে ইভিএম ব্যবহার নিয়ে গবেষণার পেছনে ৫১ মিলিয়ন ইউরো খরচ করার পর এটিকে অবৈধ নির্বাচনী যন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়। জার্মানির সুপ্রিমকোর্ট ইভিএমকে অসাংবিধানিক ও জনস্বার্থবিরোধী ঘোষণার মাধ্যমে এর ব্যবহারকে নিষিদ্ধ করে। হল্যান্ডে নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও ফলাফলের স্বচ্ছতার অভাবে ডাচ কাউন্সিল আইন করে ইভিএম ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। এছাড়াও ইটালি ও প্যারাগুয়েতে ইভিএম নিষিদ্ধ করা হয়।
যুক্তরাজ্যেও অনেক গবেষণা ও আলোচনার ভিত্তিতে ভবিষ্যতে নির্বাচনে বিতর্কিত ইভিএম ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ক্যালিফোর্নিয়াসহ যুক্তরাজ্যের অধিকাংশ অঙ্গরাজ্যে, সুইজারল্যান্ড-স্পেন-রোমানিয়াসহ বেশকিছু দেশে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর আশাব্যঞ্জক ফল না ঘটায় এর আর প্রয়োগ ঘটেনি। নরওয়েতে কোন্্ ভোটার কাকে ভোট দিচ্ছে এই গোপণীয়তা ভঙ্গের ভয়ে পরিক্ষামূলক নির্বাচনে ভোটের পরিমাণ আশঙ্কজনকভাবে কমে যায়। এটিকে গণতন্ত্রের জন্য হুমকি ও জনস্বার্থের পরিপন্থী বিবেচনা করে সেখানে ইভিএম প্রত্যাহার করা হয়।
বিবিসির একটি রিপোর্ট থেকে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকরা মোবাইল মেসেজের মাধ্যমে ভারতের ইভিএম প্রক্রিয়া হ্যাক করে কয়েকটি কেন্দ্রের ফলাফল পরিবর্তন করা হয়। এ বছরের মে মাসে ভারতের একটি স্থানীয় নির্বাচনে ১৫ শতাংশের বেশি ভোটিং মেশিন অকার্যকর হয়ে পড়ে। টাইমস অব ইন্ডিয়া পত্রিকার ভোটারদের সাক্ষাতকার নিয়ে দেখে অধিকাংশ বুথেই ভোটের দিন ইভিএম নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হয়। বিতর্কের মুখে ভারতের নির্বাচন কমিশন দাবি করে, গরমে উচ্চমাত্রার কারণে তাদের ইভিএমগুলো হঠাৎ করে নষ্ট হয়ে যায়। এই ব্যাখ্যা নিয়ে সর্বত্র হাস্যরসের সৃষ্টি হয়। গত বছরেই ভারতের আরেকটি নির্বাচনে হিন্দুস্থান টাইমস পত্রিকার অনুসন্ধানে নতুন বিতর্ক বেরিয়ে আসে। সেখানে স্বতন্ত্র প্রার্থীর সবগুলো ভোট চলে যায় সরকার দলীয় প্রার্থীর নামে।
বিভিন্ন গবেষণার ও অনুসন্ধানের রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ইভিএম সহজে হ্যাক করা যায়, চাইলে এক মুহূর্তের মধ্যে ইভিএম এর সবগুলো ফলাফল পরিবর্তন করা সম্ভব। ভোটারের সংখ্যা বাড়ানো-কমানো থেকে শুরু করে যে কোনো প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোটকেও পাল্টে দেয়া যায়। ইভিএম-এ দূর থেকেও ম্যানিপুলেট করা যায়। ইভিএম দিয়ে ভোটারের নাম, বয়স, ঠিকানা, মোবাইল, পরিবার ইত্যাদিসহ যাবতীয় তথ্য একেবারেই পাওয়া যায়। এর অপব্যবহারের মাধ্যমে হুমকি-ভীতি প্রদান থেকে শুরু করে ভোটারের অনুপস্থিতিতে তার নামেও জালভোট দেয়া সম্ভব। নির্বাচনের সাথে জড়িত ব্যক্তিরা সরকারের চাহিদামত ইভিএম এর তথ্য বা ফল রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে এমনকি দলীয় লোকদের হাতেও এই ক্ষমতা চলে যেতে পারে। ইভিএম এর সফটওয়ার পরিবর্তন বা বন্ধ করে নির্বাচনে অস্থিতিশীলতা ও শূন্যতা সৃষ্টি করা সম্ভব। অনেক স্বৈরতান্ত্রিক দেশে নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করে প্রহসন ও নির্লজ্জ কারচুপির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ভোটারদের ইভিএম স্ক্রিনে দেখানো হয় তাদের ভোট সঠিক প্রার্থীর নামে যাচ্ছে। কিন্তু ইভিএম এর ভেতর তথ্য হিসেবে ভোট চলে যায় অন্য প্রার্থীর নামে।

ইভিএম কী?
ইভিএম বা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন কি? ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) হচ্ছে ভোট প্রদানের একটি সহজতর ব্যবস্থা। মেশিনটিতে একটি পূর্ব-প্রোগ্রামিং করা মাইক্রোচিফ থাকে যা প্রতিটি ভোটের ফলাফল তাৎক্ষণিকভাবে হিসাব করে প্রদর্শন করে। এতে ব্যালট কাগজে সিল মারার পরিবর্তে ভোটার পছন্দের প্রতীকের পাশের সুইচ টিপে ভোট দিতে পারেন। প্রতিটি বুথে একটি ইভিএমের প্রয়োজন পড়ে। এটি কয়েকটি ইউনিটে ভাগ করা থাকে। ইউনিটগুলো হলো : ১. ব্যালট ইউনিট : এই ইউনিটটি থাকে বুথের ভেতর। এর মাধ্যমে ভোটার তার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেন। ২. কন্ট্রোল ইউনিট : কন্ট্রোল ইউনিট থাকে সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারের সামনের টেবিলে। ৩. ডিসপ্লে ইউনিট : ইভিএমের সঙ্গে একটি বড় ডিসপ্লে ইউনিট রাখা হয়, যা এমন স্থানে রাখা হয় যাতে বুথের ভেতর ভোট-সংশ্লিষ্ট সবার দৃষ্টিগোচর হয়। ৪. ব্যাটারি ইউনিট : এই মেশিন চালাতে দরকার হয় ১২ ভোল্টের একটি ব্যাটারি। ব্যাটারিতে মেশিনটি সারাদিন চলতে পারে। ফলে বাড়তি কোনও বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় না। ৫. স্মার্ট কার্ড ও মাস্টার কার্ড : একটি ভোটিং মেশিন পরিচালনা করার জন্য সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারকে একটি করে আইডি কার্ড দেয়া হয়। এ কার্ড ছাড়া কন্ট্রোল ইউনিট পরিচালনা করা সম্ভব হয় না। এই ইউনিটগুলো ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানে থাকলেও তারের মাধ্যমে পরস্পরের সাথে যুক্ত থাকে।

ইভিএম কীভাবে কাজ করে?
একটি নির্বাচন কেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারের কাছে থাকে ইভিএমের কন্ট্রোল ইউনিট। এই ইউনিটের সম্মুখভাগে থাকে ডিজিটাল ডিসপ্লে। বিপরীত দিকে থাকে স্টার্ট সুইচ, ব্যালট সুইচ, মেমোরি রিসেট সুইচ, ফাইনাল রেজাল্ট সুইচ এবং ক্লোজ বাটনসহ আরো কিছু সুইচ। ভোট শুরু করার জন্য স্টার্ট সুইচটি চাপতে হয়। তারপর ব্যালট সুইচটি চেপে সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ভোটারকে ভোট দিতে বুথে পাঠান। এই সুইচটি চাপলে বুথের মধ্যে থাকা ইভিএমের অপর অংশ ব্যালট ইউনিটটি একটি ভোট দেয়ার জন্য কার্যকর হয়। ভোট দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার অকার্যকর হয়ে যায় ব্যালট ইউনিটটি, যতক্ষণ না আবার কন্ট্রোল ইউনিটের ব্যালট সুইচ চাপা হচ্ছে। ভোটদান শেষে ভোটার বেরিয়ে গেলে সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার আবার ব্যালট সুইচ চেপে ব্যালট ইউনিটটি কার্যকর করেন। এভাবে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হলে ক্লোজ সুইচটি চাপলেই ভোটগ্রহণ কার্যক্রম পাকাপাকিভাবে বন্ধ হয়ে যাবে এবং ফাইনাল রেজাল্ট সুইচটি কার্যকর হবে। এটি এক এক করে চেপে চললে ব্যালট ইউনিটে সাজানো ক্রমানুযায়ী একের পর এক প্রার্থীদের প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা বেরিয়ে আসে। ইভিএমের অপর অংশ ব্যালট ইউনিটটি রাখা হয় বুথের ভেতর। ভোটার ঢুকে দেখবেন ব্যালট ইউনিটের নিচের দিকে একটি সবুজ বাতি জ্বলছে। অর্থাৎ আপনার ভোট দিন। ব্যালট ইউনিটের ওপর প্রার্থীর নাম ও প্রতীক সাজানো থাকে। প্রত্যেক প্রতীকের পাশে থাকে একটি করে সুইচ। ভোটার তার পছন্দের প্রতীকটির পাশের সুইচটি চাপবেন। ভোটটি গৃহীত হলে ভোটার ব্যালট ইউনিটের নিচের দিকে থাকা লাল বাতিটি জ্বলতে দেখবেন। অর্থাৎ ভোটটি গৃহীত হয়েছে। নতুন ভোটটি গৃহীত হলে সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারের সামনে রাখা কন্ট্রোল ইউনিটের সামনের ডিসপ্লেতে একটি ভোট যোগ হবে। এরপর তিনি আবার অন্য কাউকে ভোটদানের অনুমতি দিয়ে বুথে পাঠালে ভোটার গিয়ে ব্যালট ইউনিটে সবুজ বাতি জ্বলতে দেখবেন। এভাবেই চলতে থাকবে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া। ইভিএমের আরো কিছু... ইভিএমের একটি ব্যালট ইউনিটে ১২ জন প্রার্থীর জন্য ব্যবস্থা থাকে। চাইলে এর সঙ্গে আলাদা আরো পাঁচটি ব্যালট ইউনিট যোগ করে মোট ৬০ জন প্রার্থীর ভোট নেয়া সম্ভব। কোথাও ১২ জনের কম প্রার্থী থাকলে ফাঁকা প্রতীকের সুইচগুলো থাকবে অকার্যকর। ব্যালট ইউনিট অথবা কন্ট্রোল
ইউনিট বিকল হলে কী করা যাবে এ কথা মাথায় রেখে প্রতিটি কেন্দ্রে একটি অতিরিক্ত ইভিএম দেয়া হবে। প্রদত্ত ভোটের হিসাব কন্ট্রোল ইউনিটে সংরক্ষিত থাকে, তাই কোনো ব্যালট ইউনিট বিকল হলে ভালো ইউনিট দিয়ে সেটিকে প্রতিস্থাপন করলেই চলবে। কন্ট্রোল ইউনিটও অনুরূপভাবে প্রতিস্থাপন করা যায়। এ ক্ষেত্রে বিকল কন্ট্রোল ইউনিটে সংগৃহীত ভোট নষ্ট হবে না। নতুন কন্ট্রোল ইউনিটের ফলাফলের সঙ্গে বিকল কন্ট্রোল ইউনিটের ফলাফল যোগ করে ভোটের ফলাফল প্রকাশ করা যাবে। এ প্রক্রিয়ায় সারাদিনের ভোট প্রদান শেষ হলে মেশিন অতি দ্রুত জানিয়ে দেবে কোন প্রার্থী কত ভোট পেয়েছেন। সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ফাইনাল রেজাল্ট সুইচটি চাপলে ব্যালটে সাজানো প্রথম প্রার্থীর প্রতীকের নাম ও প্রাপ্ত মোট ভোট কন্ট্রোল ইউনিটের ডিসপ্লেতে দেখা যাবে। একই সুইচ দ্বিতীয়বার চাপলে দ্বিতীয় প্রার্থীর, এভাবে একে একে সব প্রার্থীর প্রাপ্ত মোট ভোট দেখা যাবে। আগে থেকে সরবরাহ করা একটি ফরমে প্রাপ্ত ভোট সংখ্যাগুলো লিখে সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসারকে দেবেন। প্রতিটি বুথের ফলাফল একীভূত করে প্রিজাইডিং অফিসার অন্য একটি ফরমে তুলে স্বাক্ষর করে রিটার্নিং অফিসারের কাছে তা পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন।

বাংলাদেশে ইভিএম এর সূত্রপাত
সর্বপ্রথম এক এগারোর সময়কার এটিএম শামসুল হুদা কমিশন স্থানীয় নির্বাচনে ইভিএমের প্রচলন ঘটায়। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর সহায়তায় প্রথমে ২০১০ সালে এ প্রযুক্তির ৫৩০টি মেশিন কেনা হয়। ব্যবহার করতে গিয়ে ইভিএমে নানা যান্ত্রিক ত্রুটি ধরা পড়ে। পরে ২০১১ সালে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির (বিএমটিএফ) প্রস্তুত করা ৭০০ ইভিএম কেনা হয়। এগুলোও পুরোপুরি ত্রুটিমুক্ত ছিল না। শামসুল হুদা কমিশন ২০১১ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচনে ২১ নং ওয়ার্ডে বুয়েটের ইভিএম ব্যবহার করে।
পরে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন, টাঙ্গাইল পৌরসভা ও নরসিংদী পৌরসভায় এ প্রযুক্তি ব্যবহার হয়। পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ হওয়ায় হুদা কমিশনের স্থলে বিধির নিয়মে নতুন কমিশন হিসেবে ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিদায়ী রকিব উদ্দিন কমিশন দায়িত্ব নেয়। তাদের মেয়াদে রাজশাহী সিটিতে ২০১৩ সালে ইভিএম ব্যবহার করে পুরো বিতর্কের মধ্যে পড়ে যায় ইসি। পরে কমিশনার হিসেবে মেয়াদ পূর্ণের আগে ইভিএম ব্যবহার করেনি। তবে, নতুন ইভিএমের প্রচলন চালু রেখে যায়। আর ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে কেএম নূরুল হুদার কমিশন দায়িত্বে এসে কমিটি করে পুরনো ইভিএমকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ